`

মোরা স্বপ্নবিলাসী-মোরা বাংলায় দেখি স্বপ্ন

  • Views: 1730
  • Share:
ফেব্রুয়ারী ২০, ২০২১ ২১:২৫ Asia/Dhaka

জহির উদ্দিন:: যে ভাষা ও সংস্কৃতি বার বার আমাদের আন্দোলিত করে জাতীয় অস্তিত্বের ভিত রচনা করেছে। যে ভাষা ও সংস্কৃতি মুক্তির অভিযাত্রায় ভাষাধিকার থেকে স্বাধীনতার এক অম্লান মহাসারথী, যে ভাষা দীর্ঘ ২৩ বছরের প্রতিবাদ প্রতিরোধের সংগ্রাম আর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে। আর জাতির চেতনায় জাতীয় জাগরণে জাতির হৃৎপিণ্ডে অবিরাম, ক্রমাগত রক্ত সঞ্চালন করেছে, আমরা স্বভাবতই তাঁর স্বপ্নবিলাসী।

যে ভাষার কাব্যে সাহিত্যে এশিয়ায় প্রথম নোবেল পুরুষ্কার আসে। যে ভাষায় রবীন্দ্র-নজরুলেরা অমর সাহিত্য রচনা করেন, যে ভাষায় বঙ্গবন্ধু চুয়াত্তরে জাতিসংঘে ভাষণ প্রদান করেন। যে ভাষায় আমার অস্তিত্বের শিকড়গড়া, তবে কেনইবা এ ভাষা এতকাল যাবৎ বার বার অযত্নে অবহেলার শিকার হবে, কেনইবা উচ্চ আদালতের মতো অনেক অনেক জায়গায় এ বাংলা স্থান পাবে না। তার কারণ, আমরা এখনো যথেষ্ট আন্তরিক ও সচেতন নই বলেই রার্ষ্টীয় ও সামাজিকভাবে, এমনকি অধিকাংশ প্রাতিষ্ঠানিক মানুষদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারিনি।

 বিস্তৃত নানা  গণমাধ্যম থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার দূষণ, বাচনিকে বিকৃতি ও বিভিন্ন মিশ্রণের ভুল উচ্চারণ ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত চলছে অবিরাম। ভাষার সুনিপুণ উচ্চমার্গের অর্জন ছাড়া বাংলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির তাত্ত্বিক  বিন্যাস যদিও অত্যন্ত কঠিন। তারপরও বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা সম্পর্কে বিশিষ্ট পদার্থ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অমর সেই উক্তি, যারা বলেন, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান হয় না, তারা হয় বাংলা জানেন না, নয় বিজ্ঞান বোঝেন না। " এ উক্তিটি ভাষার গভীরতাকেই ইঙ্গিত করে । 

তাছাড়া নানা অজুহাতে রাষ্ট্রীয় উচ্চাসনের অনেক প্রতিষ্ঠানে  বাংলা ভাষা'র প্রয়োগ ও ব্যবহার আজও আমরা যথাযথ প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। যার জন্য বিভিন্ন মিডিয়ায় অনেক উচ্চশিক্ষিত পদস্থ সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গের অসচেতনভাবে  বাংলা ভাষা'র যেনো-তেনো ব্যবহার দেখে আমরা প্রায়ই বিব্রতবোধ করি। অথচ আমরা প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দীর্ঘ সময় শিক্ষা গ্রহণ করে আসছি । তারপরও কেন যথাযথ হচ্ছে না এর প্রয়োগ ও ব্যবহার, তার নানা কারণ ও পন্থা হয়ত আমরা গবেষণামূলক ভাবে এখনো খুঁজিনি এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তার সুপ্ত চেতনার বদ্ধ দুয়ার গুলোতে তেমন কোনো বিশেষ আঘাতও  করতে পারিনি, তেমনি আরো পারিনি পরিকল্পিত সুবিন্যাসিত কোনো প্রায়োগিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে। নতুবা স্বাধীনতার ৫০ বছরে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম, ভাষার সুপ্ত সোনালী মাধুর্যে গহীন থেকে গহীনে। 

চেতনাহীন প্রাণী যেমন প্রাণহীন জড়বস্তুর মতোই দৃশ্যমান হয় , প্রাণহীন ভাষারও, গন্তব্য এমনই। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের প্রাণ হলো বাংলা ভাষা । আর তাঁর  চেতনা হচ্ছে এ ভাষায় সৃষ্ট  সংস্কৃতি। কাজেই বাঙালী জাতিগোষ্ঠীর ভিত গড়া যে বাংলা ভাষায়, তার অহংকারের মাধুর্যকে শাণিত করতে হলে; আগে তার সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটাতে হবে শিকড় থেকে শিখরে। আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় প্রতীয়মান হয় যে, কেবল শহরকেন্দ্রিক গুটিকয়েক শিল্পকলা ও শিশুএকাডেমি দিয়ে শুদ্ধ ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তার এবং উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব নয়। 

গ্রাম থেকে শহর তথা প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তার সকল স্তরে যথার্থ ক্রমবিকাশ ঘটাতে হবে। আমরা মনে করি যে, প্রতিটি স্কুল-কলেজে যদি সংস্কৃতি বিষয়ক একটি ঐচ্ছিক বিষয় পড়ানো হয়, তবে একদিকে যেমন সংস্কৃতি কর্মীদের কর্মসংস্হান হবে, তেমনি সংস্কৃতির মর্যাদাও বাড়বে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে ভাষা ও সংস্কৃতির একটি স্থায়ী পাঠাতন তৈরি হবে। যে বলয়ের মাধ্যমে সৃষ্টি হবে এক অবিরাম সাংস্কৃতিক মিথষ্ক্রিয়া । সংস্কৃতি বলতে কেবল গান-বাজনাকেই বুঝলে ভুল হবে। ভাষা সংস্কৃতি হচ্ছে তাই ,যা কিছু ভাষায় প্রকাশিতব্য, তা তা সঠিক, শুদ্ধ ও মার্জিতভাবে শিখিয়ে দেয়া বিষয়ক পরিমার্জন কারী বিষয়।  পাশাপাশি সকল চাকুরির নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি মৌখিক পরীক্ষায় শুদ্ধ-সুন্দর বাংলা  বাচনিকের জন্য অনন্ত ৫ টি নম্বর বরাদ্দ করা যায় এবং সকল প্রশিক্ষণের সঙ্গে শুদ্ধ বাংলা ভাষার একটা প্রাধান্য দেয়া হয়। আর হয়তো তখনই তার গুরুত্বের জন্যই সকলের দৃষ্টি ও মনোযোগ আকর্ষণ করা যাবে। সর্বোপরি বুঝতে হবে যে,  ভাষা আমাদের একটি বিমূর্ত অঙ্গ। ভাষা না থাকলে বাকপ্রতিবন্ধি হয়ে যেতে হয়। 

ভাষা এমন একটি বিজ্ঞান যা ছাড়া কোনোরকম চিন্তা- চেতনা কিংবা নতুন নতুন ভাবনা বা কল্পনার উন্নয়ন ও অগ্রগতি বা বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়,  এমনকি ভাষা ছাড়া স্বপ্ন পর্যন্ত আমরা দেখতে পারিনা। কাজেই ভাষাহীন জাতি হচ্ছে এক  স্বপ্নহীন জাতি। ভাষা ও চিন্তা এভাবেই অতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে । তাই  সে কারণে ভাষা আগে না চিন্তা আগে এর বিতর্ক অনেকটা, মুরগী ও ডিমের মতোই । কাজেই ভাষা ও চিন্তাকে সমার্থক ধরা হলেও ভাষাকে চিন্তার বাহন হিসেবেই প্রাধান্য দেয়া হয়। 

সকল প্রকার জ্ঞান, বিজ্ঞান ও চিন্তা-চেতনা, মত-অভিমত আদান-প্রদানের মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। কাজেই ভাষার যতোটা উন্নয়ন হবে, সাহিত্য- সংস্কৃতিরও ততোটাই উন্নতি হবে এবং সে জাতির প্রতিটি বিষয়ের প্রভাব ও সমৃদ্ধি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বলয়ের অভিযাত্রায় ততোই অগ্রগামী হবে। অযত্নে অবহেলায় সংকোচিত হয়ে হারিয়ে যেতে যেতে এখনও পৃথিবীতে ছয় হাজারেরও বেশি ভাষা প্রচলিত আছে। তন্মধ্যে সারাবিশ্বে প্রায় ২০০ টি ভাষায় পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়। 

বাংলাদেশেও  ৪৫ টি নৃগোষ্ঠির ভাষাও প্রায় মৃয়মান হয়েই আছে। এদেরও লিখিত মাধ্যম খুব একটা নেই। কেননা ভাষাও, রাষ্ট্রীয় এবং অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের শিকার হয়। জীবন ও জীবীকার চাপে পড়ে রাষ্ট্রীয় ও অন্যান্য জাতির ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়তে হয় এবং এ ভাবেই আস্তে আস্তে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি দূর্বল হতে হতে কালের মহা লয়ে হারিয়ে যেতে থাকে।

 কাজেই শেষ কথা হচ্ছে, যে ভাষা চর্যাপদ থেকে শুরু হয়ে হাজার বছরের পথপরিক্রমায় সৃষ্ট হয়ে, হাজারো ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বিবর্তন ও পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় যে বাঙালী জাতিগোষ্ঠীর সৃষ্টি করেছে, আর আজ প্রায়  ৩০ কোটি মানুষ  বাংলা ভাষায় কথা বলাতে, বাংলা ভাষা আজ বিশ্বে পঞ্চম তম। 

আর যে বাংলায় বাংলাদেশ। যে বাংলার জন্য আমরা প্রাণ দিয়েছি বায়ান্নের একুশে । যার ধারাবাহিকতায় আমরা যুদ্ধ করি একাত্তরে। একুশ আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। অমর ২১ শের গানের সুর আজ বিশ্ব- মাতৃভাষা দিবসে  মাতৃভাষার গানের সুরে সুরে সারাবিশ্বে ঝাংকারিত হচ্ছে। তাই আজ আমাদের বিশ্বাস যে, বাংলা ভাষা অদূর ভবিষ্যতে একটি মর্যাদাপূর্ণ, শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ভাষারুপে জাতিসংঘের সপ্তম দাপ্তরিক ভাষায় আবির্ভূত হবে । 

কাজেই মহামূল্যবান এ সম্পদ আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা, এ বাংলাকে মমত্ববোধ দিয়ে ঐকান্তিক সযত্নে জাতীয় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে লালন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। 

তাইতো কবির গভীর অনুভূতির অফুরান এক অভিব্যক্তি,

"আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই, 
আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই।  
আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন, আমি বাংলায় বাঁধি সুর, 
আমি এই বাংলার মায়া ভরা পথে হেঁটেছি এতোটা দূর,।" 

যবনিকায়, অমর শহীদদের প্রতি অবিরাম শত শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেই বলি, আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন। আমি চির স্বপ্নবিলাসী, এই বাংলায়। 

লেখকঃ
মোঃ জহির উদ্দিন,
অধ্যক্ষ, শাহ নিমাত্রা এস.এফ. ডিগ্রী কলেজ, ফুলতলা, জুড়ি

user
user
Ad
Ad