`

বসিলার ৪০ ফুট খাল উদ্ধারে অভিযান শুরু, স্থানীয়দের মনে নতুন আশা

  • Views: 2432
  • Share:
অক্টোবার ১০, ২০২৬ ২১:২১ Asia/Dhaka

ঢাকার মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার ৪০ ফুট খাল তার পুরনো রূপ ফিরে পেতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য জমে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া খালটির স্বাভাবিক রূপ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে শনিবার (১০ অক্টোবর) থেকে সেখানে পাঁচ দিনব্যাপী এক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি শুরু হয়েছে।

এ উদ্যোগ কেবল একটি জলপথ পুনরুদ্ধারের গল্প নয়; এটি মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক, শহুরে দূষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলার আশার গল্প।

একসময় এই খালটি স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এতে বৃষ্টির পানিপ্রবাহ বজায় রাখা এবং চারপাশের জলাবদ্ধতা দূর করতে সাহায্য করত এবং জলজ প্রাণীদের জন্য একটি স্বাভাবিক আবাসস্থল গড়ে উঠেছিল।

আশেপাশের বাসিন্দাদের কাছে এক সময় এ ধরনের খাল কেবল কোনো পানির আধার বা নালা নয়, বরং নগরীর বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের এক অপরিহার্য অংশ। তবে দ্রুত নগরায়নের ফলে বসিলার রূপ ধীরে ধীরে বদলে যায়। আবাসিক ভবন, রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য অবকাঠামোর প্রসারের সাথে সাথে খালটি ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়ে। বর্জ্য অপসারণ, দখল, পলি জমা এবং জলপথ সংকীর্ণ হয়ে পড়ার কারণে এর প্রাকৃতিক কার্যকারিতা হুমকির মুখে পড়ে।

১.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের যে খালটি একসময় একটি মূল্যবান ড্রেনেজ ক্যানেল হিসেবে কাজ করত, তা পরবর্তীতে জলাবদ্ধতা, দূষণ এবং পরিবেশগত অবনতির উৎসে পরিণত হতে শুরু করে।

বসিলার স্থানীয় বাসিন্দা মনির উদ্দিন বলেন, অতীতে এই খালে নৌকা চলাচল করত, কিন্তু এখন এটি হারিয়ে যেতে বসেছিল।

তিনি বলেন, যেহেতু আজ খাল পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে, আমরা খুবই আনন্দিত। আমরা আশা করি এই খালটি তার পুরোনো রূপ ফিরে পাবে।

মোহাম্মদ হাফিজ নামে আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, খালে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ থাকলে স্থানীয় মানুষই এর সুফল পাবে। বর্তমানে এই খালটি মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। খালটি পুনরুদ্ধার করা হলে মশার কারণে সৃষ্ট দুর্ভোগ কমে আসবে।

খালটি পুনরুদ্ধারে পরিবেশবাদী, সেচ্ছাসেবক এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ একসাথে এগিয়ে আসে। এতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও সিটি ব্যাংক পিএলসি-এর সহযোগিতায় মোহাম্মদপুরের বসিলার ৪০ ফিট খাল পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধারের জন্য ‘ফুটস্টেপস বাংলাদেশ’ ১০ থেকে ১৪ অক্টোবর এই পাঁচ দিনব্যাপী উদ্যোগ গ্রহণ করে।

ফুটস্টেপস বাংলাদেশ-এর লোকাল ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড আউটরিচ লিড সৈয়দ রিদওয়ান মুহাম্মদ ঋত্বিক জানান, জমা হওয়া বর্জ্য অপসারণ করা, খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং আশেপাশের পরিবেশের উন্নয়ন করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেন, এই উদ্যোগে ৪০০ জনেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘদিনের একটি শহুরে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়তা করবে।

পুনরুদ্ধার কাজে অংশ নিতে খালের পাড়ে একত্রিত হওয়া সেচ্ছাসেবকেরা খালটিকে পরিচ্ছন্ন করার এবং এর হারিয়ে যাওয়া পরিবেশ ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

সংগৃহীত বর্জ্য অপসারণে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) সহায়তা করার কথা রয়েছে, যা ময়লা-আবর্জনা পুনরায় খালের পাড়ে ফিরে আসা রোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে এই মিশনের অর্থ কেবল ময়লা কুড়ানো নয়। অপসারণ করা বর্জ্যের প্রতিটি টুকরো একটি সুস্থ পরিবেশের দিকে এক একটি পদক্ষেপের প্রতিনিধিত্ব করে। পরিষ্কার করা খালের প্রতিটি অংশ উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্ন লোকালয়ের নতুন আশা জাগায়।

রিদওয়ান বলেন, খালের পরিবেশ বজায় রাখতে এর পাড় ঘেঁষে হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে) তৈরি করা হবে। খালের সংস্কার কাজ শেষে ‘ফুটস্টেপস বাংলাদেশ’ এক বছরের জন্য এর দেখভালের দায়িত্ব পালন করবে।

বসিলার এই খাল পুনরুদ্ধার অভিযান ঢাকার বড় চ্যালেঞ্জগুলোকে তুলে ধরে। রাজধানীর জলপথগুলো দূষণ, দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখার সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে।

খাল পরিষ্কার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ, তবে দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জলপথটি টিকিয়ে রাখতে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দখলের বিরুদ্ধে সুরক্ষা, জনসচেতনতা এবং বাসিন্দা ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে সহযোগিতা অপরিহার্য।

স্থানীয় বাসিন্দাদেরও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। ড্রেন ও খালে গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, সামাজিক পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নেওয়া এবং দূষণের খবর জানানোর মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করতে পারেন যে, এই পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা যেন একটি স্থায়ী পরিবর্তনের রূপ নেয়।

বসিলার ৪০ ফুট খাল পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়—পরিবেশগত পুনরুদ্ধার তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ বুঝতে পারে সর্বজনীন স্থানগুলো সবার এবং সেগুলো রক্ষা করা একটি যৌথ দায়িত্ব।

এই উদ্যোগের সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি পাঁচ দিনে কতটুকু বর্জ্য অপসারণ করা হলো তা দিয়ে নয়; বরং পরবর্তী মাস ও বছরগুলোতে খালটি পরিচ্ছন্ন ও কার্যকর থাকে কি না তা দিয়ে বিবেচিত হবে। এই উদ্যোগ যদি জনগণের মধ্যে স্থায়ী আচরণগত পরিবর্তন আনে এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকে আরও জোরালো করতে উৎসাহিত করে, তাহলে এর প্রভাব কেবল এই খালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আরও অনেক দূর ছড়িয়ে পড়বে।

স্থানীয় বাসিন্দা মনির বলেন, কেবল খাল সংস্কারই যথেষ্ট নয়, খালটি পরিষ্কার রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।

মোহাম্মদপুর থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি ওসমান গনি শাহজাহান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারা দেশে খাল ও নদী উদ্ধারের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন এবং এরই অংশ হিসেবে বসিলার এই খালটি পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে।

user
user
Ad