`

হিজড়াদের প্রতি আমাদের দায়বোধ

  • Views: 1625
  • Share:
জানুয়ারী ২৩, ২০২১ ২১:৩৪ Asia/Dhaka

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম:: সাধারণ ভাবে আমরা বলি যে পৃথিবীতে দুই শ্রেণির মানুষ আছেন। যথাক্রমে পুরুষ ও মহিলা। এবং এই দুই শ্রেণির মানুষ নিয়েই আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র আর মানবিক জীবন প্রণালী। কিন্তু আরেক রকমের মানুষ যে আছেন যাঁদের কথা আমরা প্রায় স্বীকারই করি না। তাঁরা হলেন না পুরুষ না মহিলা। ভদ্রভাবে বললে আমরা বলি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। এঁরা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত। বাংলাদেশে আমরা তাঁদের হিজড়া বলে ডাকি। এঁরা সংখ্যায় মোট জনসংখ্যার অনেক কম। আনুপাতিক হারে কম হলেও তাঁরাও মানুষ। মানবকূলে এঁদের জন্ম। তাঁদেরও আছেন পিতা-মাতা। আত্মীয়-স্বজন। কিন্তু পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন থাকলেও একসময় তাঁরা হারিয়ে যান পারিবারিক বন্ধন থেকে। তাঁরা চলে যান হিজড়া সমাজে। চলে যান বলতে ইচ্ছে করেই যান না। বাধ্য হয়ে চলে যান পিতা-মাতার সান্নিধ্য থেকে।

একটা শিশু জন্মলাভ করার পরেই কিন্তু সে হিজড়া হয়না। ধীরে ধীরে সে হিজড়ায় পরিণত হয়। প্রথম সে জন্ম নেয় একটি অপূর্ণাঙ্গ শিশু হিসেবে। তাই সে বড় হওয়ার সাথে সাথে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। ইচ্ছে করে নয়। তার শারীরিক এবং মানসিক গঠনের জন্যে। এবং এটি হয় প্রকৃতিগত কারণেই। এতে পিতা-মাতা বা তার নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এই অস্বাভাবিক গঠন ও আচরণের কারণে প্রতিবেশী এবং ক্রমান্বয়ে সমাজের মানুষ (সব মানুষ নন) তাকে অন্য দৃষ্টিতে দেখেন।

বাচ্চাটির নাম যদি রাখা হয় ছেলে হিসেবে কিন্তু পরে দেখা যায় সে মেয়ে শিশুর মতো আচরণ করে। ফলে ছেলে হয়েও সে মেয়ে শিশুতে পরিণত হয়। বাচ্চাটির প্রকৃতিগত আচরণ মানুষের চোখে 'অস্বাভাবিক' হিসেবে ধরা পড়ে। এবং এই 'অস্বাভাবিকতাই' সমাজের মানুষের (সব মানুষ নন) কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ। আর এই অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কারণেই শিশুটি অবজ্ঞার শিকার হয়। হাসির পাত্র হয়। ক্ষেত্রবিশেষে তাকে ঘৃণাও করা হয়। এখানেই শেষ নয়, এই অস্বাভাবিক বাচ্চাটির মা-বাবাও  ঘৃণার শিকার হন। বাচ্চাটি আমাদের সমাজের সিংহভাগ মানুষের আচরণের কারণে একসময় টিকতে না পেরে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। তার সমগোত্রীয় মানুষের কাছে, যাঁরাও একসময় ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়ে ছিলেন। পেছনে পড়ে থাকে তার বাবা-মা। আত্মীয়-স্বজন। পরিবার-পরিজন। মা-বাবা কি তখন শান্তিতে থাকেন? রাতে কি তাঁরা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারেন? 
.
মা তাঁর বাচ্চাকে কত আদর করেন। থালায় দুধ মাখা ভাত নিয়ে আদর করে ডাকেন-
"খোকন খোকন ডাক পাড়ি
খোকন মোদের কার বাড়ি?
আয়রে খোকন ঘরে আয় 
দুধ মাখা ভাত কাকে খায়।"

কিন্তু যে ছেলে সমাজের বেশিরভাগ মানুষের যন্ত্রণায় বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে সে কি মায়ের সেই ডাক শুনতে পায়? সে কি আর ফিরে আসে? তাহলে মায়ের হাতে যে দুধ মাখা ভাত, সে ভাত কে খাবে? মা তাঁর দুধ মাখা ভাতের থালা নিয়ে কতদিন ছেলেকে ডাকবেন? নাকি মৃত্যুর আগপর্যন্ত ডাকতেই থাকবেন? হায়রে নিয়তি! নিয়তির এ কী খেলা? 

কবি কাজী নজরুল ইসলাম কি সে জন্যেই লিখেছিলেন
"খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে 
বিরাট শিশু আনমনে।"

বাবার কথায় আসি। বাবা তো ছেলেকে হারিয়ে আরামের ঘুম ঘুমোতে পারেন না। রাতে বিছানায় এপাশ ওপাশ করেন। 
ভোর হয়ে যায়। আজান পড়ে। তিনি উঠে পড়েন। কাজে যান। কিন্তু ছেলে হারানোর ব্যথা তাঁর বুকের মধ্যে বেজেই চলে। 
তাহলে কি তিনি পিতা হয়ে পাপই করেছেন? আর যে ছেলেটি ঘর ছাড়া হলো সে কি পাপাত্মা হয়ে জন্ম নিল? কেন বাচ্চাটি ঘর থেকে বের হলো?

পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, সামাজিক ঘৃণার কারণে সে ঘর থেকে বের হলো। কেউ তাকে আদর করেন না। ভালোবাসেন না। সে স্কুলে যেতে পারে না। খেলতে পারে না। সব জায়গায় সে অপাংক্তেয়। বড় হলে সে কাজ পায় না। কাজ ছাড়া সে কীভাবে আয়-রোজগার করবে? কীভাবে সে  ক্ষুন্নিবৃত্তি করবে? বাধ্য হয়েই তাঁরা চাঁদা তোলেন। মানুষের বাড়ি বাড়ি যান। কোনো পরিবারে শিশুর জন্ম হলে নেচে-গেয়ে আনন্দ দেন। আশীর্বাদ করেন। বিয়ের গাড়ি আটকিয়ে চাঁদা দাবি করেন। এগুলি কি সাধে করেন?  না, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্যে। কাজ পেলে এঁঁরা এমনটি করতেন না। 
.
আমরা জানি এঁরা সঙ্গবদ্ধ হয়ে বাস করেন। তাঁদের গুরুমা থাকেন। তাঁরা একসাথে বিভিন্ন জায়গায় যান। মানুষ এঁদের নিয়ে ঠাট্টা-মসকরা করেন। নিন্দা করেন। তাঁদের দেখলে কেউ কেউ আনন্দের খোরাক পান। কিন্তু একবারও ভেবে দেখেন না যে এঁরাও আমাদের মতই রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। তাঁঁদেরও আনন্দ-বেদনার অনুভূতি আছে। তাঁরা আনন্দে হাসেন। দুঃখ পেলে তাঁরাও কাঁদেন। ক্ষুধার জ্বালা মেটানোর জন্যে এঁরা পথে পথে ঘুরে চাঁদা তোলেন। চাকরি পেলে বা কাজ পেলে নিশ্চয়ই তাঁরা এ ভবঘুরে জীবন বেছে নিতেন না। এঁরা কেউই মঙ্গলগ্রহের প্রাণী নন। ভিন্ন গ্রহ থেকে আসেননি। কিংবা নন তাঁরা লতা-পাতা, জীব-জন্তু বা অন্য কোনো নিম্নশ্রেণীর প্রাণী। এঁরা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণীকূলে জন্ম নিয়েছেন। যে প্রাণীকূল বিভিন্ন গ্রহে  অভিযান চালাচ্ছেন। চাঁদকে জয় করেছেন। আবিষ্কার করে যাচ্ছেন নতুন নতুন প্রযুক্তি। কিন্তু সেই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণীকূল অর্থাৎ মানবজাতিই (সব মানুষ নন) আবার মানবতা ভুলে গিয়ে পূর্বোক্ত মানুষকে মানুষ হিসেবেই স্বীকার করতে লজ্জা পান। অথবা অবজ্ঞা করেন। যদিও অন্যদিকে অটিস্টিক বাচ্চাদের প্রতি তাঁরা দরদ দেখান যথাযথ ভাবে। এঁরাও তো অটিস্টিক। তাহলে তাঁদের প্রতি আমাদের দায়বোধের জায়গাটুকু জেগে উঠেনা কেনো?

আমাদেরও দায়বোধ আছে। নিশ্চয়ই এ দায় আমরা এড়াতে পারিনা। বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন উন্নত দেশ তাঁদের তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এজন্যে আমাদের সরকার সহ সেসব দেশের সরকার কে অন্তর থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই। 
অভিবাদন জানাই। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি। 
.
প্রিয় পাঠক, এঁদের জন্যে কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের সরকার তাঁদের পূনর্বাসনের জন্যে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছেন। সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই। এখন আমাদের পালা। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। এঁদের আমাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে ভাবতে হবে। এটি কল্পনা করতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। আমার সন্তান বা ভাই-বোন যদি এমন হতো তাহলে কি ফেলে দিতে পারতাম?  নিশ্চয়ই না। তাহলে অন্যের সন্তান বলে অবজ্ঞা করবো কেনো?  আসুন আমরা আমাদের মানবতাকে জাগ্রত করি। কল্পনা করি এঁরাও প্রাকৃতিক। প্রকৃতিগত কারণেই এঁরা এমন হয়ে জন্ম নিয়েছেন। এবং এঁদের নিজেদের কোনো দোষ নেই। তাঁদের স্কুলে নিয়ে যাই। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই। কাজের জন্যে প্রশিক্ষণ দিই। 

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মোপযোগী করি। তাহলে তাঁদের জীবনে সুখ আসবে। পাশাপাশি তাঁরা স্বাভাবিক জীবনধারায়ও ফিরে আসবেন। আর আমরাও বলতে পারবো যে, আমাদের কর্তব্য আমরা পালন করছি। যাঁদের আর্থিক সামর্থ আছে এবং যাঁরা শিল্পপতি তাঁরা এগিয়ে আসতে পারেন পূর্বোক্তদের কাজ দেয়ার ক্ষেত্রে। সরকার তো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেনই। আমাদের সরকার তাঁদের স্বীকৃতি দিয়ে বড় বা আসল কাজটি করেছেন। এখন বাকি দায়িত্ব আমাদের। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আমাদেরই করতে হবে। কারণ আমরা সামাজিক মানুষ। যাঁরা এঁদের দৈনন্দিন জীবন দেখেছেন তাঁরা জানেন যে, এই মানুষেরা কত মানবেতর জীবন-যাপন করেন। 

কিন্তু যে বাবা-মার ঘরে তারা হয়েছেন তাঁরাও জানেন যে তাঁদের সন্তান প্রকৃতপক্ষে ভালো নেই। প্রতিটি দিন প্রতিটি ক্ষণ যে মানুষের ঘৃণা বা অবজ্ঞার শিকার হচ্ছেন তাঁদের প্রিয় সন্তান এটি তাঁরা মর্মে-মর্মে অনুভব করেন। এই যে অন্তরজ্বালা, তা আর কতদিন জ্বলবে? স্বাভাবিকভাবে একটা ছেলে বা মেয়ে যদি সন্ধ্যার আগে ঘরে না আসে মা-বাবার চিন্তার শেষ থাকেনা। কিন্তু যে ছেলেটি প্রায় কোনো দিনই ঘরে ফেরে না তাঁর জন্যে মা-বাবার চিন্তার ভার কত সীমাহীন হতে পারে তা কি কল্পনা করেছি একবার?  সেই মা-বাবার কলিজার আগুন নেভানোর দায়িত্ব কি আমাদের উপর পড়ে না?  অবশ্যই পড়ে। কারণ আমরা সৃষ্টির সেরা জীব। 
.
হিজড়াদের বাবার কান্না, মায়ের গগনস্পর্শী আর্তনাদ আকাশ-বাতাসকে আর কতদিন বিদীর্ণ করবে? আর কতদিন কান্নার গান গাইবেন এই অবহেলিত নিগৃহীত মানুষগণ? তাঁরা হাততালি দেন, আনন্দ দেয়ার জন্য নাচেন এবং গান গেয়ে  যান। আবার কাঁদতে কাঁদতে মনের দুঃখ মেটানোর জন্যে গেয়ে উঠেন, 
"পাঠালেন যে নিয়তি 
তাঁর কাছে এই মিনতি, 
এই জীবন আর আমি চাইনা। 
জীবন মানেই তো যন্ত্রণা 
বেঁচে থাকতে বোধ হয় শেষ হবে না।"

প্রিয় পাঠক, তাঁদের জীবনকে কি আমরা আনন্দঘন করতে পারিনা? 

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম
প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
মৌলানা আছাদ আলী ডিগ্রী কলেজ,
মাধবপুর, হবিগঞ্জ।   
      

user
user
Ad
Ad