`

বেসরকারি কলেজে সেশন ফি ও ভর্তি চার্জ স্পষ্ঠিকরণ দরকার

*বেসরকারি কলেজ হতে সরকারি কলেজে ভর্তি ফিসহ সেশন চার্জ কেন বেশি হবে*
  • Views: 9459
  • Share:
সেপ্টেম্বার ১৯, ২০২০ ১০:২৩ Asia/Dhaka

আকমল হোসেন:: একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি চলছে। লেখালেখিও চলছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর্থিক বিষয়ে নীতিমালা মানছে না। অনেক স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানও এর ব্যতিক্রম নয়। আর্থিক নীতিমালা পড়তে গিয়ে আমি নিজেও সমস্যায় পড়ে গেলাম। বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সাথে আলাপ করে খটকার পরিমাণ আরও বাড়ল? সেটি হলো সরকারি বিধি মোতাবেক বেসরকারি কলেজ হতে আমাদের সরকারি কলেজে ভর্তি ফিসহ সেশন চার্জ কেন বেশি হবে ? বাস্তবে কে কত নেয় সেটি বলছি না। বলছি বিধি মোতাবেক আমরা সরকারি কলেজ কম হওয়ার কথা, সেখানে বিধি মোতাবেক বেশি হলো কীভাবে ?

(১) আসলে সেশন ফি শব্দের অর্থটা কী ? এটি নিয়েই গোলমাল। আলাপ করে যা বুঝলাম, নেট ঘেটে যা দেখলাম, একটি সেশনে কোন শিক্ষার্থী হতে বিভিন্ন খাতে যে পরিমাণ অর্থ আদায় করা হবে, তা হলো সেশন ফি। তাহলে শিক্ষার্থীদের বেতন, পরীক্ষার ফি, ক্রীড়া ফি, সাহিত্য সংস্কৃতি ফি, ম্যাগাজিন ফি অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত সবই সেশন ফি এর মধ্যে পড়ে। 

(২) উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তির সরকারি নির্দেশনা এবং বিভিন্ন বোর্ড হতে যে নির্দেশনা জারী হয়েছে তা হলো-
(ক) “এম পিও ভূক্ত মফস্বল/পৌর (উপজেলা) এলাকায় অবস্থিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে সেশন চার্যসহ ভর্তি ফি সর্বসাকুল্যে ১,০০০/- (এক হাজার), পৌর জেলা সদর ২,০০০/- (দুই হাজার), সিলেট মেট্রোপলিট্রন এলাকায় ৩,০০০/- (তিন হাজার) টাকার বেশি আদায় করতে পারবে না। [সিলেট বোর্ড এর তথ্য অনুযায়ী]
(খ) “সরকারি কলেজসমূহ সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ফি সংগ্রহ করবে।”  

(৩) বিধি অনুযায়ী স্পষ্ট যে সরকারি কলেজ উপজেলা, জেলা, মেট্রোপলিট্রন সব স্থানে একই ফি রাখবে। এখন আমরা দেখি সরকারি পরিপত্র ০৬ জুলাই ২০১৪ অনুযায়ী কী পরিমাণ ফি রাখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ৯ এর তফসিল (ক) অনুযায়ী-
(ক) শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি ২০/-। (এটি ‘ক’ তফসিলে নেই, কিন্তু সরকারি নিয়ম)
(খ) এক বছরের বেতন ২০ * ১২ = ২৪০/-। (এটি ‘ক’ তফসিলে নেই, কিন্তু সরকারি নিয়ম)
(গ) পরীক্ষা ফি ৪০ * ৭ = ২৮০ করে অর্ধ বার্ষিক এবং বার্ষিক পরীক্ষা বাবদ মোট ২৮০ * ২ = ৫৬০/-। 
(ঘ) উন্নয়ন ফি = ২০০/-।
(ঙ) অত্যাবশ্যকীয় কর্মচারী = ৪০০/- (পরিপত্র অনুযায়ী কম-বেশি হতে পারে। একাডেমিক কাউন্সিল নির্ধারণ করবে।
(চ) বিবিধ = ১০০/-
(ছ) ব্যবস্থাপনা ফি = ৫০/-
(জ)  ছাত্র সংসদ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সাহিত্য সংস্কৃতি, বহিঃক্রীড়া, অন্তঃ ক্রীড়া, পরিচয়পত্র, লাইব্রেরী ইত্যাদি বাবদ ৬০০ হতে ৮০০/- টাকা হবে।
(ঝ) শিক্ষার্থী প্রতি উন্নয়ন ফি ৫০/- টাকা বোর্ডে প্রেরণ করতে হবে।

(৪) উপরের সবগুলো যোগ করে সরকারি কলেজের ভর্তি ফিসহ সেশন ফি হলো মোট ২২২০/- টাকা হতে ২৪২০/- টাকা হওয়ার কথা। তবে কোন কোন কলেজে একটু বেশি হতে পারে। কারণ কিছু খাত এর ফি সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী একাডেমিক কাউন্সিল নির্ধারণ করে থাকে।

(৫) সরকারি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি ফিসহ সেশন চার্য উপজেলা, জেলা, বিভাগ সব স্থানেই একই। অর্থাৎ ২২২০/-টাকা হতে ২৪২০/- টাকা হওয়ার কথা।

(৬) আমার গোল বাধে আমরা যদি সরকারি কলেজ ২২২০/-টাকা হতে ২৪২০/- টাকা নিয়ে থাকি, তবে বেসরকারি কলেজ কীভাবে উপজেলা পর্যায়ে ১০০০/- টাকা, জেলা পর্যায়ে ২০০০/- টাকা এবং মেট্রোপলিট্রনে ৩০০০/- টাকা গ্রহণ করবে ? আমাদের বেতন-ভাতা সবকিছুই সরকার দিচ্ছে। চক-ডাস্টারের পয়সাও দিচ্ছে। এটা ঠিক আমাদেরকে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির লোক নিয়োগ দিতে হচ্ছে, যারা সরকারি নয়। এদের বেতন-ভাতা কলেজ এর বেসরকারি তহবিল হতে দিতে হচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি কলেজ এর এমপিওভূক্ত শিক্ষকরা সরকারি বেতন পেলেও বাড়ীভাড়া ভাতা পান মাত্র ১০০০/- টাকা। তাদের বিভিন্ন ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা ছাত্র বেতনের উপর নির্ভর করে। তাহলে কীভাবে একটি উপজেলা লেভেলের কলেজ শিক্ষার্থী হতে ১০০০/- টাকা ফি গ্রহণ করবে ? এই টাকা নিয়ে কলেজটি তার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারবে?

(৭) বাস্তবে কি কোন বেসরকারি কলেজ সেশন চার্যসহ ভর্তি ফি সর্বসাকুল্যে ১,০০০/- (এক হাজার), পৌর জেলা সদর ২,০০০/- (দুই হাজার), সিলেট মেট্রোপলিট্রন এলাকায় ৩,০০০/- (তিন হাজার) টাকা আদায় করে? সোজা উত্তর হলো না। তবে ব্যতিক্রম হতে পারে।

(৮) তাহলে স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন হলো এমন পরিপত্র কেন হলো যেখানে বেসরকারি কলেজগুলো মানতে পারছে না? আর সাংবাদিকরাও লিখে যাচ্ছেন, সরকারি বিধির বাইরে কলেজ টাকা নিচ্ছে? কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ভর্তির প্রথম দিনই জানতে পারছে তাদের শিক্ষাগুরুরা তাদের বাবা-মা এর পকেট কাটছেন! এই শিক্ষার্থীরা কী ম্যাসেজ পাবে?

(৯) সিলেটের কিছু বেসরকারি কলেজের ভর্তি ফি -
(ক) ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ ভর্তি বাবদ ১৯,০০০/- টাকা। মাসিক টিউশন ফি ২৬২৫/- টাকা। 
(খ) জালালাবাদ ক্যান্টনম্যান্ট ইংলিশ স্কুল এন্ড কলেজ ২৫,৪৫০/- টাকা। মাসিক টিউশন ফি ৩০০০/-
(গ) ব্লুবার্ড স্কুল এন্ড কলেজ ৩০০০+২০০=৩২০০/-। মাসিক টিউটশন ফি ১১০০ (সম্ভবত)।
মাসিক টিউশন ফি ১২ দিয়ে গুণ করে এককালীন অর্থের সাথে যোগ করুন। দেখুন তো সরকার নির্ধারিত ৩০০০/-টাকা হয় কিনা!

(১০) আবার এমনও দেখা যায় যে, ভর্তির শুরুতে শিক্ষার্থী এর বেতন এবং পরীক্ষা ফি না নিয়ে সেশন চার্য কম দেখানো হয়। পরে প্রতিমাসে শিক্ষার্থী বেতন এবং পরীক্ষার সময় পরীক্ষার ফি নেয়া হয়। এজন্য প্রথমেই বলেছিলাম সেশন চার্য বা ফি এর ব্যাখ্যা কী ? এর মধ্যে কোন কোন খাত আছে। এটি স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন।

(১১) আমি মনে করি বেসরকারি কলেজে ভর্তি ফিসহ সেশন চার্য বাস্তবতার সাথে মিল রেখে সরকারের পুনঃ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ৯ অগাস্ট ২০১৬ সালে বেসরকারি কলেজের বেতন ও টিউশন ফি বৃদ্ধির সরকারি পরিপত্র অনুসরণ করা যেতে পারে। পরিপত্রে জনবল কাঠামোর ভিত্তিতে টিউশন ফি নির্ধারণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এই নিদের্শনা অনুযায়ী বেসরকারি কলেজের একজন শিক্ষকের বেতন-ভাতা সরকারি কলেজের শিক্ষকের বেশি হতে পারবে না। আবার নন এমপিও শিক্ষকের বেতন-ভাতা এম.পিও ভূক্ত শিক্ষকের বেশি হতে পারবে না। এই নীতিমালার উপর ভিত্তি করে প্রতিটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে তাদের সেশন ফি নির্ধারণ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপনা করতে হবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে তা অনুমোদন করবে। এক্ষেত্রে ঐ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গ্রেডকেও মূল্যায়ণ করতে হবে। যেমন সিলেট ক্যান্টনম্যান্ট স্কুল এন্ড কলেজ এর মত স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানকে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের মত চিন্তা করলে হবে না। আবার সুনামের কারণে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করা হলো, কিন্তু শিক্ষক-কর্মচারীদের কোন কল্যাণে আসল না, তারা তাদের ন্যায্য বেতন-ভাতা পেল না, এটিও যাতে না হয়। আবার একইসাথে দেখতে হবে সরকারি পরিপত্রের বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর কোন আর্থিক চাপ না পড়ে।

(১২) আমরা যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করি, তাদের মনে রাখতে হবে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান হতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিন্ন। এখানে একটি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সম্পর্ক রয়েছে। আর এই সম্পর্ক হলো ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। শিক্ষকরা যদি নিয়মের বাইরে টাকা নেন, তবে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ কিছুটা হলে আসবে, কিন্তু ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা বিদায় নেবে। মনে রাখতে হবে শিক্ষকরা আর্থিক দিক দিয়ে স্বচ্ছ হলে যে ছাত্রটিকে আপনি দুষ্ট মনে করছেন, একদিন সেই ছাত্রটি আপনাকে স্মরণ করবে।

(১৩) আমাদের বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের ভাগ্যাকাশে সব সময় কালো মেঘের ছায়া ভাসতে থাকে। তাদের সারা জীবনের প্রাপ্যতা নিয়ে আমরা চিন্তা করি না। এই করোনাকালীন সময়ে অনেকেই কোন বেতন-ভাতা পাননি। কেউ তাদের নিয়ে এক কলমও লেখেননি। কর্মজীবন শেষ হয়ে গেলে তাদের কোন খবরই আমরা রাখি না। অথচ ফলাও করে আমরা বলি, বেসরকারি কলেজ অতিরিক্ত টাকা রাখছে। হ্যাঁ এটি ঠিক বেসরকারি কলেজে দু-একজন, যারা অধ্যক্ষ এর চেয়ারে বসে থাকেন, তারা লাভবান হন। কিন্তু প্রতিবছর সাধারণ শিক্ষক অবসরে চলে গিয়ে রোগ-ব্যধিতে কষ্ট করে একসময় দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। হয়ত যাওয়ার আগে আমরা স্যারকে দেখতে গিয়ে একটি খামে সাহায্য হিসেবে কিছু টাকা দিয়ে ফেইসবুকে স্যারের ছবিসহ একটি পোস্ট দিলাম!

লেখকঃ
আকমল হোসাইন, 
সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ,
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ, মৌলভীবাজার।



user
user
Ad