`

শোষণের হাতিয়ার পুঁজিবাদী অর্থনীতি এবং কোরআন ও হাদীসের আলোকে সুদ বা রিবা

পুজিবাদী অর্থনীতি এবং ইসলামের রিবা ও বর্তমান সুদ সম্পর্কে স্পষ্ঠ ধারণা প্রদান ও পার্থক্য নিরূপনে কোরআন ও হাদীসের আলোকে অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক জনাব আকমল হোসেন স্যার অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় "সুদ, যাকাত এবং ইসলামী অর্থনীতি" নামক প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেছেন। জালালাবাদ২৪.কম পত্রিকার তা ‌ধারাবা‌হিকভাবে লেখা হ‌বে। (১ম, ২য় ও ৩য় অংশ প্রকাশের পর আজকের ৪র্থ পর্ব)
  • Views: 5948
  • Share:
আগষ্ট ১৪, ২০২০ ১৫:০৭ Asia/Dhaka

আকমল হোসেন:: পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সুদ হচ্ছে শোষণের হাতিয়ার। সুদকে শোষণের হাতিয়ার বলার জন্য আপনাকে মুসলিম হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদগণ অর্থনৈতিক অগ্রসরতার পথে সুদকে প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সাম্যবাদের স্বপ্নদ্রষ্টা কার্ল মার্কসও সুদকে ঘৃণা করতেন এবং সুদকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

 আবার অর্থনীতিবিদ লর্ড মেনার্ড কেইনস মনে করেন সুদের কারণে তারল্য ফাঁদের (Liquidity trap) উৎপত্তি পূর্ণ নিয়োগ অর্জনে বাঁধা হিসেবে কাজ করে। পুঁজিবাদী সমাজে পুজিপতিরা (প্রকৃতপক্ষে একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠি, যাদের নাম কোরআনে আছে) দেশ পরিচালনা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, মিডিয়া সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাই তারা তাদের আয়ের মূল উৎস সুদকে বৈধ করাার জন্য তাদের নিয়ন্ত্রিত উপকরণসমূহ (শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, মিডিয়া) কাজে লাগিয়ে সাধারণ শিক্ষিত সমাজের নিকট সুদের গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে এবং মনমগজে এমন একটি বিষয় সেট করে দিয়েছে যে, সুদ ছাড়া অর্থনীতি চলতেই পারে না! সুদের পক্ষে যুক্তি -
(ক) পূঁজিপতিদের মতে সুদ হলো অপেক্ষার পুরস্কার। অর্থাৎ আপনি কাউকে ১ বছর মেয়াদের জন্য ঋণ দিলেন। আপনাকে ১ বছর অপেক্ষা করতে হবে এবং এই অপেক্ষার পুরস্কার হলো সুদ। বর্তমান সময়ে সুদের এই কাজটি আপনি সরাসরি করেন না। আপনি আপনার সঞ্চয় ব্যাংকে রেখে দিলেন। ব্যাংক এই অর্থ কোন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে বা কৃষি শ্রমিককে সুদের ভিত্তিতে ঋণ প্রদান করল। ঐ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা কৃষি শ্রমিক কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। ব্যাংক ঐ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা কৃষি শ্রমিকের জামানত হতে অথবা সম্পত্তি ক্রোক করে তার পাওনা অর্থ আদায় করে নিল এবং বছর শেষে আপনার নিশ্চিত পাওনা সুদ পরিশোধ করল। আপনি সেই সুদের টাকায় ক্রয়কৃত গাড়ি চরে টিভি টকশোতে গেলেন এবং দারিদ্র বিমোচনের জন্য সুন্দর সুন্দর কথাও বলে আসলেন। সত্যিই সুদ হলো অপেক্ষার পুরস্কার!

(খ) আপনি মাসে ১ লক্ষ টাকা আয় করেন। ৮০ হাজার টাকা হলো আপনার পারিবারিক ব্যয়। বাকী ২০ হাজার টাকা হলো আপনার মাসিক সঞ্চয়। এই ২০ হাজার টাকা আপনি কোথায় রাখবেন ? বাড়ীতে ? নিশ্চয়ই না। কারণ নিরাপত্তার সুবিধার্থে আপনি নিজ উদ্যোগে ব্যাংকে গিয়ে এই টাকা রাখবেন। এজন্য তো আপনাকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে উল্টো টাকা দিতে হবে। কারণ তারা আপনার টাকার নিরাপত্তা দিচ্ছে। এখানে আপনি নিজেই নিজের জন্য “অপেক্ষা” বেছে নিয়েছেন। কারণ আপনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে বলছেন, আমার যখন প্রয়োজন হবে, তখন টাকাটা নেব। তাহলে স্বেচ্ছায় নিজ সম্পদের নিরাপত্তার স্বার্থে টাকা দিয়ে আপনি অতিরিক্ত কেন নেবেন ? ব্যাংক যদি আপনাকে বলত, আমরা আপনার টাকাটা রাখব না। তাহলে এই টাকাটা নিয়ে বাড়ীতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন ? বরং আপনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করবেন, ভাই আমার টাকাটা রাখুন, প্রয়োজনে আমি আপনাকে বেশি সার্ভিস চার্জ দেব।

 কিন্তু বর্তমান চিত্র হচ্ছে পুরো উল্টো। বরং পুঁজিপতিরা ব্যাংক তৈরি করে আপনাকে সুদ দিচ্ছে এই জন্য যে, সুদের লোভে আপনি তাদের নিকট সম্পদ জমা রাখবেন এবং সমাজে তার মত আরও পুঁজিপতি যাতে তৈরি না হয়। অর্থাৎ সুদের প্রতিযোগীতায় যাতে সবাই টিকতে না পারে, অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে গুটিকয়েক পুঁজিপতিদের হাতে। সেজন্য পুঁজিপতিরা আপনাকে সামান্য সুদ দিয়ে ব্যবসায়ী, কৃষিজীবিসহ বিভিন্ন খাতে উচ্চ সুদে ঋণ প্রদান করে সমাজের ধন বৈষম্য বৃদ্ধি করছে। আর সামান্য সুদটুকু নিয়ে আপনি তৃপ্তি সহকারে বলছেন, পুঁজিপতিদের শেখানো বুলি ‘সুদ হলো অপেক্ষার মূল্য’! 

(২) সুদ হলো বর্তমান ভোগ ত্যাগ করার মূল্য। ঋণদাতা বর্তমান ভোগ ত্যাগ করে ঋণগ্রহীতাকে ঋণ প্রদান করে। ‘বর্তমান ভোগ ত্যাগ করার মূল্য হলো সুদ’ - সত্যিই কী অপূর্ব যুক্তি! সমাজের উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেরা বর্তমান ভোগ ত্যাগ করে অনেকটা অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে ব্যাংকে টাকা জমা রাখছে এবং ব্যাংক তাদের পক্ষ হতে সুদে টাকা ঋণ দিচ্ছে! আর আমরাও বিশ্বাস করা শুরু করলাম সঞ্চয়ের জন্য উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেরা বর্তমান ভোগ ত্যাগ করে অনেকটা অনাহারে-অর্ধাহারে থাকে!

অনেক অর্থনীতিবিদদের মতে বর্তমান ভোগ ত্যাগ করলে সঞ্চয় হয় এবং সঞ্চয় ঋণদান কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করলে সুদ অর্জন করে। আসলে কী বর্তমান ভোগ ত্যাগ করলে সঞ্চয় হয় ? তাহলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সঞ্চয় কেন কম হয় ? কেন দরিদ্র লোকেরা সঞ্চয় করতে পারে না ? কেন ধনী লোকেরা সঞ্চয় করতে পারে ? এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর উপরোক্ত অর্থনীতিবিদদের যুক্তিকে অসাড় করে তোলে। মানুষ যখন তার প্রয়োজনীয় ভোগ ব্যয়ের তুলনায় অধিক আয় করতে পারে, তখনই সে সঞ্চয় করতে পারে। আর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, পারিবারিক মমত্ববোধ, সন্তানের লেখা-পড়া, চিকিৎসা, সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি কারণসমূহ মানুষকে অতিরিক্ত আয় করতে প্ররোচিত করে এবং অতিরিক্ত আয় হতে সঞ্চয় সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে দরিদ্র শ্রেণির লোকদের অতিরিক্ত আয় নেই, তাই তাদের সঞ্চয়ও নেই। 

ধনিক শ্রেণির লোকেরা তাদের সম্পদ যাতে আরও নিশ্চিত পরিমাণে বৃদ্ধি পায়, সে জন্য সুদ তাদের নিকট অতি পছন্দনীয় একটি বিষয় হিসেবে কাজ করে। তাদের নিকট হতে ঋণ গ্রহণ করে কেউ ব্যবসাতে লাভ করুক অথবা ক্ষতি করুক, যাই করুক না কেন পুঁজির মালিক নির্দিষ্ট সময় শেষে তার মূলধন এবং সুদ পেয়ে যাবে। সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছে যাওয়া দাবী করা সভ্য সমাজ কীভাবে একজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তার নিকট হতে মূলধনের অতিরিক্ত দাবী করতে পারেন ? এটি কি অনৈতিক দাবী নয় ? সত্যি সুদের মত অনৈতিক বিষয়কে বৈধ করার জন্য আমরা বলছি, সুদ হলো বর্তমান ভোগ ত্যাগের মূল্য!

(৩) একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে ঋণ প্রদান করা হলে মুদ্রাস্ফীতির কারণে অর্থের মূল্য কমে গেলে ঋণের মূল্য কমে যাবে। ঋণের মূল্য যাতে না কমে, সে জন্য অতিরিক্ত হিসেবে সুদ নেয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১ বছর মেয়াদে ১০০ টাকা ঋণ প্রদান করা হলো। বর্তমানে চালের দাম ২০ টাকা হলে ১০০ টাকা ৫ কেজি চালের সমান হবে। কিন্তু ১ বছর পর চালের দাম দাম ২৫ টাকা হলে ১০০ টাকা ৪ কেজি চালের সমান হবে। অতএব দেখা গেল যে, ১ বছর পর সুদ ছাড়া শুধুমাত্র ১০০ টাকা ফেরত নিয়ে আসলে, তার মূল্য কমে ৪ কেজি চালের সমান হবে। অর্থাৎ ঋণদাতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ঋণদাতার যাতে ক্ষতি না হয়, সেজন্য তাকে সুদ গ্রহণ করতে হবে।

(ক) ১ বছর পর মুদ্রাস্ফীতি হবে, এটি আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন ? অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মুদ্রাসংকোচনও হতে পারে। ধরুন মন্দার কারণে ১ বছর পর চালের দাম ১০ টাকা হলো। তাহলে ১ বছর পর আপনার ১০০ টাকা ১০ কেজি চালের সমান হবে। তখন কি আপনি ঋণগ্রহীতা হতে ১০০ টাকা না নিয়ে তার চেয়ে কম পরিমাণ নেবেন? মুদ্রাস্ফীতির কারণে যদি সুদ নিতে পারেন, তবে মুদ্রাসংকোচনের সময় মূল টাকা হতে কম নেবেন না কেন?

(খ) ধরুন আপনি আপনার টাকা ঋণ না দিয়ে ঘরে রেখে দেলেন। ১ বছর পর মুদ্রাস্ফীতি হলে আপনার টাকার মূল্য কমে যাবে। তখন আপনি কার কাছ হতে সুদ নেবেন ? মুদ্রাস্ফীতি হলে আপনার টাকা আপনার কাছে থাকলে যেমন তার মূল্য হারাবে, তেমনি ঋণগ্রহীতার নিকট থাকলেও সে তার মূল্য হারাবে। আপনার কাছে থাকলে সুদ নেই, কিন্তু ঋণগ্রহীতার নিকট থাকলে সুদ দিতে হবে, এ ধরনের অনৈতিকতা ইসলামে নেই। কারণ ইসলাম মানবিক মূল্যবোধকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়।

(গ) যারা মুদ্রাস্ফীতিকে ভয় পান, তাদের ঋণ দানের কোন প্রয়োজন নেই। বরং তারা যদি তাদের সম্পদ বাড়াতে চান, তবে ব্যবসায় অংশীদার হবেন। আর ব্যবসায় অংশীদার হলে সেখানে সুদ থাকবে না, থাকবে মুনাফা বা ক্ষতি। আপনার যদি ব্যবসা করার যোগ্যতা না থাকে, তবে বিশ্বস্ত কোন লোকের সাথে লিখিত চুক্তি করে ব্যবসা করুন অথবা কোন কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করুন। কিন্তু সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে কোন ঝুঁকি গ্রহণ না করে প্রয়োজনে অপর পক্ষের ক্ষতি সাধন করে নিশ্চিত প্রাপ্তি হিসেবে সুদ কীভাবে নেবেন ? একজন ব্যক্তি আপনার নিকট হতে অথবা আপনার মধ্যস্থতাকারী ব্যাংকের নিকট হতে ১০০ টাকা ঋণ গ্রহণ করে ব্যবসা করে ১০০ টাকাই পেল। তার লাভ-লোকসান কিছুই নেই। কিন্তু সে আপনাকে অথবা আপনার ব্যাংককে মূলধন ১০০ টাকা ফেরত দিল এবং সেই সাথে সুদ হিসেবে আরও ১৫ টাকা প্রদান করল। হিসেব করে দেখুন ঐ ব্যক্তির ব্যবসায় লাভ-লোকসান নেই - এটি যেমন তার জন্য কষ্টের বিষয়, তেমনি আপনি বা আপনার ব্যাংকে ১৫ টাকা সুদ প্রদান করে সে নীট ক্ষতি বহন করল ১৫ টাকা। আর আপনি অথবা আপনার মধ্যস্থতাকারী ব্যাংক সুদের মাধ্যমে ১৫ টাকা লাভ করে ঋণগ্রহীতাকে শূন্য মুনাফা হতে সোজা ক্ষতিতে প্রমোশন দিয়ে সমাজের দারিদ্র বিমোচন করল! একটু আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন, আমরা আধুনিক সভ্যতর নাগরিক হিসেবে গর্ববোধ করি, অথচ আমরা কতটুকু সভ্য? 

(৪) যারা সুদের কথা বলেন, তাদের যুক্তি হলো বর্তমান অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো সুদ। সুদ ছাড়া বর্তমান অর্থনীতি কল্পনাই করা যায় না। বর্তমান আধুনিক অর্থনীতিতে সুদবিহীন অর্থনীতি নির্মাণ করা একটি কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। 

পুঁজিপতিদের সম্পদের মূল ভিত্তি হলো সুদ। কিন্তু পুঁজিপতিরা মূল সত্যটি এড়িয়ে বলছে “বর্তমান অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো সুদ”। এই পুঁজিপতি ইয়াহুদী ব্যবসায়ীরা খৃস্টান বিশ্বে সুদের মাধ্যমে যেখানে সম্পদের পাহাড় গড়েছে, সেখানে ১৩০০ বছরের মুসলিম সাম্রাজ্যে সুদ ছিল না। বর্তমানেও সুদবিহীন অর্থনীতি চালু করা সম্ভব, কিন্তু তা অত্যন্ত কঠিন কাজ হবে ইয়াহুদী পুঁজিপতিদের কারণে। কারণ বর্তমান বিশ্বের সম্পদের একটি বড় অংশ এই সুদি কারবারী ইয়াহুদীদের নিয়ন্ত্রণে, জ্ঞান-বিজ্ঞানেও তারা অগ্রসর, বিশ্বের রাজনীতিকেও তারা নিয়ন্ত্রণ করছে - সোজা কথা হলো বর্তমানে তারা বিজয়ী জাতি।

 অন্যদিকে যে জাতি ওয়াজ মাহফিলে একে-অন্যের দোষ-ত্রুটি ধরা নিয়ে ব্যস্ত, ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে স্বপ্নে, সম্পদ বৃদ্ধির জন্য যায় ‘বাবার দরবারে’, সেই জাতির পক্ষে সুদবিহীন অর্থনীতি বিনির্মাণ করা আর অন্ধের হাতি দেখা একই কাজ হবে। তবে আশার কথা হলো কিছু সংখ্যক মুসলিম স্কলার এবং তরুণরা যেভাবে এগিয়ে আসছে, হয়ত একদিন দেখা যাবে সুদবিহীন অর্থনীতি পুনরায় ফিরে এসেছে। খৃস্ট সমাজেও সুদ নিষিদ্ধ। আবার সনাতন ধর্মেও সুদ নিষিদ্ধ। ইয়াহুদী ধর্মেও সুদ নিষিদ্ধ, যদিও তারা পৃথবীতে সুদকে প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে খৃস্ট এবং মুসলিম চিন্তাবিদদের নিকট তারা নিন্দনীয়। যদি খৃস্ট, মুসলিম ও সনাতন ধর্মের লোকেরা এবং সেই সাথে ইয়াহুদীদের মধ্যে ভাল লোকগুলো সুদ নিষিদ্ধের বিষয়ে একমত হতে পারে, তবে বিভিন্ন জাতি রাষ্ট্রের মধ্যে ধন বৈষম্য এবং একই সাথে মানুষে মানুষে আয় বৈষম্য হ্রাস পাবে।  

(৫) কেউ কেউ একটি উদ্ভট যুক্তি প্রদান করেন। সেটি হলো কোন ব্যক্তির নিকট হতে সুদ গ্রহণ নিষিদ্ধ হতে পারে, কিন্তু ব্যাংক বা সরকার হতে সুদ গ্রহণে বৈধতা আছে। কারণ হলো সুদ দিয়ে ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিন্তু ব্যাংক বা সরকার কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। তাই ব্যাংক বা সরকারের নিকট হতে অতিরিক্ত (সুদ) গ্রহণ করা কোনভাবেই নিষিদ্ধ হতে পারে না। 

(ক) কোন মুসলিম উপরোক্ত মন্তব্য করলে তার জন্য আর কোন যুক্তি-তর্ক থাকে না। কারণ ইসলাম গ্রহণ করলে আপনি মুসলিম (মুসলিম শব্দের অর্থ হলো অনুগত) হবেন। আল্লাহপাক কাউকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণ করতে বলেননি। কোরআন ভাল করে অধ্যয়ন করে দেখুন, আল্লাহপাক আপনাকে প্রথমেই সালাত কায়েম, যাকাত আদায় এর কথা বলেননি। এমনকি আপনাকে মদ হারাম, সুদ নিষিদ্ধ এগুলোও বলেননি। আল্লাহপাক পৃথিবীর গঠন, সৌরজগৎ, পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির ইতিহাস টেনে বলেছেন, তিনিই সর্বশক্তিমান এবং মানুষকে তার নিকট ফেরত আসতে হবে। তাই তিনি মানুষের আনুগত্য দাবী করলেন। যারাই আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেয়ার স্বীকৃতি দিয়েছেন, তারাই ‘অনুগত’ অর্থাৎ ‘মুসলিম’ পরিচয় পেয়েছেন। আর তাদের জন্য কী মানতে হবে এবং কী মানা যাবে না, তার একটি নির্দেশাবলী দিয়েছেন, যা “আল কোরআন” নামে পরিচিত। সূরা বাকারার ২নং আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “এটা ঐ গ্রন্থ যার মধ্যে কোনরূপ সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ নেই; মুত্তাকীদের জন্য এই গ্রন্থ হিদায়াত বা মুক্তিপথের দিশারী”। তাহলে সুদ সংক্রান্ত আপনার উপরোক্ত ধারণা অর্থাৎ ব্যাংক বা সরকার হতে সুদ গ্রহণে বৈধতা আছে - এর রেফারেন্সে কোরআন বা হাদীসে কী আছে, তা আপনি উপস্থাপন করুন। কারণ একজন মুসলিম মুখে যা আসে, তাই বলতে পারে না। অবশ্য আপনি যদি বলেন, ভাই আমি বিপদে পড়ে মুসলিম হয়েছি, কারণ আমার মা-বাবা মুসলিম! তাহলে আপনি নিশ্চিন্ত মনে সুদ খেতে পারেন, এমনকি মহাজনি সুদও খেতে পারবেন! কোন ধরনের সুদ আপনার জন্য অবৈধ নয়। আর আপনি যদি অন্য ধর্মের হোন, তবে আপনি দেখুন, আপনার ধর্ম সুদ সম্পর্কে কী বলেছে এবং সেই অনুযায়ী আপনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। 

(খ) আপনি দেখছেন ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, তাই তার নিকট হতে সুদ নেয়া যেতে পারে। প্রশ্ন হলো ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হবে কেন ? ব্যাংক হলো পূর্বে যারা মহাজন ছিল, পরে পুঁজিপতি, তাদের প্রতিষ্ঠান। প্রথমদিকে পুঁজিপতি বা মহাজনরা ব্যক্তিগতভাবে দ্ররিদ্রদের রক্ত শোষণ করেছে, আর এখন তারা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ব্যাংকের মাধ্যমে ঐ একই কাজ করছে। আপনি ব্যাংকে টাকা রাখলেন ব্যাংক আপনাকে প্রতি ১০০ টাকায় ৮ টাকা সুদ দেবে। আর ব্যাংক আপনার টাকা অন্য একজনকে প্রদান করল, সে ব্যাংকে প্রতি ১০০ টাকায় ১৪ টাকা সুদ দেবে। ব্যাংক হতে ঋণগ্রহণকারী ব্যক্তি মারা গেলে বা ব্যবসায় ক্ষতি করলেও ব্যাংক ঐ ব্যক্তির জামানত বিক্রয় করে তার পাওনা আদায় করবে এবং আপনার সুদ পরিশোধ করবে। তাহলে আপনি কীভাবে বলবেন, আপনার সুদের টাকায় কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না! বরং মহাজনি প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের মাধ্যমে আপনি ঐ দরিদ্র ব্যক্তিকে বাস্তুহারা করার কাজে একজন অংশীদার।

(গ) আরও একটি চমৎকার যুক্তি হলো সরকার হতে সুদ গ্রহণ করা মোটেই দুষণীয় নয়। যারা সরকারের নিকট হতে সুদ গ্রহণ বৈধ মনে করেন, তাদের যুক্তি হলো সরকার সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। যে কোন উৎস হতে সরকার সুদের টাকা ম্যানেজ করতে পারেন। এজন্যই দেখা যায় যে প্রতিবছর বাজেটে সরকারের সুদ পরিশোধের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এই সুদ পরিশোধজনিত ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারকে করের পরিমাণ বাড়াতে হচ্ছে। অর্থাৎ সাধারণ জনগণ কর বহন করবে সম্পদশালীদের সুদ পরিশোধের জন্য!

(৬) যাদের অর্থনীতি সম্পর্কে কোন ধারণা নেই, তারাই বর্তমান ব্যাংকের সুদ এবং সরকারের সুদ ক্ষতিকর মনে করেন না এবং তা গ্রহণ করা বৈধ মনে করেন। কিন্তু বর্তমান সুদ যা ব্যাংকের হউক বা সরকারের হউক তা সমাজের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর। এই ধরনের শিক্ষিত লোকদের মাথা-মগজ বিজাতীয় চিন্তাধারা গঠিত হওয়ায় তারা মনে করেন ব্যাংক বা সরকারের সুদ অবৈধ - এটি কাঠমোল্লাদের বক্তব্য! এ সমস্ত শিক্ষিত লোকদের জন্য ফোর্ড মটরগাড়ি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হেনরি ফোর্ড এর ‘the International Jew’  যার অনুবাদকৃত গ্রন্থ হলো ‘সিক্রেটস অব জায়োনিজম’ হতে কিছু বক্তব্য তুলে ধরা হলো -

(ক) “পয়গম্বর মোজেস (মূসা আঃ) সুদ বাণিজ্য এবং ঋণি ব্যক্তির জমি দখল করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ---মোজেস (মূসা আঃ) মারা যাওয়ার পর তারা (ইয়াহুদী) আবার সুদ বাণিজ্যে ফিরে আসে এবং বলে অপরিচিত জ্যান্টাইলের (অইয়াহুদী বা ইয়ায়াহুদী নয়) সাথে সুদ বাণিজ্য করা যাবে, কিন্তু নিজ ধর্ম ভাইয়ের উপর কখনোই সুদের বোঝা চাপানো যাবে না” (সিক্রেটস অব জায়োনিজম-১৭ ও ১৮ পৃ, ২য় সংস্করণ)। দেখুন কী সুন্দর মিল! আমাদের কিছু শিক্ষিত মুসলিম বলেন মহাজনি সুদ নিষিদ্ধ কিন্তু ব্যাংক বা সরকারের সুদ নিষিদ্ধ নয়!

(খ) “যে সুদভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থাকে পৃথিবীর প্রত্যেক পয়গম্বর (নবী) নিষিদ্ধ করে গেছেন, তা-ই আজ ইয়াহুদীরা পৃথিবীর সব অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে” (সিক্রেটস অব জায়োনিজম-৩৪পৃ)। এই কথাটি কোন কাঠমোল্লার নয়। এটি হলো বিখ্যাত ফোর্ড মটরগাড়ি কোিম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হেনরি ফোর্ড এর বক্তব্য।

(গ) “বাজারের সব সম্পদ নিজেদের দখলে নিয়ে আমরা (ইয়াহুদীরা) একচেটিয়া আধিপত্যের জন্ম দেব। ----- এই নির্ভরশীলতা তাদের (রাষ্ট্রসমূহকে) ঋণের বেড়াজালে আটকে ফেলবে, যা তাহাদের উপর জাতীয় দায়রূপে চেপে বসবে। তাদের এই দূর্বলতাকে ব্যবহার করে আমরা (ইয়াহুদীরা) আন্তর্জাতিক স্বৈরশাসনের জন্ম দেব। ----কৃষকদের বন্ধকী ঋণে আটকে ফেলা। ধীরে ধীরে ঋণের সুদ কৃষকদের উপর চেপে বসবে। একসময় জমির মালিক হওয়ার পরও তারা আমাদের অধীনস্ত হবে (সিক্রেটস অব জায়োনিজম-৭৪ পৃ ‘‘Protocols of the Learned Elders of Zion” ষষ্ঠ প্রটোকল হতে )।” ‘Protocols of the Learned Elders of Zion’  লিখে অনলাইন সার্চ দিয়ে দেখুন, দেখবেন অনেক আর্টিক্যাল লেখা আছে, যেখানে এই বইটিকে মিথ্যা দলিল বলা হয়েছে। সমস্ত মিডিয়া জগত ইয়াহুদীদের নিয়ন্ত্রণে, তাই তারা যা সত্য বলবে, তাই সত্য, এবং যা মিথ্যা বলবে, তা -ই মিথ্যা, এর বাইরে কোন কিছুই নেই। ইয়াহুদীদের এই গোপন দলীলে যা বলা হয়েছে, ইতিহাস স্বাক্ষ্য বিভিন্ন দেশে তাই ঘটেছে। এই গোপন দলীলের ভূমি অধ্যায় পড়ুন এবং ইয়াহুদীদের ফিলিস্তিন এর উপর দখল দারিত্ব পড়ুন, দেখবেন পরিকল্পনার কী অপূর্ব মিল রয়েছে!  

হাজার হাজার কোটি ডলারের মালিক হেনরি ফোর্ড ইয়াহুদীদের সুদভিত্তিক অর্থনীতির উদ্দেশ্য নিয়ে যেখানে কলম ধরেছেন, সেখানে আমরা কিছু শিক্ষিত মুসলিম বলছি মহাজনি সুদ নিষিদ্ধ কিন্তু ব্যাংক বা সরকারের সুদ নিষিদ্ধ নয়! হেনরি ফোর্ড তার বইতে দেখিয়েছেন ইয়াহুদীরা কেন বার নির্যাতিত হয়েছে, বাস্তুহারা হয়েছে, আবার পুনরায় সংগঠিত হয়ে কীভাবে তাদের সুদি অর্থনৈতিক শক্তি দ্বারা খৃস্ট সমাজের নৈতিকতার পতন ঘটানো হয়েছে। হেনরি ফোর্ড এ জন্য দায়ী করেছেন প্রধানত সুদি ব্যাংকিংকে। সুদি ব্যাংকিং এর মাধ্যমে তারা সমাজের অপরাপর বিষয়ের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করেছে।

 হেনরি ফোর্ড তার বইতে যা লিখেছেন, তার অনেক আগেই আল্লাহপাক কোরআনের সূরা নিসা এর ১৬১ নং আয়াতে বলেছেন “তারা সুদ গ্রহণ করে, যা করতে তাদের নিষেধ করা হয়েছিল”। আয়াতের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী (পূর্বের আয়াত বিবেচেনা করে) এখানে ‘তারা’ বলতে ইয়াহুদীদের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ তাওরাতেও সুদ নিষিদ্ধের কথা বলা হয়েছে। হেনরী ফোর্ড বুঝলেন, কিন্তু আমাদের শিক্ষিক সমাজের কিছু মুসলিম বুঝলেন না! আঞ্চলিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি সম্পর্কে কোন ধরনের জ্ঞান না রেখে অদৃশ্য জগত হতে প্রতিষ্ঠিত তাদের মনমগজ স্বাক্ষ্য দিচ্ছে “মহাজনি সুদ নিষিদ্ধ কিন্তু ব্যাংক বা সরকারের সুদ নিষিদ্ধ নয়!”                 (চলবে..............)

লেখক,
আকমল হোসাইন,
সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ, মৌলভীবাজার।

user
user
Ad