গৃহযুদ্ধের নিষ্ঠুরতাঃ লাইবেরিয়ার অভিজ্ঞতা
কাজের সুবাদে লেখক পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ায় অবস্থান করেছিলেন। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়ারও সুযোগ হয়েছিলো সেই সুবাদে। আলোচ্য লেখাটিতে লেখক লাইবেরিয়ার রক্তক্ষয়ী আর নিষ্ঠুর গৃহযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন।
মুহম্মদ আব্দুস সামাদঃ লোফা প্রদেশ থেকে ফিল্ড ভিজিট করে রাজধানীতে ফিরছিলাম। ২০১৭ সালের কোনো একটা সময়।পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়ার একটি প্রদেশের প্রধান শহর লোফা। আমি যে সংস্থার হয়ে কাজ করি তার অনেকগুলো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় এই প্রদেশের বিভিন্ন জেলায়। বছরে দু'তিনবার কার্যক্রম পরিদর্শনে যাওয়া হতো আমার।
দীর্ঘযাত্রায় চালক আর সাথে থাকা সহকর্মীদের সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। প্রসংগান্তরে উঠে আসলো লাইবেরিয়ার দুটো রক্তক্ষয়ী আর ভয়ংকর গৃহযুদ্ধের কথা। আমি বিভিন্ন প্রদেশে আমার কর্ম এলাকাগুলোতে যেতে খুবই পছন্দ করি। সুযোগ পেলেই দূর দূরান্তে কয়েকদিনের জন্য ডুব দেই। প্রাণভরে আদিম প্রকৃতিকে অনূভব করার চেষ্টা করি। মাটির সোঁদা গন্ধ নেই। পাখ পাখালির দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকাই। নাম না জানা নানান গাছ গাছড়াকে দখি। বুনো ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকি।আর এই পরিদর্শন, ভ্রমণ আমাকে নানান নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে দেয়। নতুন নতুন তথ্য জানতে সহায়তা করে।
এখানে সড়কপথই যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম বলা চলে। আর সড়কপথ মানে কাদাময় কাঁচা রাস্তা। বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় একটানা বৃষ্টিপাত হওয়ার সুবাদে কাঁচা হাইওয়েগুলোতে কাদাপানি লেগেই থাকে। তাই এখানে সড়কপথে যাত্রা মানে দীর্ঘ সময়ের যাত্রা। কখনো কখনো রাজধানী মনরোভিয়া থেকে দূরের কোনো প্রদেশে যেতে আমার ক্ষেত্রবিশেষে ষোল ঘন্টা সময় লেগেছে। কখনো মাঝপথে একরাত্রের জন্য ট্রানজিট নিয়েছি। আবার কখনো একটানা নির্জন পথে গভীর রাতে নির্জন গহীন পাহাড়ের বুক চিরে ছুটে চলেছি।
এইরকম দীর্ঘ যাত্রাপথে আমি সাধারণত গাড়ির চালকদেরকে জাগিয়ে রাখার জন্য গল্প জুড়ে দেই। সহযাত্রী কেউ থাকলে তার সাথে নানান বিষয়ের অবতারণা করি। নতুন বিষয় সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করি। এবারের দীর্ঘ সময়ের সড়কপথের যাত্রাও তার ব্যতিক্রম ছিলো না। ফিল্ড থেকে কাজ শেষে ফিরছিলাম। দীর্ঘযাত্রায় চালক আর সাথে থাকা সহকর্মীদের সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। প্রসংগান্তরে উঠে আসলো লাইবেরিয়ার দুটো রক্তক্ষয়ী আর ভয়ংকর গৃহযুদ্ধের কথা।
গৃহযুদ্ধের আলোচনায় গাড়িতে আমার সহযাত্রী এক লাইবেরিয়ান কলিগ ডুয়েহ বলছিলো, স্মাইল অলওয়েজ! আর তা বলে হাসছিলো সে। আরেক সহকর্মী রবার্টসকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলেছিলো। রবার্টসও দেখলাম বেশ হাসছে। আমি বিষয়টির তাৎপর্য বুঝতে না পেরে জানতে চাইলাম তার হাসির কারণটি। কলিগটিকে স্মাইল অলওয়েজ এর ব্যখ্যাটা দিতেও অনুরোধ করলাম। সে যা জানালো তা শুনে রীতিমতো আঁৎকে উঠলাম আমি। আমি বুঝতে পারলাম লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে আমার আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করার জন্যই তারা এই স্মাইল অলওয়েজ সাংকেতিক কথাটি ব্যবহার করেছিলো।
লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধের প্রসংগ আসলেই পার্শ্ববর্তী দেশ সিয়ারা লিওয়নের কথা চলে আসে। লাইবেরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলরকে এই গৃহযুদ্ধের মাস্টারমাইন্ড বলা হয়। অবশ্য টেইলর সিয়েরা লিও্যনের গৃহযুদ্ধের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে সাজা খাটছেন এখন। আমার ঐ সহকর্মীটি জানালো, পার্শ্ববর্তী দেশ সিয়েরা লিওয়নের বিদ্রোহীরা গৃহযুদ্ধে মানুষকে নির্যাতনের নানাবিধ পৈশাচিক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলো। আর তার মধ্যে একটা লঘু পৈশাচিক পদ্ধতি ছিলো এই স্মাইল অলওয়েজ।
সহকর্মী রবার্টস স্মাইল অলওয়েজের ব্যাখ্যা দিলো। এই লঘু শাস্তির বর্ণনা শুনে আঁতকে উঠলাম। পৈচাশিকতা কতদুর গেলে সেটা গুরু শাস্তি হয় সেটা ভেবে আমি শিউরে উঠছিলাম। রবার্টস জানালো, গৃহযুদ্ধের সময় বিদ্রোহী যোদ্ধারা একটা বাস্কেটে কাগজের কুপনে নির্যাতনের নানা এসব পদ্ধতি লিখে ভাঁজ করে রেখে দিতো। কাউকে হত্যা বা নির্যাতনের জন্য ধরে আনলে ওখান থেকে কমান্ডার একটা কূপন তুলে ভাঁজ খুলতো। আর কুপনের লটারিতে যেটা ওঠতো সেই অনুযায়ীই ধৃত ব্যক্তির শাস্তি নির্ধারণ করা হতো।
স্মাইল অলওয়েজ হলো সব সময় হাসতে থাকার শাস্তি। একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে তো আর সবসময় হাসা সম্ভব না। পিশাচ এই মনুষ্য জীবগুলো তখন ধৃত ব্যক্তির দুই ঠোঁট একেবারে গোড়া থেকে কেটে দিত। কেটে ফেলার ফলে দাঁতগুলোকে ঢেকে থাকা এই চামড়া আর মাংসের আবরণ না থাকায় ভাগ্যাহত লোকটির দুপাটি দাঁত বেরিয়ে পড়তো। এটা দেখে হয়তো পৈশাচিক আনন্দে উন্মত্ত এই মনুষ্য জীবগুলো ভাবতো লোকটি হাসছে। তারা এই নিষ্ঠুর আনন্দ উপভোগ করতো আর তারা এটার নাম দিয়েছিলো স্মাইল অলওয়েজ!
পৈশাচিক শাস্তির আরও নানা কলাকৌশল ছিলো বিদ্রোহীদের মধ্যে। আর সেই পদ্ধতিগুলো ঝুড়িতে রাখা কূপনে লেখা থাকতো। ফুলসিভ লেখা কুপন উঠলে কবজি থেকে হাত কেটে দেয়া হতো। হাফসিভ লেখা কুপন উঠলে কনুই থেকে হাত কেটে দিত তারা। আর সিভলেস লেখা কুপন উঠলে একদম গোড়া থেকে কেটে দিত ধৃত ব্যক্তিটির হাত। পায়ের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতো মনুষ্য এই জানোয়ারগুলো। ফুলপেন্ট লেখা কুপন উঠলে গোড়ালি থেকে কেটে দিত ধৃত ব্যক্তির পা। আর শর্ট ট্রাউজার লেখা কুপন উঠলে বিদ্রোহী পিশাচগুলো হাঁটু থেকে কেটে দিতো ভাগ্যাহত ব্যক্তিটির পা।
লাইবেরিয়ার বিদ্রোহীরা অবশ্য তক্তার উপর মাথা রেখে জবাই করা পছন্দ করতো বেশি। সহকর্মী কিম্বার আর রবার্টস তাই জানালো আমাকে। তাদের কাছে জানলাম লাইবেরিয়ার এখানকার যোদ্ধারা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতো বেশ। নিশানা ঠিক করার জন্য দূরে হেঁটে যাওয়া মানুষ বা কাজে নিয়োজিত মানুষকে টার্গেট করতো বিদ্রোহীরা। হাত ঝালাই করার জন্য এটাকেই সর্বোত্তম পন্থা হিসেবেই বেছে নিয়েছিলো লাইবেরিয়ার বিদ্রোহীরা। বিদ্রোহীদের কাছে মানুষকে মানুষ বলে মনে হতো না।
অনেকে বলেন, টেইলর তার বিদ্রোহী যোদ্ধাদেরকে বø¬্যাক ম্যাজিক দিয়ে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন। ওদেরকে তিনি ম্যাজিক বলে ড্রাগন বানিয়ে ফেলেছিলেন তাই তারা এসব নৃশংস কাজ করতে পারতো। আসলে নৃশংসতাকে ঢাকার জন্য মানুষ এরকম আজগুবি নানান গল্প ফাঁদে। এগুলোর কোনো ভিত্তি আছে বলে মনে হয়না আমার। আসলে লোভ আর স্বার্থ মানুষকে অমানুষে পরিণত করে।
লাইবেরিয়ায় অনেক মানুষকে একসাথে মারার জন্য সবচেয়ে কুখ্যাত পদ্ধতি ছিলো জীবন্ত মানুষের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া। নির্বিচারে লোকজনকে ধরে এনে এক জায়গায় জড়ো করতো বিদ্রোহী যোদ্ধারা। নারী, শিশু, বৃদ্ধ কোনো বাছ বিচার ছিলো না তাদের কাছে। ধরে এনে জড়ো করা লোকজনকে পিছমোড়া করে হাত বেঁধে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিত বিদ্রোহী যোদ্ধারা। আগুনে পুড়তে থাকা জীবন্ত মানুষের আর্তনাদ শুনে পৈশাচিক আনন্দ পেত তারা।
আমি টেইলরের বাহিনী দ্বারা সংগঠিত লোফা মেসাকারের স্থানটিতে গিয়েছিলাম। চার্লস টেইলরের পেট্রিয়োটিক ফ্রন্টের যোদ্ধারা ওখানকার চারশত মুসলমানকে গায়ে আগুন ধরিয়ে জীবন্ত হত্যা করেছিলো একসাথে। এটা লোফা মেসাকার নামে পরিচিত। একটা চিহ্নিত স্থান আছে লোফা প্রদেশের প্রধান শহর ভইনজামার পাশে। জায়গাটিতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি। ঘৃণা প্রকাশ আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিই বা করার আছে এই ক্ষুদ্র আমার।
পৃথিবীর স্থানে স্থানে কোথাও ধর্মের নামে, কোথাও সুশাসন আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে আর খনিজ স¤পদের দখল নেয়ার জন্য মানুষ এধরনের হিংস্রতা করেই যাচ্ছে। আর এগুলো হচ্ছে অনেকটা রাষ্ট্রীয় মদদে। অনেকটা প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জড়িয়ে পড়ছে এসব কর্মকান্ডে তাদের অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য।
আমার কাছে সবচেয়ে নিষ্ঠুর মনে হয়েছে গর্ভবতী মহিলাদেরকে হত্যার প্রক্রিয়াটার কথা শুনে। কোনো গর্ভবতী নারী যদি বিদ্রোহী যোদ্ধাদের নজরে পড়তো তাহলে তারা বাজি ধরতো গর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে এই নিয়ে। দু’জন তর্কে লিপ্ত হতো আর শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতো যে তারা গর্ভের শিশুটিকে বের করে দেখবে আর বাজির ফয়সালা করবে। এরপর তারা গর্ভবতী নারীটির পেট চিরে সন্তানটিকে বের করে দু’জনের ধরা বাজির সিদ্ধান্ত নিতো। লাইবেরিয়ায় নাকি এটা অহরহই ঘটতো গৃহযুদ্ধের সময়টাতে। আর সেটা ঘটতো প্রকাশ্যে। কি জঘন্য আর নিষ্ঠুর!
গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে ঝুঁকিতে ছিলো নারী আর যুবকরা। কোথাও আক্রমণ করে অল্পবয়সী মেয়ে পেলে তাদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। যুবতী মেয়েদের হত্যা করা হতো না। তাদেরকে জীবিত রেখে প্রতিদিনই হত্যা করা হতো পাশবিক নির্যাতন করে। এসব যুবতীরা কমান্ডার আর বিদ্রোহী যোদ্ধাদের যৌনদাসীতে পরিণত হতো। যুবকদেরকে দেখামাত্রই হত্যা করতো বিদ্রোহীরা। তারা তাদের কোনো প্রতিদ্ব›দ্বীকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইতো না। আরেক বিদ্রোহী কমান্ডার আর বর্তমানে লাইবেরিয়ার নিম্বা প্রদেশের সিনেটর প্রিন্স জনসনের বিরুদ্ধে শত শত শিশুকে কূয়ায় ফেলে দিয়ে হত্যা করার অভিযোগ শোনা যায়।
মানুষের বুক চিরে কাঁচা কলিজা খাওয়াটা অনেক বিদ্রোহীর একটা প্রিয় কাজ ছিলো বলে শুনেছি। লাইবেরিয়ার বিদ্রোহীদের অনেকের বিশ্বাস ছিলো মানুষের কাঁচা কলিজার মধ্যে ঔষধী গুণ রয়েছে। তাদের বিশ্বাস ছিলো মানুষের কাঁচা কলিজা খেলে তাদের মধ্যে এমন এক বিশাল অজেয় শক্তি বিকশিত হবে যার ফলে বুলেটের আঘাতেও তার মৃত্যু হবে না। এরকম কাহিনী শোনাচ্ছিলো সাথে থাকা সহকর্মী বিদেস্কো।
মানুষের মাংস রান্না করে খাওয়া বিদ্রোহীদের নাকি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিলো জানালো সহকর্মী রবার্টস। মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশ এমনকি মাথাও নাকি জ্বাল দিয়ে ঝোল রান্না করে খেত বিদ্রোহী যোদ্ধারা। দেশটিতে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল যুদ্ধেও সময়। আর এই খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য সবচেয়ে সহজলভ্য ছিল মানুষের মাংস। আর এটার সংগ্রহের জন্য কোন কষ্ট করতে হত না আর অর্থ বিনিয়োগের প্রশ্নই আসে না।
লাইবেরিয়ার প্রথম গৃহযুদ্ধ হয়েছিলো ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত। এই গৃহযুদ্ধটি জাতিসংঘ আর পশ্চিম আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সহায়তা সংঘের (ইকোয়াস) হস্তক্ষেপে থামার আগ পর্যন্ত প্রায় দুইলক্ষ লোক প্রাণ হারায় লাইবেরিয়ায়।ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত আর পার্শ্ববর্তী দেশ আইভরিকোস্টে স্বেচ্ছা নির্বাসিত চার্লস টেইলর একদল বিদ্রোহী যোদ্ধাকে নিয়ে লাইবেরিয়ায় প্রবেশ করে ১৯৮৯ সালে আর গৃহযুদ্ধের সূচনা করে। তার ভাষায় অত্যাচারী প্রেসিডেন্ট স্যামুয়েল ডো'কে ক্ষমতাচ্যুত করাই ছিলো তার উদ্দেশ্য। টেইলর তার উদ্দেশ্য পূরণে সফল হয়। স্যামুয়েল ডো বিদ্রোহীদের হাতে ধৃত হয় আর পৈচাশিক পন্থায় হত্যার শিকার হয়। টেইলর প্রথম গৃহযুদ্ধ পরবর্তী নির্বাচনে লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়।
লাইবেরিয়ার দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। এই গৃহযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী গ্রুপটির নাম ছিলো “লাইবেরিয়ানস ইউনাইটেড ফর রিকনসিলিশেয়ন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি”। এই গৃহযুদ্ধের অবসান হয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। জাতিসংঘ আর ইকোয়াসের হস্তক্ষেপে একটি অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় আর গৃহযুদ্ধের অবসান হয় ২০০৩ সালে। এই যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট চার্লস টেইলরের পতন হয়। তাকে নাইজেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত টেইলর সেখানেই ছিল।
অবশ্য এর মধ্যেই ঝরে যায় প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষের প্রাণ। দশ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুহারা হয়ে আশ্রয় নেয় আশেপাশের দেশগুলোতে। শিশুদের ব্যাপকহারে ব্যবহার করা হয় এই গৃহযুদ্ধে।দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের পর গঠিত অন্তবর্তী সরকার কর্তৃক লাইবেরিয়ায় একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এক সময়ের চার্লস টেইলরের প্রবল সমর্থক আর টেইলর সরকারের কর্মকর্তা এলেন জনসন সারলিফ। তিনি নাইজেরিয়ায় নির্বাসিত চার্লস টেলরকে হস্তান্তরের আবেদন জানান। জাতিসংঘের জিম্মায় গ্রেফতার হন টেইলর। সারলিফ দুই মেয়াদে বারো বছর দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী জর্জ উইয়ার কাছে।
চার্লস টেইলর বর্তমানে যুদ্ধাপরাধের জন্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের দেয়া কারাবাসের সাজা ভোগ করছে। অবশ্য তার প্রধান সহযোগী প্রিন্স জনসন দীর্ঘদিন ধরে লাইবেরিয়ার নিম্বা প্রদেশের সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো লাইবেরিয়ার ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে টেইলরের স্ত্রী জন হাওয়ার্ড টেইলর ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে। টেইলরের বিদ্রোহী দলটির নাম ছিলো লাইবেরিয়া পেট্রিয়োটিক ফ্রন্ট।
আমার সুযোগ হয়েছে এই নির্বাচন আর ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া দেখার। তখন আমার নিয়োগকারী সংস্থার দেশ প্রধানের অন্তর্বর্তীকালীন অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলাম আমি। সংস্থাটির প্রতিনিধি হিসেবে প্রেসিডেন্ট উইয়ার শপথ গ্রহন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছিলাম।
শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও অর্জন করেন প্রেসিডেন্ট সারলিফ। লাইবেরিয়ায় সত্তর বছরের মধ্যে এই প্রথম একটি নির্বাচিত সরকার আরেকটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলো। বর্তমানে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক কৃতী ফুটবল তারকা জর্জ উইয়া।
লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রতি সতেরজনের মধ্যে একজন মারা গিয়েছিলো। দেশের এককালের মোটামুটি স্থিতিশীল অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে জিডিপি গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো মাইনাসে। এই গৃহযুদ্ধের হাওয়া গিয়ে লেগেছিলো আশেপাশের দেশগুলোতেও। এই অঞ্চলের গণতন্ত্র আর আঞ্চলিক রাজনীতিতে লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিলো।
অনেক বিশ্লেষক বলে থাকেন, এই গৃহযুদ্ধগুলোর পেছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিলো। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, অপনা মাংসে হরিণা বৈরী। সোনা আর হীরার খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ কখনোই লাইবেরিয়ার সরকার নিতে পারেনি! এইসব বিদ্রোহ, গৃহযুদ্ধের সুফল ভোগ করেছে আমেরিকান আর ইউরোপীয় বেনিয়ারা।
পৃথিবীর সকল প্রান্তে যুদ্ধ বন্ধ হউক। মানুষ হয়ে মানুষের উপর এসব বর্বতার চির অবসান হউক। সবার শুভ বুদ্ধির উদয় হউক।আমরা একটি শান্তিময় পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি।
মুহম্মদ আব্দুস সামাদ,
উন্নয়নকর্মী, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, লেখক, প্রাবন্ধিক।
[২০২০ সালের বইমেলায় প্রকাশিত লেখকের "আবাদির চোখে আফ্রিকা" বই থেকে নেয়া। আংশিক পরিমার্জিত। বইটি রকমারিতে পাওয়া যায়।]
- সিলেটের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল দ্রুত চালু করে ১২শ শয্যায় উন্নীত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
- পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে MS3 টেকনোলজি বিডি পরিবারের ঈদ শুভেচ্ছা
- এবার এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানে ইরানি আঘাত
- শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে ইরানের মোকাবিলা সম্ভব নয়: মুজতাবা খামেনেয়ী
- ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিণতির বিষয়ে রাশিয়ার হুঁশিয়ারি
- একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
- রমজান মাসই বন্ধ থাকছে মাধ্যমিকসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
- মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য, বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ: আইন উপদেষ্টা
- যুদ্ধ, বিভাজন ও অনিশ্চয়তা: বহুমুখী সংকটে ইসরায়েল
- পুরো রমজান মাসে হাইস্কুল বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ
- হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন তারেক রহমান
- বিজেপি-আরএসএসের বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় উইকিপিডিয়া
- আসামে তীব্র শীতের মধ্যেই ১৫০০ মুসলিম পরিবারের ঘর গুঁড়িয়ে দিল ভারত
- নুতন বই পেয়ে উচ্ছাসিত রাঙামাটির শিক্ষার্থীরা
- সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছেছে খালেদা জিয়ার মরদেহ
- আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই
- শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান
- জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানিয়ে নাহিদকে এনসিপির ৩০ নেতার চিঠি
- পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরশাসনের পতন
- তারেক রহমানের বহনকারী প্লেন নামল সিলেটে

