ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, নাকি স্বাস্থ্য ধূমপানের উপযোগী নয়
মোঃ নুরুজ্জামান বিশ্বাস :: ধূমপানের ইতিহাস অনেক গভীর। সেই আদিকাল হতে মানুষ ধূমপানে অভ্যস্ত। প্রাচীন জমিদারদের বৈঠক খানায় হুক্কা ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। জমিদার প্রথার হুক্কা রূপ পরিবর্তন করে নানান রূপে ও নামে তৎকালীন গ্রামীণ সমাজ থেকে আধুনিক সমাজে প্রবেশ করেছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রসারের ফলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ এখন ধূমপান বিরোধী। তারপরও ধূমপান থেমে নাই। কেউ শখে কেউ দেখে, কেউ নেশায়, কেউ সঙ্গীর প্ররোচনায় কেউ বা এমনি এমনি ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়ছেন।
জমিদারী প্রথার সময়কালে, জমিদারদের অনুসরণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ দেশীয় প্রযুক্তিতে (নারিকেলের শক্ত অংশ ও কাঠ দিয়ে ) হুক্কা বানিয়ে চিটাগুড় মিশ্রিত তামাক কলিকায় রেখে আগুণ ধরিয়ে গড়গড় করে টান দিত আর নিজেকে জমিদারের চেয়ারে কল্পনা করত। নারীরাও ঐ সময়ে হুক্কা টানে পিছিয়ে ছিলেন না। পল্লীর শ্লোক গাথায় এর প্রমাণ মিলে। গৃহকর্তা হাটের দিন বাজার নিয়ে বাড়ী এসেছেন। গৃহকর্ত্রী বাজারের ব্যাগ খূলে খেয়াল করলেন কর্তা বাজার থেকে তামাক আর চিটাগুড় আনে নাই। রেগে মেগে বাজারের ব্যাগ বাইরে ফেলে দিয়ে গৃহকর্তাকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ “যা খেয়ে গুষ্ঠি বাচে তা আনে নাই, আনছে কতগুলো চাল!”
সংশপ্তক নাটকে জমিদারের হুক্কা খাওয়ার দৃশ্যে জমিদারের সহকারী রমজানের গভীর মনোযোগ ও যত্ন সহকারে হুক্কায় কইলকা সাজানো এবং তা নিয়ে গান “পরাণের হুক্কারে তোর নাম কে রাখিল ডাব্বা...।” তৎকালীন গ্রামীণ সমাজে হুক্কার জনপ্রিয়তার জানান দেয়।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গ্রামীণ সমাজে কিছু সময় হুক্কার প্রচলন থাকলেও ধীরে ধীরে তা বিলুপ্ত হতে থাকে। প্রযুক্তির উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও মানুষের রুচির পরিবর্তনের সাথে তাল মিলাতে না পেরে হুক্কার ব্যবহার অনেকটা থমকে যায়। বাজারে আসে ক্রমান্বয়ে পাতার বিড়ি, কাগুজে বিড়ি, সিগারেট এবং পিছনে তুলা লাগানো সিগারেট। আভিজাত্য প্রকাশের জন্য অনেকে পাইপ বা চুরুটও ব্যবহার করতেন।
বাংলাদেশে গ্রামীণ সমাজের কিছু নারীরা হুক্কায় অভ্যস্ত হলেও বিড়ি সিগারেটের প্রতি আমাদের দেশে আগ্রহী নারীদের সংখ্যা খূবই কম। ধূমপায়ী নারীদের বেশীর ভাগই ছিলেন রাইচ মিলের কর্মী এবং নির্মাণ শ্রমিক। শিক্ষিত নারী সমাজে ধূমপায়ী নারীর সংখ্যা নগণ্য।
৮০ দশকে বিড়ির ফ্যাক্টরিগুলো ব্যবসার প্রসার ঘটাতে শুরু করে এবং হুক্কার জায়গা দখল করে নেয়। ঐ সময়ে গ্রামের বাজারগুলোতে বাজারের দিন বিড়ি কোম্পানির পক্ষ থেকে ভাড় সেজে চোঙা হাতে প্যারডি গান গেয়ে বিড়ির বিজ্ঞাপন দিতে আসত এবং মানুষজনকে বিনা পয়সায় বিড়ি খাওয়াত। মজমা মিলিয়ে- বিড়ি খেয়ে চোখ দিয়ে ধোয়া বের করতে পারে- একথা বলে মজমাকে আরও আকৃষ্ট করত। পিড়াপিড়ির এক পর্যায় বিড়িতে লম্বা টান দিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে ধোয়া দেখার জন্য বলত। চোখে চোখ পড়লে আস্ত করে বিড়ির ছ্যাকা দিয়ে মজা নিত।
মানুষ বিড়িতে আকৃষ্ট হয়েছে বুঝতে পেরে বিড়ির দাম দিগুণ তিনগুণ বাড়িয়ে দিল। তখনকার গ্রামীণ সমাজের একটা সাধারণ দৃশ্য ছিল – গ্রামে হাটের দিনে অন্যান্য বাজার সওদা’র সাথে বিড়ি ও তামাকেরও আলাদা দোকান বা পসরা বসত। বাজারের দোকানগুলোর বেশী ভাগ জায়গায় শোভা পেত নানান ধরণের বিড়ি ও সিগারেট। তখনকার সময়ে বড়দের একটা অভ্যাস ছিল বাজার থেকে বিড়ি/ সিগারেট কেনার কাজে ছোটদের ব্যবহার করা। আমাকে কেউ বিড়ি/ সিগারেট কিনতে বাজারে পাঠালে অর্ধেক পয়সা মেরে দিতাম। বুদ্ধিটা কাজ দিয়েছিলো। পয়সা মেরে দেয়ার কারণে বিড়ি/ সিগারেট কেনার কাজে আমাকে কেউ আর বাজারে পাঠাত না। ছোটবেলার একটা সাধারণ ধাঁধা ছিল, সবকিছু টানলে বাড়ে, কোন জিনিস টানলে কমে?
স্কুল জীবনে বন্ধুদের অনেকই বয়স হয়েছে- এটা প্রমাণ করতে বিড়িতে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে । বড়দের প্যাকেট থেকে ২/৪ টা মেরে দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে সুখ টান দিয়ে আস্তে আস্তে বিড়ির নেশায় পড়ে যায় । কলেজে পড়াকালীন একবন্ধু আভিজাত্য দেখানোর জন্য গোল্ডলীফ সিগারেটের প্যাকেটে বিড়ি রাখত। একদিন এক প্রতিবেশীর নজরে আসলে তিনি ব্যাপারটা বন্ধুর বাবাকে জানান, যে তার ছেলে দামী সিগারেটে অভ্যস্ত। তার এত টাকার উৎস কি? সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরলে কোন কথা না বলে উত্তম মাধ্যম শুরু। এক সময় মাইরের কারণ বুঝতে পারলো এবং বুঝানোর চেষ্টা করল, যে বাবার পকেট থেকে বিড়ি নিয়ে গোল্ডলীফেড় এর প্যাকেটে রেখেছে।
৯০’র দশকে সময়ে গণ পরিবহণসহ অনেক জায়গায় ‘ধূমপান নিষেধ’ লেখা কথাটি খূব প্রচার পেয়েছিলো। ঐ দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় মডেল ও অভিনেতার একটা বিজ্ঞাপন “সিগারেটটা শেষ পর্যন্ত ধরেই ফেললাম” ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে এবং শিক্ষিত তরুণ সমাজ, বিশেষকরে নারী সমাজ সিগারেটে বা ধূমপানের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসমর্থন গড়তে সক্ষম হয়।
সিগারেটখোরদের কাছে, “ সিগারেট নহ তুমি শ্বেতপরী” গান টির বাস্তব প্রমাণ দেখেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিকে হল জীবনে। রাতে কারো সিগারেটের নেশা পেয়ে বসলে ২ টাকার সিগারেট ৫ টাকা দিয়েও কিনে সুখ টান দিত।
প্রবাসে এসে অনেকটা অবাক হলাম। এখানে পুরুষের চেয়ে ধূমপানে নারীরা এগিয়ে। স্মোকিং জোনে পুরুষের চেয়ে নারী ধূমপায়ীই বেশী দেখি। আমি ধূমপায়ী না হলেও অনেককে মাঝে মাঝে ধূমপানে সংগ দিতে হয়। মজার ব্যাপার এবং খেয়াল করে দেখলাম, যুবক- যুবতীদের একটা সাধারণ অভ্যাস কাউকে সিগারেট খেতে দেখলে, এক্সট্রা সিগারেট আছে কিনা জিজ্ঞাস করা- অর্থাৎ থাকলে আমাকে একটা দাও। কারণ হতে পারে এখানে সিগারেট সহজলভ্য না। আমাদের দেশের মত মোড়ে মোড়ে বিড়ি সিগারেটের দোকান নাই। অ্যালকোহল যতটা সহজলভ্য সিগারেট ততটা নয়। তাছাড়া আইনি ব্যাপার আছে। বিক্রেতার বয়স সন্দেহ হলে ফোটো আই ডি চেয়ে বসে। অনেক ক্রেতা এটাকে সহজভাবে মেনে নিতে চায় না।
টরেন্টো সিটিতে কাজ করার সুবাদে একটা জিনিস খেয়াল করেছি এবং তা দেখে একা একা অনেক সময় হেসেছি। অনেকের পকেটে সিগারেট না থাকলেও লাইটার রাখে। উদ্দেশ্য কারো লাইটার দরকার হলে লাইটার দিয়ে এক্সট্রা সিগারেট থাকলকে চেয়ে নেয়া আর নাহলে লাইটারের ভাড়া বাবত ২ টান দিতে পাড়া। অনেকে সিগারেটের পাছা বা বাট কুড়িয়ে ধূমপানের কাজ।
ভাড়া বাবত ২ টান দিতে পাড়া। অনেকে সিগারেটের পাছা বা বাট কুড়িয়ে ধূমপানের কাজটি সেরে নিতে দেখেছি। আমার এক সহকর্মীকে দেখতাম কেউ সিগারেট চাইলে থাকলেও নাই বলত এবং সিগারেটের পরিবর্তে পয়সা অফার করত। মজার ব্যাপার কেউই পয়সা নিতে চায়না।“স্মোক থাকলে দাও না থাকলে সমস্যা নাই” বলে চলে যেত।
বাংলাদেশে গত কিছুদিন যাবত নারীদের সিগারেট খাওয়া নিয়ে ২ টি ভি ডি ও খুব ভাইরাল হয়েছে এবং পক্ষে বিপক্ষে অনেকই মন্তব্য করেছন। প্রথমতঃ পাবলিক প্লেসে প্রকাশ্যে ধূমপান আইনত অপরাধ এবং অশোভনীয়। আমাদের দেশের সামাজিক অবস্থা বিবেচনায়, নারীদের প্রকাশ্যে ধূমপান অশোভনীয়, দৃষ্টি কটু এবং অনেকটা সামাজিক অপরাধ। এ নিয়ে কুতর্কে না যাওয়াই শ্রেয়। হতে পারে বন্ধুদের সাথে মজা করে হয়ত ২/১ টা টান দিয়েছে, কেউ হয়ত সেটাকে ভি ডি ও করে বাজীমাত করতে চেয়েছেন। যিনি এটা করেছেন তিনিও আইনের চোখে অপরাধী।
আমাদের দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অবদান কম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশী। সকল ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা নয়- প্রতিযোগিতা হোক সকল ভাল কাজের। পরিশেষ, ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এটা সকলের জন্য প্রযোজ্য। ধূমপান বর্জন করি, তামাক মুক্ত সমাজ গড়ি।
লেখক
মোঃ নুরুজ্জামান বিশ্বাস
টরেন্টো, কানাডা।
- সিলেটের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল দ্রুত চালু করে ১২শ শয্যায় উন্নীত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
- পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে MS3 টেকনোলজি বিডি পরিবারের ঈদ শুভেচ্ছা
- এবার এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানে ইরানি আঘাত
- শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে ইরানের মোকাবিলা সম্ভব নয়: মুজতাবা খামেনেয়ী
- ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিণতির বিষয়ে রাশিয়ার হুঁশিয়ারি
- একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
- রমজান মাসই বন্ধ থাকছে মাধ্যমিকসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
- মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য, বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ: আইন উপদেষ্টা
- যুদ্ধ, বিভাজন ও অনিশ্চয়তা: বহুমুখী সংকটে ইসরায়েল
- পুরো রমজান মাসে হাইস্কুল বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ
- হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন তারেক রহমান
- বিজেপি-আরএসএসের বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় উইকিপিডিয়া
- আসামে তীব্র শীতের মধ্যেই ১৫০০ মুসলিম পরিবারের ঘর গুঁড়িয়ে দিল ভারত
- নুতন বই পেয়ে উচ্ছাসিত রাঙামাটির শিক্ষার্থীরা
- সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছেছে খালেদা জিয়ার মরদেহ
- আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই
- শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান
- জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানিয়ে নাহিদকে এনসিপির ৩০ নেতার চিঠি
- পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরশাসনের পতন
- তারেক রহমানের বহনকারী প্লেন নামল সিলেটে

