`

আহলান সাহলান, মাহে রামাদান

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুললাহি ওয়া বরকাতুহ।
  • Views: 10291
  • Share:
এপ্রিল ১২, ২০২১ ২৩:০০ Asia/Dhaka

নুরুজ্জামান বিশ্বাস :: বাংলা ভাষায় ‘বসন্ত’ - শব্দটি বুঝাতে ব্যাখ্যায় যেতে হয় না। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যেমন নতুন রুপ ফিরে পায়, প্রকৃতির রুপ পরিবর্তনের সাথে মিল রেখে মানব হৃদয়েও বসন্তের আগমনে নতুনত্বের আগমনী বার্তা দিয়ে যায়। প্রকৃতিতে শূন্যতা বা শুন্য থেকে ভরপুরের উর্ধ্বগতিতে পথ চলার নাম- বসন্ত।

রামাদান মাস হচ্ছে মুসলিম জাতির আমলি বসন্ত। একজন মুমিনের জন্য এ মাসটি বড়ই চ্যালেঞ্জিং। এ মাস মানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাজিলের মাস। এ মাস নিজেকে পরিশুদ্ধির মাস, আত্মসুদ্ধির মাস, গুনাহ মাফের মাস। এ মাসের আমল ও ইবাদতএর মাধ্যমে  নিজেকে গুনাহ মুক্ত করে সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর ন্যায় পরবর্তী বছর শুরু করার মাস। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সিয়ামরত অবস্থায় পারিবারিক দায়িত্ব পালন, দৈনিন্দন কাজকৰ্ম, পড়াশুনা,রাতের ইবাদত এবং কোরআন তিলাওয়াত- যা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। কিভাবে এত এত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আরো বেশি ইবাদতের মাধ্যমে মহান রবের সান্নিধ্য ও অনুকম্পা লাভ করা যায়, রামাদানকে আরও বেশী তাৎপর্যপূর্ণ করা যায় - তার জন্য অবশ্যই পরিকল্পনা ও পূর্ব প্রস্তুতি দরকার। 

মুমিনের জন্য রামাদানের প্রতিটি মুহূর্তই মুল্যবান। এ মাসের প্রতিটি ভাল কাজের সওয়াব অন্য সময়ের ৭০ গুন বা তার অধিক। কোরান নাজিলের মাস ও  মহিমান্বিত শবে কদরের রাতও এ মাসে। অর্থাৎ, এ মাসটি মুমিনের জন্য মহান রবের  পক্ষ থেকে দামাকা অফার। যাতে করে একজন মুমিন এ মাসের ইবাদতের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে এবং এ মাসে অনুশীলন করা ইবাদত, সৎ কাজ, পরোপকার, দান সাদাকা, অপরের অধিকার/হক- বছরের বাকী দিনগুলিতে সচল রাখতে পারে।   

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পৃথিবীতে একমাত্র আমাদের দেশই এ মাসটি পালন করি মিশ্রভাবে। কেউ এ মাসটিকে বেছে নেয় ইবাদত বন্দেগির মাস হিসেবে, কেউ বেছে নেয় টাকা উপার্জনের মাস হিসেবে। কেউ আবার রামাদানের কোন হক আদায় না করেই - ব্যস্ত হয়ে পড়ি লোক দেখানো ইফতার নিয়ে,  প্রশ্ন ছূড়ে দেই  তারাহবী’র রাকাত নিয়ে, কেউ বা  ঈদের জামাতে পরিপাটি মুসল্লি সেজে সবার আগে গিয়ে বসি সামনের সারিতে, কেউবা মাসের শুরু থেকে প্রহর  গুনি আর অপেক্ষায় থাকি ঈদ উদযাপনের পরিকল্পনা নিয়ে।     

খাদ্যসামগ্রীঃ এ মাসের শিক্ষা - সিয়াম পালন করে ক্ষুধার জ্বালা অনুধাবন করা। খাবারে কম ব্যয় করে উদ্বৃত্ত অংশ অসহায়দের মাঝে দান করা। বেঁচে থাকার জন্য প্রত্যেক মানুষের খাদ্য- পানীয় মৌলিক উপাদান। বছরের অন্যান্য সময় খাদ্য ঘাটতি নিয়ে তেমন প্রশ্ন  না আসলেও এ সময় এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়া সত্যিই দুঃখজনক। রামাদানের শিক্ষা অনুযায়ী এ মাসে আরও কম খাবার লাগার কথা। যোগান ও চাহিদার সূত্রানুযায়ী, বাজারে পর্যাপ্ত খাবার  থাকার কথা এবং দাম কমার কথা। বাস্তবে সবাই খাবারের প্রতি হুমড়ি খেয়ে পড়ি। আর এ নিয়ে শুরু হয় ব্যবসা। একদল খাবার খুজতে ব্যস্ত, একদল অধিক মুনাফা লাভের আসায় খাদ্য মজুদ করতে ব্যস্ত,  একদল খাবারে ভেজাল মিশাতে ব্যস্ত, আর একদল দাম বাড়াতে ব্যস্ত, একদল দাম বাড়ল কেন তা সবার নজরে আনতে বা কর্তৃপক্ষকে জানাতে ব্যস্ত। একদল এ নিয়ে  আন্দোলন করতে ব্যস্ত, আর একদল দাম বাড়ে  নাই  বা কেন বাড়ছে তার ব্যাখ্যা দিতে ব্যস্ত।  সাধারণ  মানুষ কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে এগুলো দেখে  আর কার কথা বিশ্বাস করবে সে  কাজে পূর্ণশক্তি ব্যয় করে রাতে ঘুমাতে ব্যস্ত। রমজানের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে আমাদের মূল পরিকল্পনা ইফতার কি দিয়ে হবে। মা বোনদের দিনের বড় একটা বড় সময় ব্যয় করতে ইফতার ও সিহেরী বানাতে। প্রশ্ন জাগে রামাদানের জন্য ইফতার নাকি ইফতারের জন্য রামাদান? 

তারাবীহঃ ইবাদতের মধ্যে ফরজ ইবাদতের গুরুত্ব সর্বাধিক এবং সর্বাগ্রে । অথচ একদল লোকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থাকে  তারাবিহ সালাতের রাকাত নিয়ে(নিঃসন্দেহে তারাবীহ সালাত সোয়াবের এবং রামাদানে রাতের ইবাদত হিসেবে গুরুত্ব বহন করে , তবে ফরয বাদ দিয়ে নয়)। কেউ ব্যস্ত কোথায় তারাবিহ পড়বেন? কোন ইমাম দ্রুত পড়েন? কে আস্তে পড়েন? কোন মসজিদ শীততাপনিয়ন্ত্রিত? আছে ঈমাম নিয়োগ নিয়ে দ্বন্দ্ব। এগুলো দেখে ইবলিসও লজ্জাবোধ করে। আর মনে মনে বলে এখানে আমার থাকার দরকার নেই। আমার প্রতিনিধি আছে।   

ঈদ বাণিজ্যঃ কিছু লোকের সারা বছর পরিকল্পনা থাকে ঈদকে ঘিরে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে ঈদ উদযাপন নিয়ে। একমাস সিয়াম পালনের পর রোজাদারদের জন্য ঈদ নিঃসন্দেহে আনন্দের তবে তা যেন সকল সীমাকে অতিক্রম না করে যায়। বিশেষকরে রমযানের শেষ ১০ দিন অত্যন্ত ফযিলতপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। এ সময়ই আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় ঈদ উদযাপনের পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে। এতে রসদ জোগায় দেশীয় টি ভি  চ্যানেললো। একদিনের ঈদকে তারা ৭ - ১০ দিন বানিয়ে ফেলে।   

এতেকরে রামাদানের মূল উদ্দেশ্য, শিক্ষা  ও তাৎপর্য থেকে ৯০%  মুসলিমের দেশে বেশীরভাগ মুসল্লিকে দূরে থাকতে হচ্ছে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য রামাদান। রামাদানের জন্য ইফতার, সেহরি, তারাবীহ  এবং ঈদ।  ইফতার, সেহরি  তারাবীহ এবং ঈদকে অধিক গুরুত্ব বা প্রাধান্য দিলে রামাদানের উদ্দেশ্য ও রামাদানের হক আদায়ে অপূর্ণতা থেকে যাবে। রামাদানে খাদ্যপণ্য বা ইফতার সামগ্রী, তারাহবী নিয়ে বিতর্ক ও ঈদ পরিকল্পনা নিয়ে আমরা যতটা সময় ব্যয় করি সে সময়টা রামাদানের মুল উদ্দেশ্যে ব্যয় করলে রামাদান মুমিনের জন্য বসন্ত।  
   
রামাদানে অমুসলিমদের হক আদায়ের কথা যেন ভুলে না যাই। ইফতার আয়োজন ও সিহেরী’র পূর্ব প্রস্ততি যেন অপরের বিরক্তির কারন না হয়ে দাড়ায়। রাতে সেহেরীর আহবান যেন অসুস্থ বা রুগ্ন এবং অমুসলিম প্রতিবেশীর ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটায়। মাহে রামাদান আপনার জীবনে আমলী বসন্ত হয়ে আসুক। সবাইকে মাহে রামাদানের শুভেচ্ছা।।

লেখক:
মোঃ নুরুজ্জামান বিশ্বাস 
টরেন্টো, কানাডা। 

user
user
Ad
Ad