`

ক্ষমা পরম আদর্শ

  • Views: 1755
  • Share:
মার্চ ৩, ২০২১ ১৩:৪০ Asia/Dhaka

মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর :: :: মানুষ সামাজিক জীব। সামাজিক জীবনে মানুষ একে অপরের সাথে কথাবার্তা, মেলামেশা, লেনদেন করতে হয়। এসব কাজ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অনেক সময় ভুল বুঝাবুঝি, ঝগড়া ফ্যাসাদ সৃষ্টি হয়। একপক্ষ অপর পক্ষের প্রতি রুষ্ট হয়, কদর্য কথা বলে, হিংসা জিঘাংসা ছড়িয়ে মারামারিতে লিপ্ত হয়। ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে একে অপরের শত্রু বনে যায়। একপক্ষ জালেম আর অপর পক্ষ মাজলুম হয়। সংঘাতের এ প্রাচীর কেবলমাত্র ক্ষমার পরম মহৎগুনই ভাঙ্গতে পারে।

তাইতো ক্ষমাশীল মানুষকে সর্বোত্তম ব্যবহারকারী ও ধৈর্যশীল ব্যক্তি হিসেবে কোরআন সুন্নাহ অবিহিত করেছে। কাউকে ক্ষমা করা মানব জীবনের পরম আদর্শ ও মহাগুণ। মহান আল্লাহ ক্ষমাশীল। তিনি বান্দাদের ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। তাই তিনি তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে এই গুণ অর্জনে নির্দেশ দিয়ে বলেন, আপনি ক্ষমাশীলতা অবলম্বন করুন এবং মানুষকে ভালো বিষয়ের আদেশ করুন। আর মূর্খদের উপেক্ষা করুন। (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৯৯)।  
 
যিনি উদার প্রকৃতির, তিনিই ক্ষমাশীল। যাদের এ ধরনের গুণাগুণ রয়েছে, তারা আল্লাহ তাআলার বিশেষ নেয়ামতপ্রাপ্ত। ক্ষমাকারী ব্যক্তি ধৈর্য্যবান ও সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা এই গুণ অর্জনে মানুষকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেছেন। আল্লাহ পাক বলেন, ‘আর যে সবর করে ও ক্ষমা করে। নিশ্চয়ই তা অতি আবশ্যকীয় বিষয়।  (সুরা শুরা: আয়াত : ৪৩)
 
তিনি আরো বলেন, 'তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও, যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও জমিন, যা তৈরি করা হয়েছে পরহেজগারদের জন্য। যারা সচ্চলতার ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষকে ক্ষমা  করে, বস্তুত আল্লাহ সৎকর্মশীলদিগকেই ভালোবাসেন। ' (সুরা আলে ইমরান: আয়াত: ১৩৪)।
 
 তিনি আরো বলেন, ‘যদি তোমরা ভালো কিছু প্রকাশ করো কিংবা গোপন করো অথবা মন্দ ক্ষমা করে দাও, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, ক্ষমতাবান। ’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪৯)।
 
তিনি আরো বলেন,  তোমাদের মধ্যে যারা অর্থসম্পদ ও সচ্ছলতার অধিকারী তারা যেন এরূপ কসম না করে যে, আত্মীয়স্বজন, অভাবগ্রস্ত ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছু দেবে না। তারা যেন ক্ষমা করে ও ঔদার্যতা প্রদর্শন করে। তোমরা কী কামনা করো না যে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করেন? আল্লাহ তায়ালা অতিক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা নুর: আয়াত: ২২) ।
 
তিনি আরো বলেন, আর মন্দের প্রতিফল মন্দ। অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপস নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না। (সুরা শুরা: আয়াত: ৪০)।
 
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি নম্র-বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে উচ্ছাসনে আসীন করেন আর যে অহংকারী হয়, আল্লাহ তাকে অপদাস্থ করেন।’ (মিশকাত)। 
 
উল্লেখ্য যে, যার মধ্যে ক্ষমার আদর্শ রয়েছে তিনি বিনয়ী হন। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আরেকটি রেওয়ায়াতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহিষ্ণুতার মর্যাদা তুলে ধরে বলেন, ‘হযরত মুসা আ. আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞেস করেন, হে রব! তোমার নিকট কোন বান্দা বেশি মহিমান্বিত? জবাবে আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্তে¡ও ক্ষমা করে দেয়।’ -(মিশকাত ২/৪৩৪)।
 
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন করেছেন, সদকা করলে সম্পদের ঘাটতি হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনীত হলে, তিনি তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। ( সহীহ মুসলিম: হাদিস: ২৫৮৮)। 
উদারতা ও সহিষ্ণুতা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। কোমলতা ও হৃদয়ার্দ্রতা মুমিনদের বিশেষ একটি গুণ। আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন সাহাবি মুয়াজ  (রা.) ও মুসা (রা.) কে ইয়ামেনে প্রেরণ করেন ও আদেশ দেন, ‘লোকদের প্রতি কোমলতা করবে, কঠোরতা করবে না, তাদের সুখবর দেবে, ঘৃণা সৃষ্টি করবে না। পরস্পর একমত হবে, মতভেদ করবে না। ’ (সহীহ বুখারি: হাদিস: ৩০৩৮)।
 
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, এক লোক এসে রাসুলুল্লাহকে (সা.) বললো আমাদের গোলাম কর্মচারীরা তো ভুল ক্রুটি করে থাকে; তাদেরকে আমরা কতবার ক্ষমা করবো? উত্তরে রাসূল (সা.) কী না বলে চুপ রইলেন। লোকটি আমার প্রশ্ন করলো। এবারও রাসূল (সা.) চুপ রইলেন। লোকটি যখন তৃতীয়বার প্রশ্ন করলো। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, প্রতিদিন তাকে ৭০ (সত্তর) বার মাফ করে দিবে। (আহমদ : ৫৬৩৫)। 
 
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে বান্দা অত্যাচারিত হয়েও জালিমকে ক্ষমা করে দেয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সম্মানিত করবেন। (সুনানে আহমদ: হাদিস: ১/১৯৩)।
 
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষমার আদর্শঃ
 
প্রসিদ্ধ ঘটনা মতে, নজদ-অভিমুখী এক অভিযানের সময় পথিমধ্যে দ্বিপ্রহর হলে সাহাবীগণ একটি বিস্তীর্ণ বাগানের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি বাবলা বৃক্ষের নিচে ছায়ায় আরাম করছিলেন। তাঁর তলোয়ার বৃক্ষের ডালে ঝুলানো ছিল। এমন সময় এক বেদুঈন-কাফের তলোয়ারটি টেনে নামাল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুম থেকে জেগে দেখেন তাঁর শিয়রে এ দুশমন তরবারী হাতে দাঁড়িয়ে আছে এবং বলছে, আমার হাত থেকে তোমাকে এখন কে বাঁচাবে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে ওঠেন- ‘আল্লাহ!’ একথা শুনে তার আত্মা প্রকম্পিত হয়ে ওঠল। সে তলোয়ার কোষবন্ধ করে বসে পড়ল। নবীজী তাকে কোন শাস্তিই দিলেন না বরং ক্ষমা করে দিলেন। (সহীহ বুখারী: কিতাবুল মাগাযী: ২/৫৯৩)।
 
হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, একবার এক বেদুঈন মসজিদে পেশাব করে দিল। লোকেরা তা দেখে তেড়ে এল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, তাকে ছেড়ে দাও এবং এক বালতি পানি ঢেলে স্থানটি ধুয়ে দাও। মনে রেখ, তোমাদেরকে সহজ-সাধ্যকারী হিসেবে পাঠানো হয়েছে, কাঠিন্য সৃষ্টিকারী হিসেবে নয়। -(সহীহ বুখারী: কিতাবুল উযূ: ১/৩৫)।
 
একবার এক ইহুদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মেহমান হলো; রাতে থাকলোও। হুজুর (সা.) তাকে সমাদর করলেন। সুন্দর রাত্রিযাপনের ব্যাবস্থাও করলেন। কিন্তু ওই ইহুদির মনে ছিল বড় শয়তানি। শেষ রাতের দিকে দুষ্ট ইহুদি রাসূল (সা.) এর বিছানায় ইচ্ছাকৃত পায়খানা পেশাব করলো। এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য ছিল রাসূল (সা.)-কে কষ্ট দেয়া। 
 
অতপরঃ ভোর হওয়ার আগেই সে গোপনে চলে গেল। আর মনে মনে ভাবতে লাগল- আ”ছা যাক, মুহাম্মাদকে (সা.) কষ্ট দিতে পারলাম। কিন্তু‘ সে ভুলে তার তরবারিটি ফেলে গেছে। তরবারির কথা মনে হতেই সে আবার ফিরে আসলো। এসে দেখে রাসূল (সা.) নিজে ময়লা পরিষ্কার করছেন। সে ভাবলো রাসূল (সা.) হয়তো তাকে এর শাস্তি দিবেন বা পাকড়াও করবেন, তাকে ক্ষমা করবে না। সে খুব অনুনয় বিনয়ের সঙ্গে রাসূলকে বললো আমার ভুল হয়ে গেছে’ আমাকে মাফ করে দিন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘ক্ষমার কী আছে। আমারই তো আপনার খেদমতের কমতি হয়েছে। আমি আপনার ঠিকঠাক খোঁজ নিতে পারি নাই, তাই আপনার এমন অবস্থার জন্য আমি দায়ী। আমাকে ক্ষমা করে দিন।’
 
 এই যে রাসূল (সা.) তার সবকিছু বুঝেও তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এ রকম ক্ষমার আদর্শ কেবল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মধ্যেই বিদ্যমান।
 
মক্কার সুদীর্ঘ ১৩ বছর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের ওপর যে লোমহর্ষক, অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, ক্ষমতা লাভ করার পরও এর কোনো প্রতিশোধ মুসলমানরা নেননি, এমনকি কখনো কাউকে বদ্দোয়া করেনি। নবুওয়াতের ১০ম বছর তায়েফবাসীর হাতে নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতিত হয়েছিলেন মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মাদ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম । পাহাড়-সমূহের ফেরেশতা কর্তৃক অত্যাচারী তায়েফবাসীকে পিষে মেরে ফেলার আবেদন করা হলে তা নাকচ করে দিয়ে রহমতের নবী বলেছিলেন, আশা করি এদের বংশধরদের মধ্যে কেউ লা-শরীক আল্লাহর ইবাদাতগুজার হবে। (যাদুল মা‘আদ: ১/৩০২)।
 
মক্কা বিজয়ের দিন আনসার প্রধান সা’দ ইবনে উবাদা রা. শত্রুদের বিপন্ন অবস্থা দেখে বিজয় আনন্দে বলে ওঠেছিলেন, ‘আজ প্রচন্ড লড়াইয়ের দিন, আজ কাবার সীমানায় সব কিছু বৈধ হবে, আজ আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের অপমান করেছেন।’ সা’দের এ কঠোর ঘোষণা নবীজী সা. এক দারুণ শিল্পীত ভঙ্গিতে খন্ডন করে ক্ষমার বাণী শোনালেন। ঘোষণা করলেন, ‘আজ তো পরম দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শনের দিন, আজ আল্লাহ তায়ালা কুরাইশদের সম্মানিত করবেন এবং কাবার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। (আসসীরাতুন্নবিয়্যাহৃ: পৃষ্ঠা: ৩৫২)।
 
ক্ষমার উপকারিতাঃ
  •  ক্ষমা আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ নেয়ামত। যে ক্ষমা করে সে উক্ত বিশেষ নেয়ামতে নিজেকে ধন্য করে।
  •  ক্ষমা করা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শ্রেষ্ঠ আদর্শ। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শ্রেষ্ঠতম উম্মত।
  •  ক্ষমাশীলতা ব্যক্তিকে প্রকৃত মানবে রূপান্তরিত করে, মানবিকতার গুণে গুণান্বিত করে।
  •  ক্ষমা ব্যক্তিকে সহনশীল ও ধৈয্যশীল করে তোলে।
  •  ক্ষমা ব্যক্তিকে সমাজে পরম সম্মানিত করে তোলে।
  •  ক্ষমা দ্বারা চরম শত্রু পরম বন্ধু হয়ে যায়।
  •  ক্ষমাকারী ব্যক্তি মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিয়ে সমাজে চলতে পারে।
  •  ক্ষমা অনেক সময় বীরত্বের চাইতেও শ্রেষ্ঠতম হাতিয়ার বিবেচিত হয়।
  •  ক্ষমার মাধ্যমে লালিত শত্রুতা মনোভাব দুরীভূত হয়।
  •  ক্ষমার মাধ্যমে অসংখ্য সাওয়াব ও ভালোবাসা অর্জিত হয়।
 লেখক
মুহাদ্দিস মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর 
নোয়াখালী কারামাতিয়া কামিল মাদরাসা, সোনাপুর, নোয়াখালী

user
user
Ad
Ad