`

মি’রাজুন্নবী (সা.) ও উম্মাহর করণীয়

  • Views: 437
  • Share:
মার্চ ১০, ২০২১ ২২:৩৭ Asia/Dhaka

মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর :: সাইয়েদুল মুরসালীন ও খাতামুন্নাবিয়্যীন খ্যাত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। তাঁকে মহান আল্লাহপাক ‘হাবিব’ অভিধায় অবিহিত করেছেন। মানবাত্মার সাথে পরমাত্মার হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের সুচনা দুনিয়ার বুকে শুরু হয়ে উর্ধ্ব জগতে গিয়ে পূর্ণরূপে যিনি পেয়েছেন তিনি হলেন রাসুলে আ’রাবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। ঘটনাবহুল ‘মিরাজ’ রজনীতে রাসুল (সা.) এর উর্ধ্বালোকে গমন, আল্লাহর নৈকট্যপূর্ণ সান্নিধ্য লাভ, আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মাহর প্রতি হাদিয়া সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী সাধিত হয়েছে।

মি’রাজ শব্দটি আরবি। শব্দটির অর্থ হলো উর্ধ্ব গমন। পবিত্র কোরআন মাজিদে মিরাজকে ‘লায়লাতুল ইসরা’ বলা হয়। ইসলামের পরিভাষায় বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (স.) এর মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে গমন পূর্বক তথা হতে সপ্তাকাশে ভ্রমন করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের ঘটনাই মি’রাজ নামে অভিহিত। যা রাসুল (স.) এর মদীনায় হিজরতের এক বছর আগে তথা নবুওয়াতের দশম বছরে সংঘটিত হয়েছিল । 

পবিত্র কুরআন মাজীদে মি‘রাজ সম্পর্কিত বর্ণনাঃ
মহান আল্লাহপাক বলেন, ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যান্ত,  যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল। (সুরা বনী ইসরাঈল: আয়াত: ০১)। মি‘রাজ রজনীর বর্ণনা তিনি আরো বলেন,‘নিশ্চয় সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে। (সুরা আন নাজম: আয়াত: ১৮)। 

সহীহ হাদিসে মি’রাজ সম্পর্কিত বর্ণনাঃ
মালিক ইবনু সা‘সা‘আ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি কা‘বা ঘরের নিকট নিদ্রা ও জাগরণ- এ দু’অব¯’ার মাঝামাঝি অব¯’ায় ছিলাম। অতঃপর তিনি দু’ব্যক্তির মাঝে অপর এক ব্যক্তি অর্থাৎ নিজের অব¯’া উল্লেখ করে বললেন, আমার নিকট সোনার একটি পেয়ালা নিয়ে আসা হল- যা হিকমত ও ঈমানে ভরা ছিল। অতঃপর আমার বুক হতে পেটের নীচ পর্যন্ত চিরে ফেলা হল। 

অতঃপর আমার পেট যমযমের পানি দিয়ে ধোয়া হল। অতঃপর তা হিকমত ও ঈমানে পূর্ণ করা হল এবং আমার নিকট সাদা রঙের চতুষ্পদ জš‘ আনা হল, যা খ”চর হতে ছোট আর গাধা হতে বড় অর্থাৎ বোরাক। অতঃপর তাতে চড়ে আমি জিব্রাঈল (আঃ) সহ চলতে চলতে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে গিয়ে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? উত্তরে বলা হল, জিব্রাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে আর কে? উত্তর দেয়া হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম । প্রশ্ন করা হল তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে মারহাবা, তাঁর আগমন কতই না উত্তম। 

অতঃপর আমি আদম (আঃ)-এর নিকট গেলাম। তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, পুত্র ও নবী! তোমার প্রতি মারহাবা। অতঃপর আমরা দ্বিতীয় আসমানে গেলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিব্রাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে আর কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম । প্রশ্ন করা হল, তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমি ‘ঈসা ও ইয়াহইয়া (আঃ)-এর নিকট আসলাম। তাঁরা উভয়ে বললেন, ভাই ও নবী! আপনার প্রতি মারহাবা। অতঃপর আমরা তৃতীয় আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? উত্তরে বলা হল, আমি জিব্রাঈল। প্রশ্ন করা হল, আপনার সঙ্গে কে? বলা হল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমি ইউসুফ (আঃ)-এর নিকট গেলাম। তাঁকে আমি সালাম করলাম।

তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে মারহাবা। অতঃপর আমরা চতুর্থ আসমানে পৌঁছলাম। প্রশ্ন করা হল, এ কে? তিনি বললেন, আমি জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? বলা হল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? জবাবে বলা হল, হ্যাঁ। বলা হল, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমি ইদ্রীস (আঃ)-এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে মারহাবা। এরপর আমরা পঞ্চম আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? বলা হয় আমি জিবরাঈল। প্রশ্ন হল আপনার সঙ্গে আর কে? বলা হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। প্রশ্ন করা হল, তাঁকে আনার জন্য কি পাঠানো হয়েছে? বলা হল, হ্যাঁ। বললেন, তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমরা হারুন (আঃ)-এর নিকট গেলাম।

আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী! আপনাকে মারহাবা। অতঃপর আমরা ষষ্ঠ আসমানে পৌঁছলাম। জিজ্ঞেস করা হল, এ কে? বলা হল, আমি জিবরাঈল। প্রশ্ন করা হল, আপনার সঙ্গে কে? বলা হল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বলা হল, তাঁকে আনার জন্য পাঠানো হয়েছে? তাঁকে মারহাবা আর তাঁর আগমন কতই না উত্তম। অতঃপর আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট গেলাম। আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, ভাই ও নবী আপনাকে মারহাবা। অতঃপর আমি যখন তাঁর কাছ দিয়ে গেলাম, তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাঁকে বলা হল, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, হে রব! এ ব্যক্তি যে আমার পরে প্রেরিত, তাঁর উম্মাত আমার উম্মাতের চেয়ে অধিক পরিমাণে বেহেশতে যাবে। অতঃপর আমরা সপ্তম আকাশে পৌঁছলাম। প্রশ্ন করা হল, এ কে? বলা হল, আমি জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? বলা হল, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বলা হল, তাঁকে আনার জন্য পাঠানো হয়েছে? তাঁকে মারহাবা। তাঁর আগমন কতই না উত্তম।

অতঃপর আমি ইব্রাহীম (আঃ)-এর নিকট গেলাম। তাঁকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, হে পুত্র ও নবী! আপনাকে মারহাবা। অতঃপর বায়তুল মা’মূরকে আমার সামনে প্রকাশ করা হল। আমি জিবরাঈল (আঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটি বায়তুল মা’মূর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার ফেরেশতা সালাত আদায় করেন। এরা এখান হতে একবার বাহির হলে দ্বিতীয় বার ফিরে আসেন না। এটাই তাদের শেষ প্রবেশ। অতঃপর আমাকে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ দেখানো হল। দেখলাম, এর ফল যেন হাজারা নামক জায়গার মটকার মত। আর তার পাতা যেন হাতীর কান। তার উৎসমূলে চারটি ঝরণা প্রবাহিত। দু’টি ভিতরে আর দু’টি বাইরে। এ সম্পর্কে আমি জিবরাঈল (আঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ভিতরের দু’টি জান্নাতে অব¯ি’ত। আর বাইরের দু’টির একটি হল- ফুরাত আর অপরটি হল (মিশরের) নীল নদ। অতঃপর আমার প্রতি ৫০ (পঞ্চাশ) ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়। আমি তা গ্রহণ করে মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে এলাম। তিনি বললেন, কি করে এলেন? আমি বললাম, আমার প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছে। তিনি বললেন, আমি আপনার চেয়ে মানুষ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছি। আমি বনী ইসরাঈলের রোগ সরানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। আপনার উম্মাত এত আদায়ে সমর্থ হবে, না।

অতএব আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং তা কমানোর আবেদন করুন। আমি ফিরে গেলাম এবং তাঁর নিকট আবেদন করলাম। তিনি সালাত ৪০ (চল্লিশ) ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার তেমন ঘটল। সালাত ৩০ (ত্রিশ) ওয়াক্ত করে দেয়া হল। আবার তেমন ঘটলে তিনি সালাত ২০ (বিশ) ওয়াক্ত করে দিলেন। আবার তেমন ঘটল। তিনি সালাতকে ১০ (দশ) ওয়াক্ত করে দিলেন। অতঃপর আমি মূসা (আঃ)-এর নিকট আসলাম। তিনি আগের মত বললেন, এবার আল্লাহ সালাতকে ৫ (পাঁচ) ওয়াক্ত ফরজ করে দিলেন। আমি মূসার নিকট আসলাম। তিনি বললেন, কী করে আসলেন? আমি বললাম, আল্লাহ ৫ (পাঁচ) ওয়াক্ত ফরজ করে দিয়েছেন। এবারও তিনি আগের মত বললেন, আমি বললাম, আমি তা মেনে নিয়েছি। তখন আওয়াজ এল, আমি আমার ফরজ জারি করে দিয়েছি। আর আমার বান্দাদের হতে হালকা করেও দিয়েছি। আমি প্রতিটি নেকির বদলে দশগুণ সওয়াব দিব। আর বায়তুল মা’মূর সম্পর্কে হাম্মাম (রহ.).........আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন। (সহীহ বুখারী: হাদিস: ৩২০৭) (মুসলিম ১/৭৪ হাঃ ১৬৪, আহমাদ ১৭৮৫০) ।

মি’রাজ রজনীতে রাসুল (সা.) যেসব জিনিস লাভ করলেন:
আল্লাহর হাবীব হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মি’রাজ রজনীতে অগণিত বরকতপূর্ণ জিনিসের সাক্ষাত পেয়েছেন। তা হল:
ক. জিবরাঈল (আঃ) কে নিজস্ব আকৃতিতে দেখা।
খ. মি‘রাজের বিশেষ বাহন ‘বোরাক’ এ আরোহন। 
গ. বিভিন্ন আসমানে নবী রাসুলগণের সাথে সাক্ষাত।
ঘ. জাহান্নামের জিম্মাদার মালিক (আঃ) নামক ফেরেশতার সাক্ষাত।
ঙ. ফেরেশতাদের বায়তুল মা‘মুর পরিদর্শন।
চ. প্রাণীদের ক্ষমতার সর্বশেষ ¯’ান ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ তে পদার্পণ।
ছ. ‘নাহরে কাওসার’ অর্থ্যাৎ ‘হাউজে কাওসার’ পর্যবেক্ষণ।
জ. জাহান্নামের প্রকৃত রূপের ক্ষণকালীন অবলোকন।
ঝ. জান্নাতের নয়নাভিরাম অতুলনীয় দৃশ্য অবলোকন।

উম্মাহর করণীয়ঃ
সন্দেহাতীতভাবে মিরাজের ঘটনাবলী বিশ্বাস ¯’াপন করা। কেননা মিরাজকে বিশ্বাস করা ইমানের দাবী। মহান আল্লাহপাক পবিত্র মিরাজ রজনীতে রাসুলুল্লাহ (সা.) কে যে ইবাদাত তথা ‘সালাত’ হাদিয়া দিয়েছেন সে সালাতকে যথাযথভাবে আদায় করা, পারিবারিক ও সামাজিক পরিমন্ডলে সালাতকে কায়েম করা। সকল প্রকার পাপাচার, শিরক বিদআত বর্জন করে আল্লাহর বিধান ও তাঁর রাসুল (সা.) এর সুন্নাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা। জিন্দেগীকে আল্লাহর বন্দেগীতে নিয়োজিত করা। আল্লাহপাক আমাদেরকে এ সকল বিষয়ের উপর আমল করার তাওফিক দান করুন।

লেখকঃ
মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর
মুহাদ্দিস, নোয়াখালী কারামাতিয়া কামিল মাদরাসা
সোনাপুর, সদর, নোয়াখালী।  

 

user
user
Ad
Ad