`

বাংলাদেশ আমার স্বর্গ

  • Views: 3113
  • Share:
মার্চ ২৫, ২০২১ ০১:৩২ Asia/Dhaka

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম :: স্বর্গীয় সুখ আমি কোনো দিন উপভোগ করিনি। এছাড়া স্বর্গ দর্শনও আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে, বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠে, যে আনন্দ এবং সুখ পাচ্ছি তা-ই আমার কাছে স্বর্গীয় সুখ। আমি ইচ্ছে করলেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারি। ইচ্ছে করলেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে আবার দেশে ফেরা যায়। বিনা বাধায়। এটি কি কম সুখ?

আমার নিজের একটি দেশ আছে। সে দেশের নাম বাংলাদেশ। আমার একটি পতাকা আছে। যে দেশের জন্যে, যে পতাকার জন্যে ৩০লক্ষ মানুষ রক্ত দিয়েছেন। প্রায় ৩ লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে এই আমার দেশ। এই আমার পতাকা। 

বৃটিশ শাসনের অবসান হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের উৎপত্তির মধ্য দিয়ে। পাকিস্তান সৃষ্টিই হয়েছিল ভুল একটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। জাতিতে পশ্চিম পাকিস্তানীরা ছিল ভিন্ন। সংস্কৃতিতে ছিল অন্যরকম। পূর্বপাকিস্তানীদের তারা মনে করতো  দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। সংখ্যায় গরিষ্ঠতা থাকলেও পাকিস্তানে বাংলার পরিবর্তে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল উর্দুকে জাতীয় ভাষা হিসেবে। ফলে অবধারিত ভাবে যা হবার তা-ই হয়েছিল। বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করলেন। জাতির জনক এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দূরদর্শী ছিলেন। পাকিস্তান সৃষ্টির শুরুতেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে থাকা সম্ভব হবে না। তাঁর এই শংকা বাস্তবে রূপ নিল ১৯৫২ সালেই। অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে বাঙালীরা '৭০ পর্যন্ত গিয়েছিলেন। এর আগেই বঙ্গবন্ধু '৬৬ সালে ছয়দফা ঘোষণা করেন। এবং এটি ছিল বাঙালীর ম্যাগনাকার্টা। 

এরই ধারাবাহিকতায় আসল '৭০ এর নির্বাচন। পরবর্তীতে আসল ২৫শে মার্চ '৭১ এর কালোরাত। বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হবার আগে ২৫ শে মার্চ দিবাগত রাত ১২ টা ২০ মিনিটে অর্থাৎ ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ঘোষণাটি নিম্নরূপ -
"This may be my last message, from to-day Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.
অনুবাদ: এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্য বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।" [ সূত্র অসমাপ্ত আত্মজীবনী, লেখক - বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান]

এরপর তিনি গ্রেপ্তার হলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলো। 
এর আগের ঘটনা। তিনি ৭ই মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্স ময়দানে যে ভাষণ দিয়েছিলেন সেখানেই স্বাধীনতার ইঙ্গিত ছিল। তিনি বলেছিলেন, 
"এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। 
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।" 

অবস্থাটা এমন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যে, বাঙালীর আর তর সইছিল না। উত্তাল জনতা ৭ই মার্চই স্বাধীনতার ঘোষণা আশা করেছিলেন। যা-ই হোক, ঘোষণা এলো ২৬শে মার্চ। এটি বাঙালীর মাহেন্দ্রক্ষণ। কারণ এই ক্ষণটির জন্যে অনেক বছর ধরে তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন। বা অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ঘুমন্ত এবং নিরস্ত্র বাঙালীর উপর ২৫ শে মার্চ কালো রাতে চালানো হলো পৃথিবীর বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ। যার নাম ছিল অপারেশন সার্চলাইট। শহীদ হলেন হাজার হাজার মানুষ। এ-ই যে হত্যাযজ্ঞ চলবে তা বাঙালীরা আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁরা ভয় পেলেন না। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে যে অঙুলি নির্দেশ তাঁরা পেয়েছিলেন, যে মন্ত্রে তাঁরা দীক্ষিত হয়েছিলেন, তা দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তাদের মধ্যে উজ্জীবিত ছিল। দীর্ঘ ৯ মাস তাঁরা যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন। [সূত্র - আমি বিজয় দেখেছি, লেখক : এম আর আখতার মুকুল] প্রাণ দিলেন অকাতরে। মা-বোনেরা অকাতরে সম্ভ্রম বিলিয়ে দিলেন। দেশের তরে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান দেখিয়ে। 

সাধারণ জনগণের অংশ গ্রহণের ফলে বাংলাদেশের যুদ্ধটি রূপান্তরিত হয়েছিল জনযুদ্ধে। যুদ্ধ যখন জনযুদ্ধে পরিণত হয় তখন বিজয় অনিবার্য। ফলে তা-ই হয়েছিল। আপামর জনসাধারণ এই যুদ্ধের অংশীদার। তবে বিশ্বাসঘাতকেরাও এদেশে ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি দোসররা এদেশের মানুষকে হত্যা করতে, ধর্ষণ করতে এবং এসব কুকর্মে শত্রু পক্ষকে সহায়তা করতে পিছপা হয়নি। এরা কুলাঙ্গার। এরা দেশদ্রোহী। শেষদিকে ভারত আমাদের সহায়তা করেন। এঁদের কাছে আমরা ঋণী। এখন আমি একটি কবিতার অংশ বিশেষ উল্লেখ করতে চাই -
'স্বাধীনতা -হীনতায়' কবিতায় কবি রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় বলেছেন, 
"স্বাধীনতা - হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, 
কে বাঁচিতে চায়? 
দাসত্ব শৃঙ্খল বলো কে পরিবে পায় হে, 
কে পরিবে পায়।।" 

সত্যিই স্বাধীনতা ছাড়া জীবন অর্থহীন। মূল্যহীন। একটি পাখিকে  খাঁচায় বন্দী করলে তার স্বাধীনতা থাকেনা। তেমনি মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। তাঁকে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত  করলে তাঁর মনে সুখ থাকেনা। সে হতাশায় ভোগে। এবং থমকে দাঁড়ায়। 

প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ একটি জনযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। সেটি একটু আগে বর্ণনা করেছি। কত মা যে তাঁর সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন, তাঁর ছেলেকে দেশের জন্যে কোরবানী করে দিয়েছেন, উৎসর্গ করে দিয়েছেন সেটি হিসেব করা কঠিন। এঁদের কেউ কেউ ফিরে এসেছেন মায়ের কোলে। কেউ কেউ আসেননি। যুদ্ধে যাবার আগে মায়ের পায়ের ধুলি নিয়েছেন মাথায়। রাতের অন্ধকারে ম-বাবাকে না বলেই অনেকেই যুদ্ধে গেছেন। সেগুলো তো সবারই জানা। এগুলো সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র দেশমাতৃকাকে ভালোবাসার জন্যেই। মায়ের মতো এদেশকে ভালোবাসার ফলেই তাঁরা জীবনকে তুচ্ছ করতে পেরেছেন। দেশের জন্যে প্রাণ দেয়া তাঁদের কাছে তুচ্ছ হলেও এখন চিন্তা করলে বোঝা যায় যে, কতো বড় ত্যাগ তাঁরা স্বীকার করেছেন। জীবনের চেয়ে মূল্যবান তো কোনো কিছু নাই। আর নারীর কাছে তাঁর সম্ভ্রমের চেয়ে বেশি মূল্য কোনো কিছুর হতে পারে না। এই উভয় ত্যাগই সম্ভব হয়েছে শুধু দেশকে স্বাধীন করার জন্যে।
 
কতো মার যে খেয়েছেন শত্রুর হাতে ধরা পড়া বাঙালীগণ। কতো ভাবে যে নির্যাতিত হয়েছেন মা-বোনেরা, পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে, তা ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। মা-বোনদের অনেকেই যুদ্ধ শিশুর জন্ম দিয়েছেন। অনেকে আবার আত্মহত্যাও করেছেন। নিজের মাথার চুল দিয়ে যাতে আত্মহত্যা না করতে পারেন সে জন্যে ঘাতকেরা মা-বোনদের মাথার চুল কেটে দিতো। কত বীভৎস নির্যাতন যে তাঁরা সহ্য করেছেন তা কল্পনাও করা যায়না। বাঙালী জাতির মনোবল ভেঙে দেয়ার জন্যেই এই সমস্ত অত্যাচার চালানো হয়েছিল। কিন্তু বাংলা মায়ের সন্তানেরা মনোবল হারননি। জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে এঁরা শক্তি সঞ্চয় করেছেন। গেরিলায় পরিণত হয়েছেন অনেক যোদ্ধা। সামগ্রিক আক্রমণে পাকিস্তান বাহীনিকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছেন। এবং শেষ পর্যন্ত তারা পরাজয় স্বীকার করে। আমরা স্বাধীনতা পাই। 
যদি দেশ স্বাধীন না হতো? তবে কি আমরা এখনকার মতো চলতে পারতাম? 
না। 
আমরা আমাদের মতো করে চলতে পারতাম না। আমাদের নিজেদের মতো করে দেশ পরিচালনা করতে পারতাম না। পৃথিবীর বুকে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে নিজেদের কোনো মানচিত্র আঁকতে পারতাম না। "আমার সোনার বাংলা 
আমি তোমায় ভালোবাসি।" 
এই গানটি গাইতে পারতাম না। আমরা থাকতাম শিকলে বাঁধা অবস্থায়। পায়ের শেকল পড়া থাকলে যে সুখ পাওয়া যায় সে সুখ নিয়েই আমাদের মরতে হতো। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্ব, আপামর জনসাধারণের অংশ গ্রহণ এবং লক্ষ -লক্ষ শহীদের আত্মদান আর লক্ষ-লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া এ স্বাধীনতা আমাদের জীবনকে পূর্ণ করে দিয়েছে। এখন আমরা গর্ব করে বলতে পারি যে, আমরা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। এই মুহূর্তে  একটি বিখ্যাত গানের কথা মনে পড়ছে। সেটি হলো -
"দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা 
কারোর দানে পাওয়া নয়।
আমি দাম দিছি প্রাণ লক্ষ-কোটি 
জানা আছে জগৎময়।। 
আমি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা।"

সত্যি আমরা দাম দিয়েই কিনেছি এ বাংলাকে। যে দাম কোনো কিছুর সাথে তুলনীয় নয়। যে দামের মধ্যে রয়েছে প্রাণ আর সম্ভ্রম। যাঁরা শহীদ হয়েছেন এঁদের অনেকেই পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। যাঁরা সম্ভ্রম হারিয়েছেন তাঁরাও জঘন্যতম অত্যাচার সহ্য করেছেন। তাঁরা আমাদের প্রাণ। তাঁরা আমাদের গর্ব। আমরা তাঁদের স্মরণ করি, শ্রদ্ধায়। ভালোবাসায়। এদেশ যতদিন থাকবে ততোদিন তাঁদের ত্যাগের কথা আন্তরিকতার সাথে স্মরণ করা হবে। তাঁদের ত্যাগের যে মূল্য তা কোনো ভাবেই পরিশোধ কর‍তে পারবো না। শুধু এতটুকুই বলতে পারবো যে 'তোমরা বীর।' বীর মুক্তিযোদ্ধা। তোমাদের প্রতি আন্তরিক অভিবাদন। তোমরা বেঁচে আছো আমাদের অন্তরে। আমাদের দেশের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গায়। মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গানটির কথা। যেখানে কবি বলেছেন -
"স্বার্থক জনম আমার,
জন্মেছি এই দেশে। 
স্বার্থক জনম মাগো,
তোমায় ভালোবেসে।।"

সত্যিই এদেশে জন্মগ্রহণ করার কারণেই আমার জীবন স্বার্থক। এ পৃথিবীতে আসাটাই স্বার্থক। এদেশের নদী-নালা-মাঠ, গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত আমার মনকে জুড়িয়ে দেয়। দেয় অশেষ সুখ। যে সুখ  কোনো সুখের সাথে তুলনীয় নয়। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, আমি স্বর্গ দেখিনি। তাই স্বর্গীয় সুখও অনুভব করিনি। কিন্তু আমার দেশে জন্মলাভ করে, আমার দেশে থেকে যে সুখ পাচ্ছি, সেটিই আমার কাছে স্বর্গীয় সুখ। এদেশে স্বাধীনভাবে বসবাস করে যে সুখ পাই তা আমার কাছে স্বর্গের চেয়ে বেশি।

এদেশ আমার। আপনার। আমাদের সকলের। এদেশের উন্নতি-অগ্রগতি সম্পর্কে আমাদেরই ভাবতে হবে। এদেশকে সামনের দিকে আমাদেরই নিয়ে যেতে হবে। প্রত্যেকের নিজ নিজ কর্তব্য পালনের মাধ্যমে। আমরা যদি নিজেদের কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হই তাহলে স্বাধীনতার সৈনিকদের আত্মা কষ্ট পাবেন। তাই সবার আগে দেশ। এই ভাবনা সামনে রেখে আসুন আমরা কাজে নেমে পড়ি। দেশের জন্যে কাজ করি। মনে মনে ভাবি তাঁদের ছবি, যাঁরা এদেশকে স্বাধীন করার জন্যে প্রাণ দিয়েছেন। সম্ভ্রম উৎসর্গ করেছেন। পরিশেষে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে  বলতে চাই -
"ও আমার দেশের মাটি
তোমার পরে ঠেকাই মাথা।"

লেখক::
মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম 
প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ 
মৌলানা আছাদ আলী ডিগ্রী কলেজ 
উপজেলা মাধবপুর, জেলা হবিগঞ্জ।    

user
user
Ad
Ad