`
বিশ্বখ্যাত সুগন্ধি আগর-আতরের বাড়ী আজিমগঞ্জ সুজানগর

বিশ্বখ্যাত সুজানগরের আগর-আতরের উৎপাদন ও চাষাবাদ প্রক্রিয়া 

[পৃথিবীব্যাপী তরল সোনা খ্যাত সুজানগরের আগর-আতর শিল্প। বিশ্বব্যাপী এ ব্যবসার মূল উৎপত্তিস্থল মৌলভীবাজার জেলার সুজানগর ইউনিয়ন থেকে বলে এলাকাবাসীর দাবি। তাই এ বিষয়ে জানার আগ্রহ দেশ-বিদেশের সকল মানুষের। সুজানগর এর কৃতি সন্তান সর্বজন শ্রদ্ধেয়, জুড়ী শাহ নিমাত্রা এফ এফ ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জহির উদ্দিন এর লেখা থেকে এবিষয়ে বিশদভাবে জানা যাবে। লেখাটি ৩ পর্বে প্রকাশিত হচ্ছে।..............আজ ২য় পর্ব]
  • Views: 2818
  • Share:
জুন ২৭, ২০২১ ২৩:২০ Asia/Dhaka

অধ্যক্ষ জহির উদ্দিন:: আগর গাছের প্রকৃতি ও চাষাবাদঃ 

আগর গাছ সময়ের আবর্তে ছোট বড়ো বিভিন্ন সাইজ বা আকারের হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক ভাবে বীজ থেকে যে সকল আগর গাছ উৎপন্ন হয় তা  মূলত গাছতলায় পতিত বীজ থেকে এবং পশু পাখির মাধ্যমে বীজ স্থানান্তরিত হয়েও ঘটে। কিন্তু বর্তমানে প্রায় ৩ যুগ ধরে চারা উৎপাদন করে বাণিজ্যিক ভাবেই আগর চাষ করা হচ্ছে । উঁচু ও টিলা ধরনের জায়গায় চাষ করতে হয়। ৫/৬ বর্গফুট দূরত্ব বজায় রেখে চাষ করলে পরিপুষ্টভাবে দ্রুত বেড়ে উঠে । তবে টিলার ঢালু জায়গাতে একটু ঘন হলেও উচু নিচু জায়গার কারণে আলো - বাতাস পায় বলে খুব একটা অসুবিধা হয় না । সমতল জায়গায় সঠিক দূরত্ব বজায় রাখতে হয়। তেমন কোনো সমস্যা বা পরিচর্যার দরকার হয় না, গরু- ছাগলও চারাগাছগুলো খায়না, মাঝে মধ্যে কম বয়েসী গাছের পাতা পোকামাকড়ে  আক্রান্ত করে এবং ঐ সময়ে কেবল একটু পরিচর্যার দরকার হয় ।

তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে মাঝেমধ্যে আগর গাছ চুরি হয়ে থাকে কিংবা লোহা পুঁততে পদ্ধতিগত ভুলের কারণ বা উলু পোকার আক্রমণে কিছু কিছু আগর গাছ মাঝেমধ্যে মারে যায় । আর তেমন কোনো অনাকাংকিত সমস্যায় পড়তে হয় না। এছাড়া তার শিকড় অনেক গভীর পর্যন্ত যায়, শুধু বন্যা বা পানিতে পাঁচ সাতদিন ডুবে থাকলেই কেবল শিকড় পচে গিয়ে গাছ মরে যায় । গাছটি সময়ের আবর্তে দৈর্ঘ্য প্রস্থে অন্যান্য সাধারণ গাছের মতোই বড়ো হয়ে থাকে। সোজা প্রকৃতির এবং উচ্চতায় এ গাছ সাধারণত  ৪০/৫০ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে । এ গাছের কাঠ সাদা রংগের ফাঁফা ও হালকা ঠস ধরনের । কাজেই অন্যকোনো কাজে ব্যবহৃত হয় না। এবং প্রস্ত বা বেরের দিকে দু- চার ফুট থেকে শুরু করে পরিপক্ব সময়ে অর্থাৎ ৩০/৪০ বছরের গাছ প্রস্হে সাধারণত ১৪/১৫ ফুট পর্যন্ত হয়, যা সাইজে অন্যান্য সাধারণ গাছের মতোই হয়ে থাকে । 

** লোহা পুঁতা পদ্ধতিতে আগর আতর উৎপাদনে নতুন প্রক্রিয়ার আবিষ্কার ও প্রচলনঃ
 ৮০/ ৯০ এর দশকে যখন আগর কাঠের প্রাকৃতিক উৎস প্রায় সংকোচিত হয়ে আসে এবং কাঁচামালের সংকটে আগর আতরের ব্যবসা প্রায় স্তবিরাবস্তায় চলতে থাকে।  ওমনি দুঃসময়ে দৈবক্রমে এক ঘটনা থেকে লোহা বা পেরেক পুঁতে ভিন্ন এক বিকল্প প্রক্রিয়ায় আগর আতর উৎপাদনের এক নতুন  ধারণা সৃষ্টি হয়। সুজানগরের ইউনিয়নেরই এক বাড়ির উঠোনের এপাশ-ওপাশে থাকা দুই প্রান্তের কম বয়েসী কচি আগর গাছে পেরেক মারা হয়  অর্থাৎ লোহা পুঁতা হয়, রশি টানিয়ে কাপড় শুকানোর জন্য  এবং এভাবে দীর্ঘদিন কাপড় শুকানোর পর সময়ের আবর্তে আগর গাছগুলো অনেকটা বড় হয়ে যায়। এমতাবস্থায় আগরকাঠের জন্য গাছগুলো কেটে ফেলেন। কেটেকুটে খুঁজাখুঁজির পর দেখেন গাছের কোথাও কোনো আগর নেই,  কেবলই সাদা সাদা কাঠ, তবে গাছের যে যে অংশে কাপড় শুকানোর জন্য বড়ো বড়ো লোহা পুঁতা হয়েছিল, কেবল সে সকল লোহা পুতা অংশের চারিপাশকে কেন্দ্র করে কালো রংগের আগর কাঠ তৈরী হয়েছে । এ থেকে এক নতুন ধারণার সৃষ্টি হয় যে, সাধারণ অপরিপক্ক আগর গাছে পেরেক বা লোহা পুঁতে হয়তো আগর কাঠ ও আগর আতরের কাঁচামাল এভাবেই উৎপাদন করা যাবে। 

এ ধারণাকে কেন্দ্র করে প্রায়  সকলের অজান্তেই তারা সীমিত আকারে লোহা পুঁতে পুঁতে দীর্ঘ দুই -চার বছর রেখে রেখে কেটেকুটে পরীক্ষা চালাতে থাকেন এবং একইসাথে পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে দেখতে থাকেন যে, এ কৃত্রিম প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত আগর আতরের ব্যবহারিক উপযোগীতা ও বাজার সৃষ্টি করা যাবে কিনা ইত্যাদি ।  আর এভাবে অভিজ্ঞতা ও আস্হায় আনতে আনতে যুগ পার হয়ে যায় এবং বিষয়টি পারস্পরিক জানাজানি হলে সুজানগরের আরও অনেকই  আনুমানিক একই প্রক্রিয়ায় বাড়ির আঙ্গিনার বিভিন্ন বয়সের গাছে লোহা পুঁতে-পুঁতে পরীক্ষা চালিয়ে চালিয়ে উৎপাদিত ঐ সব নতুন প্রকৃতির আগর- আতর মধ্যপ্রচ্যে বাজারজাত করে করে অনেকটা আস্হাশীল হয়ে,  নিশ্চিত হন যে, এভাবে আগর আতর উৎপাদন করলেও বাণিজ্যিক সফলতা অর্জন করা যাবে । আর এভাবেই এ নতুন পদ্ধতির কৃত্রিম প্রক্রিয়ায়  উৎপাদিত আগর- আতরে আবারও নতুনভাবে বাণিজ্যিক পথচলা হয় শুরু। তার পরও অভিজ্ঞতায় আনতে আনতে এভাবে প্রায় ৩ যুগ ধরে চলছে এ নতুন পথে, পথচলা ।   

** লোহা পদ্ধতির প্রক্রিয়ায় আগর আতর উৎপাদনের অভিজ্ঞতা অর্জনঃ
 এ প্রক্রিয়ায় আগর আতর উৎপাদনের সঠিক অভিজ্ঞতা পেতে দীর্ঘ সময় নিয়ে কাজ করতে হয় । কেননা, কত বয়সের, কোন সাইজের, কোন সিজনে, বর্ষা, শীত না বসন্তে লোহা পুঁততে হবে এবং লোহা পুঁতা অবস্থায় প্রকৃতপক্ষে কয় বছর রাখতে হবে। এসব ছাড়াও একটা গাছে সর্বোচ্চ কি পরিমাণ লোহা পুঁতা যাবে এবং লোহা বা পেরেক গাছের সাইজ মোতাবেক কতটুকু গভীর পর্যন্ত পুঁতা বাঞ্চনীয় হবে এবং এভাবে একটি গাছ কি পরিমাণ লোহা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে ইত্যাদি । 

এছাড়াও গাছের কেন্দ্র বা মধ্যভাগে কি পরিমাণ জায়গা লোহার আঘাত থেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং লোহাগুলো সোজা না তীর্যকভাবে পুঁতলে ভালো  হবে এবং লোহা এলোমেলো না সারিবদ্ধভাবে মারতে হবে। গাছের নীচ থেকে না উপরের অংশ থেকে লোহা পুঁতলে টেকনিক্যাল সমস্যা হবে না ইত্যাদি খুটিনাটি অনেক কিছুই জানতে হয় । কেবল আতর উৎপাদন করতে হলে কোন পদ্ধতিতে কি পরিমাণ লোহা পুঁততে হবে এবং কয় বছর পর্যন্ত লোহা মেরে রাখতে হবে। আর  আগর কাঠ পেতে হলে কোন পদ্ধতিতে কি পরিমাণ লোহা মারতে হবে এবং সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ কত বছর লোহা পুতা অবস্থায় রাখতে হবে ইত্যাদি ।  শীত,গ্রীষ্ম,বর্ষা কোন সিজনে আগর আতরের জন্য গাছ কাটতে হবে, ইত্যাদি বিষয়াশয় জানতে জানতে এভাবে কয়েক যুগ পার হয়ে যায় । 

**  লোহা মারা পদ্ধিতে আগর- আতর উৎপাদনের অভিজ্ঞতাঃ
অবশেষে অনেকটাই অভিজ্ঞতায় এলো যে, আতর উৎপাদনের জন্য সাধারণত,১২/১৪ বছরের ৪/৫ থেকে ৮/১০ ফুট বেরের রসালো ইয়াং গাছে সারিবদ্ধভাবে লোহা পুঁতে দু থেকে আড়াই বছর রেখে শীতের শুষ্ক মৌসুমে কাটতে হবে এবং এ লোহা বর্ষা মৌসুমে পুঁততে হবে। শু্ষ্ক মৌসুমে লোহা পুঁতলে প্রায় গাছই মারা যায়।  আর লোহা তীর্যকভাবে গাছের উপর থেকে মেরে নীচের দিকে নামতে হবে এবং লোহার কিছু অংশ গাছের বাইরে রাখতে হবে ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির সাথে সাথে ঐ বাইরের অংশ ক্রমশ গাছের প্রস্হের সাথে ঢুকে পড়বে । আর  তীর্যকভাবে পুঁতা থাকলে বৃষ্টির পানি লোহার গোড়ায় আটকে গড়িয়ে ভিতরের অংশে কিছুটা ঢুকলে বেশি সহায়ক হয় । 

আবার আগর কাঠ উৎপাদন করতে হলে গাছের সাইজ অনুযায়ী একটু বড় আকারের এবং পাশাপাশি জয়েন্ট আকারে সাধারণত দুটো করে একটু একটু গ্যাপ দিয়ে দিয়ে একই পদ্ধতিতে লোহা পুঁততে হবে এবং ৪ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত রেখে কাটতে হবে । লোহা এমন মাত্রায় পুঁততে হবে, যাতে গাছের ভিতরের অংশে ২/৩ বর্গ ইঞ্চি পরিমাণ জায়গা লোহার আঘাত থেকে মুক্ত থাকে, গাছটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য । তাছাড়া লোহাগুলো চকচকে নতুন না পুরনো হবে । তবে জং ধরা হলে ভালো হয় ইত্যাদি আরো অনেক খুটিনাটি বিষয়ের প্রয়োগ সময়ের আবর্তে অভিজ্ঞতায় সঞ্চিত হতে থাকে । কাজেই চলমান এ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে আরও নতুন নতুন অনেক ঘটনা ভবিষ্যতের পথচলায় 
সংযুক্ত হবে৷। 

** লোহা বা পেরেক মেরে আগর আতর উৎপাদনের প্রক্রিয়া,পদ্ধতি ও তার জৈবিক  কার্যকারণঃ
 বর্তমান পদ্ধতিতে আগর গাছে  লোহা বা পেরেক পুঁতে আগর আতর উৎপাদন করা হয় ।  প্রাকৃতিক নিয়মেও মাঝে মধ্যে কিছু কিছু আগর কাঠ পাওয়া যায়। পেরেক পুঁতার বৈজ্ঞানিক ও জৈবিক কারণ হচ্ছে, একটা গাছে যখন পেরেক পুঁতা হয়, তখন লোহার চারি পাশে জং জনিতকারণে পচন সৃষ্টি হয় এবং এ পচন থেকে গাছ নিজেকে রক্ষার জন্য প্রাকৃতিক নিয়মেই গাছের কোষগুলো লোহায় পচন ধরা চারি পাশের পচন রোধ করতে লেগে পড়ে এবং  কষের বা কোষের এক প্রলেপ বা  আবরণী তৈরি করতে থাকে।  সময়ের আবর্তে এ আবরণ বা স্তর একটা পরিপক্ক শক্ত পর্যায়ে পৌছালে আগর আতর উৎপাদনের জন্য উপযোগী হয়ে উঠে এবং উৎপাদনের জন্য সময় মতো গাছগুলো কেটে সংগ্রহ করা হয়।

** আগর - আতর উৎপাদনের চলমান প্রক্রিয়ায় আগর গাছের বাণিজ্যিক চাষাবাদঃ
প্রকৃতিকভাবে উৎপাদিত আগর গাছ থেকে যে আগর ও আতর পাওয়া যেতো তার মান অত্যন্ত ভাল হওয়াতে তার বাজার মূল্যও অনেক বেশি পাওয়া যেতো । কিন্তু ৮০ এর দশক থেকে  প্রাকৃতিক উৎস সংকোচিত হয়ে আসলে কাঁচামালের অভাবে প্রায় আগর শিল্প আস্তে  আস্তে বন্ধ হতে শুরু করে এবং বিভিন্ন পর্যায়ের আগর সংশ্লিষ্ট কর্মীরা বেকার হতে শুরু করেন এবং অধিকাংশই  এ ব্যবসা থেকে মুখ ফেরাতে বাধ্য হন। এমতাবস্থায় দৈবক্রমে কৃত্রিম এ নতুন পদ্ধতির আবিষ্কার ও প্রয়োগ শুরু হলে আস্তে আস্তে দীর্ঘ সময়ে তা অভিজ্ঞতায় ক্রমান্বয়ে সমন্বিত হয়ে আগর- আতর উৎপাদনে আবারও প্রাণ ফিরে আসে এবং প্রক্রিয়াটি সুজানগরের আগর আতর ব্যবসায়ী সংশ্লিষ্ট সকলের এক সমন্বিত আস্হায় পরিণত হয় এবং এদেরই সদিচ্ছা ও সহযোগিতায় মৌলভীবাজার জেলার নানা প্রান্তে, বিশেষ করে বড়লেখা, জুড়ি বিয়ানীবাজার ও কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন উঁচু ও টিলা অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদন করে আগর চাষের বিস্তৃতি শুরু হয় এবং নতুন আবিষ্কৃত এ পদ্ধতি ও প্রযুক্তির বদৌলতে আগর- আতরের শিল্পায়ন আজ অনেক অনেক সফলতা অর্জন করছে যা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের পার্ফিউম তথা সুগন্ধি আগর আতরের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেকটা সহায়ক-শক্তিতে  পরিণত হচ্ছে। 

এ প্রক্রিয়া আবিষ্কারের পূর্বে বিগতদিনে যখন সুজানগরের আগর আতরের  প্রায় শিল্প বন্ধ হয়ে যায়,   তখন ভারতীয়দের হাতে এ ব্যবসা প্রায় চলে যায়। আর সিঙ্গাপুরের খাকীমার্কেট আগর আতরের পাইকারি কেনা-বেচার এক কমন মার্কেটে পরিণত হয়, যা বর্তমানেও মধ্যপ্রাচ্যের আগর আতর ব্যবসায়ীদের পাইকারি ক্রয়ের কমন মার্কেটে  পরিণত হয়ে আছে। এ ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে এশিয়া, আফ্রিকার অনেক দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে থেকেও আগর আতর উৎপাদিত হচ্ছে। যেমনঃলাউস,কম্বোডিয়া,মালোশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে এবং তাদের  কমন মার্কেট হচ্ছে সিঙ্গাপুর । আর তার ব্যবহারিক ক্রেতা ও সর্বশেষ গন্তব্য বা  বাজার হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ । বিশেষ করে দুবাই, কাতার,কুয়েত ও সৌদি আরব । এরাবিয়ানরা আগর কাঠকে উদ এবং আগরের আতরকে, দেহনুল উদ বলে । 

**  আতর উৎপাদনের বর্তমান প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিঃ
লোহা পুঁতা গাছের বয়স  দু- আড়াই বছর হলে শীতের শুষ্ক মৌসুমে গাছগুলো সংগ্রহ করা হয়। বেশ কয়েক ধাপের কার্যশেষে আতর উৎপাদনের কারখানায় উৎপাদন প্রযুক্তির মধ্যে ফেলা হয়। প্রথমে গাছ থেকে লোহা ছাড়ানো হয় এবং এর পর ছোট্ট সাইজে কেটেকুটে আতর উৎপাদনের ডেগ বা প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াধীন করার আগে প্রায় মাস খানেক সময় বিভিন্ন টেংকীতে ভিজিয়ে রাখতে হয় তরলীকরণ বৃদ্ধির জন্য। এর পর পদ্ধতিগতভাবে ছোট- বড় ভিন্ন ভিন্ন সাইজের  চুলায় বসানো স্টিলের আতরের ডেগে, যেগুলো সাইজে তিনশো/চারশো ( ৩০০/৪০০) কেজি থেকে শুরু করে হাজার (১০০০) কেজি পর্যন্ত ধারণ ক্ষমতার  রয়েছে। ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী ঐ ভিজানো কাঁচামাল আতরের ডেগে ফেলে একটি নির্দিষ্ট আঁচের আগুনে ক্রমাগতভাবে সিদ্ধ করতে বা জ্বাল দিতে হয়। 

চুলায় সাধারণত ডেগের সাইজ অনুযায়ী বড় আকারের গ্যাস বার্ণার ব্যবহার করা হয় । ডেগের উপরে একটি বড় স্টিলের সরু পাইপযুক্ত ঢাকনা এমনভাবে সীল করে আটকানো হয় যাতে কোনো ভ্যাঁপ বা বাষ্প ঐ নল ছাড়া অন্য কোনো দিকে বের হতে না পারে। নলটি সামনের দিকে ঝুঁকানো অন্য আরেকটি ছোট্ট পাত্রে সংযুক্ত করে রাখা হয়  এবং এ পাইপ বা নলটি শীতল রাখার জন্য একটি পানির টেংকীর মধ্য দিয়ে পাস করা হয় যাতে অতি উত্তাপের কারণে আতর পুড়ে উধাও হয়ে না যায়। কাঁচামালে পূর্ণ ঐ ডেগে ধারাবাহিক ভাবে প্রয়োজনমতো কমিবেশি একটানা ১০/১২ দিন পর্যন্ত জ্বাল দিতে  হয় এবং এ ভাবে ঢাকনার ঐ নল দিয়ে ঐ ছোট  টেংকীতে বাষ্পীয় আকারে জল জমা হতে থাকে এবং ঐ বাষ্পীয় জলের সাথে মিশে বিন্দু বিন্দু তেল  আকারের যে নির্যাষটুকু সংগৃহীত হয় তাই হচ্ছে সুগন্ধি আতর। এভাবে এক ডেগ পরিমাণ জ্বাল দিয়ে ১০/১২ আউন্স আতর সংগ্রহ করা সম্ভব হয় এবং তার পর জমাকৃত ঐ আতরকে ফিল্টার করে নির্মল অবস্থায় বাজারজাত করা হয়।  

আতর উৎপাদনের পরে যে বর্জনীয় কাঠ বের হয়, তাও আবার মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হয়ে থাকে। সেখানে কারখানায় ওগুলোকে চূর্ণ বা ডাস্ট করে তাতে আরো অন্যান্য ফ্লেভার মিক্সিং করে গোলাকৃতির ছোট ছোট চাকতির মতো করে তৈরি করা হয় এবং এগুলোকে ওখানে বখোর নামে বাজারজাত করা হয় । আর এগুলোও পুড়িয়ে সুগন্ধি বিলানো হয় । কাজেই আগর কাঠ ও তার উপজাত সকল অংশই রপ্তানি হয়ে থাকে। 

** আগর-আতরের ব্যবহারিক ও বাণিজ্যিক বাজারঃ
 প্রথমতঃ আগর আতর ও তার উপজাতো সকল উপাদান মধ্যপ্রাচ্যেই রপ্তানি করা হয়, বিশেষ করে দুবাই, কাতার, কুয়েত এবং সৌদি আরব ।  দেশে তার ব্যবহারিক উপযোগীতা এখনো তৈরি হয় নি। কেবল এরাবিয়ানরা এ আগর আতর সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করেন । 
আগর কাঠ থেকে সুগন্ধি গ্রহণের পদ্ধতিঃ
 এ কাঠ আগরদানিতে কয়লার মৃদু আগ্নিতে বা ইলেক্ট্রনিক হিটারে বা কয়েলের মতো আগরদানিতে অল্প অল্প করে পুড়িয়ে দীর্ঘ সময় ব্যাপী সুগন্ধি বিলানো হয়। 
আগরের আতরঃ 
এটা সাধারণত গায়ে এবং জামায় লাগিয়ে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং এ আতর পিওর ও উন্নত মানের হলে তার সুগন্ধি বেশ দীর্ঘস্হায়ী হয় । এছাড়াও বর্তমানে আগর- আতরকে বিভিন্ন মূল্যবান প্রসাধনী দ্রব্য  উৎপাদনের ফ্লেভার হিসেবেও ব্যবহার করা হয় । 

** আগর কাঠ ও আতরের বাণিজ্যিক বাজার  মূল্যঃ 
প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত কাঁচামাল থেকে উৎপন্ন আতরের সমাদর ও মূল্য সাধারণ লোহা পুঁতে তৈরি কাঁচামালের আগর-আতরের মূল্যের চেয়ে ২/৩ গুণ বেশি হয়ে থাকে। তবে এর উৎস অত্যন্ত সীমিত । যদিও স্হানীয় বাজারে এ রকমের আতরের প্রতি আউন্সের (৩৫ গ্রাম) মূল্য ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর কৃত্রিম লোহা পুতা প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত আতরের প্রতি আউন্স স্হানীয় বাজারে ৬ থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বর্তমানে বেচাকেনা হচ্ছে । 

আগর কাঠের মূল্যঃ 
আগর সাধারণত যেতো ভালো হবে তার রং ততোই কালো ও গভীর হবে,  এবং অনেক বেশি ভারী ও মসৃণ হবে। মান বা ধরন অনুযায়ী তার মূল্য ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। আগর আতরের মধ্যে আগর কাঠ অনেক বেশি মূল্যবান । স্হানীয় বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি ১৫/২০ হজার থেকে শুরু করে দেড়/ দুই  লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। আবার  মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে এগুলোর মূল্য কাস্টমার ও বাজারভেদে ২ থেকে ৩ গুণ পর্যন্ত হয়ে থাকে। 

** পুরাতন পদ্ধতির আতর উৎপাদন প্রক্রিয়াঃ 
উল্লেখ্য যে, চলমান নতুন এ পক্রিয়া ও পদ্ধতির পূর্বে পুরাতন পদ্ধতিতে আতর উৎপাদনের ক্ষেত্রে এখনকার চেয়ে ছোট আকারের ভিন্ন সাইজের তামার ডেগ ব্যবহৃত হতো, যার উপরের নলযুক্ত ঢাকনাকে শর্ভুষ বলা হতো এবং নলটি যে পাত্রে বাষ্পীয় জল জমার জন্য সংযুক্ত করা হতো, তাকে ভখবা বলা হতো এবং এ ভখবা ও নলের জয়েন্টকে সীল করার অংশকে পাগড়ি বলা হতো এবং এ পাগড়ি দিয়ে জলীয় বাষ্পকে আটকে রাখতে হতো ।  তামার তৈরি এ ভখবাটি শীতলকরণের জন্য পানিতে ডুবিয়ে রাখার গর্তে গোলাকৃতির মাটির তৈরী বড় গামলা সাইজের যে পাত্রে আতরের ভখবা গলা পর্যন্ত ডুবয়ি রাখা হতো, তাকে মারুওয়া বলা হতো । এখনকার মতো একটা তামার কাপনাও ছিলো।  ভখবার পানিতে হাত চুবিয়ে ঐ কাপনায় হাত ঘষে ঘষে পানি থেকে আগরের তেল বা আতর পৃথক করা হতো । 

তবে এখনো সেই আগের মতো স্টীলের কাপনা একইভাবে ব্যবহার করা হয় । তবে বর্তমানে ফোমের স্পঞ্জ চুবিয়ে চিপেও আতর পানি থেকে পৃথক করা হয়। তখন কেবল কাঠের আগুনেই ডেগ জ্বাল দেয়া হতো এবং মারুওয়ার পানি বেশি গরম হলে, পানি পরিবর্তন করে ঠান্ডা পানি দেয়া হতো,যাতে অতি উত্তাপে আতর উধাও হয়ে না যায়। এভাবে লোহার গাছের মতো সারা গাছটি জ্বাল দেয়া হতো না, কেবল আগর পৃথককরণের সময় উপজাত কালো আঁচড়ের  গন্ধযুক্ত যে চুরণ বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশটুকু বের হতো, কেবল তা চূর্ণ করে জ্বাল দিয়ে আতর উৎপাদন করা হতো এবং ঐ আতর গুণে- মানে বর্তমান লোহার গাছের আতরের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত মানের হতো। 

** ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাঃ
আগর- আতর ব্যবসায় অভিজ্ঞতা খুবই জরুরী একটি বিষয়। কারণ এটা অন্যান্য যে কোনো ব্যবসা থেকে কিছুটা ভিন্ন ধরনের । উৎপাদন থেকে শুরু করে বেচাকেনার সকল পর্যায়ে প্রচন্ড রকমের এক অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় । কেননা আগর আতরের কাঁচামাল থেকে শুরু করে উৎপাদিত আগর- আতরের ক্ষেত্রে কোথাও কোনো নির্ধারিত মূল্য থাকে না এবং ভালোমন্দের ক্যাটাগরির তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট  শ্রেণীবিন্যাসও নেই।  অভিজ্ঞতা আর অনুমান নির্ভরতাই কেনা-বেচার মূল হাতিয়ার। আতর যিনি উৎপাদন করেন তিনিই কেবল জানেন এর পিওরিটির মাত্রা । হাত বদলের সাথে সাথে ভেজাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং পাতলা  আগর কাঠকে ভারীকরণ ও নিম্নমানের কাঠকে ভালো মানের মতো দেখানোর জন্য অনেক সময় কলো রংগের চিকন আঁচড় বৃদ্ধির  জন্য কৃত্রিমতার আশ্রয়ও নেয়া হয় । 

কোনো কোনোটি ছোট ছোট খন্ডের চিপসে পরিণত করা হয়। আবার প্রয়োজনে কোনো কোনোটিতে ভিন্ন অংশ জোড়া লাগিয়ে একটি সুন্দর ডেকোরেশনাল আর্টিস্টিক্যাল পিসে পরিণত করা হয়। কাজেই তার দেখার নান্দনিক সৌন্দর্য, ঘ্রাণ ও ভারীত্ব ইত্যাদি বিষয়েরও অভিজ্ঞতা থাকতে হয় । এছাড়া যিনি উৎপাদন করেন তার ব্যক্তিত্বে আস্হা, আদর্শ ও বিশ্বস্ততার উপরেও অনেকটা নির্ভরশীল হতে হয়। কাজেই অভিজ্ঞতা ও পারষ্পরিক আন্তঃসম্পর্কের উপর এ ব্যবসায় অনেকটা নির্ভর করতে হয়।..............(চলবে)

লেখকঃ
মোঃ জহির উদ্দিন,
অধ্যক্ষ ,শাহ নিমাত্রা এস.এফ. ডিগ্রী কলেজ, ফুলতলা , জুড়ি।

আরও পড়ুন: 

বিশ্বখ্যাত সুগন্ধি আগর-আতরের বাড়ী আজিমগঞ্জ সুজানগর

user
user
Ad