`
কলেজ সরকারিকরণের সুফল পাচ্ছেনা কেউই!!

৩০২টি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীর আত্তীকরণ আর কত দূর?

  • Views: 2426
  • Share:
ফেব্রুয়ারী ৮, ২০২১ ০৩:০৬ Asia/Dhaka

মোঃ আজিজুর রহমান:: ২০১৬ সালের ৩০জুন, প্রতিটি উপজেলায় একটি করে বেসরকারি কলেজেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার নির্দেশে সরকারিকরণ ঘোষণা করা হয়। তারপর পরের সকল ঘটনা সবারই জানা। বিসিএস শিক্ষা সমিতির বাধার মুখে কলেজ সরকারিকরণ বিধি-২০০০এর পরিবর্তে রচিত হয় ২০১৮বিধি!! ২০১৮ বিধি শ্রদ্ধার সহিত মেনে নিলেন ৩০২টি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীবৃন্দ। তারপরেও নাটকীয় রূপ নেয় কলেজ আত্তীকরণ!!

২০১৮সালের ৮আগষ্ট ২৭১টি কলেজের জিও জারির মধ্য দিয়ে সরকারিকরণের স্বপ্ন বুনে ঐসমস্ত কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীগণ। কিন্তু স্বপ্নে আবারও কঠিন দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় No BCS No Cadre শিরোনামে আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী কতিপয় শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা।উনারা যেন শপথই নিয়েছেন এই বাংলায় কীভাবে বেসরকারি শিক্ষা আবার সরকারিকরণ হয় তা দেখে নিবেন।

তাই উনারা মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শন রিপোর্ট বাদ দিয়ে আবার শুরু করেন মাউশিতে শিক্ষকদের কাগজ-পত্র যাছাই-বাছাইয়ের কাজ। কারণে-অকারণে শিক্ষকদের ফাইলে মন্তব্য করা হয় ৫২টি থেকে ৫৫টি।বেসরকারি কলেজে কর্মরত একজন বাবার বয়সের শিক্ষকদের সাথে কোন কোন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তার আচরণ ছিল অশুভনীয়। কান্নাজরিত কণ্ঠে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ জানান আগে যদি জানতাম আমার সাথে এমন ব্যবহার করবে ছেলের বয়সি একজন ক্যাডার কর্মকর্তা তাহলে আমি আর ফাইল নিয়ে আসতাম না। 

তারপর ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে অযাচিত মন্তব্য সহকারে মাউশি হতে কলেজ ফাইল গুলো প্রেরণ করা হয় শিক্ষামন্ত্রণালয়ে। শুরু হয় ধারাবাহিক নাটকের তৃতীয় পর্ব!!! ৫টি কমিটির মাধ্যমে আবারও শুরু হয় শিক্ষক-কর্মচারীর মূল কাগজ-পত্র যাছাইয়ের কাজ।৫টি কমিটি কাগজে কিন্তু কাজ করে ২/৩কমিটি!!সেখানেও শুনা যাই কিছু কর্মকর্তার অশুভনীয় আচরণের কথা।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রণালয় মাত্র ১২৫/১২৮টি কলেজের ফাইল যাছায়ের কাজ শেষ করেন।এরি মাঝে সদ্যসরকারিকৃত কলেজের শিক্ষক নেতারা শিক্ষা সচিব স্যারের সাথে কাজের অগ্রগতি নিয়ে বসেন। বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারলাম শিক্ষাসচিব স্যার বলেছেন ডিসেম্বর-২০২০এর মধ্যে আত্তীকরণের সকল কাজ শেষ করবেন।শিক্ষাসচিব স্যারের এই ঘোষনায় আবারও আনন্দের জোয়ারে ভাসে ৩০২টি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীগণ। কিন্তু সচিব স্যারের এই মধুময় আশ্বাসও ভেস্তে যায় অবশেষে।ডিসেম্বর মাস পার হয়ে এখন ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি!! আরকত দেরি! আত্তীকরণ আরকত দেরি।সেই কথা জানেনা পাঞ্জেরী!!! 

মাঝেমাঝে ফাইল করে চালাচালি আর এর ধারাবাহিকতায় ২৫টি কলেজের ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন শিক্ষামন্ত্রনালয়। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মাত্র ১টি কলেজের ফাইল (সরকারি পাইকগাছা কলেজ,রংপুর) রেখে ২৪টি কলেজের ফাইল আবারো শিক্ষামন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠান সম্মিলিতভাবে ২৫টি কলেজের প্রস্তাব করার কারণে!!!জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চাহিদা চান প্রতিটি কলেজকে আলাদাভাবে প্রস্তাব করার।

এখানে সদ্যসরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকদের সন্দেহ ঘনীভূত হতে থাকে। সদ্যসরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকদের ভাষ্য হলো এর আগেও বাংলাদেশে কলেজ সরকারিকরণ হয়েছে এবং শিক্ষাক্যাডারের কর্মকতারাই সরকারিকরণের কাজ করেছেন।কিন্তু ২০১৮ বিধিতে কাজ করতে এসে যেন উনারা পূর্বের সকল কাজের ধরণ ভুলে গেছেন!!!শিক্ষামন্ত্রনালয় হতে কিছু ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যায় আবার ফিরে আসে শিক্ষামন্ত্রণালয়ে।ফাইল আসা-যাওয়ার খেলাচ্ছলে পদসৃজনের কাজ যেন কর্মকতাগণ গিয়েছেন ভুলে।

তারপর করোনা মহামারীর ছোঁবলে কলেজগুলোর ফাইল যাছাইয়ের কাজ বন্ধ হয়ে যায় দীর্ঘ এক বছর।স্বপ্ন যেন দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হতে থাকে সদ্যসরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকদের আত্তীকরণ প্রক্রিয়া।

ননএম্পিও শিক্ষক-কর্মচারীর হালচালঃ
"জাল টানে অহিদে আর মাছ খান নাহিদে"
কলেজের বিভিন্ন কাজে সারাদিন কাজ করেও মাস শেষে পায়না প্রাপ্য সম্মানিটুকু। নানাভাবে কলেজ কর্তৃপক্ষ বঞ্চিত করছেন ননএমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদেরকে। অনার্স শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টিউশন ফি আদায় করছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ  কিন্তু সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে?কি কাজে ব্যয় হচ্ছে? কে জানে না!! ননএম্পিও শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন চায়লেই অধ্যক্ষ স্যারেরা বলেন ফাণ্ডে টাকা নাই,বেতন কোথায় হতে দেব? অথচ সেই অর্থ বিভিন্ন খরচের অবৈধ ভাউচার তৈরি করে আত্মসাৎ করছে কলেজের ব্রাহ্মণ নামে খ্যাত কতিপয় স্যারেরা।

স্ব স্ব বিভাগীয় প্রধানদের কাছে ননএমিও শিক্ষকেরা ন্যায্য দাবী উত্থাপন করলে উনারা জানান ফান্ড হতে অর্থ দেয়ার কোন নিয়ম নেই কিন্তু উনারা এমপিওভুক্ত শিক্ষক হওয়ার পরও অনার্স শাখার আয়  হতে সম্মানির নামে মোটা অংকের টাকা নিচ্ছে যা বিধি সম্মত নয়।

কলেজ সরকারিকরণের  সুফল পাচ্ছেনা কেউই!!
কলেজ সরকারি কিন্তু শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি দেন বেসরকারি নিয়মে।শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি মা-বাবার কাছ থেকে আদায় করতে গিয়ে যেমন পড়েন বিপাকে তেমনি শিক্ষকেরা বিপাকে পড়েন শিক্ষার্থীদের সরকারিকরণ নিয়ে কিছু অবাঞ্ছিত প্রশ্নের কাছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের ভাষ্য এ কেমন সরকারি!!

প্রান্তিক গোষ্ঠীর শিক্ষা লাভ সহজ করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ আজ প্রশ্নবাণে জর্জরিত। এর সুফল না পাচ্ছে শিক্ষক-কর্মচারী, না পাচ্ছে শিক্ষার্থী!যাদের জন্য সরকারিকরণ তারাই আজ সরকারিকরণের সুফল হতে বঞ্চিত। তাহলে কাদের জন্য এই সরকারি?

সরকারি কলেজ লিখতে ও বলতে নারাজ একদল হিংসুটে গোষ্ঠী!!
মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে ৩০২টি কলেজ সরকারিকরণ হলেও যেন মন থেকে মানতে পারছেন না একদল হিংসুটে গোষ্ঠী। প্রথমেই আসি জাতীয়বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা।জাতীয়বিদ্যালয় ঐসব কলেজকে সরকারি কলেজ হিসেবে মানতে নারাজ কারণ উনাদের কোন কাজে এসকল কলেজকে সরকারি হিসেবে চিহ্নিত করেনি। জাতীয়বিদ্যালয়ের ট্রেনিংয়ে বারবার বলে দেয়া হয় সদ্যসরকারিকৃত কলেজগুলোকে যেন কোন ট্রেনিই  সরকারি হিসেবে উল্লেখ না করেন।

দ্বিতীয়তঃবিভিন্ন সরকারি কলেজ গুলোতে পরীক্ষার সিটপ্লানের সময়ও এসব কলেজকে সরকারি লিখতে নারাজ শিক্ষাক্যাডারের কিছু শিক্ষক! ঐসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান গুলো প্রকারান্তে রাষ্ট্রপতির আদেশের বিরোধিতা করছেন!!তাই অচিরেই সকল অফিস কাজে সরকারি শব্দের প্রয়োগ চান সদ্যসরকারিকৃত কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীগণ।শিক্ষক-কর্মচারীর 
পদসৃজন আর এডহক নিয়োগ আরকত দূর?

২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৩০২টি কলেজের একটি কলেজেরও শিক্ষক-কর্মচারীর পদসৃজন হয়নি। কবে হবে এডহক নিয়োগ তা কেউই জানেন না। দিনের পর দিন অবহেলায়, অযত্নে সদ্যসরকারিকৃত কলেজগুলোর ফাইল পড়ে আছে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের বারান্দায়!! কিছু কলেজের ফাইল টয়লেটের প্রবেশদ্বারে।ফাইলের সাথে এমন আচরণ নিঃসন্দেহে হিংসার বহিঃপ্রকাশ। সদ্যসরকারিকৃত কলেজের শিক্ষক নেতারা মনে করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একান্ত হস্তক্ষেপ ছাড়া ৩০২টি কলেজের সরকারিকরণের কাজ আলোর মুখ দেখবেনা কিছুতেই!

তাই সদ্যসরকারিকৃত কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীগণ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশের অপেক্ষায় আছেন। তাদের বিশ্বাস মুজিব বর্ষেই আত্তীকরণের সকল কাজ সমাপ্ত হবে একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর নিদের্শনায়।

লেখক:
মোঃ আজিজুর রহমান 
শিক্ষা, সাহিত্য ও গবেষণা সম্পাদক,
বাংলাদেশ সরকারি কলেজ শিক্ষক পরিষদ(বাসকশিপ), কেন্দ্রীয় কমিটি। 

user
user
Ad
Ad