`

খ্যাতির বিড়ম্বনা ও আমাদের চাওয়া

  • Views: 2673
  • Share:
এপ্রিল ২৯, ২০২১ ০২:০০ Asia/Dhaka

মো. আতাউর রহমান:: খ্যাতিমান লোকরা বিড়ম্বনা, সুবিধা, অসুবিধা তিনটেই উপভোগ করে জীবন ধারণ করে। প্রশ্ন হলো- কেন? কেমন করে? কীভাবে? এসব উত্তর খুঁজে নিতে হলে সংসার, সমাজ ও দেশে দেশে বিদ্যমান কর্মগুলোর ভাণ্ডারে প্রবেশ করতে হয়। এই খুঁজাখুঁজির জন্যও যোগ্যতা লাগবে।

খ্যাতি হলে বিড়ম্বনা থাকবেই। খ্যাতিমানরা যে খ্যাতির বিড়ম্বনায় বিরক্ত, তা নয়। কেউ কেউ খ্যাতির বিড়ম্বনা উপভোগ করেন; আবার কেউ কেউ ভক্তদের এড়িয়ে চলেন। কিন্তু ভক্তদের জ্বালাতন কোনদিনও বন্ধ হবে না। খ্যাতিমানরা কাজ দিয়ে ভক্তদেরকে আরও বেশি মুগ্ধ করতে হবে। ভক্তকুলের জ্বালাতনকে ভালোবেসে তাদেরকে কাছে টানুন। তখন উন্মাদনা কমবে ও স্বস্তি ফিরবে। 

ধরুন, সন্তান প্রসবের বেদনা কতটা কষ্টদায়ক তা একমাত্র গর্ভধারিণী মা-ই ভালো জানেন। পবিত্র ভূমিষ্ঠার কণ্ঠে 'মা' শব্দটি শোনার জন্য গর্ভধারিণীকে কতই না সুবিধা অসুবিধার রীতিনীতি মেনে চলতে হয়েছে। সেই প্রসবের সন্তান পৃথিবী বিখ্যাত হলেও মা'য়ের প্রসব বেদনার মাফি হয় না। তাহলে কষ্টজনীত কারণে কী মা'য়েদের কাছে সন্তান প্রসবের মনোভাব উপেক্ষিত হয়। মোটেই না। জ্ঞাতসারেই সন্তান প্রসবিনী মায়েরা সংসার-সমাজ রীতিনীতির নানামুখি বিড়ম্বনা মোকাবিলা করে সন্তান বড় করে তোলেন। 

যারা লেখালেখি করেন তাদের লেখাগুলো তাঁদের (রচয়িতা) কাছে অনেকটা সন্তানের মতোই। তাহলে লেখকদেরও বিড়ম্বনা থাকবে; তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব জীবনে আশা, ভরসা ও বিশ্বাস বাস করে। মানুষের জীবনে আশা-ই সম্বল, ভরসা-ই শক্তি ও বিশ্বাস হলো তার পার্থিব সম্পদ। এই তিনটা শব্দ নিয়েই মানুষ জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এজন্য ভদ্রতাকে বানাতে হয় হাতিয়ার। আর কল্যাণের পথে মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হতে হয়। তবে ভদ্র সবাই হয় না। যার মধ্যে লজ্জাবোধ ও মনুষ্যত্ব আছে সে-ই ভদ্রতার মালিক হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে লেখালেখি প্রসঙ্গ নিয়ে একখানি ইলেকট্রনিক চিরকুট (১৯ এপ্রিল ২০২১) পেলাম।
আমার এক আদর্শিক অভিভাবক, সিলেটের লড়াকু রাজনীতির উত্তরপুরুষ খ্যাত পথিকৃৎ, এক আপোষহীন মুখ ও অন্যতম সমাজ সংস্কারক শ্রদ্ধেয় লোকমান আহমদ এর দেয়া চিরকুট এটি। এটি আমার কাছে এক মহামূল্যবান সম্পদ। ইলেকট্রনিক চিরকুটখানি ছিল এরকমঃ
"ভাতিজা, 
তুমি তো একজন জীবন যোদ্ধা, উচ্চ শিক্ষিত, সর্বোপরি একজন শিক্ষক। শ্রেণী-বিভক্ত এ সমাজে সুদীর্ঘকালের নানাবিধ অসামঞ্জস্যতা আরও কিছুকাল থাকবে। বিরাজমান বাস্তবতার আলোকে 'পাছে লোকে কিছু বলা' অপসংস্কৃতি চালু থাকবেই। এগুলো পায়ে মাড়িয়ে চলতে হবে। তোমার গতি থাকবে অপ্রতিরোধ্য। খড়-কুটো বিব্রতকর বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে চলো। তোমার বিজয় সারথি'র গতি কেউ রোধ করতে পারবে না, ইনশা আল্লাহ। 
তোমার ওজন অর্থাৎ তোমার গুণগত মান বিবেচনা করে ফেসবুকে সকল প্রকার মন্তব্য প্রদান করা থেকে বিরত থাকো।"

আমার নিকট এই ম্যাসেজ বাণী হলো- উপলব্দির। ম্যাসেজটি পড়ে এ,কে ফজলুল হক (রাজনীতিবিদ ও জননেতা) এর কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বলতেন, "তুমি কোথাও কোন ভাল কাজ কর, উপকার কর, তবেই লোকে তোমার বদনাম করবে। আম গাছে ফল ধরে বলিয়াই লোকে ঢিল মারে, ফজলি আম গাছে আরও বেশী মারে, শেওরা গাছে কেহ ঢিল মারে না।" এরপরও আমার কাছে ম্যাসেজটি আরো ভদ্র হওয়ার তাগিদ বলেই মনে হলো। মেনেও নিলাম ; চেষ্টায় ব্রতী হলাম। অবশেষে ভেবে বুঝলাম যে, অহংকার একদিন নিষ্কল হয়ে যাবে; কিন্তু সুন্দর ব্যবহার কোনদিন বৃদ্ধ হবে না। কারণ, মানুষের হৃদয় হলো সেই স্থান; যেখানে অবস্থান করতে হলে প্রচুর যোগ্যতা লাগে। সেই যোগ্যতা আমার এখনো হয়নি। তাই অর্জনের দিকেই ধাবিত হলাম। এই আদর্শিক সম্পদের বিনিময়ে প্রার্থনা ছাড়া কিছুই দেবার নেই। ধন্যবাদ চাচাজি। রোগমুক্ত থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন।

|| দুই ||
গেল ২১ মার্চ ২০২১খ্রি. রোববার আমার (লেখক) বর্তমান কর্মস্থলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মজির উদ্দিন স্যার ও সহকারী প্রধান শিক্ষক মিসবাহ স্যারকে নিয়ে নিজের রচিত একটা গ্রন্থ প্রকাশনার পরামর্শ চাইতে চিরকুটদাতা'র কাছে গিয়েছিলাম। সেই দিনটি ছিল তাঁর জন্মদিন। ঐদিন তাঁর ঐতিহাসিক বৈঠকখানা অনেক সময় আমাদের আঁকড়ে রেখেছিল। "পঞ্চখণ্ডের পথ ও পথিকৃৎ" গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানের অতিথি নির্বাচন থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানের যাবতীয় খরচাদি সংকুলান-কর্মে তাঁর স-প্রণোদিত উদ্যোগ, পদক্ষেপ ও কর্মসমুহ সত্যি আমাকে ঋণী করে দিয়েছে। কিন্তু করোনা নামক পেণ্ডামিনের কারণে সেই স্বাদ শেষবদি পূরণ হয়নি। যা হোক, সেই দীর্ঘ সময়ের বৈঠক আরও কিছু যে শিখিয়েছে তাঁর ঋণ-তো শোধ করা যাবে না। সেই শেখা ও শোনা কিছু অর্জন সকলের জ্ঞাতার্থে এখানেই যোগ করে নিলাম। অনুষ্ঠানের অতিথি নির্বাচন প্রসঙ্গে বললেন, আজকাল খ্যাতিমান লোকেরা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে অহরহ। তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হলে তাদের দেয়া তারিখে অনুষ্ঠান সাজাতে হয়। তা না হলে বিড়ম্বনায় ভুগতে হবে। যেখানে অনুষ্ঠান হবে সেখানেই যদি সভাপতির আসন স্থির না থাকে, তাহলে  আমন্ত্রিত অতিথিরা স্বাচ্ছন্দ উপভোগ করবেন না। এতে সুবিধা অসুবিধার দায় সভাপতির নজরে থাকে বিধায় অনুষ্ঠান প্রাণবন্ত হয়। এভাবে হয় বিস্তর আলাপ। যার সারমর্ম এরকমঃ

** ব্যক্তিগত কাজ সমাধানের জন্য আমরা সরকারী/বেসরকারি অফিসে দিনের পর দিন ঘুরাঘুরি করি, কিন্তু  খ্যাতিমানদের ঘুরাঘুরি করতে হয় না। তারা  মুঠোফোনেই কাজটা আদায় করে নিয়ে যায় ।
** আমরা যখন তখন যেথায় খুশি সেথায় বিচরণ করতে পারি, কিনতু খ্যাতিমানরা তা পারেন না।
** খ্যাতিমান লোকদেরকে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে মাপঝোঁক করে কথা বলতে হয়, কিন্তু আমাদের সে-ই ভয়টা নেই ।

সুতরাং এই কথাগুলো লেখার মূল বিষয় হলো- খ্যাতির বিড়ম্বনা। পড়ুয়া সকলেই নিশ্চয়ই জানেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত সৃষ্টি 'খ্যাতির বিড়ম্বনা' নাটিকাটির কথা। নাটিকাটির প্রধান চরিত্র দুকড়ি বাবু ছিলেন স্বার্থপর, কৃপণ ও অর্থলিপ্সুক আর পেশায় ছিলেন উকিল। কাঙালীচরণ নামের জনৈক ব্যক্তি এক সভা স্থাপন উদ্দ্যেশ্যে দুকড়ি বাবুর কাছে কিছু চাঁদা চাইলেন।   প্রথমে কাঙালীচরণের মুখে নিজ প্রশংসায় দুকড়ি তুষ্ট হলেও, পরে চাঁদা না দিয়ে কাঙালীকে অপমানিত করে তাড়িয়ে দিল।

দুকড়ির এই চাটুকারিতা বুঝতে পেরে কাঙালী পরদিন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ করল যে, তাদের সভা উপলক্ষে দুকড়ি বাবু পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা দিয়েছে। এ সংবাদ ছাপা হওয়ার পর দুকড়ির কাছে চারদিক থেকে লোকজনের সমাগম ঘটে। লোকমুখে নিজের প্রশংসায় প্রথমে খুব খুশি হয়। সেই সাথে ব্যবসায়িক খ্যাতি লাভের সম্ভাবনা আঁচ করে আরও বেশি আনন্দিত হয়।

কিন্তু ঘটলো তার সবই উল্টো। দুকড়ি বাবুকে সেরা দাতা ভেবে সবাই তার কাছে চাঁদা চাইতে আসতে লাগলো। লোকজন এসে নানাভাবে তাকে হেস্তনেস্ত করা শুরু করল। শেষ পর্যন্ত দুকড়ি চাঁদাপ্রার্থীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে মামার বাড়ি পালিয়ে গেলেন।

ধরুন, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট স্টার মাশরাফি মুর্তজা'র কথা। ঈদ উৎসব এলে তাকে পোহাতে হয় ভক্তদের যন্ত্রণা। ঈদে মাশরাফির নড়াইলের বাড়িতে  নিজ জেলার ভক্তদের পাশাপাশি যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বক্তরা মাশরাফির বাড়িতে ভীড় শুরু করেন। দূর থেকে আসা ক্লান্ত ভক্তদের অনেকেই এখানে বিশ্রামে যান। তাঁর পরিবারের পক্ষে আপ্যায়ন করানোটাও খ্যাতির বিড়ম্বনা নয় কি!

বাংলা সঙ্গীত ভুবনের জনপ্রিয় তারকা আসিফের কথাই বলি। গেল ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি ঢাকায় আসার পর এলআরবি, বেবী নাজনীন এবং সঙ্গীত তারকা আসিফ কনসার্ট করলেন। শো শেষে বের হওয়ার পথে এক মেয়ে ব্যাপক আকুতি নিয়ে আসিফের সাথে দেখা করতে চাইল। অনুমতি পেয়ে সে এসেই হাত মেলানোর অজুহাতে আসিফের বাম হাতের চামড়া খামচে মাংস তুলে নিয়ে চলে যায়। পরে আসিফকে ফোনে জানালো যে, এই মাংস সে লেমিনেটিং করে রাখবে। এটা নিয়েই বাকি জীবন বাঁচতে চায়!" কী অবাক কাণ্ড! 

খ্যাতিমান তারকা আল পাচিনো এক সাক্ষাৎকারে নিজের মুখেই স্বীকার করলেন, জনপ্রিয়তার চাপে বছরের পর বছর স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত তিনি। ৫০ বছরের মধ্যে একবারের জন্যও দোকানে কেনাকাটা করতে যেতে পারেননি আল পাচিনো। কারণ একটাই, খ্যাতির বিড়ম্বনা! 

আর্জেন্টাইন ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির চেহারার সাথে মিল থাকায় ইরানি যুবক রেজা পারাস্তেশও বিড়ম্বনার শিকার। হামাদানের পুলিশ থানায় নিয়ে নকলের সুযোগে প্রতারণাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তখন ইউরোপিয়ান শীর্ষ মিডিয়াগুলো রেজার সাক্ষাৎকার নিয়ে 'হুট' করেই যেন তাকে জিরো থেকে হিরো বানিয়ে দিল।

বাংলা চলচিত্রের এক বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা তাঁর মায়ের মরদেহ কাঁধে নিয়ে কলকাতার কেওড়াতলা শ্মশানে শেষকৃত্য করতে যাচ্ছেন। রাস্তার দু’পাশে লোক দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছে, এরই মাঝে কেউ একজন বলে ওঠলো, "অভিনেতা কাঁধে লাশ নিয়ে যাচ্ছে। তে-তো, নতুন কোনো সিনেমার শুটিং হচ্ছে “। বিখ্যাত হতে গেলে কী নিদারুণ বিড়ম্বনা পোহাতে হয়।

এক খ্যাতিমান শিল্পী তাঁর একমাত্র মেয়েকে আঠার বছর গান শিখিয়েছিলেন। কোন অনুষ্ঠানে গান গাইতেও দেন নাই। স্বপ্ন ছিলো, যেদিন মেয়েটি প্রথমবার অনুষ্ঠানে গান গাইবে, সেদিন দর্শকদের কাছে মেয়ের দীর্ঘ সাধনার প্রশংসা উন্মোচিত হবে। অনুষ্ঠান হলো। পরদিন অনুষ্ঠানের প্রশংসা করে পত্রিকা রিপোর্ট করল। আর রিপোর্টের শেষের দিকে লিখে দিলঃ "খ্যাতিমান শিল্পীর মেয়ে তো, ভালো অনুষ্ঠানের সুবিধা সে পাবেই।" খ্যাতিমান বাবার পরিচয়ে মেয়ের আঠার বছরের অক্লান্ত সাধনা ম্লান হয়ে গেলো। এটাও খ্যাতির বিড়ম্বনা। 

তাই ভালো ও খারাপ দুটোতেই বিখ্যাত হওয়ার যন্ত্রনায় বিড়ম্বনার অসংখ্য ক্ষত নিয়েই বাঁচতে হয়।

লেখক পরিচিতি:
মাস্টার ট্রেইনার ও কলামিস্ট। *লেখকঃ পঞ্চখণ্ডের পথ ও পথিকৃৎ *প্রাক্তন সভাপতিঃ বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব Πপ্রধান শিক্ষকঃ দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয়। * সহ-সভাপতিঃ বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, সিলেট। *আহবায়কঃ বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান পরিষদ, বিয়ানীবাজার উপজেলা।  

user
user
Ad
Ad