`

রহমত মু‌মিন জীব‌নের প্রত্যাশা

  • Views: 1273
  • Share:
সেপ্টেম্বার ৪, ২০২০ ১৪:১২ Asia/Dhaka

মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর:: মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামী‌নের অ‌শেষ রহম‌তে এ পৃ‌থিবী‌তে কুল মাখলুকা‌তের সৃষ্টি। তাঁর এ রহমত পৃ‌থিবী‌কে আসমা‌নের ম‌তো বেষ্টন ক‌রে আ‌ছে। তার রহমত সু‌বিস্তৃত। তিনি স্বয়ং রহমতের বিস্তৃতি সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন, ‘আমার রহমত প্রতিটি বস্তুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে।’ (সূরা আ’রাফ : আয়াত ১৫৬ ) । তাঁর রহম‌তের ফল্গুধারা থে‌কে কেউই ব‌ঞ্চিত হ‌তে চায় না। তাঁর অ‌শেষ রহমত এর সা‌ন্নিধ্য লাভ করা সকল মু‌মি‌নের জীব‌নের একমাত্র প্রত্যাশা।

রহমত মু‌মিন জীব‌নকে আল্লাহর প্রে‌মে সিক্ত ক‌রে ইবাদা‌তের ক্ষে‌ত্রে তা‌দের‌কে অনুপ্রা‌ণিত ক‌রে তো‌লে। তাই‌তো দেখা যায় ঐ মু‌মিন বান্দা যে রহমত লা‌ভে ধন্য হ‌য়ে‌ছে সে তার জীব‌নকে মহান প্রভুর সা‌ন্নিধ্য লা‌ভের জন্য উৎসর্গ ক‌রে।

রহমত এর বিপরী‌তে হতাশা ব্য‌ক্তি জীবন‌কে বি‌ষি‌য়ে তো‌লে। হতাশা তাকে আল্লাহর রহমতের কথা ভুলিয়ে দিতে চায়। আল্লাহর কুদরত থেকে তার দৃষ্টিকে সরিয়ে দিতে চায়। আল্লাহর সীমাহীন অনুগ্রহ এবং দয়াকে আড়াল করে দিতে চায়। অথচ পবিত্র কোরআনের ভাষ্য মতে, ‘মুমিন কখনোই হতাশ হতে পারে না। কোরআনে বর্ণিত ঘটনা। হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যখন বার্ধক্যে উপনীত, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একদল ফেরেশতা এসে তখন তাঁকে এক জ্ঞানী পুত্রের সুসংবাদ শোনাল। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে হযরত ইবরাহিম (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে তো বার্ধক্য পেয়ে বসেছে, এরপরও তোমরা আমাকে এ সুসংবাদ দিচ্ছ?! কিসের ভিত্তিতে তোমরা এ সুসংবাদ দিচ্ছ? ফেরেশতারা বলল, আমরা তো সত্য কথাই বলছি। আপনাকে সত্য সুসংবাদই দিচ্ছি। বার্ধক্য আপনাকে স্পর্শ করেছে করুক, এ বৃদ্ধ বয়সেই আপনার সন্তান হবে। আপনি নিরাশদের দলে যাবেন না। হযরত ইবরাহিম (আ.) তাদের কথার জবাবে বললেন, পথভ্রষ্টরা ছাড়া আর কে আপন প্রতিপালকের রহমত থেকে নিরাশ হতে পারে?’ (সূরা হিজর, ৫৩-৫৬ )।

রহমত প্রত্যাশী বান্দাহ যেন নিরাশ না হয়, সে‌দি‌কে ই‌ঙ্গিত ক‌রে আল্লাহপাক ব‌লেনঃ হে রাসুল! আপনি) বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা যুমার : আয়াত ৫৩)

রহমা‌তের আধার মহান জা‌তে পাক আল্লাহ তাঁর রহমত থেকে তাঁর বান্দা‌দের‌কে কখনই নিরাশ না হতে ব‌লে‌ছেন । ‌তি‌নি ইরশাদ ক‌রেনঃ মনে রেখ, একমাত্র কাফেররাই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যায়।’ (সূরা ইউসুফ, আয়াত : ৮৭।)

মু‌মিন বান্দাহ যতই পাপা‌সিক্ত হোক না কেন য‌দি আল্লাহর নিকট তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা ক‌রে ত‌খন তি‌নি তা‌দে‌রে‌কে রহম‌তের মাধ্য‌মে ক্ষমা করার আশার বানী শ‌নি‌য়ে‌ছেন। আল কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে ‘সে দিন যার ওপর হতে আজাব দূর করা হবে, সুতরাং আল্লাহ তার ওপর রহমত করেছেন, ইহাই স্পষ্ট সফলতা।’ (সূরা আল আনআম : আয়াত ১৬)

এছাড়াও যারা কা‌ফের  তারা রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর প্রতি মিথ্যারোপকারী। তা‌দের সম্পর্কে আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন, ‘সুতরাং যদি তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে চায়, তাহলে বলে দাও যে, তোমাদের প্রতিপালক সুবিস্তৃত রহমতের অধিকারী এবং তার আজাবকে গোনাহগারদের ওপর হতে ফেরানো যাবে না।’ (সূরা আল আনআম : আযাত ১৪৮)। এ আয়া‌তের বর্ণনায় মু‌মিন ব্য‌ক্তিরা আযাব হ‌তে নিষ্কৃ‌তি লা‌ভের সা‌থে সা‌থে রহম‌তের সৌভাগ্য হা‌সিল কর‌বে এ কথায় সুস্পষ্ট বর্ণনা বিদ্যমান।

প‌বিত্র কুরআন মা‌জি‌দে রাব্বুল আলামীন মহান আল্লাহপাক তারঁ বান্দা‌দেরকে রহমত লাভ ও ক্ষমা পাবার জন্য প্রার্থনা করার বিষ‌য়ে নি‌র্দেশনা এভা‌বে দি‌য়ে‌ছেন, বল, হে আমার প্রতিপালক! ক্ষমা করুন ও দয়া করুন, দয়ালুদের মধ্যে আপনিই দয়ালু (মুমিনূন ১১৮)।

তি‌নি তাঁর বান্দাহ‌দের‌কে প্রার্থনা এভা‌বে করার কথা ব‌লে‌ছেন, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি নিজের পক্ষ থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজ-কর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থ  করুন (কাহাফ ১০)।

করুণার আধার আল্লাহপা‌কের রহমত সম্প‌র্কে রাসুলুল্লাহ (সঃ) অসংখ্য হাদী‌স বিদ্যমান। ক‌য়েক‌টি হাদীস এ সম্প‌র্কে বর্ণনা কর‌ছি।
আবু হুরায়রাহ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন মাখলূক সৃষ্টির ইচ্ছা করলেন, একটি লিপি লিখলেন যা তাঁর নিকট তাঁর আরশের উপর আছে, আমার দয়া আমার ক্রোধ অতিক্রম করেছে’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৩৬৪; বাংলা মিশকাত হা/২২৫৫)

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আল্লাহর একশত রহমত রয়েছে যা হতে একটি মাত্র রহমত তিনি জিন, মানুষ, পশু ও কীট-পতঙ্গের মধ্যে নাযিল করেছেন। এ দ্বারাই তারা একে অন্যকে মায়া করে। এর মাধ্যমেই একে অন্যকে দয়া করে এবং এর মাধ্যমেই ইতর প্রাণীরা তাদের সন্তানদেরকে ভালবাসে। বাকী নিরানববইটি রহমত ক্বিয়ামতের দিনের জন্য রেখে দিয়েছেন। যা দ্বারা তিনি ক্বিয়ামতের দিন আপন বান্দাদের প্রতি রহমত করবেন’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৩৬৫; বাংলা মিশকাত হা/২২৫৬)।

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যদি মুমিন জানত আল্লাহর নিকট কি শাস্তি রয়েছে, তাহলে তাঁর জান্নাতের আশা কেউ করত না। আর যদি কাফের জানত আল্লাহর নিকট কি পরিমাণ দয়া রয়েছে, তবে কেউ তার জান্নাত হতে নিরাশ হত না’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৩৬৭; বাংলা মিশকাত হা/২২৫৭)।

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘এক ব্যক্তি কখনো কোন ভাল কাজ করেনি। তার পরিবার-পরিজনকে বলল, অন্য বর্ণনায় আছে, এক ব্যক্তি নিজের প্রতি অবিচার করল, বড় অপরাধ করল। কিন্তু যখন তার মৃত্যু উপস্থিত হল, তখন সে তার সন্তানদের অছিয়ত করল, যখন সে মারা যাবে তখন তাকে যেন পুড়িয়ে ফেলা হয়। অতঃপর অর্ধেক স্থলে ও অর্ধেক সমুদ্রে ছিটিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহর কসম! যদি তিনি তাকে ধরতে সক্ষম হন, তবে এমন শাস্তি দিবেন যা জগতের কাউকে কখনো দেননি। যখন সে মারা গেল তার নির্দেশ মত সন্তানরা কাজ করল। আল্লাহ সমুদ্রকে হুকুম দিলেন, সমুদ্র তার মধ্যে যা ছিল তা একত্র করে দিল। এভাবে স্থল ভাগকে নির্দেশ দিলেন, স্থলভাগ তার মধ্যে যা ছিল তা একত্র করে দিল। অতঃপর আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এরূপ করেছিলে? সে বলল, হে প্রতিপালক! তোমার ভয়ে এরূপ সে বলল, হে প্রতিপালক! তোমার ভয়ে এরূপ করেছি। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৩৬৯)।

প‌বিত্র কুরআনের আয়াত ও হাদীস সমু‌হের পর্যা‌লোচনায় আমরা এ সিদ্ধা‌ন্তে উপনীত হ‌তে পা‌রি, একমাত্র রহমত লাভই মু‌মিন জীব‌নের প্রত্যাশা। কেননা রহম‌তের বারী‌তে সিক্ত মুমিন বান্দারাই আল্লাহপা‌কের ক্ষমা, প্র‌তিদান ও সফলতা লা‌ভে ধন্য। আল্লাহপাক আমা‌দের সকল‌কে তাঁর করুণা লা‌ভের নি‌মি‌ত্তে রহমত এর ফল্গুধারা, জান্না‌তের সুশীতল ছায়া ও অতুলনীয় নেয়ামত লা‌ভের তাও‌ফিক দান করুন। আমীন।



লেখকঃ 
মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর,
প্রভাষক, নোয়াখালী কারামা‌তিয়া কা‌মিল মাদরাসা। 

user
user
Ad