`

কৃষকের কথা

  • Views: 1063
  • Share:
জুলাই ১, ২০২০ ১১:৩৫ Asia/Dhaka

গোপন দাশ, নিউইয়র্ক:: নদী মাতৃক হাওর ঘেরা সবুজ শ্যামল দেশ কৃষকদের হাড় কাটুনি পরিশ্রমে ফলানো সোনালী ফসলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে।একটা সময় কৃষি প্রধান দেশে চাষাবাদের জন্য জায়গার অভাব ছিল না।

যদিও সে সময় প্রযুক্তির ব্যবহারের অভাব ছিল। শারীরিক পরিশ্রম ও তৎকালীন সময়ের কলাকৌশল দিয়েই খাদ্য শস্য উৎপাদিত হয়েছে। তখনকার সময় বেশিরভাগ কৃষকই ছিলেন এক ফসলা চাষাবাদে অভ্যস্ত। ফসল উৎপাদনকালীন ঋতুতে কাক ডাকা ভোর হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আকাশ দেখে ও তাপমাত্রা অনুভব করে আবহাওয়ার ভবিষ্যৎদ্বাণী করতেন। 

কেউ অভিজ্ঞতালব্ধ প্রচলিত প্রবাদ প্রবচনকেও অনুসরণ করতেন। এখনও প্রচলন আছে আমে বান ( অর্থাৎ আম ফসল বেশি হলে ঝড়-তুফানও বেশি হয় )।এছাড়া প্রকৃতির অস্বাভাবিক পরিবর্তনে পশু পাখির আচরণের ইঙ্গিত তো সর্বজন স্বীকৃত। আধুনিকতার ছোয়ায় এখন আর তা প্রয়োজন পরে না । চাষাবাদ হচ্ছে মানব জাতির প্রথম ও সর্ব বৃহৎ কর্মক্ষেত্র।পৃথিবী হতে অনেক পেশার বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও কৃষি বিদ্যমান থাকবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।যাহা মৌলিক চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতি প্রদত্ত্ব উর্বর ভূমিতে চাল, পাট, গমের চাষাবাদ উল্লেখযোগ্য। অধিক পাট উৎপাদনের জন্য একসময় সোনালী আঁশের দেশ বলা হত। ফলের মধ্যে কলা, আম, আনারস, কাঁঠাল ইত্যাদি। নানান জাতের সবজি হলেও আলু হচ্ছে প্রধান যাহা খাদ্য নিরাপত্তা তৈরিতেও সহায়ক। এসব চাষাবাদে কৃষকদের নানান প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়।বিশেষ করে অকাল বন্যা শিলাবৃষ্টি ঘূর্ণিঝড় ও অতি খরায় কৃষকরা হয় ক্ষতিগ্রস্ত।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে প্রয়োজনের তাগিদেই বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাঁধ, চাষাবাদে সার, কীটনাশক প্রতিরোধে ঔষধ, গবেষণার মাধ্যমে অধিক উৎপাদনের জন্য নানান জাতের বীজ, বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার ও উৎপাদিত ফসলকে গুদামজাতকরণ করা হচ্ছে।অধিক খরা থেকে ফসল রক্ষার জন্য বিদ্যুতের সহায়তায় সেচ ব্যবস্তার উন্নয়ন হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্টানের সাথে বেসরকারী সংস্থাগুলিও কৃষির উন্নয়নে গবেষণার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির প্রসারণ ঘটাচ্ছে ।কৃষি কাজের সাথে সংযুক্ত হচ্ছে মৎস চাষ, পোল্ট্রি ফার্ম ও পশুর খামার।ফলে মানুষের পুষ্টিহীনতা দূরীকরণে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হচ্ছে ।প্রযুক্তির ব্যবহারে কাজকর্ম যদিও অনেকটা সহজ হয়েছে তবু আবাদি জমি দখলের প্রবণতা ও উৎপাদিত দ্রব্যাদির ন্যায্য মূল্য না পাওয়াতে শ্রমজীবি মানুষরা বাধ্য হয়েই ধীরে ধীরে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।

কৃষি ব্যবস্থা অনেকটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা। যাহার অবদান দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে বিশাল ভূমিকা রাখছে।দেশের সরকারী প্রতিষ্টানগুলিতে যারা স্বল্প খরচে পড়াশুনা করছে, তাদের এই সুযোগ পাওয়ার পিছনে রয়েছে কৃষকের অবদান। অথচ দুর্ভাগ্যক্রমে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীরা চাকরি পাওয়ার পরই গ্রামে বসবাসে অনীহা প্রকাশ করে ।এমনকি যারা গ্রাম থেকে বড় হয়েছে তাদের মধ্যেও এরকম প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।এ যেন নদী পাড় হওয়ার পর খেঁয়া নৌকার মাঝিকে অবমূল্যায়নের মত।

কৃষকদের জন্য যদিও সরকার বিভন্ন ধরণের সুবিধা দিচ্ছে। বিশেষ করে স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ, সারের ক্ষেত্রে ভর্তুকি, এমনকি কৃষি উপকরণ আমদানির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদেরও বিভিন্ন ছাড় দেয়া হয়ে থাকে বাস্তবতা হলো প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই মধসত্ত্বভোগীদের কারণে কৃষকদের নানান ধরণের দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয় ।বিশেষ করে তাদের অনেক কষ্টে উৎপাদিত ফসল যখন বাজারজাত করতে চায় তখন ন্যায্যমূল্য থেকে হয় বঞ্চিত। কর্তৃপক্ষ হতে দেয়া সুবিধাকে তখন মনে হয় বৃক্ষের গোড়া কেটে ডালে পানি দেয়ার মত ।ফলে কৃষকরা হয়ে পড়ে নিরুৎসাহিত। এভাবে কৃষকের অনুপাত দিন তো দিন কমে যাচ্ছে !

মরার উপর খরার ঘা হিসেবে অপরিকল্পিত  শিল্প কারখানা, আবাসন ও রাস্তা ঘাট তৈরির কারণেও কমে যাচ্ছে আবাদি জমির পরিমান। তবুও একথা সত্য যে প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও কৃষকদের  ভাগ্য বদলায়নি ।অথচ ইহা হচ্ছে এমন এক ব্যবস্তা যাহা শুধু খাদ্য উৎপাদনই করে না, পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায়ও সহায়ক।যেখানে শিল্প কারখানা পরিবেশ নষ্ট করছে সেখানে কৃষি ব্যবস্থা পরিবেশ রক্ষায় আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করছে। যারা এই পেশায় নিয়োজিত তাদেরকে নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত পরিমানে সঠিক তথ্য উপাথ্য তৈরী হয়নি।তাই যখনই কৃষকের ভাগ্য বদলের জন্য সরকারী ও বেসরকারী সেবামূলক নানান প্রকল্প গ্রহণ করা হয় তখন সঠিক মানুষের নিকট সেই সেবা পৌঁছায় না।পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় কোন সভ্যতাই যেমন কৃষিবিহীন ছিল না তেমনি বর্তমান সময়ের উন্নত দেশগুলির মধ্যেও কৃষিবিহীন দেশ পাওয়া যাবে না। বরং কৃষিকাজে উৎসাহিত করতে নানান ধরণের প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়। তাই দেশকে বসবাসের উপযোগী পরিবেশে রাখা ও পাশাপাশি উন্নত রাষ্ট্রে পদার্পনের জন্য কৃষিকে অগ্রাধিকার দেয়ার বিকল্প নেই। যাহা কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে সঠিক কর্ম সম্পাদন করা দরকার।যেহেতু দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ হচ্ছে কৃষির জন্য উর্বর ভূমি সম্পন্ন উপযোগী তাই কৃষকদের অবহেলা হচ্ছে দেশের জন্য নিজের পায়ে কুড়াল মারার সামিল।কৃষকদের সঠিক অবস্থান জেনে তাদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্টান কর্তৃক যাবতীয় সুযোগ সুবিধাকে মধ্যস্বত্ব সুবিধাভোগী বিহীন সঠিক প্রতিনিধির নিকট পাঠাতে হবে।কৃষি অফিস, ব্যাংক, পশু হাসপাতাল, বীজ-সার বিতরণ কেন্দ্র ও গুদাম সমূহকে প্রয়োজনে শহর থেকে স্থানান্তর করে  ইউনিয়ন ও গ্রামভিত্তিক করা দরকার।

কৃষিকাজে দিনমজুর হিসেবে যারা কাজ করে তাদের মান সম্পন্ন মজুরি প্রদান ও এই পেশায় নিয়োজিত পরিবার সমূহকে স্বল্প খরচে  স্বাস্থ্য ও বীমা সুবিধা দিয়ে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। কৃষকের উৎপাদিত দ্রব্যের বাজারজাতকরণের  নিশ্চয়তা ও ন্যায্য মূল্যের প্রাপ্তি  ঘটাতে হবে।এক্ষেত্রে দালালের দৌরাত্ব কমানো অত্যাবশ্যক।কৃষিকে স্বল্প শিক্ষিত মানুষের পেশা না রেখে উচ্চ শিক্ষিতদেরও অন্তর্ভুক্ত করে এই পেশায় নিয়ে আসতে হবে, যেন কৃষকের কথা কৃষক নিজেই বলতে পারে।

লেখক, 
গোপন দাশ,  নিউইয়র্ক।

user
user
Ad
Ad