`

সন্তান সন্তুতি আল্লাহর দেয়া আমানত

  • Views: 654
  • Share:
জানুয়ারী ১৮, ২০২১ ০৯:২৭ Asia/Dhaka

মোঃ আবদুল গনী শিব্বীর:: মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নারী ও পুরুষের স্বামী স্ত্রী সুলভ আচরণের মাধ্যমে মুলতঃ মানব সন্তানের জন্ম প্রক্রিয়ার কার্যক্রম সুচারুরূপে সম্পাদন করেন। প্রত্যেকটি মানব সন্তান পিতার ঔরস ও মায়ের উদর থেকে জন্মগ্রহণ করে। তাবৎ পৃথিবীতে মানব জাতির বংশবিস্তারের এ ধারা চিরকালীন চলমান প্রক্রিয়া।

মহান আল্লাহ বলেন,  ‘হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আতœীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। (সুরা নিসা: আয়াত: ০১)। 

তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের থেকে তোমাদের স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রী থেকে পুত্র প্রোপৌত্র সৃষ্টি করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে ভাল রিজিকের ব্যবস্থা করছেন। (সূরা: আননাহল : আয়াত: ৭২)। সমাজ জীবনে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ প্রত্যেকটি দম্পতি চায় তাদের জীবনে ভালোবাসার ফল তথা সুস্থ সবল সন্তান। 

যুগে যুগে নবী রাসুল ও মনীষীসহ সকল মানুষ সন্তানের জন্য মহান প্রভুর নিকট কতই না আরাধনা করেছিলেন, বিশেষকরে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) সন্তানের জন্য মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলেছিলেন ‘হে আমার পরওয়ারদেগার! আমাকে এক সৎপুত্র দান কর। সুতরাং আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দান করলাম। (সুরা সাফফাত: আয়াত: ১০০, ১০১)।

মহান আল্লাহপাক আপন অনুগ্রহ ও স্বীয় ইচ্ছায় যাঁকে পছন্দ করেন কেবল তাকেই সন্তান সন্তুতি দান করেন। পিতা মাতার স্বপ্নের ধন, কলিজার টুকরো সন্তান সন্তুতি মুলতঃ পিতামাতার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি আমানত। সন্তান সন্তুতিদের যেন আল্লাহর বিধান অনুযায়ী লালন পালন করে, আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে এ নির্দেশনা সকল পিতামাতার প্রতি। এ প্রসঙ্গে ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেন, ‘শিশু হচ্ছে মা-বাবার নিকট আল্লাহ প্রদত্ত একটি আমানত। তার পবিত্র আত্মা এখন যেকোনো ছবি ও অঙ্কন থেকে মুক্ত। নির্মল ও উৎকৃষ্ট একটি ও অঙ্কনযোগ্য একটি উর্বরভূমি। সেখানে যা অংকিত হবে তাই সে গ্রহণ করবে। যেদিকে তাকে আকৃষ্ট করানো হবে সেদিকেই সে ধাবমান হবে। 

এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) এর একটি হাদীস বেশ প্রণিধানযোগ্য তা হলো, হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার মাতাপিতা তাকে ইয়াহুদী বা খৃষ্টান অথবা অগ্নি উপাসকরূপে রূপান্তরিত করে। যেমন চতুষ্পদ  জন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয়। তোমরা কি তাকে [জন্মগত] কানকাটা দেখেছ? [বুখারী, হাদীস নং-১৩৮৫]

আল্লাহ প্রদত্ত আমানত তথা সন্তান সন্তুতিদের প্রয়োজনীয় আদব কায়দা ও উত্তম শিক্ষা দানের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন হাদীসে অসংখ্য স্থানে বর্ণনা এসেছে। হাদিস শরিফে রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের উত্তমরূপে জ্ঞান দান করো, কেননা তারা তোমাদের পরবর্তী যুগের জন্য সৃষ্ট (মুসলিম)। হাদিস শরিফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সন্তানের বয়স সাত বছর হলে নামাজ শিক্ষা দাও! ও বয়স দশ বছর হলে নামাজের জন্য তাকে প্রহার কর।’ (মিশকাত শরীফ) ।

হজরত কাতাদাহ (রাযি.) বলেন, ‘অভিভাবক তাদের রক্ষা করবে, তাদের আল্লাহআনুগত্যের নির্দেশ করবে, তার নাফরমানি থেকে নিবৃত করবে এবং আল্লাহনির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব নেবে, আল্লাহর আদেশ পালনের নির্দেশ প্রদান ও তাতে সহযোগিতা করবে। যখনই আল্লাহর কোনো নাফরমানি গোচরে আসবে তাদের তা হতে ফিরিয়ে রাখবে।’ অভিভাবকদের লক্ষ্য করে ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘তাদের সৎ কাজের আদেশ কর, অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখ আর অযথা কাজে ছেড়ে দিও না। তাহলে কিয়ামত দিবসে অগ্নি তাদের গ্রাস করে ফেলবে।’ শিশুকালের পর কিশোর বয়স থেকেই তাকে নামাজের পাবন্দ করাও।

আল্লাহর দেয়া আমানত সন্তানদেরকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করা, আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার প্রচেষ্টার ব্যাপারে প্রত্যেক পিতামাতা ও অভিভাবককে আল্লাহর কাছে অবশ্যই জবাবদিহী করতে হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদিস শরীফে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্বাধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, রাষ্ট্রনেতা তার প্রজাদের সম্পর্কে দায়িত্বশীল আর তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ লোক তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন মহিলা তার স্বামীর ঘরের সার্বিক ব্যাপারে দায়িত্বশীলা, তাকে সেটার পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পরিচারক তার মালিকের সম্পদের সংরক্ষক, আর তাকে সেটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এক কথায় তোমরা সবাই দায়িত্বশীল আর সবাই জিজ্ঞাসিত হবে সে দায়িত্ব সম্পর্কে”। (সহীহ বুখারী : ৭১৩৮; সহীহ মুসলিম: ১৭০৫)। 

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে দায়িত্বশীল  পিতামাতা ও অভিভাবক হিসেবে আল্লাহ প্রদত্ত আমানত তথা সন্তান সন্তুতিদের  সকল প্রকার অবক্ষয় থেকে রক্ষা এবং উত্তম মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন।

লেখকঃ প্রভাষক,  নোয়াখালী কারামাতিয়া কামিল মাদরাসা, সদর, নোয়াখালী।

user
user
Ad
Ad