ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষা সফর : পর্যালোচনা
মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর:: ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য কল্যাণকর সকল বিষয় পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন। পৃথিবীতে মানুষ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক তথা কর্মজীবনের অর্পিত দায়দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্লান্ত, শ্রান্ত ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ঠিক তখনই মানুষ মানসিক শান্তি লাভের পাশাপাশি আল্লাহর সৃষ্টি অবলোকন করার মানসে কোথাও না কোথাও ঘুরে বেড়াতে চায়। দেখতে চায় আল্লাহর সৃষ্টি নির্দশন। ঘুরে দেখা বা ঘুরে বেড়ানোকে আরবীতে ‘সফর’ বলে। বাংলায় সফরকে ‘ভ্রমন’ আর ইরেজীতে ‘ট্যুর’ বলে। শিক্ষা সফরকে ইংরেজি ‘স্টাডি ট্যুর’ বলে। আরবীতে যাকে ‘তরবিয়তী সফর বলা হয়।
শিক্ষা সফর বা ভ্রমণ একটি আনন্দময় ইবাদত এবং জ্ঞান-প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার উৎস। সফর বা ভ্রমণের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো, পূর্ববর্তী জাতিসমুহের কীর্তি ও পরিণতি সম্বন্ধে জানা এবং তা থেকে যথাযথ শিক্ষা গ্রহণ করা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের মনোদৈহিক প্রশান্তি লাভ এবং পূর্ববর্তী জাতিসমুহ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করার জন্য সফরের প্রতি উৎসাহিত করে বলেন, “হে রাসুল আপনি বলুন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ, কিভাবে তিনি সৃষ্টিকর্ম শুরু করেছেন। অতঃপর আল্লাহ পুর্নবার সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু করতে সক্ষম ’। (সুরা আনকাবুত : আয়াত: ২০)।
আল্লাহপাক অন্যত্র বলেন, “তোমাদের আগে অতীত হয়েছে অনেক ধরনের জীবনাচরণ। তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তাদের পরিণতি কি হয়েছে। এই হলো মানুষের জন্য বর্ণনা। আর যারা ভয় করে তাদের জন্য উপদেশবাণী।’ (সূরা আল-ইমরান : আয়াত: ১৩৭-১৩৮)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না এবং তাদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছিল তা কি দেখে না? যারা মুত্তাকি তাদের জন্য পরলোকই শ্রেয়; তোমরা কি বোঝো না?’ (সুরা ইউসুফ: আয়াত: ১০৯)।
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, “এরা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? করলে দেখত এদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছিল। পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা শক্তিতে ও কীর্তিতে প্রবলতর। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকেগকে শাস্তি দিয়েছিলেন তাদের অপরাধের জন্য এবং আল্লাহর শাস্তি হতে তাদেরকে রক্ষা করার কেউ ছিল না।’ (সুরা-৪০ মুমিন, আয়াত: ২১)।
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না ও দেখে না তাদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছিল? পৃথিবীতে তারা ছিল এদের অপেক্ষা সংখ্যায় অধিক এবং শক্তিতে ও কীর্তিতে অধিক প্রবল। তারা যা করত তা তাদের কোনো কাজে আসেনি।’ (সুরা-৪০ মুমিন, আয়াত: ৮২)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা ভ্রমণ কর, সুস্থ থাকবে এবং তোমরা গনিমত লাভ করবে। ( সিলসিলাতুল আহাদিস:হাদিস নং: ২৫৫)। তিনি আরো বলেন, তোমরা ভ্রমণ কর, সুস্থ থাকবে এবং তোমরা যুদ্ধে শরিক হও, গনিমত লাভ করবে। ( সিলসিলাতুল আহাদিস: হাদিস নং: ৩৩৫২)
‘সফর’ বা ভ্রমণ পৃথিবীর আদিকাল থেকে চলে আসছে। নবী রাসুলগণ মহান আল্লাহর নির্দেশে বিভিন্ন জনপদ ও লোকালয়ে সফর করে ‘দাওয়াতী মিশন’ বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারীগণ ধর্ম প্রচারে কিংবা ধর্ম ও জীবন বাঁচানোর তাগিদে আল্লাহর নির্দেশে সফর তথা হিজরত করেছেন। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মহান আল্লাহ মি’রাজ রনীতে ঊর্ধাকাশে একান্তে নিজের কাছে ‘সফর’ করিয়েছেন। তাইতো পৃথিবীর আদি থেকে অদ্যাবধি ইতিহাসের পাতায় অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী, পন্ডিত, নবী-রাসূলের নাম পাওয়া যায়, যাঁরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত ভ্রমণ করে ভ্রমণেতিহাসে চির স্মরণীয় ও অমর হয়ে আছেন।
ইসলামি চিন্তাবিদগণ বলে থাকেন, ‘শিক্ষা সফর ’ হলো জ্ঞানসমুদ্রের সন্ধান। সুস্থ্য দেহ ও সুন্দর মন তথা শারীরিক ও মানসিক উন্নতির জন্য সফর বা ভ্রমণ করা খুবই উপকারী। এজন্যই হজরত শেখ শাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, দুনিয়াতে দু’ব্যক্তি সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী- ১. ভাবুক বা চিন্তাশীল ব্যক্তি এবং ২. দেশ সফরকারী ব্যক্তি।
সফরের আদাব-শিষ্টাচারঃ
১. সফর শুরুর পুর্বে নিয়্যাত ও ইস্তেখারা: নিয়াতের পর মুসাফিরকে ইস্তেখারা করা উচিত। ইস্তেখারা হ’ল কল্যাণ প্রার্থনা। মানুষ যেহেতু তার ভবিষ্যৎ জানে না, তাই নিজের কল্যাণ-অকল্যাণ আল্লাহর উপরে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অথবা কোন ইঙ্গিত পাওয়ার জন্য ছালাতুল ইস্তেখারা আদায় করতে হয়। দিনে বা রাতে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করবে এবং ছালাতের সিজদায়, শেষ বৈঠকে অথবা সালাম ফিরানোর পরে নিম্নের দো‘আটি পড়বে। দোয়াটির অর্থ হলোঃ ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট তোমার জ্ঞানের সাহায্যে কল্যাণের প্রার্থনা করছি এবং তোমার শক্তির মাধ্যমে শক্তি প্রার্থনা করছি। আমি তোমার মহান অনুগ্রহ ভিক্ষা চাইছি। কেননা তুমিই ক্ষমতা রাখ, আমি ক্ষমতা রাখি না। তুমিই জান, আমি জানি না। তুমিই অদৃশ্য বিষয় সমূহের মহাজ্ঞানী। হে আল্লাহ! যদি তুমি জান যে, এ কাজটি (এখানে যে কাজের জন্য ইস্তেখারা করা হচ্ছে তা মনে মনে উল্লেখ করবে) আমার জন্য উত্তম হবে আমার দ্বীনের জন্য, আমার জীবিকার জন্য ও আমার পরিণাম ফলের জন্য, তাহ’লে ওটা আমার জন্য নির্ধারিত করে দাও এবং সহজ করে দাও। অতঃপর ওতে আমার জন্য বরকত দান কর। আর যদি তুমি জান যে, এ কাজটি আমার জন্য মন্দ হবে আমার দ্বীনের জন্য, আমার জীবিকার জন্য ও আমার পরিণাম ফলের জন্য, তাহ’লে এটা আমার থেকে ফিরিয়ে নাও এবং আমাকেও ওটা থেকে ফিরিয়ে রাখ। অতঃপর আমার জন্য মঙ্গল নির্ধারণ কর, যেখানে তা আছে এবং আমাকে তা দ্বারা সন্তুষ্ট কর’।
২. সফরের দিন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরের জন্য বৃহস্পতিবারকে উত্তম দিন মনে করতেন।
৩. সফরের সঙ্গি নির্ধারণ: একাকী সফর করা উচিত নয়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, একজন আরোহী শয়তান আর দুইজন আরোহী দুইটি শয়তান। তবে তিন জন আরোহী হল একটি জামাত। (সুনানে তিরমিযি: হাদিস: ১৫৯৮)
৪. সফরের পুর্বে পিতামাতা বা অভিভাবকে অনুমতি নেয়া।
৫. অভিজ্ঞ ও নেক্কার গুরুজনের পরামর্শ নেয়া।
৬. দিনের শুরুভাগে বা রাত্রিকালে সফর শুরু করা।
৭. সফর চলাকালীন সময়ে ইসলামের বিধিবিধানগুলো যথাযথভাবে আদায় করা।
৮. সফরের জন্য নির্ধারিত দোয়াগুলো সফরের আগে ও পরে যথাযথ নিয়মে পড়া।
৯. সফরের সঙ্গীর প্রতি যথাযথ খেয়াল রাখা, তার খাবার দাবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল হওয়। এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে, আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন; আরবদের একে অন্যকে সফরের সময়ে সেবা (খেদমত) করত। আবূ বকর ও উমর (রাঃ)- এর সাথে এক ব্যক্তি ছিল যিনি তাদের খেদমত করত। তারা উভয়ে ঘুমিয়েছিল। অতঃপর তারা জাগ্রত হলেন। (কিন্তু খাদেম) তাদের জন্য খাবার প্রস্তুত করেনি (বরং সে ঘুমিয়েছিল) তাদের একজন অন্যকে বলছিল, এ (খাদেম) তোমাদের নবীর ঘুমের সাদৃশ্যতা অবলম্বন করেছে (অন্য এক রিওয়ায়াতে আছে, তোমাদের গৃহের ঘুমের সাথে সাদৃশ্যতা রেখেছে)।
অতঃপর তারা তাকে (খাদেমকে) জাগিয়ে দিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট গিয়ে তাঁকে বল, যে আবূ বাকার ও উমার (রাঃ) আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং আপনার কাছে তরকারী (অর্থাৎ খাবার) চেয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের সালাম জানাবে এবং বলবে যে, তারা উভয়েই খাবার গ্রহণ করেছে। (এ কথা শুনে) তারা ঘাবড়িয়ে গেলেন এবং (উভয়েই) নাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার নিকট খাদেমকে খাবার চেয়ে পাঠিয়েছিলাম। আপনি বলেছেন যে, আমরা খাবার খেয়েছি। তো আমরা কী দিয়ে খাবার খেলাম? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের ভাইয়ের গোশ্ত দিয়ে। আল্লাহর শপথ! আমি তার গোশ্ত তোমাদের নখের মধ্যে দেখছি। তারা [আবূ বাকার ও উমার (রাঃ) বলেন, আমাদের ক্ষমা করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে তোমাদের ক্ষমা করবে। (আস সহীহাহ: হাদিস: ২৬০৮)।
১০. কাঙি্খত গন্তব্যে পৌঁছে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে দুরাকাত সালাত আদায় করা।
সফরের উপকারিতাঃ
১. সফরের মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ পালন করা হয়।
২. আল্লাহর সৃষ্টিরাজির সৌন্দর্য ও রহস্য সম্পর্কে জানা যায়।
৩. মনোদৈহিক সুস্থতা ও প্রশান্তি লাভ করা যায়।
৪. অতীতের ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমুহ সম্পর্কে জানা যায়।
৫. নতুন নতুন লোকাচার তথা সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটে।
৬. বিভিন্ন ভাষা বর্ণ রুচি মানসিকতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়।
৭. অগণিত সাওয়াব লাভ করা যায়।
৮. অপরিচিতদের সাথে পরিচিত হওয়া যায়।
৯. স্বীয় জীবনের প্রকৃত মুল্যায়ণ করার সুযোগ হয়।
১০. জীব বৈচিত্র, পাখ পাখালির কলতান, নদী সাগরের মিতালী দেখা যায়।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সফরের মাধ্যমে অগণিত সাওয়াব ও যাবতীয় কল্যাণ হাসিলের তাওফিক দান করুন। আমীন।
মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর,
মুহাদ্দিস, নোয়াখালী কারামাতিয়া কামিল মাদরাসা, সোনাপুর, নোয়াখালী।
- সিলেটের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল দ্রুত চালু করে ১২শ শয্যায় উন্নীত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
- পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে MS3 টেকনোলজি বিডি পরিবারের ঈদ শুভেচ্ছা
- এবার এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানে ইরানি আঘাত
- শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে ইরানের মোকাবিলা সম্ভব নয়: মুজতাবা খামেনেয়ী
- ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিণতির বিষয়ে রাশিয়ার হুঁশিয়ারি
- একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
- রমজান মাসই বন্ধ থাকছে মাধ্যমিকসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
- মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য, বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ: আইন উপদেষ্টা
- যুদ্ধ, বিভাজন ও অনিশ্চয়তা: বহুমুখী সংকটে ইসরায়েল
- পুরো রমজান মাসে হাইস্কুল বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ
- হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন তারেক রহমান
- বিজেপি-আরএসএসের বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় উইকিপিডিয়া
- আসামে তীব্র শীতের মধ্যেই ১৫০০ মুসলিম পরিবারের ঘর গুঁড়িয়ে দিল ভারত
- নুতন বই পেয়ে উচ্ছাসিত রাঙামাটির শিক্ষার্থীরা
- সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছেছে খালেদা জিয়ার মরদেহ
- আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই
- শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান
- জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানিয়ে নাহিদকে এনসিপির ৩০ নেতার চিঠি
- পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরশাসনের পতন
- তারেক রহমানের বহনকারী প্লেন নামল সিলেটে

