`

প্রসঙ্গঃছেলে না মেয়ে

  • Views: 1808
  • Share:
ডিসেম্বার ২৯, ২০২০ ১৯:৫৩ Asia/Dhaka

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম :: মানবশিশু প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর পরিবার গঠন করে। পিতা-মাতা হতে চায়। এটি একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক প্রবণতা। মাতা-পিতা না হতে পারাটা অনেকের কাছে দুঃখ ও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাতৃগর্ভে আসার পর জানতে ইচ্ছে করে সম্ভাব্য শিশুটি ছেলে না মেয়ে হবে। এই জানতে চাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে ছেলে হবে কিনা জানতে চাওয়াটা অনৈতিক ও অস্বাভাবিক।

পৃথিবীর যে সব অঞ্চল পুরুষ শাসিত সে সব অঞ্চলের পরিবারে অনাগত সদস্যটি ছেলে বা পুরুষ হয়ে আসুক সেটিই কাম্য থাকে। বিশেষ করে বাবা চান অনাগত বাচ্চাটি যেন ছেলেই হয়। এর পেছনে কাজ করে পুরুষতন্ত্র। কাজ করে দরিদ্র পরিবারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং শিশুটি বড় হয়ে পরিবারের অর্থের বা আয়ের হাল ধরবে এই আশা। 

দেখা যায় মেয়ে শিশু জন্মের পর আরেকটি মেয়ে শিশু জন্ম নিল। এ নিয়ে স্বামী - স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। স্বামী তার স্ত্রীকে দায়ী করেন। কিন্তু স্বামী বা স্ত্রী কেউই জানেন না যে সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে বিষয়টি নির্ভর করে শুধুমাত্র স্বামীর উপর। এতে স্ত্রীর কোনো ভূমিকা নেই। তারপর স্ত্রীর উপর নেমে আসে লাঞ্ছনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্যাতন। এমনকি তালাকের ঘটনাও ঘটে। 

আসা যাক কেন ছেলে বা মেয়ের প্রয়োজনঃ

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পরিবার গঠনের পর সন্তান-সন্ততি হওয়াটা একটি স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক ঘটনা। শিশু জন্ম নিলে মা-বাবার মনে একটা অনাবিল এবং অব্যক্ত সুখ নেমে আসে। যে সুখকে ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। সন্তান-সন্ততি পরিবারে বা ঘরে থাকলে যে সুন্দর এবং উপভোগ্য পরিবেশ মাতা-পিতার জন্য সৃষ্টি হয় তাও ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় হবু পিতার অবচেতন মনে বিরাজ করে ছেলে শিশু। তবে সব পিতার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না। যে পিতার মনে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নাই তাঁর কাছে ছেলে বা মেয়েতে কোনো পার্থক্য থাকে না।

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় বা বিজ্ঞানের যুগে ছেলে বা মেয়ে সমান অবদান রাখতে পারে। বিমান চালনা, সশস্ত্র বাহিনী বা মহাকাশ অভিযানে মেয়েরা ভূমিকা রেখে চলেছেন। সুতরাং মেয়ে হয়েছে বলে, সে শুধু ঘরে বসে থাকার প্রাণীতে পরিণত হবে এমন ভাবাটা এখন হাস্যকর। এই হাস্যকর বিষয়টিই পুরুষতান্ত্রিক পিতারা বুঝতে পারছেন না। আমি তাঁদের যথাযথ সম্মান করি। আমি তাঁদের অশ্রদ্ধা করছি না। কারণ তাঁরা বিষয়টি বুঝতে পারছেন না। তাঁদের যদি বিষয়টি পরিষ্কার করে বুঝানো যায় বা বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝানো যায় তবে নিশ্চয়ই তাঁরা বলবেন যে, মেয়ে শিশু থাকলে কোনো অসুবিধা নেই। মেয়ে শিশুটি বড় হবার পর বিয়ে দিলে অন্যের বাড়ি চলে যায়। এটি একটি ভাবনার বিষয় তাঁদের কাছে। এজন্যে তাঁরা মেয়ে শিশুকে বড় করতে গিয়ে ব্যয়বহুল পড়াশোনা করাতে চান না। তাদের পেছনে টাকা-পয়সা খরচ করতে চান না। ছেলে শিশুকে অনেক অর্থ খরচ করে পড়াতে চান। কিন্তু ছেলে শিশু কি বড় হয়ে বাড়িতেই বসে থাকে? সে তো আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়াতে পাড়ি জমায়। তাহলে দেখা গেলো যে শেষ পর্যন্ত ছেলেও ঘরে থাকেনা এবং মেয়েও ঘরে থাকেনা। সুতরাং সবাই সমান।

এছাড়া সন্তান-সন্ততি কামনার উদ্দেশ্যই ছিল মানবজীবন পরিপূর্ণ করা। ছেলে-মেয়ের আয় রোজগার ভোগ করার জন্যে নয়। তাই ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, সুস্থ এবং স্বাভাবিক বাচ্চা হলেই হলো। যদি-স্বাভাবিক না হয়? তাহলে কি ফেলে দিতে পারব? যদি ছেলেও না মেয়েও না, তৃতীয় লিঙ্গের হয় তাহলে কি অস্বীকার করতে পারবো? সম্ভব নয়। পিতা-মাতার পক্ষে এধরনের বাচ্চাকেও ফেলে দেয়া সম্ভব নয়। তাই বাচ্চা মেয়ে না ছেলে সেটি মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো বাচ্চাটিকে আমরা ঠিকভাবে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলতে পারছি কিনা। মানুষ করতে পারলে মেয়ে শিশুরা মানব সেবায় বা পৃথিবীর সেবায় ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে অনাগত শিশুটি কন্যা হলে ভ্রুণ হত্যা করা হয়। বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত,  অনৈতিক এবং অমানবিক। এমনটি চলতে থাকলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হবে এবং মানবজাতি হুমকির সম্মুখীন হবে। কন্যাশিশুর প্রতি আরেকটি বঞ্চনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। বিয়ে দেয়ার পর এদের পৈতৃক সম্পত্তি বন্টনের বিষয়টি আসে। সম্পত্তির উপর পিতার একচ্ছত্র অধিকার আছে। সে ক্ষেত্রে পিতা (সব পিতা নন) সম্পত্তি বন্টনের আগেই সম্পত্তির  কিছু অংশ ছেলেদের স্থায়ী ভাবে দিয়ে দেন। যাতে বিবাহিত মেয়েরা মোট সম্পত্তি থেকে কম অংশ পায়।     পিতার অবর্তমানে ভাইয়েরাও (সব ভাই নন) তাঁদের বিবাহিত বোনদের উপযুক্ত পৈতৃক সম্পত্তি প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করেন। যে পরিবারে এমন ধরনের ঘটনা ঘটে সে পরিবারের পিতা ক্ষেত্রবিশেষে মাতাও  সঠিক কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হন। এছাড়া পিতা-মাতার যে বিশ্বজনীন মর্যাদা রয়েছে সে মর্যাদা থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হন। আর মেয়েদের মনে পিতার প্রতি চরম অশ্রদ্ধা সৃষ্টি হয়। পিতা পরিণত হন একজন অমানবিক ব্যক্তি হিসেবে। যা কখনো কাম্য হতে পারেনা।

পরিশেষে বলতে হয় যে, সভ্য সমাজ ব্যবস্থায় ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে বর্ণিত বৈষম্য আর কতদিন চলবে? এর পরিসমাপ্তি কি আবশ্যক নয়?  

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম
প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ 
মৌলানা আছাদ আলী ডিগ্রী কলেজ
উপজেলা - মাধবপুর, জেলা - হবিগঞ্জ। 

user
user
Ad
Ad