`

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে এবার উত্তাল ফ্রান্স

  • Views: 2405
  • Share:
অক্টোবার ৭, ২০২৬ ১১:১৪ Asia/Dhaka

স্কুলের বেহাল অবস্থা, শিক্ষক সংকট ও অর্থের অভাবের প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা রাস্তায় নামেন। বিক্ষোভকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে সহিংস শিক্ষার্থী আন্দোলন বলে উল্লেখ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু।

প্যারিস, স্ত্রাসবুর্গ, রেন, লিয়ন, তুলুজসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মঙ্গলবার কয়েক ডজন শহরের বিক্ষোভে আড়াই লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। তবে আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার।

লেকর্নু আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন, সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১৫ কিশোর ও ৮৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন। তার ভাষায়, কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির স্কুলব্যবস্থায় এটাই সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি। এ ছাড়া ৭০০-এর বেশি পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ৪৮ জন নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন এবং ৪৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্যারিসে প্রায় ৩০০ মুখোশধারী ও মাথা ঢাকা ব্যক্তি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। শহরের কয়েকটি দোকানের সামনেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় বিক্ষোভ মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল।

সেপ্টেম্বরে প্যারিসের দরিদ্র উপশহরগুলোতে এ আন্দোলনের শুরু হয়। পরে তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দেশটির প্রায় ৩ হাজার ৭০০ উচ্চবিদ্যালয়ের অনেকগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক রক্ষণাবেক্ষণের কাজ হচ্ছে না। কোথাও পানির পাইপে লিকেজ, কোথাও ইঁদুরের উপদ্রব। শিক্ষক সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে।

উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংগঠন জানিয়েছে, ফ্রান্সের অর্ধেকের বেশি উচ্চবিদ্যালয় মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) অবরুদ্ধ ছিল অথবা দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়। কিছু এলাকায় শিক্ষার্থীদের ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

স্ত্রাসবুর্গের সাম্প্রতিক উচ্চবিদ্যালয় পাস করা শিক্ষার্থী হুগো ভেটজেল বলেন, দেশের অভিজাত শ্রেণি ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান তৈরি হয়েছে। মার্সেই ও নঁতে বিক্ষোভকারীরা হাতে তৈরি প্ল্যাকার্ডে ‘রাষ্ট্রই জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে’ লেখা প্রদর্শন করেন। তুলুজে অভিভাবকেরাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিছিলে অংশ নেন।

বিক্ষোভকারীদের দাবি মূলত ধর্ম বা অভিবাসনকেন্দ্রিক নয়। তারা শিক্ষক সংকট, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকা এবং স্কুলের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করছেন। তবে মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কয়েকটি সংগঠন অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ করেছে।

সরকারের দাবি, আন্দোলনে বাইরের লোকজন ঢুকে পড়েছে এবং কিছু এলাকায় বিক্ষোভ নগর সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।

প্যারিসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আর্জন্তয় এলাকার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ওমর সালাউতি বলেন, সরকার তরুণদের ভালো ও খারাপ বিক্ষোভকারী হিসেবে ভাগ করার চেষ্টা করছে। তার দাবি, কিছু জায়গায় আবর্জনার পাত্রে আগুন না জ্বললে সরকার সমস্যাগুলো নিয়ে এতটা সচেতন হতো না।

আন্দোলনের চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো পূরণে মন্ত্রীদের পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় বিকল্প শিক্ষক নিশ্চিত করা, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ স্কুল সময় পর্যালোচনা এবং দুপুরের খাবারের বিরতি বাড়ানোর বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া পুরোনো স্কুল ভবনগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অক্টোবরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে প্রথম দফার প্রস্তাব দিতে মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

তবে অভিভাবকদের অনেকে সরকারের এসব আশ্বাসে সন্তুষ্ট নন। প্যারিসের হেলেন বুশে স্কুলের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অভিভাবক এমিলি লোম বলেন, সরকারের কথা শুনতে ভালো লাগলেও এতে তাদের সন্তানদের প্রতিদিনের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসবে না।

এদিকে শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন করে অর্থ ব্যয়ের পথও কঠিন হয়ে উঠেছে। দুর্বল অর্থনীতি, বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি কমানোর চাপের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স। গত সপ্তাহে দেশটির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার সাময়িকভাবে ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের বেশি উঠেছিল।

ফ্রান্সের ঋণের খরচ বাড়ায় এর প্রভাব ইউরোপের অন্যান্য দেশেও পড়তে শুরু করেছে। ইউরোর দরপতনও নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেক্যুর মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বলেছেন, এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

আগামী বসন্তে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থী জনতাবাদী নেত্রী মেরিন ল্য পেন বর্তমানে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি নির্বাচিত হলে সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হওয়ার মধ্যে নিজের আর্থিক নীতির সক্ষমতা তুলে ধরতেই তিনি এই পরিকল্পনা দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় ফ্রান্সের শিক্ষা খাতে ব্যয় কমেছে। একই সময়ে সামগ্রিক শিক্ষাগত ফলাফলে দেশটির শিক্ষার্থীরা অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে বলে ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়নের তথ্য উঠে এসেছে।

user
user
Ad