`

হরিজন ভাই-বোনদের প্রতি শ্রদ্ধা

  • Views: 3024
  • Share:
এপ্রিল ২৭, ২০২১ ১৫:২৩ Asia/Dhaka

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম :: কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা দিয়ে আজকের লেখাটি শুরু করতে চাই।

কবি তাঁর 'মানুষ জাতি' কবিতায় বলেছেন,
"জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে 
সে জাতির নাম মানুষ জাতি;"

একই কবিতায় তিনি বলেছেন, 
"কালো আর ধলো বাহিরে কেবল 
ভিতরে সবারই সমান রাঙা।"
.
বিবর্তনের পথ ধরেই সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে। পাথরে পাথরে ঘর্ষণ করে আগুন জ্বালানোর প্রয়োজন আর নেই। মানুষ এখন অনেক দূর এগিয়েছে। মঙ্গল গ্রহে কী চাষ করা হবে তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা চলছে। তাহলে কি আদিম কালের মানুষ  আর বর্তমান কালের মানুষের মধ্যে অর্থাৎ তাঁদের ব্রেইনের মধ্যে পরিবর্তন হয়েছে? এর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ আমি বিজ্ঞানী নই। একজন সাধারণ শিক্ষক মাত্র। তবে আমার কাছে যেটি সত্যি মনে হয় সেটি হলো প্রাচীন মানুষ  আর বর্তমান মানুষের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে যে, বর্তমান মানুষেরা বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রায় অনেক এগিয়ে আছেন। এবং পৃথিবীটাকে এঁরা এখন হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছেন। এঁরা এখানেই থেমে নেই। জলে-স্থলে অন্তরীক্ষে অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। 
.
মূল আলোচনায় ফিরে আসতে চাই। আলোচনার বিষয়বস্তু হলো হরিজন সম্প্রদায়। এঁদের সুখ-দুঃখ আর আনন্দ-বেদনা। বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশে এঁদের অস্তিত্ব রয়েছে। আমাদের দেশে যাঁরা উত্তরাধিকার সূত্রে পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত থাকেন বা এ পেশাকেই বেচে নেন তাঁরাই সাধারণত হরিজন। এঁদের পেশা হলো পরিচ্ছন্নতা জনিত কাজ। তাঁরা ময়লা পরিষ্কার করেন। ডাস্টবিন পরিষ্কার করেন। আমরা যদি তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে, তাঁরা আমাদের মতো সুখে নেই। তাঁদের যে বাসস্থান তা-ও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমাদের মতো নয়। পরিচ্ছন্ন নয়। গাদাগাদি করে এঁরা থাকেন। সামাজিক সমস্যায় ভোগেন। আমাদের সমাজ তাঁদের ভালো চোখে দেখে না। এঁদের পাশে কেউ বসতে চান না। শিক্ষার্থীরা স্কুলে নিজের পরিচয় গোপন করে থাকে। বন্ধু-বান্ধব জানলে মুখ ফিরিয়ে নেবে এই শংকায়। কিন্তু এমনটি কাম্য নয়। বাস্তবে তা-ই হচ্ছে। 
.
প্রকৃতপক্ষে তাঁরা তথাকথিত অচ্ছুত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন সামাজিক মানুষের কাছে। কিন্তু রাষ্ট্র আবার তাঁদের পক্ষে। রাষ্ট্র এঁদের প্রতি সুনজর দিয়ে সামনে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যেমন বাংলাদেশ সংবিধানের ১৯(১) ধারায় বলা হয়েছে যে, "সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন।" আবার ১৯(২) ধারায় বলা হয়েছে যে, " মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধা দান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।" প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্র তাঁদের প্রতি সুনজর দিয়েই আছেন। এবং তাঁদের সামনে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা প্রতিনিয়ত চালিয়ে যাচ্ছেন। এজন্যে সরকার ও রাষ্ট্র কে অনেক অনেক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি। তাহলে বাধা কোথায়? কী জন্যে তাঁরা শান্তিতে নেই? অথবা কিসের অভাবে তাঁরা অশান্তিতে ভোগছেন? এবং এর উত্তর কি হতে পারে? এর উত্তর হলো আমরাই এজন্যে দায়ী। 

মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নাই, এটি আমরা মুখে বলি। কিন্তু অন্তরে বিশ্বাস করিনা। এবং কাজে বাস্তবায়িত করি না। আমাদের এবং হরিজনদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক গঠনে কোনো পার্থক্য নেই। আমরাও মানুষ। তাঁরাও মানুষ। জীবনযাপনের জন্য আমরা কাজ করি। চাকরি নিই। তাঁরা ও কাজ করেন।

পূর্বেই বলেছি তাঁদের কাজ হলো পরিষ্কার করা। ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা। ড্রেন পরিষ্কার করা।  বাথরুম পরিষ্কার করা। শহরকে, নগরকে সর্বোপরি পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন করাকেই তাঁরা পেশা হিসেবে নিয়েছেন। তবে অন্য পেশা নেয়াতে রাষ্ট্র কোনো বাধা দিচ্ছেন না। বরং উৎসাহ দিচ্ছেন। বাংলাদেশ সংবিধানের ২০(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, "কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয়, এবং " প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যাতানুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী" - এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন।" এছাড়া এ সংবিধানের ২৯(১) ধারা মতে, "প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।" আবার বর্ণিত সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদ তাঁদের এভাবেও উৎসাহ দিচ্ছে যে, "নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য  বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।"

এছাড়া এ অনুচ্ছেদের (৩) ধারায় বলা হয়েছে যে, "কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।" আবার এ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখবো যে, সেখানে বলা হয়েছে, "সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।" বিবৃত ধারাগুলোর সবকটিই হরিজনদের পক্ষে। তাঁদের রক্ষাকবচ। তাঁদের উৎসাহদাতা। সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, সাংবিধানিকভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁরা ভালো আছেন। আর রাষ্ট্র তো তাঁদের ভাগ্যন্নোয়নের জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করেই যাচ্ছেন। কিন্তু সমাজবদ্ধ মানুষ হিসেবে তাঁদের প্রতি আমাদের আচরণ কিরূপ হচ্ছে? একথা প্রায়ই শোনা যায় যে, তাঁদের সবাই ঘৃণার চোখে দেখেন। হিংসা করেন। রেস্টুরেন্টে খেতে দেয়া হয়না। তাঁদের পাশে কেউ বসতে চান না। তাহলে সামাজিক জীব হিসেবে, প্রকৃতির উন্নততর প্রাণী হিসেবে আমাদের আচরণ, তাঁদের প্রতি বিরূপ কেন? হরিজনেরা আমাদের কাছ থেকে সহযোগিতা আশা করেন। সহমর্মিতা কামনা করেন। ভালোবাসা পাবার জন্যে অপেক্ষায় থাকেন। এমন আশা করাটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ এঁরাও আমাদের মতো মানুষ। এদেশ যেমন আমার। তেমনি আপনার। তেমনি তাঁদেরও। এদেশের জন্যে তাঁরাও যুদ্ধে গেছেন। লড়াই করেছেন। শহীদ হয়েছেন। 

আমরা তাঁদের দিয়ে কাজ করাই। তাঁদের পারিশ্রমিক দিই। কিন্তু আন্তরিক ভালোবাসাটুকু কি দিই? যতকিছুই বলিনা কেনো তাঁরাও আমাদের মতো মানুষ। এঁদেরও সুখ-দুঃখের অনুভূতি আছে। শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে তাঁদের শরীর থেকেও লাল রক্তই বের হয়। তাঁদের অনুভূতিতে লাগে, যখন তাঁরা যথাযথ সম্মান পান না। তাঁরা কষ্ট পান, যখন তাঁদের দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেন। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তাঁরাও লেখাপড়া করতে পারেন। তাঁদের অনেক ছেলে-মেয়েই এখন শিক্ষিত। উচ্চশিক্ষিত। সরকার তাঁদের জন্যে সরকারি চাকরিতে নির্ধারিত কৌটা রেখেছেন। তাঁদের সামনে এগিয়ে যাবার জন্যে সরকার উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের কর্তব্য হলো তাঁদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। বিত্তবানদের উচিৎ তাঁদের আর্থিকভাবে সাহায্য করা। যদি আমরা সভ্য হয়ে থাকি তাহলে অচ্ছুত বলে কোনো কথা থাকা উচিৎ নয়। কারণ 'মানুষ' যদি হই, তাহলে কোনো 'প্রাণীও' অচ্ছুত হতে পারে না। মানুষ তো দূরের কথা। তবে কি আমরা মানুষ না?  অবশ্যই মানুষ। সবাই তাঁদের ঘৃণা করেন না। সবাই তাঁদের দেখে মুখ ফিরিয়ে নেন না। সবাই খাবারের বা চায়ের দোকান থেকে তাঁদের তাড়িয়ে দেন না। যাঁরা দেন তাঁরা সংখ্যায় কম। তাঁদের মনের মধ্যে সেই বোধ শক্তি নেই। তাঁদের ভালোভাবে বোঝাতে হবে। বোঝালেই তাঁদের মধ্যে সুবুদ্ধির উদয় হবে। এবং তাঁরা জাগ্রত হবেন। এ ব্যাপারে মিডিয়া বা প্রচার মাধ্যম ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। রেডিও, টেলিভিশন, সিনেমা এবং অন্যান্য প্রচার মাধ্যমে এঁদের নিয়ে পজেটিভ প্রচারণা চালানো যেতে পারে। ফলে জনগণ তাঁদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পাবেন। তাঁদের বোধোদয় হবে। তাঁঁরা বর্ণিতদের মনের কষ্ট উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। এবং তাঁদের মধ্যে হরিজনদের প্রতি মমত্ববোধ সৃষ্টি হবে। পরবর্তীতে একসময় এই হরিজনেরা সাধারণ সমাজের মধ্যে একীভূত হয়ে যাবেন।

যদি সভ্য মানুষ হয়ে থাকি তাহলে তো উঁচুজাত-নিচুজাত বলে কোনো কথা নেই। সবাই মানুষ। কেউ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন আবার অন্য একজন দরিদ্র ও হতে পারেন। কিন্তু উভয়েই তো মানুষ। কিসের জাত? কিসের বড়াই? শেষপর্যন্ত আমরা কোথায় যাবো বা কোথায় যাচ্ছি তা-ও ভুলে যাই। ভুলে যাই আমাদের অতীত। ভুলে যাই বর্তমানকে। ভবিষ্যৎকে নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে, অনেক সময় প্রতিবেশীর প্রতি যে কর্তব্য আছে তা-ও মনে জাগ্রত হয় না। এবং এই ভুলে যাওয়ার মধ্যেই পড়েছেন আজকের আলোচনার বিষয়বস্তুর লোকজনেরা। কারণ বাংলাদেশের যতজন হরিজন আছেন তাঁরা কারো না কারো প্রতিবেশী। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নাই। ভেদাভেদ করা উচিৎ নয়। যদি ভেদ তৈরি করি তাহলে আমার মানবকূলে জন্ম নেয়া বৃথা। সব মানুষের মধ্যেই মনুষ্যত্ব থাকা প্রয়োজন। যদি এটি না থাকে তাহলে আমার কাছে মনে হয় বৃথা এ জনম। মানুষ হয়ে যদি মানুষকেই ভালো না বাসলাম তাহলে আমি এ পৃথিবীতে কেনো আসলাম? 
কবি বলেছেন, 
"গাহি সাম্যের গান -
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,"

লেখার শেষ দিকে আমি তথাকথিত উঁচু ও নিচু জাতের কথা বলেছিলাম। সে-তো কবেই শেষ ঘোষণা করেছিলেন মরমি সাধক লালন শাহ। এ জাত প্রথার কোনো অস্তিত্ব এখন আর নেই। কেউ এখন ছোট জাতের নন। কেউ বড় জাতের নন। কোনো জাতই এখন আর নেই। আমরা সবাই মানুষ। এটিই আমাদের পরিচয়। আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত মানুষদের আমরা আপন করে নেবো। ভালোবাসবো। তাঁদের দুঃখ-কষ্টে এগিয়ে যাবো। তাঁদের আপন করে নেয়ার মধ্যে যে আনন্দ খোঁজে পাওয়া যায় তা-কি অন্য কোনো কিছুতে পাওয়া যাবে? বোধ হয় না। শেষ করবো লালনের সেই বিখ্যাত গান দিয়ে -

"জাত গেল জাত গেল বলে 
একি আজব কারখানা 
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি 
সবই দেখি তা না না না।।

আসবার কালে কি জাত ছিলে
এসে তুমি কি জাত নিলে
কি জাত হবা যাবার কালে
সে কথা ভেবে বলো না।। 

ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল চামার-মুচি 
এক জলেই সব হয় গো শুচি 
দেখে শোনে হয় না রুচি 
যমে তো কাকেউ ছাড়বে না।।"

লেখক::
মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম 
প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ 
মৌলানা আছাদ আলী ডিগ্রী কলেজ 
উপজেলা মাধবপুর, জেলা হবিগঞ্জ।    

user
user
Ad
Ad