`

এলিফ্যান্ট রোডের ঘটনায় আমরা কী শিখলাম!

  • Views: 3649
  • Share:
এপ্রিল ১৯, ২০২১ ১৪:১৮ Asia/Dhaka

আতাউর রহমান:: আমরা বাঙালি এমন এক জাতি, আমরা ভূমি পরিমাণ বাক্য রচনা করতে জানি কিন্তু তিল পরিমাণ ত্যাগ করার ইচ্ছে পোষণ করি না। আমরা সবই আয়ত্ত করতে চাই, কিন্তু কিছুই পুরোপুরি শিখি না। আমরা ভুল করে করে শিখি, অথচ কারো ভুল পেলে তুলোধুনো করে তৃপ্তির ঢেকুর দেই। আমরা সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাই, অথচ সিদ্ধান্তহীনতা আমাদের অস্তিমজ্জায় পুতে রাখি। কভিড-১৯ থেকে পরিত্রাণ পেতে লকডাউন আসলো। এটাকে হালকাভাবে নিতে হেফাজত আটকানোর কৌশল বলে চালিয়ে দেই। তাই নিজকে 'বাসা-বাড়ি' রাখবো না-কি 'কবরে' নিয়ে যাবো- সেই সিদ্ধান্ত নিতেও আমরা হিমশিম খাই।

একটা কথা মনে রাখবেন, আপনি চোখের সামনে সবকিছু দেখতে পারেন। কিন্তু আপনার চোখের ভেতরে ক্ষুদ্র একটা পোকা ঢুকে পড়লে তাকে দেখার যোগ্যতা চোখের থাকে না। আর এক্ষেত্রেই আমরা ভুল করে বসি। এরকম একটা ঘটনা ঘটে গেল গত ১৮ এপ্রিল ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে। যে ঘটনাটি দেশব্যাপী ভাইরাল হলো। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় দুনিয়া জানলো আমাদের কৃষ্টি আর তকব্বরির নমুনা। এর পক্ষে-বিপক্ষেও বাকবিতন্ডা কম হয়নি। প্রশ্ন হলো- এ ঘটনা আমাদেরকে কী বার্তা দিয়ে গেল? এ থেকে আমরা কী শিক্ষা পেলাম? 

আমরা কি কিছু শিখেছি? নাকি একেবারেই চুপ থাকবো! যদি আপনি-আমি চুপ থাকি তাহলে ক্ষমতার অপব্যবহার বেড়ে যাবে, ভুলের সাথে ভুলের যুদ্ধ হবে। তাই কিছু বলা তো যায়।

লকডাউন যেহেতু স্বাভাবিক অবস্থা নয়, সেহেতু  বাসা-বাড়ি বা কর্মস্থল ত্যাগ করলে পরিচয়পত্র সাথে রাখা নিরাপদ। প্রয়োজনে 'মুভমেন্টপাস' নেয়া যায়। মনে রাখবেন, ইউনিফর্ম কোন ক্ষমতা নয়; এটা দায়িত্ব। স্বীকৃত দায়িত্ব পালনের জন্য ইউনিফর্ম ব্যবহার করতে হয়। সরকারের কাজে সাহায্য করা ইউনিফর্মধারীর নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। কঠিন পরিস্থিতিতে পথিমধ্যে সরকারি দায়িত্ব পালনকারী যে কারো পরিচয় জানতেই পারে। এই পরিচয় জানা কোন অপরাধ নয়; আপনি ক্ষমতাবান হন আর জরুরি কাজের সম্মুখযোদ্ধা হন, কোন অজুহাত ছাড়াই আপনার পরিচয় দিয়ে কর্মপালনকারীকে সহযোগিতা করা নাগরিক দায়িত্ব। 

রাস্থা চলাচলে মেজাজ দেখানো বোকামির সামিল। কিছু কিছু আমিত্ববাদীরা নিজেদেরকে জাহির করতে গিয়ে অহেতুক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন। পরাজিত সৈনিকের মতো হৈচৈ শুরু করেন। এক্ষেত্রে তুইতুকারি, গালিগালাজ, অভদ্রতা প্রদর্শন সুখকর হয় না। পক্ষান্তরে, নারীদের সাথে অসদাচরণ কিংবা বাকবাকম করে দায়িত্বশীল দক্ষতার পরিচয় বহন করে না।

মনে রাখবেন, নিজের যোগ্যতা একান্ত নিজের। বাপ-দাদার তকব্বরি দেখানো কোন বীরত্বের কাজ নয়। মানুষের ভুল হতেই পারে। ভুলের ক্ষমা চাওয়া মানুষের মহৎ গুণ। ভুল শুধরে নিলেই শান্তি ফিরে, পরিত্রাণ পাওয়া যায়। পথিমধ্যে কে ছোট আর কে বড়, তা না ভেবে সবাই যে মানুষ- এ কথাটি উপলব্ধি করাই উত্তম। আর বলা মুশকিল, আপনি কোথায়, কার দরজায়, কখন দাঁড়াবেন, তা মহান আল্লাহ-ই ভালো জানেন। সুতরাং কারো সাথে অমানুষের মতো ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকাই আমাদের জন্য নিরাপদ। 

ভুল_দৃষ্টিভঙ্গীও_ভাইরাস:
COVID-19 করোনাভাইরাস জীবনের সব ক্ষেত্রকেই সংক্রামিত করে দিয়েছে। দেশে কিংবা সমাজে কিংবা  ঘরে-বাইরে সোশ্যাল মাইনফিল্ডে এখন বিস্ফোরণ চলছে। এতে দেখা দিয়েছে অভাব, অস্থিরতা, নৈরাজ্য, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নানাবিধ মানসিক জটিলতা। জীবনের জন্য মানুষ যদি- লকডাউন না মানে, মাস্ক পরিধান না করে, সরবরাহ করা মাস্ক নকল হয়, ত্রাণের মালামাল চুরি হয়, রোগী নিজেই তথ্য গোপন করে, ধর্মীয় নেতারা মানুষের জমায়েতকে উৎসাহিত  করে, রাষ্ট্রীয় অভয় পাবলিক না মানে, তাহলে আমাদের করণীয় কী? এই প্রশ্নই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। 

মনে রাখবেন, ভুল দৃষ্টিভঙ্গি করোনা ভাইরাসের চাইতে বড় ভাইরাস। যদি আমরা দৃষ্টিভঙ্গি না বদলাই, তাহলে কিছুতেই কোনো লাভ হবে না! হাত ধুয়ে আর মাস্ক দিয়েও রেহাই হবে না। এজন্য শরীর সুস্থ রাখতে হলে মনের সুস্থ চিন্তা খুব জরুরি। 
এ সময়ে আমরা-

** যদি মানসিকভাবে সবল না থাকি,
** যদি দুর্নীতি, মিথ্যা, লোভ মনে আঁকড়ে রাখি,
** যদি অপরের জন্য ভালোবাসা কাজ না করে, 
** যদি উসকানি দিতেই থাকি, 
** যদি ঘরে থাকার ভরসা না পাই,
** যদি সামাজিক সহিংসতা বাড়িয়ে দেই,

তাহলে করোনার দোষ কি? আর্তনাদ একটাই।
এখন তো-

মৃত্যুর মিছিল বিশ্বজুড়ে 
দিল-কাবাতে অশ্রু ঝরে
ক্ষমা করো প্রভু।

আমরা ভাবি আয়নায় মানুষের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। আসলে এটা একটা ভুল ধারণা। এই 'আয়না'ও এক ধরনের প্রতারক! খেয়াল করলে দেখবেন, আয়না'র সামনে আপনি ডান হাত উঁচু করলে আয়না'টি আপনাকে বাম হাত দেখাবে। এটি উপলব্ধি করার জন্য কিছু সময় নিতে হয়। তাই বোধশক্তিতে কোনটি ভুল আর কোনটি সঠিক? তা এক নিমিষে বিচার করা যায় না। কারণ, ঘরে যখন মা চিল্লাচিল্লি করেন, তখন আমরা বলি 'শাসন'। আর যখন বউ চিল্লাচিল্লি করে, তখন সেই চিল্লাচিল্লিকে আমরা বলি 'ভাষণ'। এই শাসন-ভাষণ সুর যদি পজিটিভ রূপ লাভ করে, তবে আমরা আর সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবো না। জাতি হিসেবে আমরা-ই সর্বাগ্রে খুশি হবো। এগিয়ে চলুক স্বদেশ, প্রাণের বাংলাদেশ। 

লেখক:
মাস্টার ট্রেইনার ও কলামিস্ট, প্রধান শিক্ষক- দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয়।
প্রাক্তন সভাপতিঃ বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাব, সহ-সভাপতিঃ বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, সিলেট। আহবায়কঃ বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান পরিষদ, বিয়ানীবাজার উপজেলা। 

[বহুল আলোচিত "পঞ্চখণ্ডের পথ ও পথিকৃৎ" গ্রন্থের লেখক। বইটি বিয়ানীবাজারের কাদির লাইব্রেরীতে পাওয়া যায়]

user
user
Ad
Ad