`

বিশ্বখ্যাত সুগন্ধি আগর-আতরের বাড়ী আজিমগঞ্জ সুজানগর

[পৃথিবীব্যাপী তরল সোনা খ্যাত সুজানগরের আগর-আতর শিল্প। বিশ্বব্যাপী এ ব্যবসার মূল উৎপত্তিস্থল মৌলভীবাজার জেলার সুজানগর ইউনিয়ন থেকে বলে এলাকাবাসীর দাবি। তাই এ বিষয়ে জানার আগ্রহ দেশ-বিদেশের সকল মানুষের। সুজানগর এর কৃতি সন্তান সর্বজন শ্রদ্ধেয়, জুড়ী শাহ নিমাত্রা এফ এফ ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জহির উদ্দিন এর লেখা থেকে এবিষয়ে বিশদভাবে জানা যাবে। লেখাটি ৩ পর্বে প্রকাশিত হচ্ছে..............আজ ১ম পর্ব]
  • Views: 8190
  • Share:
জুন ১, ২০২১ ১৮:১২ Asia/Dhaka

অধ্যক্ষ জহির উদ্দিন:: আগর কাঠের আবিষ্কার, ক্রমবিকাশ ও বাণিজ্যিক উৎপাদনঃ

শত শত বছরের পথপরিক্রমায় প্রকৃত উৎসের কথা অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যায় । সম্প্রতি সিলেটি একটি বিয়ের গান ব্যাপকভাবে ভাইরাল হওয়াতে কত যুগ পর আজ তার উৎস বা গীতিকার খুঁজা হচ্ছে ।  আগর আতরের ক্ষেত্রেও হয়তোবা এমনটাই । উৎকর্ষের উচাটনে একসময় প্রবল হয়ে ওঠে তার উৎস বা আবিষ্কারের গল্প ও রহস্যকে জানার ইচ্ছেগুলো এবং ততোদিনে তা হয়তো তার মূল উৎসের সংযোগ বা পথ হারিয়ে ফেলে ।

এ বিশ্বের অনেক কিছুই সরাসরি টার্গেট করে আবিষ্কৃত হয় নি । একটা কিছু করতে গিয়েও অনেক সময় অন্য আরেকটি বেরিয়ে আসে। যেমন X-Ray বা রঞ্জনরশ্মি । কিংবা আমরা যদি কফির কথাই বলি। প্রায় নয় শত বছর আগে আফ্রিকার একটি দেশে গরুর মালিক গরু চরাতেন এক জঙ্গলের পাশে এবং তিনি প্রায়ই খেয়াল করতেন যে, একজাতীয় কিছু গাছের পাতা ও বিচি খেলে ঐ দিন গরুগুলোর মধ্যে বেশ উত্তেজনা কাজ করে এবং সেজন্য গরুগুলোর চঞ্চলতা বেড়ে যায় এবং বার বার এমনটি দেখতে দেখতে ঐ গাছের প্রতি গরু পালকের মনোযোগ নিবিষ্ট হয় এবং কৌতহল বশত তিনি নিজে ঐ গাছের গোটা ( বিচি ) খেয়ে বেশ চাঙ্গাভাব অনুভব করতেন । 

আর এভাবেই তার পরীক্ষামূলক এ অনিভুতি ও একটা কিছু বুঝতে পারার উৎস থেকেই আজকের আধুনিক বিশ্বের কফির সূত্রপাত । 

আগর আতরের আবিষ্কারের কাহিনীও হয়তোবা অনেকটাই এরকম । উৎস বা আবিষ্কারের সুনির্দিষ্ট কোনো গল্প আমি জানতে পারিনি । তবে ধারণা করা হয় যে, যেহেতু আগরগাছ ঠস বা ফাঁফা ধরনের আগাছা জাতীয় বৃক্ষ এবং এটা কোনো আসবাবপত্র তৈরির কাজে লাগানো যায় না, কেবল একটু পুড়ানোই যায় । এভাবে প্রাচীন কালের কোনো এক সময়ে গাছের কাঠ পুড়াতে গিয়ে কেউ হয়তোবা বার বার দেখেন যে, এ গাছের ভেতরের কালো রংগের দাগযুক্ত অংশটি পুড়ার সময় মনোমুগ্ধকর একটি সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে, আর এভাবেই এ আগাছা জাতীয় বৃক্ষটি সুগন্ধি গাছ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং শত শত বছরের পথপরিক্রমায় বিবর্তিত হতে হতে আজ তার উন্নত উৎপাদন ও বাণিজ্যিক ক্রমোবিকাশ ঘটে । 

আগর আতরের নামকরণঃ 
আঞ্চলিক ভাষার প্রভাবে বিভিন্ন ভাষার শব্দে, এমনকি নিজ ভাষারও অনেক পরিবর্তন ও পরিমার্জন ঘটে কালের স্রোতে ব্যবহারিক আবর্তে ।  যেমন, শীলহট থেকে শ্রীহট্ট, শ্রীহট্ট থেকে সিলট এবং সিলট থেকে আজকের পরিমার্জিত সিলেট কয়েক শত বছরের পথপরিক্রমায় এ ক্রমবিকাশ । কিংবা  সিলেট জকিগঞ্জের ছাগলির কথাই যদি বলি, প্রথমে ছিলো, সাহেবের গলি, তারপর আরেকটু পরিবর্তিত হয়ে, শাহের গলি এবং সব শেষে দীর্ঘ দিন যাবৎ থেকে সাহেবের গলি, ছাগলি হয়ে গেছে ।  অম্বর, আম্বর মানে সুগন্ধি  এবং ঐ একইভাবেই অম্বর থেকে আম্বর এবং আম্বর থেকে আনঞ্চলিক ভাষায় পরিশীলিত হতে হতে কালের স্রোতেই আগর ও আতরে নামান্তরিত হয়েছে । আর আগর-আতর মানে সুগন্ধি । আগর গাছের ভিতরের কাঠ সাদা রংগের । আর আগর বা আগর কাঠ হচ্ছে ঐ  আগর গাছ থেকে উৎপাদিত কালোরংগের সুগন্ধি অংশটি বা কালো কাঠ যা বিশেষ প্রক্রিয়ায় পুড়িয়ে সুগন্ধি বিলানো হয় । আর আতর হচ্ছে ঐ গাছের হালকা কালো রংগের অংশ যা দিয়ে আগর কাঠ তৈরী করা যায় না, তা থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত তরল তৈল জাতীয় সুগন্ধি উপাদান যা গায়ে বা জামায় লাগিয়ে ব্যবহার করা হয় । 
 
** দেশ বিভাগের উত্তর-পূর্ব সময়ের কিছু  সুবিধা ও সংকটের কথাঃ
১৯৪৭ শের পূর্বে অবিভক্ত ভারতবর্ষের নানা পাহাড়ি অঞ্চল যেমন অজাই,শীলচড়, আসাম,কাচাড়,ইমপল,নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা  ইত্যাদি জায়গা থেকে আগর কাঠ  ও আগর আতর উৎপাদনের কাঁচামাল অবাধে আজিমগঞ্জ সুজানগরের কারখানায় সংগ্রহ করে নিয়ে আসা হতো এবং এখানের অভিজ্ঞ কারিগরদের মাধ্যমে আগর কাঠ ও আগর আতর উৎপাদন করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হতো এবং এ শতভাগ রপ্তানি দ্রব্য আজও একইভাবে এ সুজানগর কেন্দ্রিক শিল্পায়নের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করে প্রচুর ফরেন কারেন্সি আমদানি করা  হচ্ছে এবং প্রকৃতির বিশেষ এক বদান্যতায় এই সুজানগর যেন ভৌগোলিক ভাবেই আগর- আতরের ইন্ডেক্স ভূমিতে পরিণত হয়েছে । 

** ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পরঃ 
আগের মতো আর অবাধ যাতায়াত ও আগর আতরের কাঁচামাল পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিকভাবে আমদানি করা সম্ভব হতোনা এবং আগর আতর উৎপাদনের বৃহত্তর প্রাকৃতিক উৎসটুকু ভারত অঞ্চলেই থেকে যায়। ভারত থেকে আমদানি করতে, পাক প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকাতে এ আগর- আতরের ব্যবসা অনেকটাই সংকোচিত হয়ে পড়ে । তখন কেবলই প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত  বর্তমান সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার পাহাড়ি অঞ্চল, উপত্যকা ও টিলাব্যাষ্টিত গ্রামাঞ্চল থেকে আহরিত আগর গাছ থেকে উৎপাদিত আগর- আতর দিয়ে সীমিত আকারে একদল লোক ব্যবসা-বাণিজ্য চালাতে থাকেন এবং আরেক দল লোক কাঁচামালের আমদানি সংকটের কারণে আগর আতরের দক্ষ জনবল ও আতর উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে একইসাথে ভারতে পাড়ি জমান। এভাবেই এ আজিমগঞ্জ সুজানগরের কিছু আগর কারিগর ও  ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই  আগর- আতরের ব্যবসা ভারতে সম্প্রসারিত হয় এবং এ ব্যবসা পাশাপাশি একসময় ভারতীয়দের হাতেও চলে যায়। 

** স্বাধীনতা উত্তোর এ ব্যবসাঃ
 প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে এবং এ সংকটকালীন সময় কিছুটা অতিবাহিত হলে ৮০ র, দশকের শেষ দিকে আবারও একটু একটু করে সিলেট, মৌলভীবাজারের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত আগর- গাছ থেকে আগর - আতর উৎপাদন করে সীমিত আকারে  মধ্যপ্রাচ্যে সে আগের মতোই রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয় এবং ঐ সময়ে এ সুজানগর ইউনিয়নের বেশ কিছু মানুষও মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থানের জন্য পাড়ি জমান, আর এর সুবাদে আগর- আতরের ব্যবসাও সম্প্রসারিত হতে শুরু করে এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হতে থাকলে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত আগর- গাছের সংকট দেখা দেয় এবং ক্রমান্বয়ে আগর শিল্প ও তার ব্যবসা সংকোচিত হতে থাকে। 

** প্রাকৃতিক উৎসঃ 
সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত আগর- গাছ থেকেই আগর আতর উৎপাদনের এক মাত্র উৎস ছিলো । আর এ প্রক্রিয়ায় সব গাছ থেকেও সব সময় আগর কাঠ পাওয়া যেতো না । আবহাওয়া, ভৌগোলিক অবস্হান, মাটির ধরন ইত্যাদির উপযোগিতা এবং বিশেষ বিশেষ কারণে অনেক সময় দীর্ঘ দিনের পুরাতন বয়সের গাছ থেকেই কেবল আগর কাঠ ও আতর উৎপাদনের কাঁচামাল পাওয়া যেতো। অল্প বয়সের গাছ খুব একটা কাজে আসতো না। আবার সব পুরনো পাছেও অনেক সময় উপরোক্ত কারণে আগর- আতরের কাঁচামাল পাওয়া যেতো না । আর গাছ পুরাতন বা পরিপক্বতা পেতেও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হতো এবং বিশেষ করে বিভিন্ন পুরনো গাছে প্রাকৃতিকভাবে নানা পোকামাকড়ের আক্রমণ ও সংক্রমণের জন্য দীর্ঘ সময়ে গাছের ঐ সকল অংশে ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং যে সকল গাছে নানা ছিদ্রপথ তৈরি হয় সাধারণত সেগুলোতে বৃষ্টির পানি ঢুকার কারণেও গাছের ঐ সকল অংশে পচন ধরে  এবং গাছ এ পচন থেকে আত্মরক্ষার জন্য প্রাকৃতিক নিয়মেই  আভ্যন্তরীন জৈবিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ক্ষতের চারি পাশে শক্তিশালী প্রটেকশন তৈরি করতে গিয়ে অভ্যন্তরের এখানে-ওখানে কষের একটি শক্ত আস্তরণ ক্রমাান্বয়ে গড়ে তোলে এবং এ আস্তরণ ঘনীভূত হয়ে কালো রংগের ঘন অংশে পরিণত হয় এবং  যত বেশী শক্ত হয় ততো বেশি কালো রং ধারণ করে এবং ততই ভারী, মসৃণ ও বেশি সুগন্ধি হিসেবে ততো বেশি মূল্যমানের আগর কাঠ হয়ে থাকে । 

** আগর কাঠ ও আগর আতর উৎপাদন প্রক্রিয়াঃ 
 গাছ কেটে তার ভিতরের সম্ভাব্য যে যে অংশে আগর থাকতে পারে ঐ সকল অংশগুলো দাইয়া কামলার মাধ্যমে কেটে আলাদা করে কারখানায় নিয়ে আসা হয় এবং কিছুটা শুকালে ঐ সকল অংশগুলো থেকে ফ্রেশ আগর কাঠ পৃথককরণের কাজ শুরু হয় । এ আগর কাঠ থেকে  আগরের অংশ পৃথককরণের জন্য কয়েক স্তরের দক্ষ আগরকামলা বা কারিগরের প্রয়োজন হয়, যাদের নিপুণ হাতের বাটালী কর্মে স্তরে স্তরে, কুরে কুরে সাদা ও হালকা কালো রংগের অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো কেটে ফেলা হয় । মসৃণতা বাড়িয়ে চিক চিক করণের জন্য বাটালি বা রডের ঘর্ষণেরও প্রয়োজন হয় ।

বিশ্বখ্যাত সুগন্ধি আগর-আতর সংরক্ষনে ব্যস্ত আজিমগঞ্জ সুজানগরের ব্যবসায়ীরা।

পরিশেষে সুন্দর কালো রংগের মসৃণ আগর কাঠে রুপান্তরিত করেই তা বাজারজাত করা হয়। আর এ আগর কাঠ উৎপাদন করতে গিয়ে বেশ কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতো কাঠ উৎপন্ন হয় এবং এ সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঠের চূর্ণগুলোকে চূরণ বলে । আর এ চূরণগুলোকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ডাস্ট করে, মাস খানেক পানিতে ভিজিয়ে রেখে তার পর আতর উৎপাদন প্রযুক্তির মাধ্যমে বাষ্পীকরণ পদ্ধতিতে তার নির্যাষ বা যে তৈলাক্ত  অংশটি আহরণ করা হয়, তাই হচ্ছে সুগন্ধি আতর।..............(চলবে)

লেখকঃ
মোঃ জহির উদ্দিন,
অধ্যক্ষ ,শাহ নিমাত্রা এস.এফ. ডিগ্রী কলেজ, ফুলতলা , জুড়ি।

user
user
Ad
Ad