স্মৃতির আলপনায় সোনালী শৈশব
মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল :: ঢাকা মিরপুর ১৩ নাম্বার থেকেই শুরু সেই বাল্যকালে বাবাকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ ছন্নছাড়া জীবনের বাকি শৈশব আমার কেটেছে নিজের গ্রামে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়ন।
বাড়ির পাশের পুকুর, আর আমাদের গ্রামের বুক চিরে বয়েচলা স্রোতস্বিনী সেই নদীতে দৌড়-ঝাপ দিয়ে। মেঠো পথের ধূলু বালি মেখে, বর্ষার কাঁদাপানিতে ভিজে, মাঠভরা আষাঢ়ের বৃষ্টির পানিতে ফুটবল খেলে, শীতের কুয়াশায় ভোরের শিশির ভেজা দুব্বা ঘাস মাড়িয়ে আনন্দ উপভোগে। দুব্বা ঘাসে বড় বড় শিশির ফোটায় হানা দিয়ে পা ভিজিয়ে আনন্দ উল্লাসে কত খেলা করেছি !!মধুময় সেই শৈশবে।
আমার এখনো মনে পড়ে পুকুর পারের সেই জারুল গাছের কথা ।ফাল্গুনে বেগুনি রঙ্গের ফুলে নববধূর অপরূপ সাজে সজতো পুকুর পারের সেই জারুল গাছ। চৈত্রের খরায় ঝরে পড়া জারুল গাছের শুকনো পাতায় নগ্ন পায়ে হেঁটে চলার অসাধারন এক অনুভূতি!!!
জারুলের শুকনো পাতার ঝন ঝনানি তরঙ্গ শুনলে মনে হতো বাসুরিয়া তার বাঁশির সুরে গান ধরেছে। শৈশবে শীতের সকালে ভোরের আলো ফোটার আগে মক্তবে যাওয়া ছিলো বেশ বিরক্তের ।
মক্তবের পড়া ফাঁকি দিয়ে পাখির বাসা খুঁজাখুঁজি, দোয়েল পাখির ডিম সংগ্রহ করা, চড়ুই পাখির ছানা ধরা, বাড়ী উঠোনের কোনায় রান্না বাড়ি খেলা করে চাচাতো ভাই বোননদের সাথে কলা পাতা দিয়ে ঘর বানিয়ে সংসার গড়ে তোলা। কতবার যে সংসার পেতেছি অবুঝ সময়ের বাল্যকালে ।
চাচাতো ভাই বোনদের সাথে মারামারি ঝগড়া-ঝাটি,পাড়ার বন্ধুদের সাথে মিলেমিশে সময় বেশ আনন্দেই কেটে যেত। আমাদের শৈশবে প্রতিবছর ভুলাভুলি নামে প্রতিটি গ্রামে একটি আনন্দ উৎসব পালন করা হতো। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম ভূলবুলি নামক উৎসবের জন্য।
সম্ভবত ভাদ্র মাসের কোন এক সময় দিন তারিখটা মনে নেই, কিন্তু প্রতিবছর এই তারিখটা আমাদের আগে থেকেই স্মরণ রাখতে হতো, যাতে করে দিনটা বেশ আনন্দে কাটানো যায় । সেই দিন আসার আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে নিয়ে রাখতাম । এই উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল কলা গাছের ডালি আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় কলাগাছের ডালি কে কলার বাউঘড়া বলা হয়। কলার বাউঘড়া দিয়ে প্রতিবেশী ভাবী এবং দাদিদেরকে ঐদিন ইচ্ছামত পেটানো হত !!!
ভোলাবুলির দিন আমাদের পাড়ার দাদিরাও আক্রমনাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে রাখতেন। দাদিদের হাতের অনেক পিটুনি খেয়েছি আমি আমার শৈশবে। ভোলাবুলি উৎসবের আরেকটি আকর্ষণ ছিল টুপা টুপি। শুদ্ধ ভাষায় এটাকে বলা হয় চুড়ুইভাতি।
আমাদের ইউনিয়নের বাজারে শনি এবং মঙ্গলবারে বড় হাট বসতো। দূরদূরান্ত থেকে ব্যাপক মানুষের উপস্থিতি থাকতো। দূরদূরান্তের কৃষকরা তাদের ফসলি জমির তরিতরকারির পসরা নিয়ে বসতেন আমাদের আজিম গঞ্জ বাজারে। এককালে এই বাজারের অনেক নামডাক ছিল। এখনো অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় যে, আমাদের ইউনিয়নকে দূর-দূরান্তের মানুষ আমাদের বাজারের নাম আজিম বলে পরিচিত করা হয়।
ভোলাবুলির মাসখানেক আগ থেকে দূরদূরান্তের কুমারেরা মাটির আসবাবপত্র নিয়ে আসতেন আমাদের বাজারে মাটির আসবাবপত্রের মধ্যে আমাদের মূল আকর্ষণ ছিল মাটি দিয়ে বানানো ছোট ছোট ঘটি বা পাত্র। ভোলাবুলির কয়েকদিন আগে থেকে আমরা বাড়ির ভাইবোন মিলে টাকা জমিয়ে রাখতাম ঘটি কেনার জন্য।
উৎসবের দিন সকলে মিলে চাল ডাল তরীতরকারি জোগাড় করে বাড়ির আঙ্গিনায় মাটি খুঁড়ে চুলা বানিয়ে, কুমারের কাছ থেকে কিনে আনা মাটির ঘটিতে আমরা রান্নাবাড়া করতাম।
প্রিয় পাঠক আপনাদেরকে বলে বুঝাতে পারব না ছোটবেলার সেই ঘটিতে রান্না করা খাবারের স্বাদ মনে হলে আজও আমার জিভে জল এসে যায়। পরিপক্ক এই বয়সে এসে ছোটবেলার সেই ঘঠিতে বানানো খাবার স্বাদ আমি আজ পর্যন্ত কোথাও সেই স্বাদ পাই নাই।
খুব মনে পড়ে আমাদের গ্রামের সেই কাঁঠাল গাছ তলায় পাড়ার ছেলেরা বসে খুনসুটি ঝগড়াটে গল্প করে সময় কাটানোর কথা! আমাদের গ্রামের সেই কাঁঠাল গাছ তলা -বলতে পারেন আমাদের গ্রামের জাতীয় সংসদ। গ্রামের বাদ -প্রতিবাদ গল্প-গুজব, মান-অভিমান এই গাছ গাছতলা থেকে শুরু হতো।
গ্রামের খালি মাঠে ক্রিকেট, ফুটবল খেলে জীবনের অধিকাংশ সময় গ্রামের মাঠের ধুলূ-বালিতে খেলাধুলা করে বড় হয়েছি।কত হাসাহাসি, বন্ধুদের সাথে মারামারি, কত খুনসুটি স্মৃতি ময় দিন পাড়ি দিয়ে জীবনের খাতা থেকে হারিয়ে গেছে কত বসন্ত।
গ্রামের সেই বিশেষ জায়গাটির সামনে দাঁড়িয়ে খুঁজে ফিরি আমার হাফপ্যান্ট পরা প্রিয় শৈশব।
ছোটবেলায় মক্তবের পড়া আমাদের গৃহশিক্ষকের হাত ধরেই শুরু । গৃহ শিক্ষক হুজুরের নাম ছিল সবুর মেয়াছাব। আঞ্চলিক ভাষায় হুজুরকে আমরা মেয়াছাব বলে সম্বোধন করতাম।
মেয়াছাবের কাছে পড়তে বসলে জীবনের সমস্ত ঘুম যেন আমাকে চেপে বসতো। ঘুমের বাহানা করে পড়ার টেবিলে না বসার দুরন্ত কৌশল করেও হুজুরের কাছে ব্যর্থ হতাম।
বুকের বেতরে যত ফন্দি আছে সব ফন্দি ফিকির এনেও আমাদের হুজুরে কাছ থেকে রক্ষা পেতাম না। হুজুর আমার চাইতেও তিন চামছ চালাক ছিলেন।
ঘুম পেয়েছে বললে, হুজুর কস্কো সাবান আর এক বদনা পানি হাতে দিয়ে বলতেন যা ভালো করে ছোঁখে সাবান দিয়ে মুখ ধুয়ে আয়! আর প্রতিদিন দোয়া করতাম হুজুরের শরীর খারাপ হয় না কেন।
মনে মনে বলতাম হুজুরের পাতলা পায়খানা হলে বেশ ভালোই হত। ডিসেন্ট্রি মানে পাতলা পায়খানা,পাতলা পায়খানার ওপর হুজুর কিছুটা দুর্বল ছিলেন। হুজুরের গোপন দুর্বলতা জেনেও শৈশবে আমার কোনো লাভ হয়নি। তখন পাতলা পায়খানাকেও গালি দিতাম মনে মনে। বলতাম মরার ডিসেন্ট্রি দুনিয়ার কত মানুষরে তুমি কাবু করেছ,ঈদ পার্বণে আমাদের হুজুরকে একটা দিনও কাবু করতে পারলি না!!!
আমাদের হুজুরও বড় শক্ত কটকটা মানুষ ছিলেন। আমার জীবনে কখনো দেখিনি হুজুরের অসুখ হতে। মন খুলে দোয়া করতাম হুজুরে শরীর খারাপ হলে কিছুদিন হলেও প্রানভরে খেলাদুলা করতে পারতাম। রাতের বেলা আমাদের গল্প গুজব নিয়ে হুজুরের হস্তক্ষেপও ছিল। পড়া ছুটি দিয়ে হুজুর বলতেন খাওয়া-দাওয়া করে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে। রাতে ঘরে গিয়ে গল্পগুজব করারাও কোনো উপায় ছিল না।
পড়া শেষ করে গল্পগুজব করলেই পরেরদিন হুজুরের হাতে মার খেতে হত। হুজুর রাতে আমাদেরকে ছুটি দিয়ে। আমাদের একান্নবর্তী বাড়ির পিছনে আড়ি পেতে শুনছেন। কোন কারণে আমাদের গলার সাউন্ড শুনলে পরের দিন রাতে আরো দেরি করে ছুটি দিতেন। শৈশবে মক্তবের লেখাপড়া অনেক যন্ত্রণার ছিল । এবং বিরক্তেরও বটে!!
আজ এই বয়েসে এসে হুজুরের সেই কটুর শাসন শ্রদ্ধাধার সাথে স্মরণ করে হুজুরে জন্য প্রাণ ভরে দোয়া করি । খুব মনে পড়ে শৈশব জীবনের সেই বালুকা বেলার অসম্ভব দুরন্তপনার কথা । মনে এখনও প্রশ্ন জাগে, আজকের শিশুরাও কিভাবে সময় পার করতেছে? এখন আর হয়তো আগের দুরন্তপনার নেই, সবাই মোবাইল ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত। ভালো থাকুক সকল বাল্যবন্ধু ও গ্রামের লোকজন। মনে পড়ে বারবার, ইচ্ছে হয় আবার মিশে যেতে সেই মাঠের সাথে , যেখানে কেটেছে আমার শৈশব।
কুয়েত থেকে
মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল
- সিলেটের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল দ্রুত চালু করে ১২শ শয্যায় উন্নীত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
- পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে MS3 টেকনোলজি বিডি পরিবারের ঈদ শুভেচ্ছা
- এবার এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানে ইরানি আঘাত
- শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে ইরানের মোকাবিলা সম্ভব নয়: মুজতাবা খামেনেয়ী
- ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিণতির বিষয়ে রাশিয়ার হুঁশিয়ারি
- একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
- রমজান মাসই বন্ধ থাকছে মাধ্যমিকসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
- মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য, বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ: আইন উপদেষ্টা
- যুদ্ধ, বিভাজন ও অনিশ্চয়তা: বহুমুখী সংকটে ইসরায়েল
- পুরো রমজান মাসে হাইস্কুল বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ
- হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন তারেক রহমান
- বিজেপি-আরএসএসের বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় উইকিপিডিয়া
- আসামে তীব্র শীতের মধ্যেই ১৫০০ মুসলিম পরিবারের ঘর গুঁড়িয়ে দিল ভারত
- নুতন বই পেয়ে উচ্ছাসিত রাঙামাটির শিক্ষার্থীরা
- সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছেছে খালেদা জিয়ার মরদেহ
- আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই
- শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান
- জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানিয়ে নাহিদকে এনসিপির ৩০ নেতার চিঠি
- পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরশাসনের পতন
- তারেক রহমানের বহনকারী প্লেন নামল সিলেটে

