`
বাংলাদেশের ২৫ মার্চ হত্যাযজ্ঞ বিশ শতকের পাঁচটি ভয়ংকর গণহত্যার অন্যতম- ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’

২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবসঃ ইতিহাসের নিষ্টুরতম গণহত্যা

  • Views: 4152
  • Share:
মার্চ ২৫, ২০২১ ০২:১৭ Asia/Dhaka

মো: ইয়াহইয়া:: ভয়াল ২৫ মার্চ। মানব ইতিহাসে বর্বর ও নিষ্ঠুরতম গণহত্যার একটি কালো রাত। একাত্তরের ২৫শে মার্চের সেই রাতে নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎই ট্যাংকের গর্জন শুনতে পায় ঢাকা শহরবাসী, এদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ। বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ জনসাধারণ জেগে ওঠে অনবরত গোলাগুলির শব্দে। কিছুই বুঝে ইঠার আগে বিশ্ব ইতিহাসের নৃশংসতম এবং বৃহত্তম এক গণহত্যার সূচনা হয়।

আর্চার ব্লাডের লেখা "দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ" গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সেই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং ছাত্রীরা হল থেকে দৌড়ে বের হওয়ার সময় মেশিনগানের গুলি চালিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল। ২৬ মার্চ সকালের দিকে সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুম ও ৮৮ ইউনিটের মধ্যে যে কথোপকথন হয় তার রেকর্ড থেকে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই অগণিত ছাত্রছাত্রী নিহত হয়েছিলেন। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নূরুল্লার ধারণকৃত ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, ছাত্রদের দিয়েই জগন্নাথ হলের মাঠে গর্ত খোঁড়া হচ্ছে, আবার সেই গর্তেই ছাত্রদের লাশ মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে। অনেক ঘরবাড়ি ও পত্রিকা অফিস, প্রেসক্লাবে আগুন ধরিয়ে, কামান ও মর্টার হামলা চালিয়ে সেগুলো বিধ্বস্ত করা হয়। অগ্নিসংযোগ করা হয় শাঁখারীপট্টি ও তাঁতীবাজারের অসংখ্য ঘরবাড়িতে। ঢাকার অলিগলিতে, বহু বাড়িতেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। হত্যাকাণ্ড শুরুর প্রথম তিন দিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া ও অন্যান্য শহরে লাখ লাখ নর-নারী ও শিশু প্রাণ হারায়। ঢাকার প্রায় ১০ লাখ ভয়ার্ত মানুষ গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

১০ দিন ব্যাপী পাকিস্তানের সরকার সামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যা, অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি বিপুল পরিমাণে আমদানী করছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এই ভূখণ্ডে। এসবই ঘটছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যখন ক্ষমতাসীন সরকারের আলোচনা চলছিল নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরকে হাতে কীভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটবে তার নেপথ্যে। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ধূলিসাৎ করে দেয়া।

সেদিন, ২৫ মার্চ অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান সন্ধ্যা সাতটার দিকে পাকিস্তানি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে করে করাচি ফিরে যান। সমস্ত আয়োজনই ছিল পরবর্তীতে কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ সম্পন্ন করার সর্বাত্মক প্রস্তুতি। বিমানে চড়ার আগেই উচ্চতর সামরিক কমান্ডকে নির্দেশ দিয়ে যান বাঙালিদের বিরুদ্ধে অপারেশন শুরু করতে, তবে তা রাষ্ট্রপতি করাচিতে অবতরণের আগে নয়। পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল টিক্কা মেজর জেনারেল খাদেম হোসেন রাজাকে এই বার্তাই দেন। “খাদেম, ইটস টুনাইট”, বলেন টিক্কা, যা ছিল বাঙালিদের উপর সামরিক আক্রমণ শুরুর প্রথম ইঙ্গিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এবং ঢাকার সাধারণ জনতা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে সামরিক সেনাদের সম্ভাব্য আক্রমণ রুখে দিতে ব্যারিকেড দিতে থাকেন। কিন্তু কারও ধারণাই ছিল না কী ব্যাপক আকারের ভয়ানক এক আক্রমণ সামরিক বাহিনী পরিকল্পনা করে রেখেছিল।

রাত ১১টা থেকে সাড়ে এগারোটা নাগাদ পাকিস্তান আর্মি বাংলাদেশের জনগণকে আক্রমণের জন্য বেরিয়ে আসতে থাকে। সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট রাস্তায় মার্চ করতে করতে বিভিন্ন গন্তব্যের দিকে ধাবিত হয়। রাতের অন্ধকারে ট্যাংক, সাঁজোয়া গাড়ি বহর এবং ট্রাকভর্তি সৈন্য নিয়ে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে এগিয়ে চলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, রেসকোর্স ময়দান (যেখানে কালী মন্দির অবস্থিত), হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমানে রূপসী বাংলা) এবং পুরান ঢাকার দিকে। আরেকটি বহর এগিয়ে যায় ধানমণ্ডির দিকে এগিয়ে চলে। উদ্দেশ্য তাদের, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দী করা।

অন্যান্য ইউনিটগুলো ধ্বংসলীলা চালায় রেসকোর্স ময়দানের কেন্দ্রে অবস্থিত কালী মন্দিরে এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। আরও কিছু বাহিনী আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে বন্দী করতে যায়, যাদের অধিকাংশই গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সামরিক কিছু কন্টিনজেন্ট আক্রমণ চালায় রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টা এবং পিলখানায় অবস্থিত ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে।

পাকিস্তান আর্মি এভাবে ঢাকায় হাজারো নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। তাদের নৃশংসতায় শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী, পুলিশ, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলের সদস্য এবং ঘুমন্ত রিকশাওয়ালা কেউই রক্ষা পায়নি, শত শত গুলি আর বেয়োনেটে ক্ষতবিক্ষত হয় তারা। প্রথম প্রহরেই যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয় কালী মন্দির ও শহীদ মিনার থেকে, তা পরবর্তী নয় মাস জুড়ে অসংখ্য গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক নজীর স্থাপন করে। প্রথিতযশা শিক্ষাবিদদের মধ্যে যারা নিহত হন তাঁদের অন্যতম ছিলেন, শ্রদ্ধেয় জিসি দেব এবং পণ্ডিত জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্রদের লাইনে দাঁড় করিয়ে, গুলি করে মেরে, তারপর গণকবর খুড়ে, দ্রুত মাটি চাপা দেয়া হয় সেখানেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁকে বন্দী করে রাখা হয় তৎকালীন দ্বিতীয় রাজধানীর (বর্তমানের শের-এ-বাংলানগর) নির্মাণাধীন ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলী বিল্ডিংয়ে। তারপর তাঁকে সরিয়ে নেয়া হয় ক্যান্টনমেন্টের আদমজী কলেজে, যেখানে তাঁকে সেই রাতে আটকে রাখা হয়, এবং পরবর্তীতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ফ্ল্যাগস্টাফ হাউজে। তিন দিন পরে তাঁকে বিমানে করে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে, মিয়ানওয়ালি জেলে তাঁকে আলাদাভাবে বন্দী করে রাখা হয়। সারা দেশে শুরু হয় ত্রাসের রাজত্ব।

২৫ মার্চের গণহত্যা ছিল জঘন্যতম গণহত্যার সূচনামাত্র। পরবর্তী ৯ মাসে ৩০ লাখ নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা সৃষ্টি করেছিল সেই বর্বর ইতিহাস, নিষ্ঠুরতা এবং সংখ্যার দিক দিয়ে ইহুদি নিধনযজ্ঞ (হলোকাস্ট) বা রুয়ান্ডার গণহত্যাকেও অতিক্রম করে গেছে।

এদিকে আমেরিকার সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ১৯৭১ সালে ভারতে শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি গণহত্যার অভিযোগ করেন। ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ বাংলাদেশের হত্যাযজ্ঞকে বিশ শতকের পাঁচটি ভয়ংকর গণহত্যার অন্যতম বলে উল্লেখ করা হয়। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নিরাপত্তাবিষয়ক আর্কাইভ’ তাদের অবমুক্তকৃত দলিল প্রকাশ করে। এতে বাংলাদেশের নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে সিলেক্টিভ জেনোসাইড বা জেনোসাইড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

 ২৫ মার্চ এর ‘গণহত্যা শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, বিশ্বমানবতার অগ্রযাত্রার স্বার্থেও অন্তত একটি দিন গণহত্যার মতো পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন। দিনটিকে ঘিরে গণহত্যার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক-সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে পৃথিবীর কোথাও আর কখনোই এ রকম গণহত্যার ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। তাই ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্তটি ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
মো: ইয়াহইয়া,​
 সম্পাদক, শিক্ষক ও গবেষক। 

user
user
Ad
Ad