`

প্লিজ, হাত বাড়ান

  • Views: 6226
  • Share:
নভেম্বার ২৯, ২০২০ ০০:২০ Asia/Dhaka

ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস সোহেল:: কয়দিন ধরে মনটা ভাল নেই, যার চাপ শরীর-মন এবং চারিপাশে বিস্তৃত। জাগতিক নানাবিধ পরিকল্পনা ও চিন্তা আমার স্বাভাবিক সত্ত্বার সাথে বেমানান লাগছে। অনেক বিষয়াদির মেকি আবরণ দেখে মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলছি। ভাবছি, মানব সৃষ্টির স্বার্থকতা কোথায়? যেখানে প্রতিনিয়ত লোভ-লালসা, সংকীর্ণতা, হীনমন্যতা এবং দাম্ভিকতার কাছে বনি আদম অসহায়।

গত কয়দিন ধরে ভাবছিলাম দায়বদ্ধতা এবং আবেগের কারণে আমার প্রিয় অনুজ যে কিনা মরণব্যাধি ঘাতকের সাথে নিয়ত সংগ্রাম করে বাঁচার আকুতি ও আশায় দিনাতিপাত করছে তাকে নিয়ে কিছু লিখবো। কিন্তু আয়করের হিসাব এবং জমাদানের রজনী ফুরিয়ে আসার কারণে এক্ষেত্রে সময় দেয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি।

এখন আমি আমার প্রিয় বিভাগের  নিজ  কামরায় বসে ভাবছি, কেন আমরা এত স্বার্থপর? সামাজিক জীব হিসেবে দায় বদ্ধতা ও দয়া কি পৃথিবী থেকে উঠে গেছে? কলম হাতে নিলাম, লিখতে কষ্ট হচ্ছে। এ বিষয়ে লেখার তো কথা ছিল না।

আমার ছাত্র ইশতিয়াক সিফাত যে কিনা সোনালী স্বপ্নের জাল বুনতে ২০০৯-২০১০ সেশনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম পরিবারের আঙ্গিনায় পা রেখেছিল। অন্তর্মুখী এবং শান্ত স্বভাবের ছেলেটি, যার ধ্যান জ্ঞান জুড়ে অধ্যবসায়ের বিকল্প কিছু ছিলনা।  ফলতঃ পুরস্কারস্বরূপ ৩৫ তম বিসিএস-এ সমাজসেবা অফিসার হিসাবে নিযুক্তি লাভ করে। বয়সই বা কত হবে, বড়জোর আটাশ কিংবা ঊনত্রিশ। সবে তরুণ, যার চোখ মুখ অবয়বে সামনে যাওয়ার হাতছানি। যবে, সমাজ-পরিবার ও ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের দায়ভার থেকে  মুক্তির পথে হাঁটি হাঁটি পা পা করে কদম ফেলছিল।তখনই কিনা মরণব্যাধি কোলন ক্যান্সার তাকে আক্রমণ করে বসলো। একজন পিতা যেমন সন্তানের সাফল্যে আনন্দাশ্রু ফেলে এবং কষ্টে দারুণভাবে কাতর হয়, তেমনি শিক্ষক হিসেবে ও তরতাজা স্বপ্নবাজ সামনে যাওয়ার পথ যার শুরু এরকম ছাত্রের এহেন ব্যাধির কথা শুনে স্থির থাকা যায় না।অন্তত আমি পারিনা। যার কারণে দুটো ফোরামে তার জন্য কিছু করা যায় কিনা আকুতি জানিয়েছিলাম, এমনকি সাম্প্রতিক দায়িত্বভার হস্তান্তরের সভায় ও নিরবে  এবং প্রকাশ্যে ইশতিয়াক এর জন্য কিছু করতে না পারার অতৃপ্তির খেদের কথা বলেছিলাম এবং ভাবছিলাম।

তরুণ সদ্যবিবাহিত এ ছাত্রের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তার পরিবার শেষ সম্বলটুকু ও শেষ করে ফেলেছে। তার চিকিৎসার জন্য আরও অনেক অর্থের প্রয়োজন। উন্নত চিকিৎসার নিমিত্তে হয়তোবা বিদেশে ও যাওয়া লাগতে পারে।আমরা কি অনুজ প্রিয় যুবকের পাশে দাঁড়াবো না? সর্বদা কি নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকবো? তার চিকিৎসার পর্যাপ্ত টাকার যোগান না দিতে পারার দায় কি এড়াতে পারবো? ইতিমধ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তর সমাজকর্ম বিভাগ এবং অ্যালামনাই এসোসিয়েশন নানাভাবে সাহায্যের হাত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এবং কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। আশাবাদী আমরা কিছু করতে পারবো।

সামাজিক মানুষ হিসেবে,ইশতিয়াকের পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়, বিলম্ব করার সুযোগ নেই। আল্লাহর রহমতে আমরা তো ভালো আছি এর জন্য শুকরিয়া স্বরূপ সবাই যদি সামান্য সাহায্যের হাত বাড়াই তাহলে হয়তোবা  বিনা চিকিৎসায় তাকে মৃত্যুর দিকে যেতে হবেনা। হায়াত মউত সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নির্ধারিত।তবে চেষ্টা তো করতে পারি।

প্লিজ, আসুন না সমাজের বিবেকবান মানুষ হিসেবে এ মেধাবী কর্মকর্তা এবং ছাত্রের চিকিৎসার তহবিলে হাত বাড়াই। আপনাদের সামান্য ভালোবাসা ও সহানুভূতিতেই বেঁচে যেতে পারে ইশতিয়াক এবং স্বপ্ন দেখতে পারে তার পরিবার ও সমাজ। অতীতে আপনাদের সহানুভূতি, আবেগ, আমরা মনোভাব এবং মানবিক অনুভূতির উপস্থিতিতে অনেক প্রাণ ই পৃথিবীর আলোতে বড় হয়েছিল। আজও তার শিক্ষক হিসেবে সবার কাছে বিনীত নিবেদন করি, আমরা যদি সামান্য কৃচ্ছতা সাধন করে, দৈনন্দিন খরচ কম করে, ভোগ বিলাসিতা এমনকি মৌলিক চাহিদার জায়গাতে ও যদি একটু ত্যাগি হই তাহলে এ তহবিল গঠন শুধু সময়ের ব্যাপার।  ছোট ছোট ভালোবাসা ই সমুদ্রে পরিনত হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সে আমাদের মাঝে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার রসদ পাবে। 

আসুন আমরা এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভালো লাগার জায়গাটুকু সমৃদ্ধ করি এবং সিফাতকে জানিয়ে দেই তুমি একা নও আমরা ও তোমার সাথে আছি। বিশ্বাস এবং আশা এ যাত্রায় মানবতার জয় হবেই।

লেখকঃ ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস সোহেল
শিক্ষক ও কলামিস্ট, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। 
ইমেইল: alioakkas@gmail.com.



user
user
Ad
Ad