`

আমার বাবাঃ অনুভূতি ও ভালোবাসা

  • Views: 5851
  • Share:
জানুয়ারী ১, ২০২১ ২০:৩৮ Asia/Dhaka

ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস সোহেল:: আমি দুই সন্তানের জনক। করোনাকালীন ভয়াবহতায় প্রায় সবটুকু সময় নীড়ে থেকেই আশা আকাঙ্ক্ষা এবং আশংকায় দিনাতিপাত করছি। প্রতিটি মুহূর্ত নিজের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ব্যাপারে চিন্তা না করে সবটুকু ভালোবাসা, আশা এবং প্রত্যাশা সন্তানকে ঘিরে আবর্তিত করে থাকি। একজন মানুষ বাবা না হলে এ শব্দের সার্বিক মমার্থ অনুধাবন করতে পারে না বা পারার কথা নয় যা আজ আমি বাবা হিসেবে অনুভব করছি। কারণ বাবা হলেন নির্ভরতা, আশা এবং প্রত্যাশার প্রতীক যাকে ঘিরেই সন্তানের যাপিত জীবন ।

পৃথিবীতে যাদের সন্তান নেই সেইসব দম্পতি যেমন অনুভব করতে পারে সন্তানের প্রয়োজনীয়তা এবং যার কারনে সারাজীবন তাদের মাঝে হাহাকার দেখা যায়, ঠিক তেমনি যাদের বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন সেইসব বাবাহারা সন্তানরা ও মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে থাকে বাবার অনুপস্থিতি। সংসার পরিচালনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমঝোতা, ঐক্য, ভালবাসা প্রতিটি অধ্যায়ে বাবার অনুপস্থিতি দৃশ্যমান।

আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা এ কথাটি প্রায় প্রতিটি সন্তানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। প্রত্যেক সন্তানের-ই- বাবাকে ঘিরে নানা রকমের সুখ স্মৃতি রয়েছে যা আউড়িয়ে সামনের দিনগুলো অতিবাহিত করার রসদ পায়। আমার বাবাকে ঘিরে ও রয়েছে অসংখ্য স্মৃতি- বাবার ব্যক্তিত্ব, সময় জ্ঞান, প্রতিবেশীর প্রতি ভালোবাসা, আত্মীয়তার সম্পর্ক মজবুত করার প্রানান্তর প্রচেষ্টা, শিক্ষানুরাগী, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানসিকতা, অসাম্প্রদায়িক চিন্তাশক্তি, সাদাসিধে জীবন যাপনে অভ্যস্ত এবং আর্থিক অনটনের মাঝে ও অগ্রসর হওয়ার সক্রিয় মানসিকতা আমাকে সামাজিক মানুষের গুনাবলী অর্জনের ক্ষেত্রে আলোকবর্তিকা হিসেবে উপাদেয় সরবরাহ করে থাকে ।

শিক্ষা ব্যতীত কোন সমাজ, ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের পক্ষেই উন্নয়ন,মনন, উৎকর্ষতা এবং উজ্জ্বলতা অর্জন প্রায় অসম্ভব কারণ বিদ্যা এমন একটি ধন যা ইচ্ছে করলেই ভাগাভাগি করা যায় না। আমরা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, আমার বাবা স্বল্প বেতনের সরকারি চাকরিজীবী, গ্রামের হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আমরা ছয় ভাই আমাদের  কোন বোন ছিল না, আমার অবস্থান চতুর্থ। একটি জিনিস প্রায়শই খেয়াল করতাম উনি নিজের আরাম-আয়েশ, সুখ এবং  স্বপ্নের কথা না ভেবে সর্বদাই আমাদের কথা ভাবতেন। যারই ফলাফল হলো, আজ আমার বাবার সব সন্তান ই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ-বিদেশে সুনামের সাথে কর্মময় জীবন যাপন করছেন। অথচ উনার সমসাময়িক অনেকের সন্তানরা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বিকশিত হতে পারেনি, এমনকি গ্রামের অনেক ধনীর দুলালরা ও ঠিক মতো মানুষ হতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রতি তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ পায়। আমার বাবা প্রায়ই বলতেন লেখাপড়া না হলে কি করে জীবন চালাবা? আমাদের পড়ালেখা ও সংসার চালানোর জন্য কৃষি জমি বন্ধক, বিক্রি এমনকি মায়ের গহনা বন্ধক ও বিক্রিতে  কার্পণ্য করেননি। শিক্ষার প্রতি দরদের অনেক উদাহরণ উনার মৃত্যুর পর এলাকার সচেতন অভিভাবকদের স্মৃতিচারণমূলক কথামালায় উঠে এসেছে। আমাদের এলাকায় যেসব ছেলেমেয়ে মেধাবী অথচ সংসারের  টানাটুনি এবং সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ালেখা থমকে যাওয়ার উপক্রম এসব মেধাবী ও অভিভাবকদের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে সামনে যাওয়ার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন  যা অনেক মেধাবী তরুণ এবং অভিভাবক আমাদেরকে বাবার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রায়ই বলে থাকেন।  এমন বাবার সন্তান হতে পেরে নিজেকে অনেক সম্মানিত ও গর্বিত লাগে।

মানুষ হিসেবে  বাবার জুড়ি মেলা ভার।  বাবা সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের সাথে মিশতে এবং  কথা বলতে ভালোবাসতেন। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস নেয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সমাজ-রাষ্ট্র পরিবারকে নিয়ে ভাবতেন। বাবার আরেকটা অনুকরণীয় গুন ছিল আমাদের এলাকায় কর্ম ক্ষেত্রে যেসব উচ্চ শিক্ষিত চাকুরিজীবি ডাক্তার,ব্যাংকার এবং শিক্ষকদের আগমন ঘটতো খুব  অল্পসময়েই তাদের আপনজনে পরিনত হতে পারতেন। বাবার সুবাদেই সেইসব মানুষদের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটতো। বাবার জীবদ্দশায় আমাদের এলাকায় চাকরিসূত্রে অবস্থানরত কেউ বলতে পারবেন না যে তাদের পায়ের ধূলো  আমাদের বাড়িতে পড়েনি।আব্বা আমাদের শিক্ষক, মসজিদের ইমাম এবং  মক্তবের হুজুরদেরকে খুবই ভালবাসতেন। বাড়িতে ভালো খাবারের আয়োজন হলে মেহমানসমেত  খেতে পছন্দ করতেন। ভোগবাদী চিন্তাচেতনা এবং  ব্যক্তিকেন্দ্রিক আরাম-আয়েশের কারনে যা আজ আমাদের সমাজ থেকে বিলুপ্ত হতে চলেছে।

ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে আমাদের গ্রামের সাথে সড়ক পথ ও নৌপথে কয়েকটা উপজেলার সংযোগ ছিল এবং আমাদের বাজারে রবিবার ও বুধবার হাট বসত। ছেলেবেলায় দেখতাম মানুষজন অনেক দূর-দূরান্ত থেকে হাটে আসত এমন কি ঢাকা, বি বাড়িয়া এবং সিলেট থেকে ও অনেকে আমাদের গ্রামের রাস্তা ব্যবহার করে গন্তব্যে যেত। আমাদের গ্রামের পর সড়কপথে পায়ে হেঁটে অথবা পালকিতে চড়ে মানুষজন নানা দিকে যাওয়া-আসা করত। নিরাপত্তাজনিত কারণে সন্ধ্যার পর আগুন্তক পথিকরা আমাদের গ্রামের পর বিস্তৃর্ণ দিগন্ত এবং নির্জন পথ পায়ে হেঁটে যেতে ভয় পেত এমতাবস্থায় প্রায়ই দেখতাম অপরিচিত, অনাত্মীয়  এমনকি দূরসম্পর্কের অনেক আত্মীয় রাত্রিবেলায় বাবার গরীবালয়ে আতিথেয়তা গ্রহণ করে সকাল বেলা গন্তব্যে রওয়ানা দিত। যদিও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতিতে এসব এখন অতীত।

বাবা- চাচারা দুই ভাই ছিলেন। দুই জনই সরকারি চাকরি করতেন। আমার বাবা বড় ছিলেন উনার মানসিকতা, বড়মন এবং  দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নানা অভাব-অভিযোগ টানাপোড়েন এবং শত সমস্যার মাঝে ও পরিবারের সংহতি ও ঐক্য আনয়নে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন যা আজ গ্রাম বাংলায় বিরল। এক্ষেত্রে আমার চাচা যাকে আমরা ছোট আব্বা বলে ডাকতাম উনার অবদান ও কম নয়। তাই তো দেখতাম আমার মা-চাচীরা এ বাড়ির বউ নয় যেন দুই বোন হিসেবে বসবাস করতেন।ভাতিজা-ভাতিজিদের প্রতি তাঁর  সমান দরদ ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকাংশে দেখা যেত নিজের সন্তানের চেয়েও  তাদেরকে বেশি প্রাধান্য দিতেন।

১৯৯৮ সালের পনেরো সেপ্টেম্বর সারাদেশে যখন  বন্যা এমন সময় আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের অভিভাবক আমার চাচার মৃত্যু হয়। ইতিমধ্যে আমার তিন ভাই যথাক্রমে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে কর্মক্ষেত্রে সমাসীন। তখন আমার বড় চাচাতো ভাই এসএসসি পাস ও করেনি, এমতাবস্থায় আমার বাবা প্রায়ই বলতেন ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া এবং প্রতিষ্ঠার পেছনে যদি আমরা মনোনিবেশ করি তাতেই তিনি  অনেক খুশি হবেন যতটা না খুশি হবেন উনার প্রতি খেয়াল নেয়ার মাধ্যমে। যার কারণে আমার চাচাতো ভাই বোনদের পড়ালেখা এবং বিয়ে-শাদীতে এবং সব বিষয়ে সরব উপস্থিতি থেকে এমন একটা আবহ তৈরি হয়েছিল  গ্রাম, সমাজ-প্রতিবেশী  অনেকেই আমাদের মাঝে  সম্পর্কের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারত না। চাচাতো ভাই বোনদের সাথে আমাদের সম্পর্ক  আপন ভাই বোনের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না, যা এখনও আছে। আমরা কখন ও চাচাতো ভাই বোন এবং নিজের ভাইয়ের মাঝে ফারাক অনুভব করিনি যা আজও বর্তমান। পরিবারের আকার ও পরিধির বিস্তৃতি হয়েছে তথাপি ও মননে, আবেগে, আন্তরিকতায়, ভালবাসায়, স্নেহ এবং  শ্রদ্ধাবোধ আজো আমাদের মাঝে পূর্বের ন্যায় বিরাজমান।

আমার বাবা ছিলেন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক। ধর্মীয় আবেশে মানুষজনের সাথে বিভাজনে বিশ্বাস করতেন না। অবশ্য আমাদের পরিবারে উত্তরাধিকার সূত্রেই এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাবের উদাহরণ পাওয়া যায়। আমার দাদাও শিক্ষক ছিলেন যদিও দাদাকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। গ্রামের মুরুব্বিদের জবানীতে ও তাঁর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ এবং হ্রদ্যতাপূর্ন সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়। বাবার সাথে ও সনাতন ধর্মের মানুষজনের ভালোবাসা ও আন্তরিকতার উপস্থিতি দেখতে পাই। আজ ও বাবার বন্ধু  আমেরিকা থেকে দেশে আসলে আমাদের বাড়িতে ঢু-মারেন এবং  উনার সন্তানেরা ও আসেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং দুরালাপনীর মাধ্যমে পরিবারের সবার খোঁজ খবর রাখেন  যার নিয়ামক শক্তি হল আমার বাবার অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ ও পরমতসহিষ্ণু মনোভাব।

কর্মজীবনেও আমার বাবা ভালোবাসা ও আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন।চাকরিসূত্রে যেসব এলাকায় গমন করেছেন সেখানকার মানুষজনের সাথে মৃত্যু অবধি সম্পর্ক রেখেছিলেন যা বর্তমান সময়েও বিরল। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে আল্লাহ ও পছন্দ করেন না  এ সম্পর্ক দৃঢ়করনে বাবা সদা সচেষ্ট ছিলেন। নিয়ম করে সবার সাথে যোগাযোগ করা, কারো অসুস্থতার খবরে পাশে দাঁড়ানো, প্রজন্মের সন্তানদের লেখাপড়ার খোঁজ নেওয়া এবং স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখানো এসব  ক্ষেত্রে বাবা পথ প্রদর্শকের  ভূমিকায় ছিলেন।মামা, খালারা যে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আব্বার প্রতি আস্থা রাখতেন।এবং তিনিও আমাদের  মামাতো- খালাতো ভাই-বোনদের পড়াশোনা, চাকরি,ব্যবসা এবং বিয়ে শাদীর ব্যাপারে  মূখ্য  ভূমিকা পালনে পিছু হটতেননা। এমনকি চাচার শ্বশুরবাড়ির মানুষজনের বিষয়ে ও সমান যত্নশীল ছিলেন।

সাতাশে জুলাই ২০১০ সালের শবে বরাতের রাত্রিতে আমার বাবা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে যান। সেদিন থেকে আমরা বাবাহারা কিন্তু বাবার রেখে যাওয়া সততা, ব্যক্তিত্ব, সাদাসিধে জীবনযাপন, সমাজ সচেতনাবোধ, মানুষের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব, শিক্ষার প্রতি দরদ ও ভালোবাসা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মন-মানসিকতা, আত্মীয়তার প্রতি সৌজন্যতাবোধ প্রদর্শন, পরিবারের আর্থিক অভাব-অনটন মোকাবেলা করার হিম্মত, সমাজে ছোটদের স্নেহ ও বড়দের শ্রদ্ধা করার অনুশীলন প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে আগাতে অনুপ্রেরণা যোগায়। কায়মনোবাক্যে কামনা করি বাবা যেন পরপারের স্রস্টার সান্নিধ্য লাভের মাধ্যমে জান্নাতুল ফেরদৌসে সমাসীন হোন।

লেখকঃ
 ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস সোহেল,
 শিক্ষক,গবেষক ও কলামিস্ট, 
সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সিলেট।

ড. শামীম আহসান সম্পাদিত, মা ও শিশু বান্ধব সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত "বাবা" শীর্ষক বই থেকে সংকলিত। ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা সম্পাদক ও প্রকাশককে।

user
user
Ad
Ad