`

আল্লাহর নৈকট্য লাভে এতেকাফ

  • Views: 2805
  • Share:
এপ্রিল ২৯, ২০২১ ১৬:০৫ Asia/Dhaka

এইচ.এম.ফখরুল ইসলাম সিদ্দিকী:: পবিত্র শবে কদর প্রাপ্তির সুনিশ্চিত প্রত্যাশায় সর্বোপরি মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য রমজানের শেষ দশকের এতেকাফ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। রমজানের শেষ দশকের এতেকাফ রাসুলুল্লাহর (সা.)এর গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত আমল। ফরজ ইবাদত ব্যতিত আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য যেসব ইবাদত করা হয় তার মধ্যে এতেকাফ একটি অন্যতম ইবাদত।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَعَہِدۡنَاۤ اِلٰۤی اِبۡرٰہٖمَ  وَ اِسۡمٰعِیۡلَ اَنۡ طَہِّرَا بَیۡتِیَ  لِلطَّآئِفِیۡنَ وَ الۡعٰکِفِیۡنَ وَ الرُّکَّعِ  السُّجُوۡدِ ﴿۱۲۵ ﴾‘আমি ইবরাহিম ও ইসমাঈলকে আদেশ দিয়েছিলাম যেন তারা আমার ঘরকে (কাবা) তাওয়াফকারীদের জন্য, এতেকাফকারীদের জন্য ও (সর্বোপরি তার নামে) রুকু-সিজদাহকারীদের জন্য পবিত্র রাখে।  (সুরা বাকার ১২৫)
মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
وَلَا تُبَاشِرُوۡہُنَّ وَ اَنۡتُمۡ عٰکِفُوۡنَ  ۙ فِی الۡمَسٰجِدِ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ  اللّٰہِ ﴿۱۸۷﴾
‘আর মসজিদে যখন তোমরা ইতেকাফ অবস্থায় থাকবে তখন স্ত্রী-সম্ভোগ থেকে বিরত থাকো। সিয়ামের ব্যাপারে এগুলোই হলো আল্লাহর সীমারেখা’। (সুরা বাকারা : ১৮৭)
মহানবী (সা.) স্বয়ং এতেকাফ করেছেন এবং এতেকাফ করার জন্য সাহাবিদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন। 
وَعَنْ عَائِشَة رَضِيَ اللهُ عَنْهُا قَالَتْ : كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُجَاوِرُ فِي العَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ، ويَقُوْلتَحرَّوا لَيْلَةَ القَدْرِ في العَشْرِ الأَوَاخرِ مِنْ رَمَضَانَ متفقٌ عليه
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশ দিনে এতেকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা রমযানের শেষ দশকে শবেক্বদর অনুসন্ধান কর। বুখারী ২০২০, মুসলিম ২৮৩৩
হজরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুলে পাক (সা.) বলেছেন-
عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى قَبَضَهُ اللَّهُ ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ ‏.‏

হজরত আয়েশা (রাঃ) আরো বলেন, ‘নবী করিম (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিন এতেকাফ পালন করতেন। তার ওফাতের আগ পর্যন্ত তিনি এতেকাফ পালন করে গেছেন। তারপর তার পত্নিরাও তা পালন করেছেন।’ (তিরমিজি : ৮০৮)।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলে পাক (সা.) বলেছেন-
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ فِي الْمُعْتَكِفِ هُوَ يَعْكِفُ الذُّنُوبَ وَيُجْرَى لَهُ مِنْ الْحَسَنَاتِ كَعَامِلِ الْحَسَنَاتِ كُلِّهَا
হজরত ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ই‘তিকাফকারী সম্পর্কে বলেনঃ সে নিজেকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে এবং নেককারদের সকল নেকী তার জন্য লেখা হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নম্বরঃ ১৭৮১

রামাদানের শেষ দশকের এতেকাফ সুন্নতে মোয়াক্কাদা আ’লাল কেফায়া। অর্থাৎ মহল্লার জামে মসজিদে কোনো রোজাদার মুসলিম এতেকাফ করলে সবার পক্ষ থেকে এ ধরনের সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। তাই এলাকাবাসীর কেউ যদি এতেকাফ না করে তা হলে সুন্নত ছেড়ে দেয়ার কারণে সবাই সুন্নত তরকের কারনে গুনাহ হবেন।

এতেকাফের পরিচয়ঃ
এতেকাফ শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে স্থির থাকা, আবদ্ধ থাকা, অবস্থান করা। শরিয়তের পরিভাষায় নির্ধারিত সময়ে বিশেষ নিয়তে বিশেষ অবস্থায় সওয়াব হাসিলের উদ্দেশ্যে পার্থিব ও জাগতিক সব ধরনের সংস্পর্শ ত্যাগ করে যে মসজিদে জামাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নিয়মিত আদায় করা হয় এমন মসজিদে মহান আল্লাহর ইবাদতের নিয়তে ২০ রমাদান সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পূর্ব থেকে ২৯ অথবা ৩০ রামাদান ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখার পূর্ব পর্যন্ত পুরুষদের জন্য মসজিদে এবং নারীদের জন্য নিজ গৃহে নামাজের নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করাকে এতেকাফ বলে।

এতেকাফের প্রকারঃ
সুন্নাত এতেকাফঃ রমজানের শেষ দশকেরে এতেকাফ। অর্থাৎ ২০ রমজানের সূর্য ডোবার আগ মুহূর্ত থেকে শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠা পর্যন্ত মসজিদে এতেকাফ করা। এ ধরনেরেএতেকাফকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া বলা হয়। গ্রাম বা মহল্লাবাসীর পক্ষে কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তি এই এতেকাফ করলে সবার পক্ষ থেকে তা আদায় হযয় যাবে।

ওয়াজিব এতেকাফঃ নজর বা মানতের এতেকাফ ওয়াজিব। যেমন কেউ বলল যে, আমার অমুক কাজ সমাধা হলে আমি এত দিন এতেকাফ করব অথবা কোনো কাজের শর্ত উল্লেখ না করেই বলল, আমি এত দিন অবশ্যই ইতিকাফ করব। যত দিন শর্ত করা হবে তত দিন ইতিকাফ করা ওয়াজিব। ওয়াজিব ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা শর্ত। সুন্নাত ইতিকাফ ভঙ্গ করলে তা পালন করা ওয়াজিব হয়ে যায়। 

নফল এতেকাফঃ সাধারণভাবে যেকোনো সময় এতেকাফ করা নফল। এর কোনো দিন কিংবা সময়ের পরিমাপ নেই। অল্প সময়ের জন্যওেএতেকাফ করা যেতে পারে। এ জন্য মসজিদে প্রবেশের আগে এতেকাফের নিয়ত করে প্রবেশ করা ভালো।

এতেকাফের উদ্দেশ্যঃ
* লাইলাতুল কদর প্রাপ্তির মাধ্যমে মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভ।
* ‘আল্লাহর প্রতি মন নিবিষ্ট করা, তাঁর সাথে নির্জনে বাস করা এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে জাগতিক উদ্দেশ্য থেকে দূরে অবস্থান করা, যাতে তার চিন্তা ও ভালোবাসায় একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিকে স্থান করে নিতে পারে।’
* মসজিদে অবস্থানের অভ্যাস গড়ে তোলা।
* পাশবিক প্রবণতা  এবং অহেতুক কাজ থেকে দুরে থাকা।
* নেক কাজে ইচ্ছাশক্তি প্রবল করা এবং প্রবৃত্তিকে খারাপ অভ্যাস ও কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা।

এতেকাফের শর্তঃ
* নিয়ত করা।
* জামাআ’ত অনুষ্ঠিত হয় এমন মসজিদে এতেকাফ করা।
* এতেকাফকারী রোজাদার হওয়া। 
* জ্ঞানসম্পন্ন মুসলমান স্ত্রী-পুরুষের জানাবাত ও মহিলারা হায়েজ-নেফাস হতে পাক হওয়া।
* পুরুষ লোক জামে মসজিদে এতেকাফ করা।
* নারীদের জন্য নিজ গৃহে নামাজের নির্ধারিত স্থানে এতেকাফ করা ।
* সর্বদা হদসে আকবর থেকে পাক-পবিত্র থাকা।

এতেকাফের উপকারিতাঃ
* এতেকাফকারী এক নামাজের পর আর এক নামাজের জন্য অপেক্ষা করে থাকে, এ অপেক্ষার অনেক ফজিলত রয়েছে।
* এতেকাফকারী কদরের রাতের তালাশে থাকে, যে রাত অনির্দিষ্টভাবে রমজানের যে কোন রাত হতে পারে। এই রহস্যের  কারণে আল্লাহ তা-আলা সেটিকে বান্দাদের থেকে গোপন রেখেছেন, যেন তারা মাস জুড়ে তাকে তালাশ করতে থাকে।
* এতেকাফের ফলে আল্লাহ তা’আলার সাথে সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং আল্লাহ তা’আলার জন্য মস্তক অবনত করার প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠে।
* যখন কেউ মসজিদে অবস্থান করা পছন্দ করতে শুরু করে তখন সে মসজিদকে ভালোবাসবে ও সেখানে নামাজ আদায়কেও ভালোবাসবে। আর এ প্রক্রিয়ায় আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক মজবুত হবে।
* মসজিদে এতেকাফের মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশে নিজেকে আবদ্ধ করে নেওয়ার কারণে মুসলমানের  অন্তরের কঠোরতা দূরীভূত হয়।
* মসজিদে এতেকাফ করার কারণে ফেরেশতারা এতেকাফকারী জন্য দোয়া করতে থাকে।
* এতেকাফের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি আসে।
* বেশি বেশি  কুরআন তিলাওয়াতের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
* ঐকান্তিকভাবে তওবা করার সুযোগ লাভ হয়।
* তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হওযা যায়।
* সময়কে সুন্দরভাবে কাজে লাগানো যায়।

যে সব কারণে ইতেকাফ মাকরূহ হয়ঃ
* সম্পূর্ণ নীরব থাকা এবং কারোর সঙ্গে আদৌ কথা না বলা।
* মসজিদে পণ্য সামগ্রীর ক্রয়-বিক্রয়।
* প্রাণীর ছবিযুক্ত পেপার দেখা।
* আর্থিক বিনিময়ের মাধ্যমে তালিম দেয়া।
* কলহ-দ্বন্ধ ও বাজে কথা চর্চা করা।
যদি কেউ উপরে উল্লেখিত কাজ সমূহ এতেকাফরত আবস্থায় করেন তবে তাহার এতেকাফ মাকরুহ হয়ে যাবে।

এতেকাফ ভাঙা জায়েজ যে কারণেঃ
ইতেকাফকারী যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, যার চিকিৎসা মসজিদের বাইরে যাওয়া ছাড়া সম্ভব নয় তবে তার জন্য ইতেকাফ ভেঙে দেওয়ার অনুমতি আছে। -ফাতাওয়ায়ে শামী

বাইরে কোনো লোক ডুবে যাচ্ছে বা আগুনে দগ্ধ হচ্ছে তাকে বাঁচানোর আর কেউ নেই, অনুরূপ কোথাও আগুন লেগেছে, নেভানোর কেউ নেই তবে অন্যের প্রাণ বাঁচানোর এবং আগুন নেভানোর জন্য ইতেকাফকারীর ইতেকাফ ভেঙে দেওয়ার অনুমতি আছে।

জোরপূর্বক মসজিদ থেকে ইতেকাফকারীকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয় যেমন ওয়ারেন্ট এসে গেলে ইতেকাফ ভেঙে দেওয়া জায়েজ। সেরূপ ইতেকাফকারীর যদি এমন সাক্ষ্য দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে, যা শরিয়তানুযায়ী তার জন্য ওয়াজিব সেরূপ সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ইতেকাফ ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি আছে।

মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তান-সন্ততির অসুস্থতার কারণেও ইতেকাফ ভেঙে দেওয়া জায়েয। তেমনি পরিবারের কারো প্রাণ, সম্পদ বা ইজ্জত আশঙ্কার সম্মুখীন হলে এবং ইতেকাফ অবস্থায় তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা সম্ভব না হলে ইতেকাফ ভেঙে দেওয়া জায়েয। এ ছাড়া যদি কোনো জানাযা হাজির হয় এবং জানাযা পড়ানোর কেউ না থাকে তখনো ইতেকাফ ভেঙে দেওয়া জায়েয। -ফাতহুল কাবির

উল্লিখিত প্রয়োজন পূরণ করতে বের হলেই ইতেকাফ ভেঙে যাবে, তবে গোনাহ হবে না। -বাহরুর রায়েক

এতেকাফ ভেঙে গেলে করণীয়ঃ
সুন্নত ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর মসজিদের বাইরে চলে আসা জরুরি নয়। বরং বাকি দিনগুলো নফলের নিয়ত করে ইতেকাফ করা যেতে পারে। এর দ্বারা সুন্নতে মোয়াক্কাদা তো আদায় হবে না কিন্তু নফল ইতেকাফের সওয়াব পাওয়া যাবে। যদি অনিচ্ছাকৃত ও ভুলক্রমে ইতেকাফ নষ্ট হয়, তবে হতে পারে আল্লাহতায়ালা আপন রহমতে সুন্নত ইতেকাফেরও সওয়াব দিয়ে দিতে পারেন। সে কারণে ইতেকাফ নষ্ট হয়ে গেলে উত্তম হলো বাকি দিনগুলোও পূর্ণ করা। ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর ইতেকাফকারী মসজিদ থেকে চলেও আসতে পারে, তাতে কোনো সমস্যা নেই। আবার এক দিন পরে গিয়ে নফল ইতেকাফের নিয়ত করে মসজিদে আবার ইতেকাফ শুরুও করতে পারে, তাও জায়েজ আছে। যেদিন ইতেকাফ নষ্ট হয়েছে শুধু সে দিনেরই কাজা করা ওয়াজিব। পুরো ১০ দিনের কাজা করা ওয়াজিব নয়। -ফাতাওয়ায়ে শামি
ইসলাম এতেকাফকারীকে যেসব প্রয়োজন পূরণে মসজিদ থেকে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছেঃ
* প্রস্রাব-পায়খানার প্রয়োজনে।
* যদি মসজিদে অবস্থানকালে গোসল করা সম্ভব না হয়।
* যদি মসজিদে অবস্থান করে অজু করা সম্ভব না হয়।
* এতেকাফকারীর খাওয়া-পরার জিনিস এনে দেওয়ারমতো কোন লোক না থাকার কারণে  যদি এতেকাফকারীকে খাওয়া-পরার প্রয়োজনীয় জিনিস আনার জন্য বাইরে যেতে হয়।
* মুয়াজ্জিনের আজান দেওয়ার জন্য বাইরে যাওয়া লাগে।
* যে মসজিদে ইতেকাফ করা হচ্ছে, সে মসজিদে যদি জুমার ব্যবস্থা না থাকে তবে জুমার নামাজ আদায়ের প্রয়োজনে অন্য মসজিদে যেতে হয় সে জন্য মসজিদ থেকে  বের হওয়া ওয়াজিব, এবং আগে ভাগেই রওয়ানা হওয়া তার জন্য মুস্তাহাব।
* মসজিদ ভেঙে যাওয়ার কারণে অন্য মসজিদে স্থানান্তরিত হতে হয়।

যেসব প্রয়োজনীয়তার কথা উপরে উল্লেখ করা হলো, এসব ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ইতেকাফকারী মসজিদের সীমানা থেকে বের হলে তা এক মুহূর্তের জন্য হলেও ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। সেটা ইচ্ছায় হোক বা ভুলক্রমে। তবে ভুলক্রমে হলে ইতেকাফ নষ্ট করার গোনাহ হবে না।

এতেকাফকারীর জন্য জ্ঞাতব্য জরুরী মাসআলা:
মাসআলা-১: ইতেকাফকারীর মাথা ধৌত করা, চুল আঁচড়ানো, সুগন্ধি ব্যবহার করা, মাথা ন্যাড়া করা ও সৌন্দর্য গ্রহণ করা বৈধ। আবু দাউদের এক বর্ণনায় আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- হজরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মসজিদে ইতেকাফ করতেন, তিনি হুজরার ফাঁক দিয়ে আমার কাছে তার মাথা দিতেন, আমি তা ধুয়ে দিতাম।
মাসআলা-২: ইতেকাফকারী কোনো প্রয়োজনে মসজিদের বাইরে গেলে সালাম বা সালামের জবাবের জন্য না থেমে রাস্তায় চলতে চলতে কিংবা প্রয়োজনীয় কাজটি সারতে সারতে সালাম ও সালামের জবাব দিতে পারবে। এতে তার ইতেকাফের কোনো ক্ষতি হবে না। হাদিস আছে, আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইতেকাফ অবস্থায় (প্রয়োজনে বাইরে গেলে) যখন কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে অতিক্রম করতেন তখন হাঁটা অবস্থাতেই ওই ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নিয়ে নিতেন। -আবু দাউদ: হাদিস নং ২৪৭২; আহকামে ইতেকাফ: মুফতি তকি উসমানি: ৪০
মাসআলা-৩: রোজা ইতেকাফের জন্য শর্ত। যদি কেউ ইতেকাফ অবস্থায় রোজা ভেঙে দেয়, হোক তা কোনো ওজর বা অপারগতার কারণে, ইচ্ছায় বা ভুলক্রমে ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। -ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/২১৩

মাসআলা-৪: ইতেকাফকারী যদি বেহুঁশ বা পাগল হয়ে যায়, জিন-ভূতের আছরের কারণে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে এবং এ অবস্থা যদি একদিন একরাত বিদ্যমান থাকে তবে ধারাবাহিকতা খতম হয়ে যাওয়ার কারণে ইতেকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। যদি একদিন একরাত পূর্ণ হওয়ার আগেই হুঁশ বা বুদ্ধি ফিরে আসে, তবে ইতেকাফ নষ্ট হবে না। -রদ্দুল মুহতার: ২/৪৫০
মাসআলা-৫: ইতেকাফকারী কোনো শিরক বা কুফরি কাজ করলে ইতেকাফ ভেঙ্গে যাবে। অনুরূপ নারীদের হায়েজ-নেফাস শুরু হয়ে গেলে এবং স্ত্রী সহবাস বা যে কোনো প্রকার যৌন সম্ভোগ করলে ইতেকাফ ভেঙ্গে যাবে। -রদ্দুল মুহতার: ২/৪৪৭
মাসআলা-৬: যেসব ইবাদতের প্রভাব অন্যদের পর্যন্ত পৌঁছায় যেমন- সালামের উত্তর দেওয়া, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বারণ, প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, পথ দেখানো, ইলম শিক্ষা দেওযয়া কুরআন  পড়ানো ইত্যাদি করতে পারবে। কিন্তু শর্ত হল এগুলো যেন এত বেশি না হয যে এতেকাফের মূল উদ্দেশই ছুটে যায়।
মাসয়ালা-৭: এতেকাফকারীর জন্য মুস্তাহাব হল তার এতেকাফের স্থানে কোন কিছু দ্বারা পর্দা করে নেয়া। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তুর্কি গম্বুজের ভিতরে  এতেকাফ করেছেন যার  দরজায় ছিল চাটাই।
মাসআলা-৮: এতেকাফকারী তার প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্র  সঙ্গে নিয়ে আসবে। যাতে নিজের প্রয়োজনে তাকে বার বার মসজিদের বাইরে যেতে না  হয়।
মাসআলা-৯: এতেকাফকারী মসজিদে অবস্থানকালে ক্রয়-বিক্রয় করবে না, কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। এমনিভাবে যা ক্রয় বিক্রয়ের কাজ বলে বিবেচিত যেমন বিভিন্ন ধরনের চুক্তিপত্র, ভাড়া, মুদারাবা, মুশারাকা, বন্দক রাখা ইত্যাদি।
মাসআলা-১০: এতেকাফকারীর পরিবার তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে, কথা বলতে পারবে, কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ  এতেকাফকালীন তার সাথে সাক্ষাৎ করতেন। কিন্তু সাক্ষাৎ দীর্ঘ না হওয়া বাঞ্ছনীয়।
মাসআলা-১১: কোন নেকির কাজ করার জন্য এতেকাফকারীর মসজিদ থেকে বের হওয়া বৈধ নয়। যেমন রোগী দেখতে যাওয়া, জানাযায় অংশ গ্রহন করা ইত্যাদি।
মাসআলা-১২: এতেকাফকারী যদি বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হয় তাহলে তার এতেকাফ ভঙ্গ  হয়ে যাবে।

স্মরণ রাখতে হবে, উজরত অর্থাৎ বিনিময় বা পারিশ্রমিক দিয়ে কাউকে এতেকাফে বসানো জায়েজ নয়। কেননা ইবাদতের উজরত দেয়া ও নেয়া উভয়ই শরিয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েজ। (ফাতওয়ায়ে শামি)। এতেকাফকালীন অবস্থায় কারো সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ ও অনর্থক গল্প-গুজব বা বেহুদা কথাবার্তা বলে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। দুনিয়াবি কোনো লেনদেন না করার পাশাপাশি বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়াও অনুচিত। এতেকাফ অবস্থায় বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করার পাশাপাশি নফল নামাজ, তাসবিহ-তাহলিল, জিকির-আজকার, দোয়া-দরুদ, দান-সদকা ইত্যাদি নফল আমলের প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত।

লেখক: 
মাওলানা এইচ.এম.ফখরুল ইসলাম সিদ্দিকী

সিনিয়র শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা)
সাদিপুর অদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়
উপজেলা-ওসমানীনগর, জেলা-সিলেট।

বিঃদ্রঃ- সম্মানিত পাঠকবৃন্ধে প্রতি আমার আবেদন- কোন মানুষই ভুলের উর্ধ্বে নয়। অতএব, আমার লেখায় কোন ভুল-ত্রুটি আপনাদের দৃষ্টিগোচর হলে অনুগ্রহপূর্বক ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন এবং সঠিক তথ্যসহ কমেন্ট করে আমাকে কৃতজ্ঞ করবেন। লেখাটি শেয়ার করে অন্যকে জানার সুযোগ করে দিন; ইনশাআল্লাহ্ তাতে আপনিও সাদাকায়ে জারিয়া সাওয়াবের অংশিদার হবেন।

user
user
Ad
Ad