বিভাজনের প্রাচীরে বন্দি মুসলিম উম্মাহ
নভোমণ্ডলে বিচরণকারী সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ ও অসংখ্য উপগ্রহ-সবাই এক সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার অধীন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে আবর্তিত হচ্ছে। কেউ তার নির্ধারিত পথ ভুলে যাচ্ছে না। প্রত্যেকেই আপন গতিতে, আপন দায়িত্বে ছুটে চলছে। আর সেই শৃঙ্খলাতেই টিকে আছে সৌরজগতের ভারসাম্য। একটি গ্রহও যদি তার নির্ধারিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তার প্রভাব কেবল তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা ব্যবস্থায়।
পৃথিবীর বুকে বসবাসকারী হাজারো প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ মিলে গড়ে উঠেছে সুবিশাল জীবজগৎ। এ জগতের প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদ কোনো না কোনোভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। একটি প্রাণী হয়তো অন্যটির খাদ্য, আবার সেটিই অন্য কোনো প্রাণীর শিকার। কোনো একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হলে তার প্রভাব শুধু তার নিজের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা জীবজগতে। প্রকৃতির ভারসাম্যে ছোট একটি পরিবর্তনও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
মানবদেহেও একই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। হাত, পা, নাক, মুখ, মাথা, বুকসহ অসংখ্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সমন্বয়েই মানুষের অস্তিত্ব। প্রতিটি অঙ্গের কাজ আলাদা হলেও তারা পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। একটি অঙ্গের কর্মক্ষমতা ব্যাহত হলে তার প্রভাব সামগ্রিকভাবে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে পড়ে। শরীরের সুস্থতা তাই কোনো একটি অঙ্গের সক্ষমতার ওপর নয়; বরং সব অঙ্গের সমন্বিত কার্যকারিতার ওপর নির্ভরশীল।
মুসলিম উম্মাহর ক্ষেত্রেও বাস্তবতা এর ব্যতিক্রম নয়। সাদা-কালো, ধনী-গরিব, আরব-অনারব-সবাই মিলে মুসলিম উম্মাহ। ভাষা, বর্ণ, অঞ্চল, পেশা ও চিন্তার নানা পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইমানের বন্ধন তাদের একসূত্রে আবদ্ধ করেছে। রাসূল (সা.) মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাতে বলেছেন-
‘মুসলমানরা পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতায় একটি দেহের মতো। তার কোনো একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে পুরো শরীর জ্বর ও অনিদ্রার মাধ্যমে তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে।’ (বুখারি, মুসলিম)
এখানে মুসলিম উম্মাহর পারস্পরিক সংযোগ ও দায়িত্ববোধের একটি গভীর চিত্র ফুটে উঠেছে। উম্মাহর কোনো অংশের দুর্বলতা অন্য অংশকে ভাবিত করার কথা। একজনের সাফল্য যেমন সবার আনন্দের বিষয়, তেমনি একজনের বিপর্যয়ও সবার চিন্তার কারণ হওয়ার কথা।
কিন্তু বর্তমান চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। ইমানের বন্ধনে আবদ্ধ এ বিশাল জনগোষ্ঠী নানা পরিচয় ও বিভাজনে খণ্ডিত হয়েছে। মত ও পথের পার্থক্য অনেক সময় সহাবস্থানের সীমা পেরিয়ে পরস্পরের বিরোধিতায় গড়িয়েছে। ফলে যে ভিন্নতাগুলো উম্মাহর শক্তি ও সমৃদ্ধির উৎস হতে পারত, সেগুলোই অনেক ক্ষেত্রে বিভাজনের দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিভাজনের ছাপ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও স্পষ্ট। শিক্ষার বিভিন্ন ধারা নিজেদের পৃথক পরিসর তৈরি করেছে। দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিতরা অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের থেকে দূরে থেকেছেন; একইভাবে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের একটি অংশও আলেম সমাজকে নিজেদের জগতের বাইরে মনে করেছেন। ফলে একই উম্মাহর দুটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণির মধ্যে তৈরি হয়েছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব।
এ শিক্ষা বিভাজনের পেছনে ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাবও কম নয়। হিন্দুস্তানে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রবর্তিত নতুন শিক্ষাব্যবস্থা এমন একটি শ্রেণি গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছিল, যাদের চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পাশ্চাত্যের প্রভাব ছিল। লর্ড ম্যাকলের ১৮৩৫ সালের শিক্ষাবিষয়ক নথিতেও এমন একটি শ্রেণি তৈরির চিন্তার প্রকাশ পাওয়া যায়। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান সত্ত্বেও সেই শিক্ষাদর্শনের প্রভাব আমাদের সমাজে রয়ে গেছে। ফলে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলমানদের একটি অংশের মধ্যে নিজস্ব ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের তুলনায় পাশ্চাত্য জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক প্রবণতার প্রতি বেশি আকর্ষণ লক্ষ করা যায়।
এ শিক্ষা বিভাজন মুসলমানদের দীর্ঘদিনের জ্ঞানচর্চা ও পারস্পরিক সংযোগকে দুর্বল করেছে। দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতদের মধ্যে তৈরি করেছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব। অথচ মুসলিম সভ্যতার জ্ঞানচর্চার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মধ্যে এমন অস্বাভাবিক দেওয়াল ছিল না। একজন ফকিহ, মুহাদ্দিস বা মুফাসসির যেমন উম্মাহর জ্ঞান ও নেতৃত্বের অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন, তেমনি চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, আইনজ্ঞ ও অন্যান্য পেশাজীবীরাও উম্মাহর প্রয়োজন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
এ সমন্বিত জ্ঞানচর্চাই মুসলিম সমাজকে বহুমাত্রিকভাবে এগিয়ে নিয়েছিল। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা উম্মাহর সামগ্রিক প্রয়োজন পূরণে নিজ নিজ ভূমিকা রেখেছে। একজন আলেম দিয়েছেন দ্বীনের দিকনির্দেশনা। একজন চিকিৎসক করেছেন মানুষের চিকিৎসা। একজন প্রকৌশলী গড়ে তুলেছেন নগর ও অবকাঠামো। একজন প্রশাসক পরিচালনা করেছেন রাষ্ট্র। কাজের ক্ষেত্র আলাদা হলেও বৃহত্তর কল্যাণের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ছিল পরস্পর পরিপূরক।
আজ আমাদের প্রয়োজন সেই ঐতিহ্য থেকে শিক্ষা নিয়ে সমন্বয়ের সেই ধারাকে ফিরিয়ে আনা, যেখানে দ্বীনি শিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞান পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহযোগী হিসাবে কাজ করবে। এ যুগের আলেম সমাজকে যেমন সময়ের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, তেমনি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলমানদেরও নিজেদের জ্ঞান ও পেশাকে ইমান, নৈতিকতা ও উম্মাহর কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
সবাইকে একই কাজ করতে হবে না; যার যে যোগ্যতা ও অবস্থান, সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করাই যথেষ্ট। প্রয়োজন শুধু নিজের ভূমিকার পাশাপাশি অন্যের ভূমিকার মূল্য বোঝা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে তোলা। কারণ উম্মাহর শক্তি কোনো এক শ্রেণির একক সক্ষমতায় নয়; বরং বিভিন্ন জ্ঞান, দক্ষতা ও দায়িত্বের সমন্বিত প্রয়াসে।
তাই এখন প্রয়োজন বিভাজনের দেওয়াল সরিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা। দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার দূরত্ব কমিয়ে উভয় ধারার মানুষকে উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণের অভিন্ন লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করতে হবে। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করে অন্যের শক্তিতে শক্তি যোগ করতে পারলেই গড়ে উঠবে সুস্থ, শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ মুসলিম উম্মাহ।
কালীম মাহফুজ
- সুনামগঞ্জে আপত্তির মুখে মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ স্থগিত
- সিলেটে উৎপাদন বাড়াতে ১৫ গ্যাসকূপে তৎপরতা
- দেশের নির্মাতা শিক্ষকরা: শিক্ষামন্ত্রী
- আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস
- নতুন পে স্কেলে বেতন পুনর্নির্ধারণ শুরু আজ, লাগবে যেসব তথ্য
- বিভাজনের প্রাচীরে বন্দি মুসলিম উম্মাহ
- জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো অনুশীলনে লিওনেল মেসি
- সার্বিয়াকে হারিয়ে নেশনস লিগের শীর্ষে নেদারল্যান্ডস
- ঢাকার সব স্থানে হকার বসতে দেওয়া হবে না
- রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলায় আহতদের দেখতে রামেকে শিবির কেন্দ্রীয় সভাপতি
- দেশের সব নাগরিকের নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার’
- ফেনীর পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
- ঘাটতি হবে না এলএনজির, অক্টোবর-নভেম্বরে আসছে ১৯ কার্গো
- দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের প্রতি সহায়তার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
- বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে চীনের বিদায়ী রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ
- নেপাল ভ্রমণে বাংলাদেশি পর্যটকদের সতর্ক করলো দূতাবাস
- নেপাল ভ্রমণে বাংলাদেশি পর্যটকদের সতর্ক করলো দূতাবাস
- দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের নির্দেশ
- প্রাথমিকের নিয়োগ বঞ্চিতদের শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি
- বাংলা কিউআরে লেনদেনে প্রণোদনা ঘোষণা

