`

বাংলাদেশে শাইলক আখ্যান ও আকাঙ্ক্ষার লড়াই

  • Views: 2510
  • Share:
এপ্রিল ২৩, ২০২১ ০৩:০৪ Asia/Dhaka

আতাউর রহমান:: আমরা কোবিড-১৯ নামক করোনাভাইরাস মোকাবিলা করছি ও নিজেদের পাহারা দিচ্ছি। এই করোনা আবার বিশ্বের অস্ত্র বিক্রেতাদের ব্যবসা মান্দা করে দিয়েছে। এ করোনার ঝলমলে রূপ দেখে দেশে দেশে আগ্রাসন ও সমর যুদ্ধ স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। এই করোনা কি বিশ্বকে চলতি বছরও অদৃশ্য বোমার দখলে রাখবে!

আল্লাহ মেহেরবান। যেভাবে বিশ্ব বদলেছে, বদলেছি আমরাও। বর্তমানে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মনন পাঠশালায় এখন আগের গতি নেই। তারা এখন গোলপোস্ট বিহীন মাঠের তুখোড় খেলোয়াড়। আর করোনা আমাদেরকে শুধু ভয় দেখায়নি, শৃঙ্খলাও শিখিয়েছে। পবিত্র হতে তাগিদ দিয়েছে; নৈতিকতা অর্জনের আগাম বার্তাও দিয়েছে। ফলে আমাদের অর্থনীতির চাকা সংকটেও কমেনি; কারণ, আমরা তো আর না খেয়ে মরিনি। আমাদের ঐতিহ্য, অহংকার, অঙ্গীকার, ভাবমূর্তি অনেক অনেক পুরোনো। কেন জানি আজকাল সেই অহংকারগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেল। এরমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে টানাহেঁচড়া কম হয়নি। তবু্ও সন্দেহ, অবিশ্বাস, হতাশা আজও কাটেনি। অজ্ঞাত রাহুগ্রাসের কবলে বারবার বাঙালি জাতি ঝাঁকুনি খেয়েছে। ভ্রাতৃত্বের মাঝে ফাঁটল আজও পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা অজানা ত্রুটির অজুহাতে একে অপরের সাথে অন্তর্দ্বন্ধে লিপ্ত। আর এই সুযোগে শেক্সপিয়রের কুটবুদ্ধিসম্পন্ন 'শাইলক'রা বিভিন্ন রাজনীতির ব্যানারে  ভেতরে প্রবেশ করে সর্বত্র বিভাজন বাড়াচ্ছে। এসব দায়ভার কে নিবে?

ইংলিশ ভাষার কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ছিলেন  ইংল্যান্ডের "জাতীয় কবি"। তাঁকে "বার্ড অব অ্যাভন" (অ্যাভনের চারণকবি) নামে অভিহিত করা হতো। আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক রঙ তামাশায় তাঁর লিখা জনপ্রিয় এক কমেডি নাটক ''দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস (The Merchant of Venice)" নাটকের কথা বেশ মনে পড়লো। এই নাটকটির কাহিনী আমাদের জীবনের নানা বার্তার ইংগিত বহে বেড়াচ্ছে।

নাটকটির সংক্ষিপ্ত কাহিনী এ রকমঃ
ইতালির ভেনিস শহরের সওদাগর অ্যান্টনিও। সে সৎ নির্ভীক ও বন্ধুবৎসল হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত। বন্ধুরা তার কাছ থেকে বিনা সুদে ঋণ নিতে পারতো। বন্ধুত্বের মর্যাদা রক্ষা করতে তিনি তার জীবনকে পর্যন্ত বিপন্ন করেন। সেজন্য সে সকলের কাছে ছিল প্রশংসিত। আর অপর এক ব্যবসায়ী শাইলক ছিলেন নীতিহীন, সুদখোর, কুটবুদ্ধিসম্পন্ন লোক। কেউ তাকে পছন্দ করত না। সে সওদাগর অ্যান্টিনিওকে হিংসা করত। সংগত কারণে অ্যান্টনিও তাকে ভালো চোখে দেখত না। অ্যান্টোনিও'র এক বন্ধু বাসানিও ছিল অমিতব্যয়ী এবং উচ্চ বিলাসী। সে শহরের সুন্দরী, বিত্তশালী ও অত্যন্ত মেধাবী তরুণী পোর্শিয়া'কে বিয়ে করতে চায়।

কিন্তু টাকার অভাবে পোর্শিয়া'কে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারছে না। সেজন্য সে বন্ধু অ্যান্টনিওর কাছে টাকা ধার চায়। অ্যান্টনিও বন্ধুর মনোবাসনা পূরণ করতে গিয়ে শাইলকের কাছে টাকা ধার চাইলেন। শাইলক সাথে সাথে ধার দিতে সম্মত হয়ে যায়। কারণ, ইতিপূর্বে অ্যান্টোনিও'র কাছের অসংখ্যবার শাইলক অপমানিত হয়; সেই প্রতিশোধ নেবার সুযোগ নিতে চায় শাইলক। তাই ঋণের দলিলে শর্ত ধরে যে, যদি অ্যান্টিনিও সময়মতো টাকা পরিশোধ করতে না পারে তবে তার এক পাউন্ড মাংস কেটে দিতে হবে। এই ধার করা টাকা পাওয়ার পর এক বিচিত্র পরীক্ষায় সফল হয়ে বাসানিও পোর্শিয়া'কে বিয়ে করে। কিন্তু টাকা প্রদানের সময়সীমা অতিক্রম হওয়ায় শাইলক অ্যান্টিনিওর শরীর থেকে এক পাউন্ড মাংস দাবী করে বসে। আদালতের বিচারক ঋণের শর্তটি বাদ দেয়ার অনুরোধ করলেও শাইলক অনমনীয়তা দেখায়। খবরটা বাসানিওর স্ত্রী পোর্শিয়াকে বিচলিত করে তোলে। সে যখন জানতে পারে তার স্বামীর কারণে অ্যান্টনিওর জীবন বিপন্ন, তখন সে আদালতের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। যখন আদালতে  অ্যান্টিনিও'র বিচারকার্য চলছে, তখন পোর্শিয়া এক তরুন উকিলের ছদ্মবেশে বিচারকের সামনে হাজির হয়। তরুণ উকিল শাইলক'কে বলে, অ্যান্টিনিওর শরীর থেকে এক পাউন্ড মাংস তুলে নিতে কোন অসুবিধে নেই। তবে রক্তপাতহীন মাংস তুলে নিতে হবে। কারণ, রক্তের কথা তো দলিলে উল্লেখ ছিল না। ধূর্ত শাইলক বিপদে পড়ে যায়। কারণ, রক্তপাতহীন মাংস কাঁটা তো অসম্ভব। অবশেষে বিচারে শাইলক পরাজিত হয় এবং তার অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

এ চরিত্রগুলো আমাদের মাঝে বিরাজমান। চরিত্রের দিক থেকে আমরা অ্যান্টনিও'র চেয়ে 'শাইলক' চরিত্রে বেশি অভিনয় করে সুবিধা নিতে পছন্দ করি। কিন্তু ফলাবর্তন যে অন্ধকার, সেটা আমরা ভাবি না কিংবা ভাবনায় আসে না।

যা হোক,  একদা এক সময় ছিল বিদেশী শাসক ও শোষকচক্র আমাদের এই সোনার বাংলাকে দু'হাতে লুন্ঠন করেছে। দেশপ্রেমিক বাঙালি রুখে দাঁড়িয়েছিল বলে আমাদের আত্মশক্তি খর্ব হয়নি। তবে বিসর্জন দিতে হয়েছে তিরিশ লক্ষাধিক তাজা প্রাণ ও দু'লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে আমরা তখন এক কাতারে ছিলাম। একাত্তরের যুদ্ধ ছিল আমাদের জাতিসত্বার যুদ্ধ। এ যুদ্ধ করেছে এদেশীয় শিল্পপতি থেকে কারখানা শ্রমিক, সচিব থেকে পিয়ন, শিক্ষক থেকে ছাত্র, কৃষক থেকে ক্ষেতমজুর-সহ সকল শ্রেণী পেশার লোকেরা। সে সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে বিত্তশালীদের চেয়ে নিম্ন-মধ্যবিত্তরা ছিল অগ্রগামী। তাদের কাছে পদ-পদবি ও ক্ষমতার বাসনা ছিলো না। তাদের কাছে এসবের চেয়ে আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য ছিল প্রবল। গুটি কয়েক আলশামস, আলবদর, রাজাকার ব্যতীত সেদিন সবাই ছিল এক ও অভিন্ন। হিন্দু-মুসলমানে কোন ভেদাভেদ ছিলো না; জাতপ্রথার কোন বিদ্বেষ ছিল না। সেই আকাঙ্খা বাস্তায়নের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা পেলাম। এই স্বাধীনতার বদৌলতে আজ অনেকেই বাড়ি, গাড়ির মালিক। নানাবিধ কৌটায় অনেকেই অসাধ্য সাধন করেছেন, অনেকেই রাজনীতির প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে চেহারা পাল্টিয়েছেন। আর নিম্ন-মধ্যবিত্তরা যে-ই কুটিরে ছিল, আজও তারা সে-ই কুটিরে আছে। তাদের সাথে শানশৌকতের দুরত্ব অনেক বেড়েছে। যাঁরা আঙুল ফোলে কলা গাছ হয়েছেন,  তাদের তো নিচের দিকে তাকানোর ফুসরতই এখন নেই। কিন্তু স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। ভুলে গেলে চলবে না যে, শেক্সপিয়রের নাটকের 'শাইলক'রা দেশ স্বাধীনের আগেও ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

ইদানীং আমাদের দেশের এক শ্রেণির সুবিধাভোগী শাইলকরা কূটকৌশলী রাজনীতির নামে সমগ্র দেশজুড়ে তামাশার খেলা শুরু করেছে। তারা জাতিকে শিক্ষা দিতে চায়; বাংলাদেশের সংবিধান নতুন করে শেখাতে চায়। তারা গৃহবধুর অলংকার বদলের মতো দেশের নেতৃত্ব গ্রহণের স্বপ্ন দেখে। তাদের পেছনে নাকি দেশের আমপাবলিক বিশাল সমর্থন। এসব খেলার নেপথ্যে নায়ক কারা? করোনাকালীন সময়ে কাদের ইন্দনে এ তামাশা চলছে! যে মাঠে গোলপোস্ট নেই, সেই মাঠে শাইলকরা সারাদিন বল পেটালে কী করে গোল দিবে? গোলপোস্টবিহীন মাঠে কালা মানিক, ম্যারাডোনা, মেসি, রোনালদো'র জার্সি পরে কী লাভ? অবশেষে ঘটলোও তাই। যখন মাঠে রেফারি হলুদ কার্ড, লাল কার্ড দেখানো শুরু করলো, তখন ধূর্ত সাইলক'দের চরিত্র জনসমক্ষে বেরিয়ে পড়ল। তাতেই মাঠের অনলাইন দর্শক কিংকর্তব্যবিমূঢ়! তারাও সমর্থন উঠিয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেল! অবশেষে শাইলকদের সহযোগী যারা ছিলেন, তারাও আজ রঙ পাল্টে পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ।  

এই সুবিধাভোগী দলবাজ শাইলক'রা জানে না যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদানে শ্রম লাগে, আবার শিক্ষা গ্রহণেও শ্রম লাগে। শ্রমিকের ইট ভাঙা অথবা ট্রাক-বাসের বোঝাই মালামাল খালাস করাও শ্রম। এটা হলো কায়িক শ্রম। এই কায়িক অংশটি রাজনীতির মাঠে গুরুতর নয়। শিক্ষার আসল শ্রমের অংশটি আসে মেধা ও মননের অঞ্চল থেকে। পুরনো চিন্তা, মত, সংস্কার, অভ্যাস ও চর্চাকে বদলানোর মধ্যেই শিক্ষার শ্রম নিহিত। শিক্ষার সংস্কৃতি অপূর্ণ রেখে বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনে সুস্থ সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটানো সম্ভব নয়। যদি কোন গোস্টী ভোটের রাজনীতির জন্য অপসংস্কৃতিকে লালন কিংবা বহন করে তাহলে সংস্কৃতির মূল ধারা বিকৃত করার সামীল হবে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই অনভিপ্রেত বিষয়গুলো আগের তুলনায় এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শিক্ষায় সংস্কৃতির বিকাশ ছাড়া স্বাধীনতার আগামী আদর্শিক লড়াই মোকাবিলা কঠিন হবে।

 মনে রাখবেন, স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ। কিন্তু স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা বড়ই কঠিন। আমাদেরকে স্বাধীনতা রক্ষায় শাইলক চরিত্র সনাক্ত করে অগ্রসর হতে হবে। সেই আগামীর জয়ের জন্য আমাদের দরকার এখন ইস্পাত-দৃঢ় ঐক্য। আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার আকাঙ্খা বাঁচাতে চাই।

লেখক পরিচিতি:
মাস্টার ট্রেইনার ও কলামিস্ট। *লেখকঃ পঞ্চখণ্ডের পথ ও পথিকৃৎ *প্রাক্তন সভাপতিঃ বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব Πপ্রধান শিক্ষকঃ দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয়। * সহ-সভাপতিঃ বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, সিলেট। *আহবায়কঃ বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান পরিষদ, বিয়ানীবাজার উপজেলা।  

user
user
Ad
Ad