`

এরপর এসএসসি পরীক্ষার কী হবে ?

  • Views: 4045
  • Share:
অক্টোবার ২৪, ২০২০ ১৯:১৬ Asia/Dhaka

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী:: করোনা মহামারির কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত কেবল কওমি মাদরাসা ছাড়া দেশের অন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। করোনার শুরুতে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ন্যায় কওমি মাদরাসা বন্ধ থাকলেও দু'-তিন মাস যেতে না যেতে খুলে দেয়া হয়। ইতিমধ্যে এবারের এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। সেটি গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিলো। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা এইচএসসির ফল প্রাপ্য হবে বলে জানানো হয়েছে।

মাধ্যমিক স্তরে বার্ষিক পরীক্ষা হবে না বলে গত বুধবার মাননীয় শিক্ষামন্ত্রি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। ৩০ দিনের একটি সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের আলোকে এসাইনমেন্টের ভিত্তিতে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের উপরের শ্রেণিতে প্রমোশনের সুযোগ অবারিত করে দেয়া হয়েছে। এটিকে নির্দ্ধিধায় অটোপাস বলা যায়। 

প্রশ্ন জাগে, এই মুহূর্তে কী অটোপাস দেয়া একান্ত অপরিহার্য ছিলো? অটোপাস আমাদের আগামী দিনের শিক্ষায় কি রকম নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে?-এ জাতীয় প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা আজ খুব প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষটি যথা সময়ে শুরু করার জন্য সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসেও করোনা বিদায় না হলে, সেটি কী করে সম্ভব হবে ? চলতি শিক্ষাবর্ষটি আরো দু'-চার মাস বাড়ালে এমন কী ক্ষতি হতো ? চার মাস বর্ধিত করলে আগামী চার বছর এক মাস এক মাস করে বাড়িয়ে সেটি কাভার দেয়া যেতো। 

আমাদের এক সময় সেশন জট ছিলো। এক বছরের পরীক্ষা তিন বছর পরে অনুষ্ঠিত হতো। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সেশন জট একটি স্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো। স্কুল পর্যায়ে অবশ্য সেটি ছিলো না। করোনার কারণে সেশন জট দেখা দিলেও পরীক্ষা অনুষ্ঠানের জন্য আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করা উচিত ছিলো।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব জনিত কারণে দীর্ঘ প্রায় সাত মাস আগে সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। দু'-তিন মাস যেতে না যেতে প্রথমে হিফজ মাদরাসা এবং এরপর অন্য সব কওমি মাদরাসা যথারীতি খুলে দেয়া হয়। এখন মাদরাসাগুলো পুরোদমে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে এসব মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাবার কোনো খবর শুনতে পাইনি। 

মাদরাসাগুলো খুলে দেবার সময় পরীক্ষামুলক ভাবে খুলে দেবার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া যেতে পারতো। তারপর অনুসন্ধান করে জানা যেতে পারতো যে, সেগুলো খুলে দেবার কারণে করোনা সংক্রমনের উপর কোনরূপ প্রভাব পড়েছে কীনা? এ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলার বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা যেতো। কওমি মাদরাসাগুলোতে এখন স্বাস্থ্যবিধি কতটুক মানা হয়, সে আমাদের সকলের জানা। পর্যায়ক্রমে নয়, সব মাদরাসা তো এক সাথেই খুলে দেয়া হয়েছে। এর ফলে করোনা সংক্রমনের ক্ষেত্রে কোনো বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি। বড় বড় কওমি মাদরাসায় আবাসিক ব্যবস্থা চালু আছে। এসব হোস্টেলে শিক্ষার্থীরা কলেজ কিংবা ভার্সিটির হোস্টলের চেয়ে বেশি গাদাগাদি করে থেকে থাকে। তাতেও করোনার কোনো ভয়াবহতা পরিদৃষ্ট হয়নি। তাহলে স্কুল-কলেজ স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যায়ক্রমে খুলে দিয়ে এতোদিনে আতংক কেটে উঠে আমরা সংক্ষিপ্ত সিলেবাস করে কিংবা শিক্ষাবর্ষ বাড়িয়ে হলেও পরীক্ষা আয়োজন করতে পারতাম। 

অটোপাস দেবার চিন্তাটি এতো তাড়াতাড়ি আমাদের মাথায় আসতো না। অটোপাস আমাদের শিক্ষায় যে দীর্ঘমেয়াদী একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। এসাইনমেন্ট করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা 'ওপেন বুক' সিস্টেমের সাথে বহুল পরিচিত হবে। সেটি আমাদের দেশে আশি-নব্বই'র দশকে পরীক্ষায় নকল প্রবণতা কিংবা বইয়ের পাতা ছিঁড়ে পরীক্ষার হলে নিয়ে যাবার আশংকা বাড়িয়ে দিবেনা তো ? আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বর্তমান সময়ের ন্যায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিলো। লেখাপড়া মোটেও হয়নি। তাই ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত পরীক্ষাগুলোতে তেমন কড়াকড়ি ছিলো না। এরপর থেকেই আস্তে আস্তে পরীক্ষা ব্যবস্থা নানা ভাবে কলুষিত হতে থাকে। পরীক্ষায় নকলের অবাধ অনুপ্রবেশ ঘটে। গত শতাব্দীর শেষের দিকে এমনও হয়েছে যে, পরীক্ষা শেষে প্রতিদিন কেন্দ্রের চারপাশ থেকে কয়েক বস্তা নকল জমিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হতো। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় সৃজমশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু করে 'নকল' নামক দুর্ণামের হাত থেকে আমাদের শিক্ষাকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে বটে। কিন্তু, শিক্ষার মান এখন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা পুরো সিলেবাস শেষ করেছে। প্রি-টেস্ট, টেস্ট সবই দিয়েছে। ফরম ফিলাপ করেছে। পরীক্ষার সব আয়োজন শেষ হয়েছিলো। আরো কিছুদিন অপেক্ষা করা যেতো। মুল বিষয়গুলোর সীমিত আকারে একটি পরীক্ষা নেয়া যেতো। তা না করে এসব পরীক্ষার্থীদের ঘাড়ে 'অটোপাস'-র দুর্ণামটি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। সারা জীবন এই দুর্ণাম তাদের বয়ে বেড়াতে হবে। তাছাড়া এই অটোপাস উচ্চ শিক্ষায় ভর্তিসহ শিক্ষাক্ষেত্রে নানা সংকট সৃষ্টি করবে। পরবর্তি জীবনে কর্মক্ষেত্রে এসব শিক্ষার্থী অবহেলার শিকার হবে। ডিসেম্বরে এইচএসসি'র ফল দেয়া হবে। একান্তই পরীক্ষা নিতে না পারলে ফল রেডি করে এক সপ্তাহ আগে পরীক্ষা না নেবার বিষয়টি জানানো যেতো। এতো আগেভাগে জানাবার কী এমন প্রয়োজন ছিলো? 

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি পরীক্ষা নির্ভর। শিক্ষার্থীরা মুলতঃ পরীক্ষা পাশের জন্যই পড়াশুনা করে। অভিভাবকেরা যে কোনো মুল্যে সন্তানের জন্য পরীক্ষায় ভালো একটি ফল পেতে চান। শিক্ষকেরাও শতভাগ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাশ করানোর জন্য প্রাণান্ত চেষ্ঠা করে থাকেন। শিক্ষাবোর্ডগুলোর মধ্যে পরীক্ষায় পাশের হার বৃদ্ধির এক অশুভ প্রতিযোগিতা বরাবর পরিলক্ষিত হয়। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ভালো ফলের চেয়ে ভালো মানুষ করে গড়ে তোলার প্রয়াস কোথাও নেই। আমাদের শিক্ষায় একজন শিক্ষার্থী কতটুকু শিখতে পেরেছে, তা যাচাই করার জন্য পরীক্ষার চেয়ে উত্তম কোনো ব্যবস্থা নেই। পরীক্ষা পদ্ধতিটি সেই বহুদিন আগের ন্যায় এখনো চলমান।

পৃথিবীর বহু দেশে পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার সাধিত হলেও আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের উদ্যোগ নেই। মুল্যায়নের জন্য পরীক্ষার বিকল্প পদ্ধতি খুঁজে নিতে হবে। আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা আয়োজনের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক ক্লাস টেস্ট, বিষয় ভিত্তিক মুল্যায়ন কিংবা ধারাবাহিক মুল্যায়নের উপর জোর দিতে হবে। এসব কথা অনেকদিন থেকে শুনে আসছি। বিষয় ভিত্তিক ও ধারাবাহিক মুল্যায়নের উপর শিক্ষকদের অনেক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এসবের প্রয়োগ নেই। এতোদিন থেকে এসবের চর্চা অব্যাহত থাকলে আজ করোনাকালে শিক্ষায় অটোপাসের চিন্তা করতে হতো না। বিষয়ভিত্তিক কিংবা ধারাবাহিক মুল্যায়ন চালু থাকলে তার ভিত্তিতে উপরের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করে দেয়া যেতো। 

করোনাকালে সংসদ টেলিভিশনে ক্লাস হয়েছে। যদিও সব জায়গা থেকে এই ক্লাসগুলো দেখা যায়নি। বিটিভি থেকে হলে অনেক ভালো হতো। এছাড়া বিভাগ, জেলা এমনকি কোনো কোনো জায়গায় উপজেলা পর্যায়ে অনলাইন স্কুল চালু করে ক্লাস পরিচালনা করা হয়েছে। একটা পর্যায়ে এসে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে প্রায় প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান অনলাইন শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করে দেয়। আস্তে আস্তে এক সময় সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী এর আওতায় চলে আসতে পারতেন। এখন তাড়াহুড়ো করে পরীক্ষা বাতিল ও অটোপাসের ঘোষণা দেয়ায় অনলাইন শ্রেণি কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। সংসদ টিভির ক্লাসগুলোর আর কী কোনো মুল্য রইল? অনলাইন ক্লাস চালাতে গিয়ে আমাদের শিক্ষকেরা অনেক পারদর্শি হয়ে উঠছিলেন। শিক্ষার্থীরাও আস্তে আস্তে অনলাইন ক্লাসের প্রতি ঝুঁকে পড়ছিলো। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের সুফল ঘরে তুলবার আগেই অটোপাসের ঘোষণা দেয়ায় তা মাঝপথে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবার উপক্রম হয়েছে। এখনই এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না জানিয়ে আরো পরে জানালে ভালো হতো। বার্ষিক পরীক্ষার বিষয়েও তাই। অন্তত আরো কয়েকটা দিন শিক্ষার্থীরা বই পুস্তকে লেগে থাকতো। এখন তারা বই, খাতা, কলম শিঁকেয় তুলে রেখে দিয়ে সারাদিন 'হুররে, হুররে' করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। 'ছাত্রজীবন সুখের জীবন, যদি না হয় এগজামিনেশন'-এই পরমানন্দে এখন তাদের দিন কাটে। 

করোনা মহামারির কারণে পৃথিবীর কোনো কোনো দেশে হয়তো অটোপাস দেয়া হয়েছে। তাদের মুল্যায়নের জন্য কেবল পরীক্ষার উপর নির্ভর করতে হয়না। অনেক দেশে আইসিটি ও কারিগরি ভিত্তিক শিক্ষা চালু আছে। তাদের শিক্ষায় পরীক্ষা একটি গৌণ বিষয়। পরীক্ষা ছাড়া তাদের অন্য উপায়ে মুল্যায়নের সুযোগ আছে। আমাদের তা নেই। করোনা আমাদের শিখিয়েছে, পরীক্ষা নির্ভর শিক্ষা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। মুল্যায়নের জন্য পরীক্ষার বিকল্প পদ্ধতি খুঁজে বের করতে হবে। পরীক্ষা হচ্ছে মুল্যায়নের একটি পুরনো পদ্ধতি। এর আধুনিক উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কী হবে? তাদের প্রি-টেস্টের সময় গত হয়ে গেছে। টেস্টের সময়ও পার হয়ে যাচ্ছে। এইচএসসি ও বার্ষিক পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় তারা অনেকে বেজায় খুশি। এভাবে একদিন তাদের পরীক্ষা বাতিল হয়ে পিইসি ও জেএসসি'র ফলের ভিত্তিতে তারা ঘরে বসে এসএসসি'র ফল পাবে-সেই আশায় তারা দিন গুণতে শুরু করে দিয়েছে। 'এসএসসি ব্যাচ-২১' নামে ফেসবুকে একটি গ্রুপ খুলে তারা সংগঠিত হতে শুরু করেছে। পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে এরা একদিন হয়তো মিছিল-মিটিং করবে। সভা, সমাবেশ ও মানববন্ধন করবে। হয়তো এসব কিছুই তাদের করা লাগবে না। এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা যেমন ঘরে বসে অটোপাস পেয়েছে, তারাও হয়তো একদিন তেমনি পেয়ে যাবে। সেই আশায় অনেকে বই, খাতা ও কলম শিকেঁয় তুলে রেখে দিয়েছে।

মহামারি করোনা আমাদের শিক্ষায় যে সংকট সৃষ্টি করেছে, তা কতদিনে কাটবে-সেটি বলা  কঠিন। করোনা আমাদের শিক্ষার অসহায়ত্বের দিকটি স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তুলেছে। শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার বিষয়টি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।করোনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার প্রয়াস চালাতে হবে। এবারের ন্যায় দীর্ঘ মেয়াদী কোনো দুর্যোগ বা মহামারিতে শিক্ষা যেনো আর মুখ থুবড়ে না পড়ে। মুল্যায়নের জন্য অন্য কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে আর যেন অটোপাসের দিকে অগ্রসর হতে না হয়। অটোপাস শিক্ষায় আমাদের দৈন্যতাই ফুটিয়ে তুলে। এই দৈন্যতার কারণে আমাদের শিক্ষা প্রতিবেশি দেশগুলোর চেয়েও  পিছিয়ে আছে। মুল্যায়নের জন্য পরীক্ষার বিকল্প পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী দুর্যোগ বা মহামারিতে আর যেন অটোপাসের পথে হাঁটতে না হয়।

লেখক: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট।

A complete Academic Management Software

user
user
Ad
Ad