`

'কাপুরুষ'

  • Views: 811
  • Share:
জুন ২৬, ২০২০ ২০:৩৪ Asia/Dhaka

মোহাম্মদ আল আমিন নোবেল: জুনিয়র ডেকে বললো, 'ভাই, এক ম্যাম এসেছেন। উইমেন এন্টারপ্রেনার। ঋণ সুবিধা নিয়ে কথা বলবেন।' আমি রুমে পাঠিয়ে দিতে বলে নিজের কাজে মনোযোগী হই। দরজায় টোকা পড়লে চোখ মেলে তাকাতেই বিদ্যুৎস্পর্শের মতো শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে।

             কিছু বলবো কী! ঋণ প্রত্যাশীর অগ্নিদৃষ্টি আমাকে যেন ভস্ম করে দেবে। আমি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াই। কিন্তু কিছু না বলেই অস্ফুটে স্বরে আমার দিকে 'প্রতারক' শব্দটি ছুড়ে দিয়ে হনহনিয়ে বের হয়ে গেলো। 

মনটা উসখুস করছে। করোনার এই সময়ে তার উপর রমজান মাস, দম ফেলার ফুরসত না পেয়ে একটানা কাজ সেরে অফিস থেকে বের হলাম। সরু রাস্তায় একটি দুটি রিকশা অলস বসে আছে। মূল সড়কটি বিরান। আজকাল সড়কটিকে বেশ প্রশস্ত মনে হয়। একটা মন খারাপের অনুভূতি থাকায় গতি বদলে সুনসান রাস্তার উপর এতিম দাঁড়িয়ে থাকা ওভারব্রীজে গিয়ে দাঁড়াই। 

ওভারব্রিজের উপর রাস্তার ঠিক মাঝামাঝি আছি। ডানে বায়ে যেদিকেই তাকাই একটি দু'টি প্রাইভেটকার ছাড়া আর কোন চঞ্চলতা চোখে পড়ে না। একটি মৃতবৎ নগরী আমার পদতলে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। 

রেলিংয়ে থুতনি ঠেকিয়ে সম্মুখে দৃষ্টি প্রসারিত। আকাশটাও থমকে আছে। সূর্যের উপর দিয়ে মেঘেদের ঘন আসা যাওয়া। চঞ্চল মনটা কোথাও ঠাঁই পাচ্ছে না। 

এমন একটা জীবন কি আমাদের প্রত্যাশিত ছিলো? কখনোই না। আজ খুব আফসোস হচ্ছে।    মধ্য বয়সে পা দিই দিই করা অবস্থায় কেন এই অচলায়তন? কেন এই পৃথিবীর থমকে যাওয়া? আজকের এই দিনগুলোতে এই ধীরস্থির পৃথিবী বড় বেশী বেদনার! যখন সময়টি থমকে যাবার দরকার ছিলো তখন পৃথিবী ছিলো বড় বেশী মসৃণ ও গতিময়। অথচ আমার জন্য ছিলো তা বন্ধুর থেকে বন্ধুরতর। 

স্মৃতি এসে চোখ জ্বালা করছে। দু'একটি অশ্রুকণাও কি নির্গত হলো? আমি পাষাণ হৃদয়ে শূণ্য দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রই। আয়নায় যেন পূর্বোতন সকল কিছু ফিরে ফিরে আসে। নিজেকে নিজের প্রতিবিম্বে ফিরে পাই প্রায় দুই যুগ আগের সেই আমাকে। 

আহা! কি সময়টাই না ছিলো! নীরা'কে কেন্দ্র করেই ছিলো সে প্রতিটিক্ষণ। প্রাতেঃ ঘুম থেকে জাগরনের পর এবং রাতে নয়ন দু'টি মুদিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কেবল নীরা আর নীরা। আজ বুঝি ভলোবাসা পাওয়ার আকুলতায় কত বেশী নিরেট বোকা ছিলাম, করেছি কত বোকামি!

প্রবহমান সময়ে হারানো নীরা কে  নিয়ে বেশি ভাবনার সময় হয়নি কখনোই। হয়তো সযতনে এড়িয়ে গেছি কিংবা স্থবির মন গতি পায়নি। আজ সুনসান নীরব এই স্থানে দাঁড়িয়ে মনে পড়ছে, বড় বেশি। নীরা কেমন আছে? সেও কি কভু ভরদুপুরের নির্জনতায় আমাকে স্মরণ করে? নাকি ভুলে থাকার মানসে সবই ভুলে আছে?

দু'যুগ পূর্বে কোন একদিন দুপুরে নীরার আব্বু ডেকে পাঠিয়েছিলো। কারণ বুঝতে পারিনি। বাসায় গেলে দেখলাম নীরার পরিবারের আর কেউ নাই। আমি গেলে আঙ্কেল খুব বেশি ভূমিকা না করেই কথা বলছিলো।
আঙ্কেলঃ তুমি মিলন, আমি জানি। নীরা তোমার খুউ উ উ ব ভালো বন্ধু। তোমাদের বয়সে তোমরা কি ভাবতে পারো তা আমি জানি। 

আমি নতমুখে বসে থাকি। আঙ্কেল আবার শুরু করেন-
আঙ্কেলঃ তোমার পরিবারের কী আছে না আছে তা আমার বিবেচ্য নয়। তোমাদের স্নাতক শেষ। আমি তোমাকে ৬ মাসের সময় দিচ্ছি এর মাঝে একটি সম্মানজনক আয়ের ব্যবস্থা করতে পারলে নীরা'কে তোমার হাতে তুলে দিতে আমার আপত্তি নেই।  

আমি লজ্জায় আর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে মিনমিন করে কিছু বলার চেষ্টা করছিলাম। তিনি স্পষ্টতই বিরক্তির সুরে বলেন, এটাই আমার শেষ কথা। আর হ্যাঁ, এটা যেন নীরা না জানে।

 নীরার বাসা থেকে বের হয়েই মনে হলো আমার আশার আজ সলিল সমাধি ঘটলো। একটানা প্রায় একঘন্টা শহরের আনাচে কানাচে ঘুরলাম। হাঁপিয়ে পড়লেও মানসিক শান্তি মিললো না। আদৌ কি এই জীবনে কখনো শান্তির সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটেছে নাকি ঘটবে?

কত্তদিন পর আজ নীরা আমার অফিসে এসেছিলো! এই কয়েক সেকেন্ড দেখতে পেয়ে মনটা যে শান্তি পেলো তা কি কেউ তাকে কখনো দিতে পেরেছে? পারেনি। অথচ এই মায়াবিনী আমাকে প্রতারক বলে গেলো!

নীরার বাবার শর্ত শুনে আমি তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঢাকা চলে আসি। নীরা জানতো না, বলেও আসিনি। শহর পরিভ্রমণ শেষে বুঝলাম সময় নষ্ট করার সময় আমার হাতে নেই। হেন কোন জায়গা নেই যেখানে যাইনি। একটি চাকুরির সুযোগ নিতে ও করে দিতে কত মানুষজনের পিছনে ছুটে চলেছি। কখনো মনে হতো দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হাঁপিয়ে উঠছি। কুকুরের মতো জিহ্বা বের হয়ে যেতো। মানুষগুলোও যেন কেমন কুকুরের মতো ব্যবহার করতো!

চোখের পলকে ছয় মাস শেষ হয়ে গেলো। শর্ত পূরণ হয়নি তাই আর সেই শহরে ফিরে যাইনি। ভবিতব্য মেনে নিয়েছি। নীরা'কে কিছু বলিনি। চুপিসারে তার জীবন থেকে সরে দাঁড়িয়েছি। 

অথচ আজ চব্বিশটি বছর পর নীরা এসে আমাকে 'প্রতারক' বলে গেলো। আমি চিৎকার করে বলতে চাই আমি প্রতারক নই আমি একজন কাপুরুষ!

 লেখক,
মোহাম্মদ আল আমিন নোবেল
সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার এন্ড কমার্স ব্যাংক লিঃ, উত্তরা শাখা, ঢাকা।
ই-মেইলঃ nobel.sust@gmail.com

user
user
Ad
Ad