`

বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রম: সামাজিক রীতিনীতি, প্রথা, কুপ্রথা ও বাস্তবতা  

  • Views: 5868
  • Share:
জুন ৯, ২০২১ ২০:২৩ Asia/Dhaka

মোঃ নুরুজ্জামান বিশ্বাস:: আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও কর্ম জীবনের বড় একটা সময় বাংলাদেশের গ্রামে ও শহরে পার করে এসেছি।  ঢাকার অভিজাত এলাকায় থাকলেও মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও অসচ্ছল পরিবারের পারিবারিক কাঠামো  ও সামাজিকতা প্রত্যক্ষ করে কিছু বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তা উপলব্ধি করে কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আবার ১০ বছরের প্রবাস জীবনে পশ্চিমা বিশ্বের সামাজিকতা ও পারিবারিক কাঠামো দেখেছি। দেশে ও প্রবাসে প্রত্যক্ষ করা সামাজিকতা ও  পারিবারিক কাঠামোর কিছু সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য মেলানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু কেন যেন অনেক ক্ষেত্রে সমীকরণটা কিছুতেই মিলছে না।

আমাদের দেশে গ্রামে ও শহরে উভয় জায়গাতেই পথে ঘাটে বা রাস্তার পাশে অনেককে প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন করতে দেখেছি। তবে ১০ বছর প্রবাস জীবনে এটা চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না এবংপশ্চিমা দেশসমূহে এটা আইন বিরোধী। অপরদিকে প্রবাসে পথে ঘাটে পূর্ণ বয়স্ক নর- নারী একে অপরকে  জড়িয়ে ধরে চুমো খেতে দেখেছি যা পশ্চিমা দেশসমুহে সাধারণ ঘটনা। পক্ষান্তরে, এটা আমাদের দেশে সামাজিক প্রথা বিরোধী এবং আইনের চোখে অপরাধ। তবে পশ্চিমাদের মত আমাদের দেশে বিবাহ বহির্ভূত অবৈধ সম্পর্ক এখন সামাজিকতার হাল ফ্যাশনে রুপ নিয়েছে।  

দেশে ও প্রবাসের ছোট ছোট কয়েকটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করলাম। এরকম হাজারও প্রসঙ্গ আছে যেগুলো  বাংলাদেশের একটা প্রবাদকে মনে করিয়ে দেয়, “এক দেশের গালি, অপর বুলি”। 

পশ্চিমা বিশ্বে সাধারণত সন্তানের (ছেলে মেয়ে উভয়ের) বয়স ১৮ বছর হলে তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে। বাবা মা তাদের স্বাধীন চিন্তাকে সম্মানের চোখে দেখেন। এসব দেশে সন্তানের প্রতিষ্ঠার পিছনে বাবা মা’র প্রচেষ্টা বা অবদান আমদের দেশের বাবা মা’দের চেয়ে কোন অংশে কম না। তবে আমাদের দেশের মত পশ্চিমা দেশসমূহে বাবা মা’কে প্রবীণকালীন বা বৃদ্ধ বয়সের অবসর সময় সন্তানের উপর নির্ভরশীল হতে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বাবা মা নিজেদের বাড়ি সন্তানের নামে   ট্র্যান্সফার করে দিয়ে তারা সন্তানের কাছে সেই বাড়ীতে ভাড়া পরিশোধ করে বসবাস করে থাকেন। যা আমাদের দেশে  অকল্পনীয়।  

পশ্চিমা দেশে সন্তান জন্মের পূর্বেই তার কিছু আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে যায়। যেমনঃ সন্তানের নাম রাখা, হাস্পাতাল থেকে বাচ্চাকে বহন করার জন্য বিশেষ ধরনের বাহন  যা পিতা মাতাকে আগেই সমাধান করে রাখতে হয়। এমন কি মারা গেলে সৎকারের বন্দোবস্ত আগে থেকে ঠিক করে রেখে যান।  

পশ্চিমারা  সাধারণত ৬৫ বছর পরে অবসরে যান এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে  রাষ্ট্রীয়ভাবে সবাই অবসর ভাতা পেয়ে থাকেন।  অবসরে যাবার পূর্বেই  বৃদ্ধ জীবন নিয়ে পরিকল্পনা করে রাখেন।  পশ্চিমা বিশ্বে একজন বৃদ্ধ তার অবসর জীবনটা যতটা স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাতে পারেন আমাদের  দেশে  সে পর্যায়ে পৌছাতে আরও যোজন যোজন বছর  অপেক্ষা করতে হবে। গণপরিবহন  থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা পাবলিক প্লেসে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকে। বৃদ্ধকালীন অবসর সময় কিভাবে, কোথায় এবং কাদের সাথে পার করবেন সে পরিকল্পনা আগে থেকেই করে রাখেন। সে রকম একটা নিজস্ব বন্ধুমহল তৈরি করে রাখেন। এসব দেশে প্রবীণদের বড় সুবিধা এখানে বৃদ্ধনিবাস খুব সহজলভ্য এবং এটা সাধারণ জীবন প্রণালীর একটা অংশ। এসব দেশে সরকারী, নানা ধরনের সেবা মূলক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনসহ অনেক এন জি ও কর্তৃক পরিচালিত বৃদ্ধ নিবাস যেমন আছে, আবার বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত বৃদ্ধ নিবাসও আছে। ৬৫ বছরের আগ পর্যন্ত রক্ষিত সঞ্চয় এবং পেনসন প্লানে জমার পরিমান অনুযায়ী পশ্চিমারা বৃদ্ধ নিবাস বেছে নিয়ে থাকেন।      

বৃদ্ধ নিবাসের বয়স গ্রুপটা কাছাকাছি হওয়ায় নিজেদের মানিয়ে নেয়া অনেকটা সহজ। এখানে বয়স উপযোগী শরির চর্চার ব্যবস্থা থাকে,  থাকে লাইব্রেরী, প্রার্থনা করার জন্য আলাদা রুম, সার্বক্ষণিক নার্স / সেবিকা, ডাক্তার, পরিবহন ব্যবস্থা, সর্বোপরি সারবক্ষকনিক  নিরাপত্তা ব্যবস্থা। 
 
পশ্চিমা বিশ্বে বৃদ্ধ নিবাসে যারা কাজ করেন বা  এ সংক্রান্ত  সেবার সাথে নিয়োজিত প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত, উচ্চতর প্রক্ষিন প্রাপ্ত এবং তাদেরকে তাদের কাজের দক্ষতা বা  স্কিল অনুযায়ী পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়। সেবা’র সাথে পারিশ্রমিক জড়িত। তাই যারা বৃদ্ধ নিবাসের সাথে জড়িত তাদেরকে  শতভাগ পেশাদারিত্ব বা  প্রফেসনালিজম অনুসরন করতে হয়।  পশ্চিমা বিশ্বে ওল্ডহোম, বয়ষ্করা বেশ ভালোই থাকেন।

‘বৃদ্ধনিবাস’ পশ্চিমা দেশসমূহে সামাজিকতার একটি অংশ এবং এটি একটি সাধারণ ঘটনা যা আমাদের দেশে এখনও সামাজিকভাবে হেয় দৃষ্টিতে দেখা হয় এবং সামাজিক প্রথা বিরোধী মনে করা হয় । পশ্চিমা বিশ্বের জীবন ব্যবস্থা নিয়ে আমরা অনেক  ক্ষেত্রে নাক ছিটকালেও তাদের প্রচলিত হাল ফ্যশনের অনেক সামাজিকতা আমরা শুধু গ্রহণ করি নাই, অনেক ক্ষেত্রে তাদের থেকে এককাঠী এগিয়ে। 
 
মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক জীব হিসেবে, পরিবর্তিত বিশ্ব পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষ প্রতিমিয়ত তার পারিপার্শ্বিকতা, সামজিকতা ও জীবন ব্যবস্থা বদলাচ্ছে। এক কথায় ‘মানুষ মরলে পচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়’। 

আমাদের দেশে বৃদ্ধ নিবাস সম্পর্কে সবারই একটা নেতিবাচক ধারনা কাজ করে এবং সামাজিক রিতিনীতি অনুযায়ী বৃদ্ধ বয়সে সবাই  পরিবারের সব সদস্যসহ একসাথে বসবাস করতে চান। ছেলে মেয়ে, নাতি নাত্নি নিয়ে একসাথে বসবাস করার প্রবণতা আমাদের  সামাজিক রীতিনীতির একটা অংশ। বৃদ্ধ বয়সে ছেলে মেয়ে বা পরিবারের সব সদস্যদেরকে নিয়ে একসাথে থেকে সময় কাটানো সবচেয়ে আনন্দের ও নিরাপদ। তবে দ্রুত  পরিবর্তনশীল বিশ্বে আর্থসামাজিক পরিবর্তনের সাথে পরিবারের সব সদস্যদের নিয়ে এক সাথে থাকা অনেকগুলো নিয়ামকের উপর নির্ভরশীল।
আমাদের দেশে সাধারণত একজন মেয়ে বিয়ের পর স্বামীর সাথে স্বামীর বাড়িতে বসবাস করে থাকেন। এর বিপরীত, অর্থাৎ স্বামী যদি স্ত্রী’র পরিবারের সাথে বসবাস করে তবে সামাজিক ভাবে তাকে হেয় করে ‘ঘরজামাই’ সম্বোধন করা হয়। 

বৃদ্ধনিবাস কনসেপ্টটা অনেকটা এর সাথে তুলনীয়। অনেকে যেমন বৃদ্ধ বাবা মা’কে সম্মান করে মাথার তাজ বানিয়ে রাখেন আবার অনেকে বৃদ্ধ বাবা মা’কে শারীরিকভাবে প্রহার করেন - এমন সংখ্যাও কম না। বৃদ্ধ বাবা মা পরিবারে শত লাঞ্ছনা, নিপীড়ন ও অবহেলার স্বীকার হলেও সেটা  বাইরের কেউ বুঝতে পারেন না। আবার বৃদ্ধনিবাসে তাদের আশ্রয় হলে  ‘সমাজটা রসাতলে’ গেল বলে বুলি আওড়াতে আমাদের সমাজ দেরি করে না। সন্তান হিসেবে বৃদ্ধ বাবা মা’র প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য  অপরিসীম এবং প্রত্যেক ধর্মেই গুরুত্বের সাথে এর উল্লেখ আছে। তবে পরিবর্তিত বিশ্ব ও বাস্তবতার সাথে তাল মিলিয়ে বিকল্প চিন্তাও করা উচিত। 

পরিবারের কর্তা বা স্বামীকে সারাদিন বাইরের কাজ নিয়ে ব্যাস্ত থাকতে হয়। অপর দিকে স্ত্রীকে ঘরের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। স্ত্রী চাকুরীজীবি হলে  চাকুরি সামলিয়ে ঘরের কাজ করা অনেকটা কঠিন ব্যপার। আবার মেয়েরা নিজের মা বাবার সাথে যতটা সহজ হতে পারেন শ্বশুর- শাশুড়ি ‘র সাথে ততটা  হয়ে উঠে না। আমদের দেশে বিয়ের পর একজন মেয়ে  নিজের মায়ের সাথে এক বিছানায় ঘুমাতে পারলেও,শাশুড়ির পাশে  বসে থাকতেও সাচ্ছান্দ্য বোধ করেন না। বউ শাশুড়ির এই সামাজিক বিপর্যয়  একদিনে তৈরি হয়নি আর রাতারাতি পরিবর্তন করাও যাবে বলে মনে হয় না। চাকুরীজীবী মেয়ে তার মায়ের কাছে থাকতে যতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন শাশুড়ির কাছে ততটা না। ব্যতিক্রম আছে, তবে সংখ্যায় নগণ্য। 
একজন মেয়ে যতটা সহজে তার বাবাকে বাজার থেকে জরুরী কিছু আনার জন্য বাজারে পাঠাতে পারেন শ্বশুরকে ঠিক সেভাবে বলতে পারেন না। কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে স্বামী, সংসার ছেলেমেয়ে সামলিয়ে বৃদ্ধ শশুর শাশুড়ির সেবা করা সত্যি দুরূহ। অনেকে করেন। তবে দু পক্ষই অতৃপ্তিতে ভোগেন। গ্রামীন সমাজে অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হলেও শহুরে পরিবেশে এটা অনেকটা কষ্টের। একসময় যৌথ পরিবারের প্রচলন ছিল। পারিপারিক কাঠামো এখন নড়বড়ে। আছে আয়ের সাথে ব্যয়ের অসংগতি। বেশীর  ভাগ ক্ষেত্রে বৃদ্ধ বাবা মা বৃদ্ধ বয়সে একসাথে এক রুমে থাকতে পারেন না। হয় বাবা থাকেন এক ছেলের সাথে আর মা থাকেন অন্য ছেলের সাথে বা মেয়ের সাথে। অনেকক্ষেত্রে তাদেরকে দেয়া হয় পরিত্যক্ত ঘরটি বা সিঁড়ির নীচের ব্যবহার অনুপযোগী কোন রুম। যা তারা সহজভাবে মেনে নিতে পারেন না। মানসিক যন্ত্রণায় ভূগতে থাকেন। একসময় বাবা মা টাকার পিছনে ছুটেছেন। সন্তান বাবার জায়গা দখল করে তিনিও বাবার পথ অনুসরন করেন।  বাবা মা একসময়  সংসারে ইচ্ছামত খরচ করলেও  বৃদ্ধ বয়সে সামান্য খরচের জন্য সন্তানের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে ছেলের বউ খরচের কারন জানতে চেয়ে দু-চার কথা শুনিয়ে দেন। যার ফলে, অনেকে মানসিক আঘাত পেয়ে মুষড়ে পড়েন। 

অনেকে বাবা মাকে সাথে রাখেন এবং সকল ধরনের বাহ্যিক চাহিদা পুরন করেন। কেউ হয়ত তাদের মনের কথা জানতে চায় না। কোন কোন বাবা মায়ের ধারনা ছেলে ও ছেলের বউ তাদের সংসারের জন্য দুই জন বিশ্বস্ত কর্মচারী পেয়েছেন। স্বামী - স্ত্রী, ছেলে মেয়ে’র সংসারে বৃদ্ধ বাবা মা থাকলে এবং স্বামী স্ত্রী দুজনই কর্মজীবী হলে তাদের নিজস্ব ব্যস্ততা আছে। সারাদিন কর্মক্ষেত্রে থাকতে হয়, ছেলে মেয়েকে স্কুলে থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে বৃদ্ধ  বাবা মাকে বাসায় সারাদিন নিঃসঙ্গ দিন কাটাতে হয়। সারাদিনের কর্ম ব্যস্ততার পর বাসায় ফিরে সবাই যারা যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বৃদ্ধ বাবা মা’ র সাথে সময় কাটানো অনেকটা কষ্টের ব্যাপার বা হয়ে উঠে না। সপ্তাহে বা মাসে একদিন বাবা মা’র পাশে বসে ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে  বৃদ্ধ বাবা মা’র প্রতি  দায়িত্ব ও কর্তব্য শেষ করলে বাবা- মা’র প্রতি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বৃদ্ধ বয়সে তারা কথা বলতে চান, কথা শোনার জন্য পাশে কাউকে চান। এজন্য মানুষের সহচার্জ দরকার। অনেকে অসুস্থ বাবা মাকে ঘরে রেখে  বাইরে থেকে  তালা মেরে নিজেদের কাজে চলে যায়। ব্যাপারটা শুনতে অমানবিক মনে হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটাই বাস্তবতা।  

সম্পত্তি সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব একটি সামাজিক ব্যাধি। সামজিক প্রথানুযায়ী স্বামী- স্ত্রী’র বয়সের ব্যবধান একটা সাধারণ ঘটনা। স্বামী স্ত্রী’র আগেই প্রবীন জীবনে প্রবেশ করেন। এসময়ে অনেকে সম্পত্তিগুলো সন্তানদেরকে বন্টন করে দিয়ে সন্তানদের উপর নির্ভর হন। স্বামী আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলে বৃদ্ধ স্ত্রী (মা)’কে সন্তানদের কাছে অবহেলার স্বীকার হতে হয়। রোজগারহীন বৃদ্ধ বয়সে ‘অচল মাল’ খ্যাত বৃদ্ধ বাবা মাকে ছেলেমেয়ের সংসারে থাকতে হলে অনেক কিছুর ছাড় দিতে হয়, মানিয়ে নিতে হয় - যা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভবপর পর হয়ে উঠে না। 

পরিবর্তিত বিশ্বে মেয়েরা শিক্ষিত  ও সচেতন হয়ে প্রতিবাদী হচ্ছে। আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাদের যৌক্তিক প্রতিবাদের কাছে আত্মসমর্পণ না করে নির্যাতনের আশ্রয় নেয়াকে শ্রেয় মনে করে। এতে করে বিবাহ বিচ্ছেদের পরিমান বাড়ছে। প্রবীণ বয়সে হয়ত উভয়কেই নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে হয়। নিসঙ্গতা, হতাশা আর মানসিক অশান্তি  থেকে অনেকে আত্মহত্যার পথও  বেছে নিয়ে থাকেন।  

আছে নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্ন।  আমাদের দেশে এটা একটা সাধারণ ঘটনা। সন্তানেরা পরিবার থেকে দূরে থাকলে বা দেশের বাইরে থাকলে বৃদ্ধ বাবা মাকে বাড়ীর বিশ্বস্ত পাহাড়াদাঁড়  মনে করা হয়। সম্পত্তি সম্পর্কিত পূর্ব শত্রুতার সূত্র ধরে অনেককে নিজ বাড়ীতে খুন হয়েছেন, নিঃসঙ্গ বাসায় মৃতদেহ অনেক পড়ে থাকার ঘটনা ও নিঃসঙ্গ জীবনে হতাশ হয়ে আত্মহত্যার কাহিনীও সংবাদ মাধ্যমে বেড়িয়েছে। এমন পরিসংখ্যান একেবারে কম না। 

আমাদের দেশে পথ শিশুদের নিয়ে সরকারী ও বেসরকারি অনেক সংগঠনসহ ব্যক্তি পর্যায়ে অনেকে কাজ করে থাকেন। অনেকে তাদের দায়িত্ব নেন। অপ্রিয় হলেও  সত্য প্রবীণ বা  বৃদ্ধদের নিয়ে রাষ্ট্র বা সমাজ তেমন একটা ভাবে না। বৃদ্ধদের নীরব কান্না সমাজে কারো কানে পৌছে না। 

পশ্চিমা বিশ্বের মতো আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রমের প্রচলন বা সংস্কৃতি এখনও ততটা জনপ্রিয় বা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। সামাজিকভাবে বৃদ্ধাশ্রমকে হেয় বা  খারাপ দৃষ্টিতে দেখার প্রবনতা স্পষ্ট। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, সামাজিক স্বীকৃতি ও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেলে এবং উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ও দক্ষ কর্মী, পেশাদারিত্ব ও  সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে  আসলে আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রমকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব। দেশের পরিবেশ অনুযায়ী বৃদ্ধাশ্রম সংস্কৃতি  তৈরি হলে নিঃসঙ্গ ও অসহায় বৃদ্ধ মানুষগুলো সন্তানের অবহেলা, পারিবারিক লাঞ্ছনা, একাকীত্বের যন্ত্রণা  ও  নিঃসঙ্গতার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারেন।  
 বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমের প্রচলন বা সংস্কৃতি এখনও ততটা জনপ্রিয় বা গ্রহণযোগ্য নয়।

পরিশেষে, বৃদ্ধ বাবা মা কে নিয়ে এক সাথে থাকার আনন্দ এবং তাদের সেবা শুশ্রূষা করে যে মানসিক তৃপ্তি অনুভূত হয় তা পরিমাপের  ব্যারোমিটার পৃথিবীতে এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। তবে বাস্তবতা, পরিবর্তিত সমাজ ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের  সাথে তাল মিলাতে গিয়ে অনেকের পক্ষে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। উচ্চভিত্তের আর্থিক নিরাপত্তার কারণে হয়ত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় না। তবে মধ্যবিত্ত, নিম্ম মধ্যবিত্ত ও নিম্ম  আয়ের মানুষের প্রবীণ কালীন সময়ের অসহায়ত্বের কথা মাথায় রেখে বিকল্প চিন্তা করা উচিত। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি, সুশিল সমাজের প্রতিনিধি, বিত্তশালী ও সমাজ সেবকরা উদ্যোগী হয়ে প্রচার প্রচারণা চালালে এবং বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হলে নিঃসঙ্গ ও অসহায় প্রবীণেরা হয়ত বৃদ্ধ বয়সে নিরব কান্না থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারেন। 

লেখকঃ 
মো. নুরুজ্জামান বিশ্বাস
কানাডা প্রবাসী, কলামিস্ট
ইমেইল: n_zaman_sust@yahoo.com.

user
user
Ad