`

অভিবাদন জুতা সেলাইকারী

  • Views: 1365
  • Share:
ফেব্রুয়ারী ১৯, ২০২১ ২১:২৭ Asia/Dhaka

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম :: প্রতিনিয়ত যাঁরা আমাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাঁদের মধ্যে জুতা সেলাইকারী একজন। আমাদের এলাকায় বা বাজারে তাঁরা বসেন। এই জুতা সেলাইকারীগণকে শুধুমাত্র বাজারেই দেখা যায় না। রেলস্টেশন, রাস্তার মোড়, সিনেমা হলের সামনে, যেখানে মানুষের চলাফেরা সেখানেই তাঁদের দেখা মেলে। কেউ থাকেন আবার ভাসমান। ফেরিওয়ালাদের মতো। কারো জুতা নষ্ট হয়ে গেলে বা ছিঁড়ে গেলে তাঁরা নিপুণ হাতে মেরামত করে দেন। এটি তাঁদের পেশা। অথবা জুতা সেলাইকেই এঁরা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। জীবিকার তাগিদে। এঁদের সেবা জরুরী সেবা। আমরা কোথাও বেড়াতে যাবার সময় হঠাৎ জুতা ছিঁড়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে এঁরা জুতা ঠিক করে দেন। নইলে আমরা একধরনের বিপদে পড়ে যাই। যদি তাঁকে অর্থাৎ জুতা সেলাইকারীকে না পাওয়া যায় তখন বোঝা যায় যে কী সেবা তাঁরা আমাদের দেন। সাধারণত বাজারের নির্দিষ্ট স্থানে একটি ছাতা লাঠিতে বেঁধে এর নিচে তাঁরা বসেন। সামনে থাকে তাঁদের বাক্স এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। প্রিতিদিনই কাস্টমাররা তাঁদের সামনে এসে জুতা খুলে দেন। কেউ কেউ আবার পা বাড়িয়ে দেন। জুতা সেলাইকারী নিজ হাতে তাঁর পা থেকে জুতা খুলে নেন। নিঃসংকোচে। তারপর সেটি যথাযথ ভাবে ঠিক করে দেন। রং করে দেন। পালিশ করে দেন। এভাবে অসংখ্য মানুষকে দিনের পর দিন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন জুতা সেলাইকারীগণ। রোদ বৃষ্টি যাই হোক তাঁরা একই স্থানে থাকেন। গায়ের চামড়া বিবর্ণ হয়ে যায়। হাতে দাগ পড়ে যায়।

তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, এই জুতা সেলাইকারীগণ আমাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। এবং এ সেবাটি আমাদের খুব প্রয়োজন। কিন্তু সামাজিকভাবে কি তাঁরা যথাযথ সম্মান পাচ্ছেন?  না। এঁরা সঠিক সম্মান পাচ্ছেন না। অর্থাৎ আমরা (সবাই নন) তাঁদের উপযুক্ত সম্মান দিতে পারছিনা। তাঁদের যথাযথ স্নেহ-ভালোবাসাও দিই না। কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে দাওয়াত করি না। অথচ এঁরা আমাদের সমাজের অংশ। সামাজিক উন্নয়নে এঁদেরও ভূমিকা আছে। আইন অনুযায়ী এঁরা উপযুক্ত সম্মান পাওয়ার অধিকারী। বাংলাদেশ সংবিধান সব নাগরিককে সমান মর্যাদা দিয়েছে। এ সংবিধানের ২৭নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, "সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।" এছাড়া আমাদের সংবিধানের ২০(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, "কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয়, এবং " প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতানুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী" - এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন।" 

রাষ্ট্র তাঁদের সাংবিধানিকভাবে সম্মানিত করেছেন। এজন্যে সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ। কিন্তু সামাজিক মানুষ হিসেবে আমরা এঁদের সামাজিক মর্যাদা দিচ্ছি না। এর জন্যে আমরাই দায়ী। কারণ শেষপর্যন্ত তাঁরাও আমাদের মতোই রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। এঁদেরও আনন্দ বেদনার অনুভূতি আছে। যদিও এঁদের অনেকেরই আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তবে সরকার তাঁদের স্বচ্ছল করার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। 
.
অনেক মানুষ আছেন যাঁরা উক্তরূপ ব্যক্তিগণকে ভালো দৃষ্টিতে দেখেন না। পাশাপাশি বসে বা এক টেবিলে বসে খাবার খেতে দ্বিধা বোধ করেন। এমনটি কাম্য নয়। মনের মধ্যে যদি ঘৃণাবোধ জন্মে তাহলে আমরা সভ্য সমাজের সদস্য হিসেবে নিজেদের দাবি করি কিভাবে? সব মানুষই সমান। কিন্তু সব মানুষই এক পেশার হতে পারেন না। এবং এটি কাম্যও নয়। সব পেশারই প্রয়োজন আছে। এবং সব পেশার মানুষেরই সমান মর্যাদা পাওয়ার অধিকার আছে। সামাজিক মানুষ হিসেবে তাঁদের প্রতি আমাদের কর্তব্য আছে। যেমন বিয়ে, বৌভাত বা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁদের দাওয়াত দেয়া। তাঁরা যদি আমাদের দাওয়াত দেন তাহলে আমাদের কর্তব্য হবে তাঁদের বাড়িতেও যাওয়া। 

অন্যদিকে তাঁরাও রাষ্ট্রের মালিকানার অংশ। আমাদের প্রতিনিধিগণ তাঁদের ভোটেও নির্বাচিত হন। আমাদের সরকারি কর্মচারীদের বেতন তাঁদের করের টাকায় হয়। এছাড়া যাঁরা শিক্ষিত হচ্ছেন তাঁদের পেছনেও বর্ণিতদের পরিশ্রমের টাকা ব্যয় হচ্ছে। সুতরাং কোনো নাগরিকই তাঁদের অবহেলা করতে পারেন না। তাঁরা অবহেলার পাত্র নন। ঘৃণার পাত্র নন। অবজ্ঞার পাত্র নন। নন অস্পৃশ্য। বিপরীত দিকে তাঁরা ভালবাসা পাবার অধিকারী। স্নেহ পাবার যোগ্য। এবং সমাজের অন্যান্য মানুষের মতো তাঁদেরও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার অধিকার আছে। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো তাঁদের কাছে এগিয়ে যাওয়া। তাঁদের খোঁজ খবর নেয়া। তাঁরা কেমন আছেন জিজ্ঞেস করা। উৎসবে অনুষ্ঠানে তাঁদের নিমন্ত্রণ দেয়া। 

এই জুতা সেলাইকারীগণের অনেকেই এখন শিক্ষার দিকে এগিয়ে আসছেন। ছেলে মেয়েদের লেখা-পড়া করাচ্ছেন। দেশের জন্যে বিভিন্নভাবে অবদান রেখে যাচ্ছেন। তাঁদের উৎসাহিত করতে হবে। সাহস দিতে হবে। বিপদে পড়লে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ এটি আমাদের নৈতিক কর্তব্য। মানুষ হিসেবে এটি আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। 

এমন অনেক জুতা সেলাইকারী আছেন যাঁরা নিয়মিত পত্রিকা পড়েন। দেশের খবর রাখেন। বিদেশের খবর জানেন। অর্থাৎ তাঁরা জ্ঞান চর্চাও করেন। পাশাপাশি জুতা সেলাইও করেন। কিন্তু পান না ভালোবাসা। বা যথাযথ সম্মান। অন্যদিকে একটু বলি। আমাদের সমাজের এমন কিছু লোক আছেন যাঁরা এই জুতা সেলাইকারীগণকে ভালোবাসেন। তাঁদের খোঁজ খবর নেন। তাঁদের বিপদে এগিয়ে যান। আমি তাঁদের অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি। 

কিন্তু সমাজের বেশিরভাগ অংশই তাঁদের মতো আচরণ করেন না। এ অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। তাঁদের সাথে মিশতে হবে।  তাঁদের কাছে টানতে হবে। একই টেবিলে বসে খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। কারণ তাঁরাও মানুষ। তাঁরা আমাদের বন্ধু। বিপদের সাথী। এঁরা প্রতিনিয়ত আমাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা একজন আরেকজনকে দেখলে সালাম দিই। আদাব দিই। কিন্তু যিনি একটি ছাতার নিচে বসে অনেক ক্ষেত্রে ছাতা ছাড়াই খোলা আকাশের নিচে বসে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে জুতা সেলাইয়ের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত যে সেবা আমাদের দিয়ে যাচ্ছেন তাঁকে কি আমরা আদাব দিই? মনে হয় না। 

বেশির ভাগ লোকই তাঁদের আদাব দেন না। কিন্তু এটি তো কাম্য হতে পারে না। যদি জুতা সেলাইকারী বয়সে আমার থেকে বড় হন তাহলে তো তিনি আমার কাছ থেকে আদাব পাবার অধিকারী। যদি আমি সভ্য হয়ে থাকি। আর যদি বয়সে আমার থেকে ছোট হয় তাহলে তো সে আমার কাছ থেকে স্নেহ পাবার যোগ্য। জুতা সেলাইকারীগণকে যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান দেয়া আমার কর্তব্য। তাঁদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করা আমার দায়িত্ব। তাঁদের সাথে ভালো ব্যবহার করা আমাদের কর্তব্য। যাঁদের জীবন আমাদের জীবনের মতো অতোটা সুখের নয়। যাঁদের দৈনন্দিন জীবন আমাদের মতো ততোটা উপভোগ্য নয়। বৃষ্টি আর রোদ যাঁদের মাথার উপর দিয়ে নিত্য বয়ে যায়। যাঁদের ছেলেরা ট্রেনের এক কামড়া থেকে অন্য কামড়ায় জুতা পালিশের বাক্স হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এবং যাঁদের বেশিরভাগ লোকই কষ্টে আছেন। আর্থিক কষ্টে। যদিও রাষ্ট্রীয় সাহায্যের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। 
.
ধনী এবং বিত্তবান লোকদের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ, দয়া করে আপনারা এগিয়ে আসুন। সামাজিকভাবে কাছে টানা কঠিন বিষয় নয়। শুধু মনের ব্যাপার। কিন্তু আর্থিক ভাবে সচ্ছল করে তোলতে গেলে বিত্তবান লোকদের সাহায্যের প্রয়োজন। বাড়িয়ে দিন সহায়তার হাত। সহায়তা বলতে কাজ দিয়ে সহায়তা। আপনার কারখানায় যোগ্যতানুসারে এঁদের কাজ দিন। সুযোগ দিন দেশকে সেবা করার। আপনার এই উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং আপনার কাজ দিয়ে সহযোগিতার কারণে পাল্টে যাবে তাঁদের জীবন। দূর হয়ে যাবে তাঁদের দৈনন্দিন কষ্ট। হাসি আর আনন্দে ভরে উঠবে তাঁদের প্রতিটি দিন। প্রতিটি রাত। প্রতিটি সকাল। বিত্তবানদের হৃদয়ের উদারতা প্রকাশ পেলে বদলে যেতে পারে অর্থহীনদের জীবনের চিত্র। এবং এটি কাল্পনিক নয়। এটি বাস্তবেই সম্ভব। আমার ধারণা বাংলাদেশের শিল্পপতিগণ যদি উদার হয়ে এগিয়ে আসেন তাহলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল এ জনগোষ্ঠীর জীবনের চিত্র নিশ্চয়ই বদলে যাবে। যদি তা-ই হয় তাহলে বর্ণিত জনগোষ্ঠীর লোকেরা ভাববেন বোধ হয় দেবতা নেমে এসেছেন। স্বর্গ থেকে। স্বর্গীয় সুখ দেয়ার জন্যে। তখন তাঁদের মনের অবস্থা কেমন হবে তা-কী আমরা কল্পনা করতে পারি? অবশ্যই হ্যাঁ। তখন তাঁরা নিশ্চয়ই আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবেন। হয়তো আনন্দে, কৃতজ্ঞতায় ভাষা হারিয়ে ফেলবেন। হয়তোবা দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়বে আনন্দাশ্রু। আমরা কি সেই আনন্দাশ্রু দেখার আশা কর‍তে পারিনা?                                                                                                               
.বিবৃত জুতা সেলাইকারীগণ সারা দেশের মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। পুরুষ মহিলা সবার। কিন্তু সবার কাছ থেকে তাঁরা কাঙ্ক্ষিত সম্মান ও মর্যাদা পাচ্ছেন না। আসুন আমরা সবাই তাঁদের যথাযথ সম্মান, ভালোবাসা, স্নেহ এবং মর্যাদা দিই। এঁদের জীবনকে আনন্দে ভরপুর করি। এটি আমাদের দায়িত্ব। কারণ এঁরা এদেশেরই নাগরিক। আমাদের ভাই। বোন। প্রতিবেশী। 

পাঠক, তাহলে পরিশেষে তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি, "অভিবাদন হে জুতা সেলাইকারী।"
.
মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম 
প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ 
মৌলানা আছাদ আলী ডিগ্রী কলেজ 
উপজেলা মাধবপুর, জেলা হবিগঞ্জ। 
  

user
user
Ad
Ad