`

শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙ্গেই পড়েছে সরকারিকৃত ৩০৫টি কলেজের!

  • Views: 7192
  • Share:
জানুয়ারী ১৫, ২০২১ ১৯:৫২ Asia/Dhaka

মোঃ আজিজুর রহমান:: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষা জননী, জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেন স্বল্প খরচে লেখাপড়া শিখতে পারে সেজন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি করে স্কুল ও একটি করে কলেজ সরকারিকরণের উদ্যোগ নেন। ২০১৬ সালের জুন মাস থেকে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিগত ৪ বছরে এসব প্রতিষ্ঠান হতে অনেক শিক্ষক অবসরে গিয়েছেন অথবা মৃত্যুজনিত কারণে পদ শূন্য হলে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যাচ্ছেনা। এমতাবস্থায় শিক্ষক সংকটের কারণে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে শিক্ষাব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে।

ক্যাডার-ননক্যাডার দ্বন্দ্বঃ
লৌহমানবী প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের উদ্যোগ নিলে মাধ্যমিক পর্যায়ের কোন শিক্ষকই এর বিরোধিতা করেননি। যদিও মাধ্যমিক লেভেলের সম্মানিত শিক্ষকগণ সরকারিভাবে প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষায় সফলতার সহিত উত্তীর্ণ হয়েছেন।প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে সেদিন বিরোধিতায় করেছিলেন কিছু শিক্ষা ক্যাডারের ভাইয়েরা। ফলশ্রুতিতে জনসভা, মানববন্ধন, টকশোতে প্রতিবাদ সর্বোপরি নানা ধরনের আল্টিমেটামে পিছিয়ে যায় কলেজ সরকারিকরণ প্রক্রিয়া। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে তাদের এ আন্দোলন ছিল বেআইনি। অতঃপর রচিত হয় ২০১৮বিধি।

একই রঙের টিশার্ট পরে দর্শনীয় আন্দোলন  প্রদর্শনঃ
No BCS No Cadre আন্দোলন শিরোনামে টি-শার্টে No BCS, No Cadre লিখে সেদিনের দর্শনীয় আন্দোলন প্রদর্শন জাতি আজ ভাল করেই অনুধাবন করতে পেরেছে। সেদিন তারা মূলত বেসরকারি শিক্ষাকে অবজ্ঞা করেননি, অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন সমস্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে! সরকারিকরণের কাজের ধীরগতির ফলে জাতি আজ টের পাচ্ছে এই এই দর্শনীয় আআন্দোলন প্রদর্শন করার অর্থ কি ছিল!

কলেজ জিও জারি:
২০১৮ সালের ৮ আগষ্ট কলেজগুলোর জিও জারি হয়। এরপর চলছে ধারাবাহিক নাটক। প্রথমে মাউশিতে শিক্ষক-কর্মচারীদের মূলকাগজ পত্র দেখার মধ্য দিয়েই শুরু হয় ধারাবাহিক নাটক। এই নাটক কত পর্বের আত্তীকৃত শিক্ষক সমাজ আজও জানতে পারেনি!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাদার অব হিউম্যানিটি যিনি দেশের উন্নয়নমূলক বক্তৃতা প্রায়ই বলেন, "আমি প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কলেজ সরকারি করে দিয়েছি"।  কিন্তু দুঃখের বিষয় ৪ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এর কোন সুফলই পাচ্ছেন না। আমার মনে হয় একটি গোষ্ঠী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আত্তীকৃত শিক্ষকদের ব্যাপারে ভুল বোঝাচ্ছেন। এই বাংলায় জননেত্রী শেখ হাসিনার বিরোধিতা করার সাহস একমাত্র দেখিয়েছেন বিসিএস শিক্ষা সমিতি কতিপয় কর্মকর্তা! যারা বিসিএস সমিতির ব্যানারে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন তাদের রাজনৈতিক পরিচয় সবার কাছেই এখন পরিষ্কার।

দাও ফিরে সে অরণ্য লও হে নগর। যদি আমলাতন্ত্র এতই শক্তিশালী হয়, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা যদি একটি হিংসুটে  মহলের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়ে, নয় মাসের কষ্টার্জিত রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে অর্জিত দেশ যদি সবার ন্যায্য অধিকার দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আমাদের প্রয়োজন নেই এই সরকারিকরণের নামে কুতকুত খেলার।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পাবার পর শিক্ষক সমাজ একবুক আশা নিয়ে জীবন সাজানোর স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষাব্রতে নিজেদের নিয়োজিত করেছিলেন। শিক্ষক সমাজ ভেবেছিল ঘুণধরা শিক্ষাব্যবস্থাকে নিজের সন্তানের মতো সাজিয়ে তিনি নতুন রূপ দিবেন।

কিন্তু সদ্য সরকারিকৃত কলেজের জনবল মনে করেন তিনি জননেত্রী শেখ হাসিনার এই মিশন বাস্তবায়নে ক্যাডারদের শিখানো কথাই বারবার ব্যক্ত করছেন। তিনি একটি ভার্চুয়াল মিটিংয়ে বলেছেন শিক্ষকদের আত্তীকরণের ব্যাপারটা বেশ জঠিল! তিনি নাকি তা দেখেছেন। 

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী যত জঠিলই হোক না কেন ৪ টি সার্টিফিকেট আর ৪ পৃষ্ঠার রেজুলেশন মিলিয়ে ১০ প্রস্থ কাগজ দেখতে ৪ বছর লেগে যাওয়ার কথা নয়। তাই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, শিক্ষা ক্যাডারগণ আপনার আপন ভাই আর আমরা আপনার সৎভাই কী ?

ননএমপিও শিক্ষকদের অন্তর্দহন:
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ক্ষুধার জ্বালা বড়ই অদ্ভুত। ছাত্রজীবনের একদিনের উপোস থাকার কথা মনে করে দেখুন। তাহলে অনুধাবন করতে পারবেন ক্ষুধার জ্বালা কি ভীষণ পীড়া দেয়। কলেজগুলো সরকারি হওয়ার পর থেকেই ননএমপিও শিক্ষকদের জীবনে নেমে আসে গভীর অন্ধকার। এরই সাথে করোনার করাল গ্রাস। পৃথিবীতে এমন কোন দেশ আছে কি যেই দেশে সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জনকারী একটি ছেলে-মেয়ে দেশ ও জাতির সেবা করে অভুক্ত থাকে? আমার মনে হয় কেবল বাংলাদেশেই এই ব্যবস্থা দিনের পর দিন প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সদ্য সরকারিকৃত কলেজের ননএমপিও শিক্ষকেরা যখন তাদের প্রাপ্য সম্মানীটুকু চায় তখন কলেজ তহবিলে অর্থ থাকে না। মূলত এসব কলেজে রয়েছে নীলকরদের রেখে যাওয়া কিছু প্রেতাত্মা। আমার প্রশ্ন ফান্ড নেই এমন অযুহাতধারী কলেজগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে টিউশন ফি নিচ্ছে তা কোথায় যাচ্ছে? সরকারিকরণ যদি দেরি হয় তাহলে ননএমপিওদের বেতনের ব্যবস্থা করে দিন।

মাউশির কলেজ পরিচালক স্যার ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির প্রতিবেদনে বলেছিলেন ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে সরকারিকৃত ১৫ হাজার কলেজ শিক্ষকের সরকারিকরণের কাজ শুরু হবে। কিন্তু আদৌ কি তা সম্ভব হয়েছে?
কাজের কাজ কিছু না শুধু কালক্ষেপণ এর সূত্র আবিষ্কার!

 কালক্ষেপণ এর সূত্রগুলো নিম্নরূপঃ

  •  সমন্বিত পদসৃজন।
  •  ৪ টি বড় কলেজকে মডেল ধরে কাজ সম্পাদন।
  •  ক,খ ও গ ছকে শিক্ষকগণের তথ্যাদি প্রেরণ।
  •  বার কোড থাকা স্বত্ত্বেও নিবন্ধন সনদের যাছাই প্রত্যয়ন।
  •  ফাইল দেখে অযাচিত মন্তব্য করা।

কালক্ষেপণ আর নয়, ধীরে ধীরে পুঞ্জিভূত হচ্ছে সদ্য সরকারিকৃত কলেজের শিক্ষকদের ক্ষোভ। পুঞ্জিভূত ক্ষোভ যেকোন মহূর্তে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। যা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য কাম্য হতে পারে না।

সরকারিকৃত কলেজের জনবল অতিদ্রুত এডহক নিয়োগে বিদ্যমান জটিলতা নিরসনে সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। সদ্য সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকগণ তাকিয়ে আছেন মানবতার মায়ের একটি নির্বাহী আদেশের দিকে।আমাদের বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী আদেশ ছাড়া এই সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়।

সরকারিকৃত কলেজের জনবল দ্রুত এডহক নিয়োগে বিদ্যমান জটিলতা নিরসনে সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। সদ্য সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকগণ তাকিয়ে আছেন মানবতার মায়ের একটি নির্বাহী আদেশের দিকে।আমাদের বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী আদেশ ছাড়া এই সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়।

অতএব আগামী মার্চ ২০২১ এর আগে তথা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আগে সরকারিকরণ কাজে বিদ্যমান জটিলতা নিরসন করে যাতে সদ্য সরকারি কলেজগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীবৃন্দ এডহক নিয়োগসহ আর্থিক সুবিধা পেতে পারে তার সুব্যবস্থা করার জন্য  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রীর নিকট সকল শিক্ষক-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বিনীত অনুরোধ করছি। 

লেখকঃ 
মোঃ আজিজুর রহমান  
শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক, 
বাংলাদেশ সরকারি কলেজ শিক্ষক পরিষদ ( বাসকশিপ)  কেন্দ্রীয় কমিটি।

user
user
Ad
Ad