রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর প্রামাণিকতা
মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর:: পবিত্র কুরআনের পর সুন্নাহর মর্যাদা। সুন্নাহ ইসলামের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ন বিষয়। মুহাদ্দিস তথা হাদিস শাস্ত্রবিদদের নিকট নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কথা, কাজ, সম্মতি এবং সৃষ্টিগত ও চারিত্রিক গুণাবলী যাহাই প্রমাণিত হয় সবই সুন্নাহ বলে পরিচিত। আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগে হাদীসের প্রামাণিকতা বিষয়ে যৌক্তিক বিষয়াবলী সন্নিবেশিত করা হলঃ
১. কোরআনের ভাষায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অবস্থান
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত ২১)
২. রাসুলের আনুগত্য করতে কোরআনের নির্দেশ:
আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘আপনি বলে দিন, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ কাফিরদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩২)
৩. রাসুল (সা.)-এর নাফরমানি থেকে সতর্কবাণী:
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নাফরমানি করে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করে আল্লাহ তাকে আগুনে জ্বালাবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর তার জন্য রয়েছে অপমানজনক আজাব।’ (সুরা : নিসা, আয়াত ১৪)
৪. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সব কথা ও কাজ ওহির অন্তর্ভুক্ত:
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তিনি মনগড়া কথা বলেন না। তা তো কেবল ওহি, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩-৪) আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে রাসুলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল...।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮০)
ক. রাসূলের কথা সুন্নাত হওয়ার প্রমাণ:
ইমাম বুখারি আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু হতে একটি হাদিস বর্ণনা করেন তিনি বলেন:
“এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আপনি আমাকে নসিহত করুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি রাগ করো না। লোকটি আবারও বলল, আমাকে নসিহত করুন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উত্তর দিলেন, তুমি রাগ করো না।
এভাবে কয়েকবার সে নসিহত করার কথা বললে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বার বার একই উত্তর দিলেন এবং বললেন, তুমি রাগ করও না।
অনুরূপভাবে ইমাম মুসলিম আবু সাঈদ খুদরী রাদিআল্লাহু আনহু হতে একটি হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি তিনি বলেন, তোমাদের কেউ যখন কোন অন্যায় কর্ম সংঘটিত হতে দেখে, সে তাকে হাত দ্বারা প্রতিহত করবে, যদি সম্ভব না হয়, মুখ দ্বারা প্রতিহত করবে, আর তাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করবে, আর এটি হল ঈমানের সর্ব নিম্ন স্তর”।[5] উল্লেখিত হাদিস-দ্বয়ের প্রথম হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় সাহাবীকে একটি নির্দোষ দিলেন, যা পালন করা এবং রাসূলের অনুসরণ করা তার জন্য ওয়াজিব।
খ. রাসূলের কর্ম সুন্নাত হওয়ার প্রমাণ:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কর্ম সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখেছ ঠিক সেভাবে সালাত আদায় কর”।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন: "বিধানগুলো আমার থেকে গ্রহণ কর”
এ দুটি হাদিস প্রমাণ করে, যে ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে সালাত আদায় করেছেন সেভাবে সালাত আদায় করল বা রাসূল যেভাবে হজ পালন করেছে ঠিক সেভাবে হজ পালন করল, সে অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ ও অনুকরণ করল। তার আমল শরীয়তের বিধান অনুযায়ী হল।
গ. রাসূলের সম্মতি সুন্নাত হওয়ার প্রমাণ:
ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ আব্দুল্লাহ বিন মুফাজ্জাল রাদিআল্লাহু আনহু হতে একটি হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “খাইবরের যুদ্ধের দিন আমি চর্বির একটি মশক পেলাম এবং আমি সেটিকে আমার নিজের কাছে রেখে বললাম, আমি এ থেকে একটুও কাউকে দেবো না। আমি এ কথা বলে মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পেলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসছেন”।
হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসলেন এবং কোন প্রতিবাদ করলেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসি এবং প্রতিবাদ না করা দ্বারা প্রমাণিত হয় এটি ছিল এ কর্মের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মতি। এতে আরও প্রমাণিত হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার মতই একটি পরিপূর্ণ শরীয়ত। অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দস্তরখানে গুই সাপ খাওয়া। তিনি দেখা সত্ত্বেও কোন প্রকার প্রতিবাদ করেননি, এতে প্রমাণিত হয় তা খাওয়া ছিল হালাল।
ঘ. হাদিসের প্রামাণিকতার উপর সাহাবিদের আমল:
সাহাবায়ে কেরাম তাদের জীবনে হাদিসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর অনুসরণ করেছেন, তার নির্দেশ পালন করেছেন এবং ছোট-বড় প্রত্যেক বিষয়ে তারা তার শরণাপন্ন হয়েছেন। তারা রাসূলের এত অনুসরণ করতেন যে, কোন কারণ ও হিকমত জানা ছাড়াই তিনি যা করতেন তারা তাই করত, তিনি যা পরিহার করতেন তারাও তা পরিহার করত।
যেমন ইমাম বুখারি ইব্ন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি স্বর্ণের আঙটি পরিধান করেছিলেন, ফলে লোকেরাও স্বর্ণের আঙটি পরিধান করে। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা এ বলে নিক্ষেপ করেন: “আমি কখনো তা পরিধান করব না, ফলে লোকেরাও তাদের আঙটি ফেলে দেন”।
ইমাম আবু দাউদ আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 'একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবিদের নিয়ে সালাত আদায় করতে ছিলেন, হটাৎ তিনি জুতো খুলে বাম পাশে রেখে দেন। যখন লোকেরা তাকে দেখল, তারাও তাদের জুতো নিক্ষেপ করল। অতঃপর তিনি সালাত আদায় করে বলেন: তোমরা কেন তোমাদের জুতো নিক্ষেপ করেছ, তারা বলল: আমরা আপনাকে দেখেছি আপনি জুতো নিক্ষেপ করেছেন, তাই আমরাও আমাদের জুতো নিক্ষেপ করেছি। তিনি বললেন: জিবরিল আমার নিকট এসে বলল যে, জুতোতে ময়লা রয়েছে”।
ঙ. হাদিসের প্রামাণিকতার পক্ষে ইজমায়ে উম্মত:
আমরা যদি আদর্শ পূর্বসূরি ও তাদের পরবর্তী ইমামদের পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে আমরা এমন কাউকে পাব না, যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ ইমান, সামান্য কল্যাণ ও ইখলাস রয়েছে,তিনি হাদিসকে অস্বীকার করেছেন, বা তাকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করেননি, তার দাবি অনুযায়ী আমল করেননি; বরং এর বিপরীতে আমরা দেখিযে, তারা সকলে হাদিস আঁকড়ে ধরেছেন, তার আদর্শে আদর্শবান ছিলেন, অতি আগ্রহ ও উৎসাহ নিয়ে তার উপর আমল করেছেন, এবং তার বিরোধিতা থেকে সতর্ক করেছেন।
কারণ একটাই যে, হাদিস ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস, হাদিসের উপর নির্ভর করে কুরআনুল কারীম বুঝা ও তার অধিকাংশ আহকাম। অতএব সন্দেহ নেই হাদিসের প্রামাণিকতার উপর উম্মতের ইজমা ও ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং এ বিষয়ে তাদের অন্তরে কোন দ্বিমত নেই। ইমাম শাফে‘ঈ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, যার নিকট হাদিস প্রমাণিত হল, তার কোন সুযোগ নেই অন্য কারো কথায় তা ত্যাগ করা”।
তিনি আরো বলেন: “আমি এমন কাউকে শুনিনি, যাকে মানুষ আহলে ইলম বলে অথবা যিনি নিজেকে আহলে ইলম বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লামের ফয়সালাকে মেনে নেয়া, একমাত্র তার অনুসরণ করা, কোন অবস্থাতে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের হাদিস পরিহার না করা, কুরআন ও হাদিস ব্যতীত যাবতীয় বিষয় কুরআন ও হাদিসের অনুগত; আমাদের উপর, আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস মেনে নেয়া, তার সংবাদ গ্রহণ করা ওয়াজিব ইত্যাদি বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন”।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
“অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যর্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর”।
এ আয়াত প্রসঙ্গে ইমাম ইব্ন হাযম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “সকল উম্মত এ ব্যাপারে একমত যে, এ সম্বোধন আমাদের ও সকল মখলুকের প্রতি, যাদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টি করা হবে ওযেসব রূহ শরীরে সঞ্চার করা হবে, হোক সে জিন বা মানুষ।
যেমন এ সম্বোধন ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সবারপ্রতি, তাদের পরবর্তীতে যারা আসবে তাদের উপর সমানভাবে প্রযোজ্য হবে”।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “জানা আবশ্যক যে, এমন কোন ইমাম নেই, উম্মতের নিকট যার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তিনি স্বেচ্ছায় ছোট কিংবা বড় কোন বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধিতা করেছেন।
কারণ তারা সবাই একমত ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করা ওয়াজিব।
উপরোক্ত বিষয়াবলীর প্রেক্ষিতে বলা যায় যে সুন্নাহর প্রামানিকতা সুপ্রমানিত। রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর উপর সকলকে অামল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখকঃ
মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর,
প্রভাষক, নোয়াখালী কারামাতিয়া কামিল মাদরাসা।
- পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে MS3 টেকনোলজি বিডি পরিবারের ঈদ শুভেচ্ছা
- এবার এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানে ইরানি আঘাত
- শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে ইরানের মোকাবিলা সম্ভব নয়: মুজতাবা খামেনেয়ী
- ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিণতির বিষয়ে রাশিয়ার হুঁশিয়ারি
- একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
- রমজান মাসই বন্ধ থাকছে মাধ্যমিকসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
- মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য, বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ: আইন উপদেষ্টা
- যুদ্ধ, বিভাজন ও অনিশ্চয়তা: বহুমুখী সংকটে ইসরায়েল
- পুরো রমজান মাসে হাইস্কুল বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ
- নির্বাচন একটি অধ্যায় মাত্র; আমাদের আদর্শিক ও নৈতিক সংগ্রাম চলমান থাকবে - ওবায়দুল্লাহ ফারুক
- হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন তারেক রহমান
- বিজেপি-আরএসএসের বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় উইকিপিডিয়া
- আসামে তীব্র শীতের মধ্যেই ১৫০০ মুসলিম পরিবারের ঘর গুঁড়িয়ে দিল ভারত
- নুতন বই পেয়ে উচ্ছাসিত রাঙামাটির শিক্ষার্থীরা
- সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছেছে খালেদা জিয়ার মরদেহ
- আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই
- শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান
- জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানিয়ে নাহিদকে এনসিপির ৩০ নেতার চিঠি
- পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরশাসনের পতন
- তারেক রহমানের বহনকারী প্লেন নামল সিলেটে

