`

তিন দশক পর দিল্লিতে সংকুচিত গণতান্ত্রিক পরিসর

  • Views: 2996
  • Share:
অক্টোবার ১৪, ২০২৬ ১৩:৩৯ Asia/Dhaka

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তরকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের নির্ধারিত স্থান হিসেবে বাতিল করেছে দিল্লি পুলিশ। তিন দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক আন্দোলন, শ্রমিকদের দাবি, দুর্নীতিবিরোধী প্রচার এবং নাগরিক অধিকার আদায়ের প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই স্থানের মর্যাদা প্রত্যাহারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মীরা। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে ভারতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানোর সুযোগ আরো সীমিত হতে পারে। এর আগে সোমবার দিল্লি পুলিশের জারি করা এক আদেশে জন্তর মন্তরকে বিক্ষোভের অনুমোদিত স্থান হিসেবে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

কেন বন্ধ হলো জন্তর মন্তর?

জন্তর মন্তর বন্ধের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক চলছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।

অনলাইনে সংগঠিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আন্দোলনসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও জন্তর মন্তরকে কেন্দ্র করে জোরালো হয়েছিল। সেই আন্দোলনের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেন।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ঘিরে কর্তৃপক্ষ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘাতের পর জন্তর মন্তরের মর্যাদা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আসে। তবে দিল্লি পুলিশ আদেশে স্থানটি বাতিলের নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেনি।

বিকল্প তিনটি স্থান নির্ধারণ

জন্তর মন্তরের পরিবর্তে দিল্লিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ আয়োজনের জন্য তিনটি বিকল্প স্থান নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। সেগুলো হলো—রামলীলা ময়দান দিল্লির কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত। বুরারি ময়দান উত্তর দিল্লিতে অবস্থিত। সিবিডি ময়দান পূর্ব দিল্লিতে অবস্থিত।

কর্তৃপক্ষের যুক্তি, বিকল্প স্থানগুলোতে বিক্ষোভ আয়োজনের সুযোগ থাকবে। তবে আন্দোলনকারীদের মতে, শুধু সমাবেশের জায়গা নির্ধারণ করলেই প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত হয় না। জন্তর মন্তর ছিল রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে, সংসদ ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের কাছাকাছি। ফলে সেখানে প্রতিবাদ জানালে তা সহজেই রাজনীতিক, নীতিনির্ধারক ও সংবাদমাধ্যমের নজরে আসত।

মানবাধিকারকর্মী শবনম হাশমি বলেন, জন্তর মন্তর শহরের কেন্দ্রে এবং সংসদের কাছে অবস্থিত হওয়ায় এটি প্রতিবাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল। তার মতে, এই সিদ্ধান্ত ভিন্নমত দমনের একটি পদক্ষেপ।

তিন দশকের আন্দোলনের ইতিহাস

জন্তর মন্তর মূলত ১৮ শতকের একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। তবে এর পাশের সড়কটি ১৯৯৩ সালে বিক্ষোভের স্থান হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। এরপর থেকে শ্রমিক সংগঠন, অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য, দুর্নীতিবিরোধী কর্মী, নারী অধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থীরা এখানে বিভিন্ন দাবিতে সমাবেশ করেছেন।

২০১১ সালে সমাজকর্মী আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল জন্তর মন্তর। শক্তিশালী লোকপাল আইন প্রণয়নের দাবিতে তার অনশন দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরে আন্দোলনের ব্যাপ্তি বাড়লে বিক্ষোভের একটি বড় অংশ রামলীলা ময়দানে স্থানান্তরিত হয়।

এ ছাড়া কৃষকদের দাবি, নারী অধিকার, সরকারি নীতির প্রতিবাদ এবং বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনেও জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবশ্য জন্তর মন্তরে বিক্ষোভের সময় ও পরিসর নিয়ে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।

প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক

জন্তর মন্তরে বিক্ষোভ আয়োজনের অধিকার নিয়ে অতীতেও আইনি বিতর্ক হয়েছে। ২০১৭ সালে ভারতের জাতীয় পরিবেশ আদালত (এনজিটি) শব্দদূষণ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অসুবিধার কথা উল্লেখ করে সেখানে বিক্ষোভ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। পরে ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট ওই এলাকায় বিক্ষোভের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে জানায়, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।

সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পরও সেই বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। একদিকে কর্তৃপক্ষের সামনে জননিরাপত্তা, যান চলাচল ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন রয়েছে; অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলছেন, প্রতিবাদের স্থানকে রাজধানীর কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে নিলে জনদৃষ্টি আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

ভারতের সংবিধান শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার স্বীকার করলেও নির্দিষ্ট স্থানে যেকোনো সময় ও যেকোনো আকারে বিক্ষোভ আয়োজনের অবাধ অধিকার দেয় না। তবে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

জন্তর মন্তরের মর্যাদা প্রত্যাহারের ফলে দিল্লিতে প্রতিবাদের ধরন ও স্থান কীভাবে বদলাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তিন দশকের আন্দোলনের ইতিহাস বহনকারী এই স্থানকে ঘিরে সিদ্ধান্তটি ভারতে নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক পরিসরের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

user
user
Ad