`

যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদের সাথে এশিয়া বিদ্বেষের যে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে তা আমাদেরকে কি শিক্ষা প্রদান করে

  • Views: 828
  • Share:
এপ্রিল ১, ২০২১ ২১:৩১ Asia/Dhaka

জহির উদ্দিন :: যুক্তরাষ্ট্রের দাস প্রথা ও বর্ণবাদের সংগ্রাম ও ইতিহাস অনেক দীর্ঘ এবং তা সচেতন মহলের জ্ঞান ও ধারণার মধ্যেই আছে। কিন্তু ইদানিং নতুন করে মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠছে যে এশিয়া বিদ্বেষী মনোভাব ও অভিবাসী তাড়নের কর্মকাণ্ড তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

ট্রাম্পকালীন সময়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চা সনের ইচ্ছে প্রনোদিত শ্বেতাঙ্গবাদের উদোম পক্ষপাতিত্বের ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে নতুন করে ঘৃণার বাগাড় যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি তার প্রতিক্রিয়ায় আজ বেড়েছে এশিয়ো বিদ্বষী হাজারো রকমের ঘৃণা-বিদ্বেষ আর অবজ্ঞা,অবহেলার নতুন খড়গ দাহন । 

এ মার্চেরই শেষাংশে প্রায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে বন্দুকধারীর গুলিতে দুটি ঘটনায় ১৮ জন নিহত হন। গত সমবার উত্তর কলারাডোর বলডার শহরের, কিং স্কুপার্স, নামের দোকানে বন্দুক হামলায় ১০ জন এবং আবারও গত সপ্তাহে জর্জিয়ার আটলান্টায় তিনটি স্পা হাউজে ২১ বছরী এক শ্বেতাঙ্গ যুবকের বন্দুক হামলায় ৬ নারীসহ আট জন এশীয় নিহত হন । 

এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শুধু ২০২০ সালে এশিয়ো আমেরিকানদের ওপর ৩ হাজার ৮০০ টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অভিবাসী অসহিষ্ণুতা ও জাতিগত বিদ্বিষ্ট মনোভাবের প্রতিক্রিয়াশীল ঘটনাবলী উতলে পড়ার পেছনে ট্রাম্পের বিগত দিনের বক্তব্য ও অভিবাসী সংকোচন কর্মকাণ্ডের ভূমিকাই মূলত বেশি কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। 

কেননা, একদিকে বিগত দিনের বক্তব্যে শ্বেতাঙ্গবাদের উসকানি, অভিবাসন সংকোচন নীতি গ্রহণ এবং অন্যদিকে ট্রাম্প তথা রিপাবলিকানের পরাজয় ছাড়াও এশিয়ো-আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কমলা হ্যারিসের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে অধিষ্ঠান, সবই এ বিদ্বেষ বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া বা উৎস হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। 

গত নির্বাচনের আগে ভারতের সংগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ক শুধু  ভালোই ছিলো এমনটা নয় বরং ট্রাম্প অনেক বেশি আশাবাদীও ছিলেন ভারতীয় আমেরিকান  ভোটারের প্রতি এবং তিনি যখন ভারত আসেন, তখন সরাসরি গুজরাটে ছুটে যান, কেননা সবচেয়ে বেশি এবং কেবল গুজরাটি আমেরিকান ভোটারই ওখানে কোটি খানেক এবং ভারতে  ট্রাম্পের শুভকামনায় প্রায় ঘরে ঘরে পুঁজারও আয়োজন হয়েছিল।

 ট্রাম্প শ্বেতাঙ্গদের ভোট গতবারের চেয়েও বেশি পেয়েছেন এবং কেবল ভারতীয় আমেরিকানদের যথাযথ ভোট পেলেই বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গদের নেতা ট্রাম্পকে হয়তো পরাজয় বরন করতে হতো না । কিন্তু ডেমোক্রেটিক বাইডেনদের কূটনীতিক চালে নির্বাচনী প্যানেলের আসন বিন্যাসেই জয়ে ঘটে ট্রাম্পের যতো গুড়েবালি । 

বহুজাতিক মিলনের ভূমিরুপে যুক্তরাষ্ট্রের মৌখিক খেতাব থাকলেও প্রকৃতপক্ষে ওখানে বর্ণবাদসহ, আঞ্চলিক ও নানা মেরুর অজুহাতের সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প প্রচন্ডভাবে যে দাবমান, তা রাজনৈতিক ও সচেতন মহলের নখদর্পনেই আছে। কাজেই ট্রাম্প যেমন আগেভাগেই ভারতে এসেই সরাসরি চালটা চালিয়েছিলেন । তেমনিভাবে বাইডেনও কিন্ত শেষ চালে আর ভুল করেননি । তিনি বরং কমলা হ্যারিসের একই চালে আফ্রিকা-এশিয়ো দু- মহাদেশীয় ভোটারদের কাত করে ফেলেন এবং গুঁটিটিও ছিলো প্রায় তিধার সম্পন্ন । কেননা কমলা একদিকে কৃষ্ণাঙ্গ, অন্যদিকে বাবা আফ্রিকান ও মা ভারতীয় । কাজেই বাইডেন যে ঐ এক চাইলেই মূলত বাজি মাত করেন, তাতে উগ্রবাদীসহ কারো বুঝতে দেরি হয়নি । 

বাইডেন যেখানে প্রথমাবস্থায় নির্বাচনী বাজেট সংকটে ছিলেন, সেখানেও কিন্তু কমলা হ্যারিসের নাম ঘোষণা করতেই এশিয়ো,আফ্রিকা ও কৃষ্ণাঙ্গদের অনুদানে নির্বাচনী বাজেট সংকটের দ্রুতই উত্তরণ ঘটে । কাজেই সব মেরুর মেরুকরণের যে সমীকরণ বা প্রেক্ষাপট দাঁড়ায় তাতে বিদ্বিষ্ট চিন্তাভাবনা আর ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার প্রতিক্রিয়াই হচ্ছে চলমান এসব জঘন্য ঘটনাবলী। 

উগ্র জাতীয়তাবাদ সমাজের দেহে একবার ছড়িয়ে পড়লে তা কিন্তু  ক্যান্সারের মতোই আকার ধারণ করে। আর এজন্যই যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া কমিউনিটির মধ্যে আজ এ আতংকই বিরাজ করছে। এখানে আজ ধর্মের চেয়েও এশিয়ান পরিচয়ই বড় আতংকের বিষয়, সম্প্রতি চীনা বংশ্বোদ্ভুত এক আমেরিকান নাগরিক বিয়োংকে শুধু হত্যা করেই শেষ নয় বরং তার হত্যাকে উজ্জাপনও করা হয় এবং বিয়োংগের অন্তেষ্টিক্রিয়ার দিন তার মেয়েকে চিটি লিখে জানানো হয় যে, বিয়োং নিহিত হওয়াতে ওখানকার আদি আমেরিকানরা  একজন এশিয়ানকে কমাতে পারায় অন্তত এক জন কম এশিয়ানকে সহ্য করতে হচ্ছে । আর এই যদি হয় অসহিষ্ণুতার মাত্রা, তবে যেখানে মিলিয়ন মিলিয়ন আমেরিকানদের হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত মানের ভয়ানক এআর-১৫,অটোমেটিক রাইফেলগুলো রয়েছে, সেখানে এমতাবস্থায় অভিবাসীদের নিরাপত্তা কিভাবে সংরক্ষিত থাকবে । যদিও বাইডেন উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ জাতীয় ভারী অস্ত্র কেনা-বেচায় নিষেধাজ্ঞা আনতে সিনেটে একটি বিল পাশ করানোর আপ্রাণ চেষ্টায় আছেন এবং এ বিলটি পাশ করাতে সিনেটে ৬০ টি ভোটের প্রয়োজন হবে। সামরিক শক্তিধর সুপার পাওয়ারে বলিয়ান মার্কিনীরা দীর্ঘ দিন যাবৎ বিশ্বমাতুবরের ভূমিকায় থেকে অন্যায্যিক অনেক যুদ্ধে বিশ্বের নানা প্রান্তের অসংখ্য নারী, শিশুসহ মানবসম্পদের চরম ধ্বংস ও সংকট সৃষ্ঠির জন্য দায়ী । যদিও আজ বিশ্বের সংকটাপন্ন মানবগোষ্ঠী বাইডেনের নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছেন । আর বাইডেন যদিও বলছেন আমেরিকা শুধু শ্বেতাঙ্গদের নয় । জাত, ধর্ম, বর্ণ  নির্বেশেষে সকল মানুষের মিলনমেলার এক গণতান্ত্রিক আদর্শিক মূল্যবোধের দেশ হবে এই আমেরিকা । কিন্তু মানুষকে বিশ্বমানবতা ও সভ্যতার মূল্যবোধ থেকে মানবসম্পদ হিসেবে যদি চিন্তা করা না যায় তবে কিছু মাত্র আইন প্রণয়ন করে  নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে আমেরিকার আভ্যন্তরীন কিংবা বিশ্ববাতায়নের কোথাও নিরলস ও অবিরাম শান্তি-শৃঙ্খলা কিংবা নিরাপত্তা বিধান করা আদৌ সম্ভব নয় । 

উপরোক্ত ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপট আজ আমাদেরকে সেই শিক্ষাই দেয় যে, কোনো দেশই আদি বা নিজ মাতৃভূমির মতো কারো জন্য  আপন হতে পারে না । আমরা শুধু জীবনমান উন্নয়নে বা অর্থ  উপার্জনের প্রয়োজনে নিজের দেশ ছেড়ে পরদেশী হই। হৃদয়ে এমন অনুভূতি যদি জাগে তবে সবার আগে নিজের দেশকে আপন করেই ভাবতে হবে । নিজের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে আইন,বিচার ও শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে নিজেদেরকেই ।

কেননা নিজের দেশ উন্নত না হওয়াতে আজ আমাদের ছেলে, মেয়ে পরিবার পরিজন ছেড়ে দূর পরদেশে বছরের পর বছর থাকতে হয় ইচ্ছা-অনিচ্ছায় শত নিপীড়ন অবহেলা সহ্য করেই এবং প্রতি বছর কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই হাজার হাজার শ্রমিক ভাইরা নানা দূর্ঘটনায় পড়ে পরদেশেই মারা যান এবং এমনই সব কষ্ট আর বেদনার দিনগুলো সারাজীবন আমাদের  প্রিয়জন ও পরিবারকে সইতে হয়। 

উন্নত দেশ থেকেতো নারী-শিশু পাচার হয় না । সৌদিআরবের মতো দেশে এসে আমাদের মতো নারী শ্রমিকদের মান ইজ্জত লুন্ঠিত করিয়ে নানা বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় না । আজ যদি আমরা কেবল জাপানের কথাই বলি, তাতেই যথেষ্ট হবে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অ্যাটোমিক নৃশংসতার একমাত্র শিকার যে  জাপান, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সে জাপান আজ বিশ্বের অনন্য অসাধারণ একটি দেশ । যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের ইতিহাস একেবারে ভিন্ন এবং চীনাদের সাথে জাপানিদের  বেশ অমানবিক ও নৃশংসতার ইতিহাস রয়েছে। তারপরও সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে জাপানিরা আজ নিজেদের  সবকিছুই বদলে ফলেছেন। 

আজ বিশ্বের সেরা তিনটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ শহরের দুটোই জাপানে। জাপান অ্যাটোমিক বোমা তৈরি করে না, সে কোনো এটোমিক শক্তিধর দেশও নয় । অথচ এই  জাপানের পাসপোর্ট আজ বিশ্বের সবচেয়ে দামী পাসপোর্ট । তাই জাপানিরা বিনা ভিসায় ১৯০ টি দেশে যাতায়াত করতে পারেন । কারণ বর্তমানে জাপানিরা সবার চেয়ে অগ্রগামী, ভদ্রতা, নম্রতা ও সভ্যতায় অত্যন্ত  আদর্শিক । মাথাপিছু আয় ছাড়াও নাগরিক ও সামাজিক সুযোগ সুবিধা অনেক বেশি সন্তোষজনক । কাজেই জাপানিরা অন্য কোনো দেশের অভিবাসী হতে চান না। নিজের দেশকেই তারা নিজের স্বর্গ বানিয়েছেন । ইত্যাদি কারণে তারা প্রায় সারা বিশ্বেই বিশ্বস্ততার মর্যাদায় বিনা ভিসায় যাতায়াত কিংবা ভ্রমণ করতে পারেন । 

আর তাতে অতি সহজেই বুঝা যাচ্ছে যে, আগে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রয়োজন, কেননা, অর্থনীতি হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের কাটামো আর বাকী সবকিছুই হচ্ছে তারই উপকাটামো, আর  সব  উপকাটামোর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন প্রধানত  নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা কাটামোর উপর । কাজেই আমেরিকাসহ বেশ কিছু দেশের বৈষম্যমূলক আচরণ ও নানা নিরাপত্তাহীনতা আমাদেরকে আজ এই শিক্ষাই দেয় যে, প্রত্যেকের নিজ নিজ দেশের উন্নয়নই সর্বাগ্রে প্রয়োজন এবং এ উন্নয়নই হবে সার্বিক অর্থে প্রকৃত ও মৌলিক উন্নয়ন । 

মোঃ জহির উদ্দিন
অধ্যক্ষ, 
শাহ নিমাত্রা এস.এফ. ডিগ্রী কলেজ, ফুলতলা, জুড়ি

user
user
Ad
Ad