`

ফজিলতের রাত শবে কদর

  • Views: 1261
  • Share:
মে ৩, ২০২১ ০০:৪৮ Asia/Dhaka

এইচ. এম.ফখরুল ইসলাম সিদ্দিকী:: 'শবে কদর'কথাটি ফারসি। ‘শব’ মানে রাত বা রজনী, ‘কদর’ মানে সম্মান, মর্যাদা, গুণাগুণ, সম্ভাবনা, ভাগ্য ইত্যাদি। শবে কদর অর্থ হলো মর্যাদার রাত বা ভাগ্যরজনী। শবে কদরের আরবি হলো লাইলাতুল কদর তথা সম্মানিত রাত।

লাইলাতুল কদরঃ
অজস্র ধারায় আল্লাহর রহমত বর্ষিত হওয়ার রাতপবিত্র শবে কদর মহিমান্বিত একটি রজনী। শবে কদরের অন্য নাম লাইলাতুল কদর। কদরের রাতে অজস্র ধারায় আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে আলোচনাকরতে গেলে সর্ব প্রথম চলেআসে সূরা কদরের কথা। যে সূরাতে শবে কদরের মর্যাদা খুঁজে পেতে একটুও বেগ পেতে হয়না। মহান আল্লাহএ রাতের পরিচয় দিচ্ছেন এভাবে -“লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম“।

মহান আল্লাহরএবানীতেপ্রতিয়মানহয়লাইলাতুল কদরের ফজিলত ও তাৎপর্য অপরিসীম।মহান আল্লাহ যে রাতকে ‘হাজার মাসের চেয়ে উত্তম’ঘোষনাদিলেন সে রাতকে ইবাদত-বন্দেগীতে পূর্ণ করাই যেন তাঁর প্রতি আমাদের যথার্থ সম্মানের বহিঃপ্রকাশ।

পবিত্র কুরআন নাযিলের রাত শবে কদরঃ
পবিত্র কুরআনের সংস্পর্শে একটি সাধারণ রাত ‘লাইলাতুল কদর’ বা ‘শবে কদর’ রজনীর সম্মানে বিভূষিত হয়েছে।কুরআনুল কারীমেআল্লাহ তাআলা বলেন-“নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি মর্যাদাপূর্ণ কদর রজনীতে। আপনি কি জানেন, মহিমাময় কদর রজনী কী? মহিমান্বিত কদর রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।উক্ত রজনীতেরহমতের ফেরেশতাগণ ও জিবরাঈল (আ.)আল্লাহর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে, সকল বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। এই শান্তির ধারাফজর না হওয়া পর্যন্তবিরাজমান“। (৯৭:সুরা আল্ কাদর ১-৫,)

অতএব, পবিত্রকুরআনের সঙ্গে যার যতটুকু সম্পর্ক ও সংস্পর্শ থাকবে, তিনি ততটুকু সম্মানিত ও মর্যাদার অধিকারী হবেন।

সুরা কদর নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপঠঃ
ইবনে আবি হাতেম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সামনে বনী ইসরাঈলের জনৈক চারজন লোক সম্পর্কে আলোচনা করলেন যে, তারা দীর্ঘ হায়াত লাভ করে অধিককাল যাবত ইবাদত করেছেন। এ সময়ের মধ্যে তারা একটিও নাফরমানি করেননি।

রাসুলুল্লাহর (সা.) জবান মোবারক থেকে এ কথা শুনতে পেরে সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত বিস্মিত হলেন এবং নিজেদের ব্যাপারে আফসোস করতে লাগলেন। সাহাবায়ে কেরামের এ আফসোসের পরিপ্রেক্ষিতে মহান রাব্বুল আলামিন হজরত জিবরাঈলের (আ.) মাধ্যমে রাসুলের (সা.) নিকট এমন সময় এই সুরায়ে ‘কদর’ অবতীর্ণ করেন।

লাইলাতুল কদরের গুরুত্বঃ
কদরের ফজিলত বোঝানোর জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ‘কদর’ নামে আলাদা একটি সূরা অবতীর্ণ করেন। কেবল কোরআন নয় বরং হাদিসেও কদরের ফজিলত রয়েছে বলে প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, নিশ্চয় আমি তা (কোরআন) এক মোবারক রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। (সুরা আদ দুখান : ১-৪)

হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, শবে কদরে হজরত জিবরাইল (আ.) ফেরেশতাদের বিরাট এক দল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং যত নারী-পুরুষ নামাজরত অথবা জিকিরে মশগুল থাকে, তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন। 
রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, যদি কেউ ঈমানের সঙ্গে সাওয়াব লাভের খাঁটি নিয়তে লাইলাতুল কদর কিয়ামুল্লাইল বা তাহাজ্জুদে অতিবাহিত করে তবে তার পূর্ববর্তী সকল গোনাহ ক্ষমা করা হবে।

কোন রাত লাইলাতুল কদর?
লাইলাতুল কদরের নির্দিষ্ট কোনো তারিখ নেই। অনেকেই মনে করেন ২৭ রমজানই লাইলাতুল কদরের রাত। আসলে এ ধারণাটি সঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনও বলেন নি যে, ২৭ রমজানের রাত কদরের রাত। তবে ২১ রমজান থেকে নিয়ে ২৯ রমজন পর্যন্ত বেজোড় যে কোন রাতই শবে কদর হতে পারে। 
লাইলাতুল কদরের তারিখের ব্যাপারে নবী করীম (সা.) এরশাদ করেন, আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছে, অতঃপর আমাকে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। অতএব তোমরা শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতসমুহে তা খোঁজ করবে।
ইবনে মাজাহ শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হজরত রাসুল (সা.) বলেন, যে লোক শবে কদর থেকে বঞ্চিত হয় সে যেন সমগ্র কল্যাণ থেকে পরিপূর্ণ বঞ্চিত হল। 

আবু দাউদ শরিফে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর পেলো কিন্তু ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে কাটাতে পারলো না, তার মতো হতভাগা দুনিয়াতে আর কেউ নেই। 
কদরের রাতের ইবাদতের সুযোগ যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায় সেজন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামরামাদানমাসেরশেষ দশদিনের পুরো সময়টা ইতেকাফরত থাকতেন।
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুল (সঃ) বলেন-
عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُجَاوِرُ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ وَيَقُولُ ‏"‏ تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ ‏"‏ ‏.‏ حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ ‏.‏

আইশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলেন, রমযান মাসের শেষের দশদিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাসজিদে থাকতেন (ইতিকাফ করতেন)। তিনি বলতেনঃ রমযান মাসের শেষের দশদিন তোমরা কাদরের রাতকে খোঁজ কর।
وَقَوْلُهَا يُجَاوِرُ يَعْنِي يَعْتَكِفُ ‏.وَأَكْثَرُ الرِّوَايَاتِ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ ‏"‏ الْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ فِي كُلِّ وِتْرٍ ‏"‏ ‏.
এখানেতিনি ‘ইউজাবিরু’ শব্দের অর্থনিয়েছেন‘ইতিকাফ‘। এই ক্ষেত্রে বেশিরভাগ হাদীসের শব্দ হচ্ছেঃ শেষ দশদিনের প্রতি বিজোড় রাত্রে তোমরা লাইলাতুল কাদর খোঁজ কর।
‏ وَرُوِيَ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ أَنَّهَا لَيْلَةُ إِحْدَى وَعِشْرِينَ وَلَيْلَةُ ثَلاَثٍ وَعِشْرِينَ وَخَمْسٍ وَعِشْرِينَ وَسَبْعٍ وَعِشْرِينَ وَتِسْعٍ وَعِشْرِينَ وَآخِرُ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ.‏
লাইলাতুল কাদর প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণিত আছে যে, তা হল একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ, ঊনত্রিশ বা রমযানের শেষরাত।
সর্বোপরি;আমাদেরকে যদি শবে কদরের বরকত হাসিল করতে হয় বিশেষ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হয় তাহলে অবশ্যই রমাদানের শেষ-দশকের পাঁচটি বেজোড় রাত্রিতে একনিষ্ঠতার সহিত ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকতে হবে।

শবে কদরে সাধারনত যেসব আমল করা যায়ঃ
*  নফল নামাজ: 
*  কুরআন তিলাওয়াত:
*  বেশীবেশীদুরুদ শরীফ পড়া।
*  অধিক পরিমাণে তাওবা-ইস্তিগফার করা।
*  তাসবিহ-তাহলিল, জিকির-আজকার ইত্যাদি করা।
*  কবর জিয়ারত করা।
*  নিজের জন্যএবং পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও সব মোমিন মুসলমানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা।
*  দেশ ও জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনায় দোয়া করা।
আল্লাহ পাক আমাদের সকল কে পবিত্র শবে কদরের রাত অন্বেষন করার তাউফিক দান করুন।
আমিন।

লেখক: 
মাওলানাএইচ.এম.ফখরুল ইসলাম সিদ্দিকী
সিনিয়র শিক্ষক (ইসলামশিক্ষা)
সাদিপুর অদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়
উপজেলা-ওসমানীনগর, জেলা-সিলেট।

user
user
Ad
Ad