`

প্রসঙ্গ: বেসরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স

  • Views: 4403
  • Share:
জানুয়ারী ৭, ২০২১ ১৩:৩৭ Asia/Dhaka

মুজম্মিল আলী:: সম্প্রতি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রি বলেছেন, বেসরকারি কলেজ থেকে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স উঠিয়ে দেবেন। এটি কেমন কথা ? উচ্চ শিক্ষার দ্বার যেখানে প্রশস্ত করে দেবার কথা, সেখানে সংকোচিত করার মানে কী ? আজ থেকে আটাশ বছর আগে দেশের বেসরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালু করার অনুমতি দিয়ে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন পূরণের যে সিঁড়িটি তৈরি করে দেয়া হয়েছিল, আজ এতদিন পর সেটি ভেঙ্গে ফেলার মানে কী ? দেশের কয়েকশ' বেসরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্সের কয়েক হাজার শিক্ষক আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন ? তারা বিধি মোতাবেক নিয়োগ পেয়েছেন। সরকারের নিয়ম নীতি মেনে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজি হয়েছেন।

আজ প্রায় আড়াই যুগ ধরে বিনা বেতনে শিক্ষকতা করছেন। তাদের বেতন দিতে না পেরে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স বন্ধ করে দেয়ার কোন মানে হয় না। বেসরকারি এসব কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালু হবার কারণে কত দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন, তার হিসেব কি কেউ রেখেছেন ? এক সময় কেবল জেলা শহরের সরকারি কলেজেগুলোতে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স থাকায়, টাকার অভাবে সেখানে গিয়ে অনেকে লেখাপড়া করতে পারে নাই। আবার সীমিত আসনের কারণে অনেকে টাকা পয়সা থাকলেও ভর্তি হতে পারে নাই। ফলে অনেকের উচ্চ শিক্ষার আশা অংকুরে বিনষ্ট হয়েছে।

বেসরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালু হবার কারণে মফস্বলের অনেক কলেজে উচ্চ শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানেরা পর্যন্ত উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারছে। ধনী-গরীব নির্বিশেষে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করতে পারছে। দেশে উচ্চ শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে গৌরবের বিষয়।

অনেকে মনে করতে পারেন, তাতে দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এটি অন্য কথা। এর জন্য অনার্স-মাস্টার্স কোর্স খোলা কলেজ কিংবা এর শিক্ষকেরা দায়ী নন। এর দায় সরকার ও রাষ্ট্রের। এর দায় আমাদের সকলের। উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সংকোচিত করে উচ্চ শিক্ষিত বেকার সমস্যার সমাধান করা বা উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা হ্রাস করার চিন্তা করা সমীচিন নয়। এ জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মাথায় রোগ হলে সেটি কেটে ফেলে রোগ সারাবার চিন্তা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি উচ্চ শিক্ষিত বেকার সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে বেসরকারি কলেজ থেকে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স উঠিয়ে দেয়া উচিত নয়। দেশে সাড়ে তিনশ'র মত বেসরকারি কলেজে প্রায় পাঁচ হাজার অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক আছেন। তারা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সম্প্রতি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রির কথায় তারা খুবই হতাশ হয়েছেন। মনে কষ্ট ধারণ করে তারা আন্দোলন-সংগ্রামের পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছেন।

সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সরকার ও রাষ্ট্রের গুরু দায়িত্ব। শিক্ষার দ্বার সংকোচিত নয়, প্রশস্ত করাই আমাদের কাম্য। আজ যদি শুধুমাত্র শিক্ষকদের বেতন দিতে না পারার কারণে বেসরকারি কলেজ থেকে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স উঠিয়ে দেয়া হয় তবে সেটি একটি আত্মঘাতি কাজ হবে। কোন সচেতন মানুষ সেটি মেনে নিতে চাইবে না। আমরা যারা শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট আছি, তারা সেটি কখনো মেনে নিতে পারি না। বেসরকারি কলেজ বেশিরভাগ মফস্বল এলাকায় অবস্থিত। এসব কলেজে প্রধানত গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক পরিবারের সন্তানেরা লেখাপড়া করে। তাই, এসব কলেজ থেকে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স উঠিয়ে দেয়া প্রান্তিক ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে দেবার সমান হবে। 'সবার জন্য শিক্ষা'-এই স্লোগানের পরিপন্থি কাজ হবে। 

দয়া করে এ কাজটি করবেন না। এটি দেশ ও জাতির জন্য মোটেও কল্যাণকর হবে না। বেসরকারি কলেজে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চলমান রেখে বিধিমত নিয়োগ দেয়া শিক্ষকদের অবিলম্বে এমপিও দেবার অনুরোধ জানিয়ে আজ এখানেই শেষ করছি।

লেখক
অধ্যক্ষ, মুজম্মিল আলী 
চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ
কানাইঘাট, সিলেট।

 

user
user
Ad
Ad