আবরার হত্যার বর্ষপূর্তিঃ ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর কোনো সংস্কার উদ্যোগ কি দৃশ্যমান?
মুহম্মদ আব্দুস সামাদ:: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার খুন হওয়ার একবছর হয়ে গেলো। তাঁর এই হত্যাকান্ডটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিলো। প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিলো। সারাদেশে তীব্র গণবিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিলো। মানুষের ক্ষোভের আগুনে পুড়েছিলো পুরো দেশ। তীব্র এই গণরোষ সামাল দিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিলো সরকারকেও।
প্রশ্ন উঠেছিলো ক্ষমতার ছত্রছায়ায় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের বেপরোয়া হয়ে উঠা নিয়ে। অবশ্য এই প্রশ্ন বহু পুরনো। যে দলই ক্ষমতায় গিয়েছে তাদের মদদে তাদের দলীয় ছাত্র সংগঠন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সেই ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিলো জিয়াউর রহমানের আমল থেকে। সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে তার তৈরি করা ছাত্র সংগঠন সারাদেশে বিকল্প সরকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলো। এরশাদ কিছুটা ব্যতিক্রম হলেও এই ধারাবাহিকতা আজও বিদ্যমান আছে।
ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিমানে সংগঠনটির এই পদ ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিছুদিন আগেও সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি-সম্পাদককে নানান অভিযোগ আর অপকর্মের কারণে একসসাথে সরিয়ে দেয়া হয়। এটা একটা নজিরবিহীন ঘটনা। এই পদক্ষেপগুলো থেকে বোঝা যায় সংগঠনটির নেতা কর্মীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের নানান অপকর্মের খবর প্রতিদিনই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসছে।
দুই.
২০১৯ সালের অক্টোবরে মেধাবী তরুণ আবরারের হত্যাকান্ডটি আমাকে ভীষণভাবে তাড়িত করেছিল। আবরারের আর্তনাদ আমার মস্তিষ্কে একটানা হাতুড়ির আঘাত দিচ্ছিলো। আবরারকে আমি একটি চিঠি লিখেছিলাম। আমার লেখা চিঠির কথাগুলো আজও প্রাসংগিক। আমার অভিযোগগুলিকে মিথ্যা প্রমাণ করার ন্যূনতম কোনো উদ্যোগ নজরে পড়েনি এই একটা বছরে। আমরা বিস্মৃতির জাতিতে পরিণত হচ্ছি দিন দিন। নতুন ঘটনার আড়ালে পূরনো এই ঘটনা বেমালুম ভুলে গেছি আমরা। চিঠিটি আংশিক পরিমার্জনা করে নিচে তুলে দিলাম।
“খুনের বিচার চাওয়া এই জনপদে একটা বিলাসিতা। আবরার তুমি মরে বেঁচে গেছ। তোমার ব্যথায় কাতর হওয়া নীলাভ দেহখানি আমাদের দীর্ঘদিনের দুঃস্বপ্নের সঙ্গী হবে। তুমি অর্ধমৃত হয়ে বেঁচে না গিয়ে বেঁচে গেছ! পঙ্গু হয়ে ধুকে ধুকে বেঁচে থাকার কষ্ট থেকে বেঁচে গেছ। সারাজীবন একটা তীব্র অপমান নিয়ে বেঁচে থাকার কষ্ট থেকে বেঁচে গেছ। বিচারহীনতা আর এরকম আরও ঘটনা দেখে কষ্টে আর অভিমানে কুঁকড়ে যাওয়া থেকে বেঁচে গেছ। এই শাপদ ভূখন্ডে প্রতিনিয়ত নিরপত্তাহীনতা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে বেঁচে থাকার কষ্ট থেকে বেঁচে গেছ।
আমরা উটপাখি হয়ে গেছি প্রিয় আবরার। আমরা অন্ধ, বধির, বোবা হয়ে বেঁচে আছি আবরার। শুধুমাত্র যখন তুমি আবরার, ত্বকী, রাজনদের মৃত্যু সামনে চলে আসে তখন কেবল আমাদের প্রতিবাদী হয়ে উঠার কথা মনে পড়ে। আমাদের বিলাসী জীবনে ছন্দপতন ঘটানো মৃত্যু ছাড়া আর কিছু দ্বারা সম্ভব নয় আবরার। তোমাকে ধন্যবাদ আমাদের বিচার চাওয়ার বিলাসিতায় অবগাহনের সুযোগ করে দিয়েছ বলে। আমরা সাময়িক এই সুখে হাবুডুবু খেতে পারছি শুধু তোমার জন্য। আর এইজন্য তোমাকে ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় স্নেহের আবরার। তুমি মরে গিয়ে সেই সুযোগ করে দিয়েছ আমাদেরকে। তুমি মহান।
একেকটা হত্যাকান্ডের পর প্রতিবাদ করার বিলাসিতায় আমরা মেতে উঠি ক্ষণিকের জন্য আবরার। সহসাই আবার আমরা ফিরে যাই আমাদের বিলাসী জীবনে। হয়তো অবচেতন মনে অপেক্ষা করতে থাকি আরেকটা ঘটনা ঘটার। কারণ আমাদের জন্য তো উপলক্ষ লাগে। আমাদেরকে উদাহরণ দিতে হয় পূর্বের ঘটনার বিহিত বা বিচার না হওয়ার।
অভিযোগ দিতে হয় আমাদেরকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে খুনিকে ধরার জন্য। বিচার বিভাগের কাছে দাবি জানাতে ন্যায় বিচারের জন্য। আর অপরাধীর বিচার করার নিশ্চয়তার জন্য দাবি জানাতে হয় খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে। ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য রাজপথে নেমে আন্দোলন করতে হয়। তোমার হত্যাকান্ডের বিচারের জন্যও আমাদেরকে তা-ই করতে হচ্ছে। কিছুদিন দাবি দাওয়া জানাই। আন্দোলন সংগ্রামে মশগুল হয়। পরক্ষণেই আবার ভুলে যাই। সবকিছু ঠিকঠাক স্বাভাবিক হয়ে যায়। অপরাদীরাও তাদে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে যায়। আবার অপেক্ষায় থাকি! আমাদেরকে আরেকটা অভিযোগ দেয়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ আবরার। তোমার মৃত্যু আমাদের দাবি জানানোর বিলাসিতা করার সুযোগ এনে দিয়েছে।
আমরা উটপাখি আবরার। আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটা প্রলয় আমরা দেখতে পাইনা। অন্যায় আর অবিচারগুলি আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলি খুলে খুলে পড়ে যাচ্ছে আর আমরা না দেখার ভান করি অথবা দেখিনা, আবরার। আমরা গা বাঁচিয়ে চলি। ভাবি, পাশের বাড়িতে আগুন লেগেছে তো আমার কি? কিন্তু নগরে আগুন লাগলে দেবালয়ও পোড়ে একথাটা আমরা ভুলে যাই।
আবরারের বাবা, আমি আজ সারাদিন আমার দুই ছেলেকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আবরারবিহীন আপনার জীবন আর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আমাকে স্পর্শ করেনা। এই হিংস্র সমাজে নিজের সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আমি শংকিত। আমি স্বার্থপর। নিজেরটা নিয়েই বেঁচে আছি। ব্যতিক্রম ঘটানোর ঝামেলায় যেতে চাইনা। শুধুমাত্র একটা লাখা লিখে প্রতিবাদ করে বিলাসি জীবনেই থেকে যাচ্ছি আমি। আপনি আমাকে করুণা করেন বা অভিশাপ দেন আমার কিচ্ছু যায় আসেনা! আমিও উটপাখি।
আবরার, তুমি ভাগ্যবান। তুমি এলিট। অভিজাত মৃত্যু তোমার। তোমাকে নিয়ে অনেক প্রতিবাদ হবে। টেলিভিশনে প্রতিবেদন হবে। তোমার মেধা নিয়ে কথা হবে। সংবাদপত্র বড় কলাম ছাপবে। একটা জিনিস অনুপস্থিত থাকবে। সেটা হলো, তোমার মতই মেধার পরীক্ষায় জিতে আসা আর একই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া একদল মানব সন্তানকে কারা অমানুষ বানালো সেই বিষয়টার আলোচনা।
আবরার, অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের দায় নিয়ে আমরা কথা বলবোনা। টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহৃত ২০১১ কক্ষটি নিয়ে প্রক্টর, প্রভোস্ট, ভিসিকে কিছুই বলবোনা আমরা। খুনিদের প্রশ্রয় দেয়া আশ্রয় দেয়া দূবৃত্তদের নিয়ে কথা বলবোনা একদম। ব্যর্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে কথা বাড়াবোনা আমরা। খুনিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কথা বলতে মানা করবো আমরা। তাদের কেবল খুনি বলে আত্মতুষ্টিতে থাকবো আমরা। প্রশ্ন তুলবোনা, পঁচে যাওয়া রাজনীতি নিয়ে যেটা এরকম খুনি পয়দা করছে। তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বড়ব বোন সনির প্রসঙ্গ এখানে আনবোনা মোটেও। বলবো বুয়েটে ঘটনাটি ঘটেছিলো তো কি হয়েছিলো? ওটার প্রেক্ষাপট তো আলাদা ছিলো। প্রলয় যে শুরু হয়েছে অনেক আগেই সেটা ঘূনাক্ষরেও বলবোনা আমরা।
আবরার, তোমার মৃত্যুর সাথে নোয়াখালীতে পুলিশ তাদের ভ্যান থেকে নামিয়ে যে যুবককে পিটিয়ে মেরে ফেলতে বলেছিলো তাকে মেলাবোনা। মাইরা হালা, মাইরা হালা বলে যেভাবে নিরীহ মানুষরা (!) তাকে পিটিয়ে মারছিলো সেই দুঃসহ স্মৃতি টেনে আনবোনা। আমরা বিলাসী। আমাদের কাছে জীবনের দাম ক্ষেত্রবিশেষে আলাদা।
আবরার, গাজীপুরের সেই ছেলেটা, যাকে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে দিয়ে আর পিটিয়ে অর্ধমৃত করে শরীরে ইট বেঁধে পানিতে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিলো তাকে আমরা এই আলোচনায় টেনে আনবোনা। তারা তাদের এই উল্লাসের ছবি ভিডিওতে ধারণ করেছিলো। তরুণটিকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পৈচাশিক আনন্দ নিচ্ছিলো মানুষের মত দেখতে কয়েকটা প্রাণী। আমরা বিলাসী। আমাদের কাছে জীবনের দাম ক্ষেত্রবিশেষে আলাদা।
আবরার, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে অনেক মানুষের হত্যাকাণ্ডের সাথে এটাকেও টেনে আনবোনা এই আলোচনায়। সারাদেশে এই গণপিটুনি চলছে। কোথাও না কোথাও প্রায় প্রতিদিনই মানুষ হত্যা হচ্ছে। টেনে আনবোনা কারণ আমাদের প্রতিক্রিয়া সিচুয়েশনাল। আমরা বিলাসী। আমাদের কাছে জীবনের দাম ক্ষেত্রবিশেষে আলাদা।
আবরার, সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদের অনেক চেয়ারম্যান মেম্বার মানুষ ধরে এনে হাত পা বেঁধে পিটান। অনেক সময় প্রাণেও মেরে ফেলেন। আমরা জোড়ো হয়ে পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করি। আমরা হাততালি দেই। নির্যাতনের মাত্রা বাড়ানোর আবদার করি। ঐ চেয়ারম্যান, মেম্বারকে দাপুটে আখ্যা দেই আমরা। ভোটে তাদেরকে এগিয়ে রাখি। আবার নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ করে দিই। গণপিটুনির সময় এক ঘা বসাতে পারলে আত্মতৃপ্তিতে ভুগি। কারণ আমাদের প্রতিক্রিয়া সিচুয়েশনাল। আমরা বিলাসী। আমাদের কাছে জীবনের দাম ক্ষেত্রবিশেষে আলাদা।
প্রিয় আবরার, তারপরও আমরা এটা থেকে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করবো। ভারত বিদ্বেষী প্রচারণা চালাবো, আওয়ামীলীগের গোষ্ঠী উদ্ধার করবো, শিবির কানেকশন খুঁজবো, যার যার স্বার্থ হাসিলের পায়ঁতারা করবো। আমরা সমস্যার গভীরে যাবো না। শিক্ষা, রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান আর সামাজিক ব্যবস্থায় যে আমূল সংস্কার প্রয়োজন সেটা বলবোনা। কারণ আমাদের প্রতিক্রিয়া সিচুয়েশনাল।
আবরার, তুমি কি জানতে যে এখানে খুনের বিচার চাইতে হয়। খুনির শাস্তি দাবি করতে হয়। ন্যায়বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ লাগে?
আবরার, তোমার কাছে ক্ষমা চাইলে কি তুমি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ো? আর দূর দূর করে তাড়িয়ে দাও? হয়তো তাই করো। বেশ করো। এটাই তোমার করা উচিত। আমরা বেহায়া।“
তিন.
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ছাত্র সংগঠনগুলোতে অপরাধীদের চাষ করেছে বরাবরই। তারা জল সেচ দিয়েছে। অধিক ফলনের জন্য সার দিয়েছে। মাচা তৈরি করে দিয়েছে যেনো আয়েশে থাকতে পারে। আর এই প্রক্রিয়ায় তারা যে ধরণের ফল আশা করেছে সে ধরণের ফলই ফলেছে ছাত্র সুংগঠনগুলোতে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একটা বিষয় বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে আর সেটা হলো এই ২০-২৫ বছর বয়সী টগবগে তরুণগুলো ফ্রাংকেনস্টাইন হয়ে উঠতে পারে। এরা মাটির পুতুল নয়। ক্ষেতে লাগানো ফসল নয়। ওরা মানুষ। রক্তের স্বাদ একবার পেয়ে গেলে আর তাদের খোদ স্রষ্টা এদেরকে সামলাতে পারেনা। আর হয়েছেও তাই। দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে, সংসদে তাদের নিজেদের ছাত্র সংগঠনগুলির কুকীর্তি নিয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের উষ্মা প্রকাশ করতে দেখা গেছে। দিশেহারা হয়ে যৌথ বাহিনীকে মাঠে নামিয়ে ক্ষমতাসীন দলের অংগসংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী সনি নিহত হয়েছিলেন নিজ ক্যম্পাসে। ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের বলি হয়েছিলেন তিনি। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গুলাগুলির মাঝখানে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ দিতে হয়েছিলো সনিকে। সারাদেশ এর প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছিলো। কিন্তু টনক নড়েনি তৎকালীন ক্ষমাতাসীন দলের। তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতাদের বিচারে এগিয়ে আসেনি দলটি। বুয়েটের ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনি হত্যা মামলার আসামি নিয়াজ মাখদুম মাসুম বিল্লাহ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন ২০১৩ সালের কমিটিতে। আর সহসাধারণ সম্পাদক তারেকুজ্জামান ছিলেন পুরান ঢাকার ইসলামপুরে পুলিশ হত্যা মামলার আসামি। এমনকি নিজ সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মী হত্যা মামলার আসামিরাও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পেয়েছিলেন।
অছাত্র, চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীরা এই সংগঠনটির কমিটিতে স্থান পান নিয়মিতই। বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, জাসাস ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পদে থাকা ব্যক্তিরাও বিভিন্ন সময়ে পদ পেয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে।
চার.
আল্লাহর আইন আর সৎলোকের শাসনের দাবিতে রাজনীতি করে শিবির। তারাও মানুষ হত্যায় পিছিয়ে নেই। অবশ্য তাদের মূল টার্গেট থাকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ছাত্রলীগের দফতরে বিভিন্ন সময় শিবিরের হাতে নিহত ও আহত ছাত্রনেতাদের তালিকা সংরক্ষিত রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ছাত্র নেতাদের শিবির সরাসরি হত্যা করেছে কিংবা তাদের দোসরদের দিয়ে হত্যা করিয়েছে।
ছাত্রলীগের দফতর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের নির্বাচিত এজিএস ছাত্রলীগ নেতা তবারক হোসেনকে হত্যা করে শিবির। এটি ছিল শিবিরের প্রথম হত্যা।
এরপর থেকে একের পর এক হত্যাযজ্ঞ চালায় শিবির। ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ শিবিরের হামলায় মারা যান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা মীর মোশতাক এলাহী। ১৯৮৪ সালে শিবির চট্টগ্রাম কলেজের সোহরাওয়ার্দী হলে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও মেধাবী ছাত্র শাহাদাত হোসেনকে জবাই করে হত্যা করে। ১৯৮৬ সালে জাতীয় ছাত্রসমাজের নেতা আবদুল হামিদের হাতের কবজি কেটে নেয় শিবির ক্যাডাররা। ১৯৮৮ সালে শিবিরের ক্যাডার বাহিনী ছাত্রমৈত্রী নেতা ডাক্তার জামিল আক্তার রতনকে কুপিয়ে ও হাত পায়ের রগ কেটে হত্যা করে। একই বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাসদ নেতা জালালকে হত্যা করে তারা। একই বছরের ১৭ নভেম্বর শিবিরের হামলায় মারা যান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসলাম হোসেন। এর পরদিনই শিবিরের হামলায় মারা যান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আজগর আলী।
একই বছর ঘটেছে আরও কয়েকটি হত্যার ঘটনা। ১৭ জুলাই এসএম হলে বহিরাগত শিবির ক্যাডাররা হামলা চালিয়ে জাসদ ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতি ও সিনেট সদস্য আইয়ুব আলী খান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সিনেট সদস্য আহসানুল কবির বাদল ও হল সংসদের ভিপি নওশাদের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়। একই বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মো. ইউনূসের বাসভবনেও বোমা হামলা চালানো হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তিন জনকে হত্যা করে সিলেটের রাজনীতির ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি করে ছাত্রশিবির। এদিন শিবির ক্যাডাররা জাসদ ও ছাত্রলীগের মেধাবী নেতা মুনীর-ই-কিবরিয়া চৌধুরী, তপন জ্যোতি ও এনামুল হক জুয়েলকে হত্যা করে।
১৯৮৯ সালের ১৮ এপ্রিল শিবিরের হামলায় মারা যান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শফিকুল ইসলাম। ১৯৯০ সালের ২২ ডিসেম্বর হত্যা করা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রমৈত্রীর সহ সভাপতি ফারুকুজ্জামানকে। ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ গুলি করে হত্যা করা হয় জাসদ ছাত্রলীগ কর্মী ইয়াসির আরাফাত। এ বছর শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে করা আন্দোলনে শিবির হামলা করে। এতে আহত হন জাসদ নেতা মুকিম। পাঁচদিন পর তিনি মারা যান।
১৯৯৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর খুন হন ছাত্রমৈত্রী নেতা জুবায়ের হোসেন রিমু। ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রমৈত্রী নেতা প্রদ্যুৎ রুদ্র চৈতীর হাতের কব্জি কেটে নেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শিবিরের হাতে খুন হন ছাত্রমৈত্রীর আরেক নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য। ১৯৯৭ সালে শিবিরের হামলা শিকার হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কর্মী বকুল।
১৯৯৮ সালে বরিশাল থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা ছাত্র আইয়ুব আলী শিবিরের হাতে নিহত হন। ১৮ মে চট্রগ্রাম শহরতলির বটতলী এলাকায় শহরগামী শিক্ষকবাসে শিবিরের গুলিবর্ষণের ঘটনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মুসফিকুর সালেহীন নিহত হন। একই বছর ২৪ মে সিলেটের ব্লু-বার্ড স্কুলের সামনে ছাত্রলীগ নেতা সৌমিত্র বিশ্বাসকে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী সঞ্জয় তলাপত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবছর।
২০০০ সালে বহুল আলোচিত ৮ মার্ডারের ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামে। এ বছর চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে ৮ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে প্রকাশ্য দিবালোকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ২০০১ সালে শিবিরের হাতে নিহত হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা আলী মর্তুজা। এ বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলে শিবির কর্মীরা কমান্ডো হামলা চালায়। এতে ছাত্রীদের লাঞ্ছিত ও রক্তাক্ত করে তারা।
২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের মিছিলে হামলা চালিয়ে শিবির ক্যাডাররা অর্ধশতাধিক ছাত্রীকে রক্তাক্ত করে। ওই বছর ৩১ আগস্ট শিবিরের হাতে নিহত হন সিলেট সরকারি ভেটেরিনারি কলেজের ছাত্র রফিকুল হক সোহাগ।
২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শিবিরের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ হয়। এদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনকে হত্যা করে ম্যানহোলের মধ্যে ফেলে রাখে শিবির কর্মীরা। ১২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র এএএম মহিউদ্দিনকে শিবির ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। একই বছরের মার্চ মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দখল করতে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী বিনোদপুর বাজারে তিন ছাত্রলীগ কর্মীকে কোপায় শিবির। এ ঘটনায় সোহরাওয়ার্দী হলের ৮ শিক্ষার্থী আহত হন।
এ তালিকা প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের দফতর মারফত জানা যায়, বিভিন্ন সময় এসব ঘটনা ঘটার পর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও নিজস্ব অনুসন্ধানের মাধ্যমে এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
পাঁচ.
যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, ক্যাম্পাসে শুধু তাদের তৎপরতাই থাকে৷ বাকিরা রীতিমত নিষিদ্ধ একটা অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। যেমন এখন ছাত্রলীগের একক নিয়ন্ত্রণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাস। ছাত্রদলের অস্তিত্ব তেমন একটা চোখে পড়েনা। আবার যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল তখন ছিল উল্টো চিত্র। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বদলের সাথে সাথে রাতারাতি বদলে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দখল। পুরো ক্যমাপাস ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই এখন ছাত্রলীগের একক কর্তৃত্ব৷ তবে এটা জনপ্রিয়তায় বা ভালোবাসায় যে হয়েছে সেটা বলা বোধহয় সম্ভব হবেনা। আর সমস্যাটা কিন্তু এখানেই। ছাত্রলীগের মাস্তানী, চাঁদাবাজি, দখলবাজিকে আমরা ছাত্র রাজনীতির সমস্যা ভেবে বসে আছি। অথচ এটা চলে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। যে দল যখন ক্ষমতায় গিয়েছে, তাদের ছাত্র সংগঠন তখন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।
সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের নানা সমস্যা আর দাবি দাওয়া নিয়ে কাজ করতে পারে ছাত্র সংগঠনগুলো। নানান জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সচেতনতা আর জনমত তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পারে ছাত্র সংগঠনগুলো। ছাত্রলীগ এখন আওয়ামী লীগের লেজুড় হয়ে গেছে। তবে ছাত্রলীগের জন্ম কিন্তু আওয়ামী লীগেরও আগে। আর ছাত্রলীগের রয়েছে গৌরবের দীর্ঘ ঐতিহ্য। এদেশের স্বাধীনতা, সংগ্রাম আর মুক্তিতে সংগঠনটির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।
ছয়.
যে দলই ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের ছাত্র সংগঠনই অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে। দলীয় সাংগঠনিক শক্তি কাজে লাগিয়ে নানান অপকর্ম করে বেড়ায়। মূল দল ক্ষেত্রবিশেষে এসব অনিয়মকে প্রশ্রয় দেয়। সাংগঠনিক শৃঙ্খলার জায়গায় যদি শক্ত থাকা না যায়, তাহলে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখাটা সম্ভব হয় না। এটাই আমরা দেখতে পাচ্ছি বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে। অতীতেও ক্ষমতাসীন দলগুলোর ক্ষেত্রেও তাই দেখেছি।
ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের বেপরোয়া হয়ে উঠার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো সাংগঠনিক শৃঙ্খলা না থাকা। ছাত্রদের সময়টাই হচ্ছে শিক্ষা গ্রহণের। এ সময় যদি তাদের নানা ভুলত্রুটি হয়, সেটি সংশোধনের দায়িত্ব শিক্ষক, অভিভাবক ও তারা যে রাজনৈতিক দলের, সেই দলের। এক্ষেত্রে আমরা অভিভাবকত্বের দায়িত্বে অবহেলা করি ও সতর্ক থাকি না। পাশাপাশি যাদেরকে ছাত্র সংগঠনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় তারাও সেই দায়িত্ব পালনে এগিয়ে না এসে ক্ষমতার চর্চা করা শুরু করে। অবৈধ সুযোগ সুবিধা নেওয়া শুরু করে। সংগঠনের নেতারা বিত্ত-বৈভব আর প্রভাব প্রতিপত্তির পেছনে ছুটতে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, নানা রকমের অনিয়মের সঙ্গে থাকার কারণে ছাত্রলীগের সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদককে বহিস্কার করা হয়েছে।
তবে, যেখানে সমাজের চারদিকে এত অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি সেখানে শুধু ছাত্রদের দোষ দেওয়া ঠিক হবেনা। তারাতো এই সমাজেরই মানুষ। সমাজের ঘোষখোর, দূর্নীতিবাজ ব্যক্তিটিও এই ছাত্রদেরই কারো না কারো মা কিংবা বাবা। দূর্নীতিবাজ শিক্ষকটি, ছাত্রদেরেকে ব্যবহার করে অন্যায্য সুযোগ নেয়া শিক্ষকটিও এই ছাত্রদের কারও না কারো শিক্ষক।
সমাজের চারদিকে অনিয়ম ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের মাধ্যমে আমরা নিজের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করি। আর এই পরিস্থিতির সুযোগ নেয় ছাত্র সংগঠনগুলো। সমাজের সর্বস্তরে লোভের থাবাটা চেপে বসেছে বেশ জোরালোভাবে। আর এর প্রভাব অবধারিতভাবে পড়েছে ছাত্র সংগঠনগুলোর ওপরেও। এ লোভ সামলানোর শিক্ষাটা যদি ছাত্রদের না দেওয়া যায়, তাহলে এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলবে। ছাত্ররা চাঁদাবাজি, দূর্নীতি, অপকর্ম করছে আর সেই দায় নিজেরা না নিয়ে পুরোটাই দলগুলোর উপরে চাপিয়ে দিলে হবে না। শিক্ষক, অভিভাবকদেরকেও এর দায়-দায়িত্ব নিতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ও অন্যান্য ঘটনাগুলোর বিষয়টি শুধু ছাত্রলীগের একার নয়। আমাদের পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। এ ঘটনাগুলো হওয়ার কারণ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠান বিকশিত না হওয়া। যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের ছাত্র নেতাদের মধ্যেই এমন একটা চরিত্র তৈরি হয়। এখন দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, তাই তাদের ছাত্র সংগঠনের একটার পর একটা ঘটনা আসছে। যতদিন পর্যন্ত দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা চালু না থাকবে, যোগ্য লোক যতক্ষণ পর্যন্ত পার্টির মধ্যে না থাকবে, ততদিন পর্যন্ত এই অস্বাভাবিক প্রক্রিয়াটা বিকশিত হতে থাকবে। দলের নেতারা তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি আর টিকে থাকার ঢাল হিসেবে ছাত্র সংগঠনের মধ্যে এই অসুস্থ ধারাটি টিকিয়ে রাখবে নিজেদের স্বার্থে।
সাত.
এধরনের ঘটনা প্রতিরোধে রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নজরে পড়েনা। কেউ অভিযুক্ত হলে সাথে সাথে তাকে অনুপ্রবেশকারী বলে দায় এড়াতে দেখা যায়। অনেকসময় কমিটি মেয়াদ উত্তীর্ণ এবং অভিযুক্ত নেতাকর্মীরা তাদের দলীয় পদে নেই বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। অনেকটা উটপাখির মত আচরণ করে থাকে দলীয় সংগঠনগুলো। যেনো তারা যা বলছে তা সত্য বলে সবাই মেনে নিচ্ছেন। অথচ দেশের মানুষ তাদের এই ফাঁকা বুলি আর প্রতারণাপূর্ণ মন্তব্যে যে কতটা বিরক্ত সেটা তারা তারা না বোঝার ভান করে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই চোখ বন্ধ করে থেকে প্রলয় ঠেকানো যাচ্ছেনা।
ছাত্র সংগঠনগুলোকে তাদের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় ইদানিং। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে উঠা নানান অভিযোগের বিরুদ্ধে একটা সহজ ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় সংগঠনটিকে। আর সেটা হলো দল থেকে বহিস্কার করা। এটা খুবই সহজ একটা ব্যবস্থা। আর পত্রিকা বা যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযোগ আসার পরই কেবল ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়। দলীয় ছত্রছায়ায় দানব হয়ে উঠাদের পেছনের ইন্দনদাতা আর যোগানদাতাদের কখনো চিহ্নিত করার চেষ্টা দেখা যায়না। আর এর ফলে সেই যোগানদাতারা নতুন দানব পোষা আর স্বার্থ হাসিল করা শুরু করে। ব্যবস্থাটা যেই তিমিরে ছিলো সেই তিমিরেই থেকে যায়।
গুরুতর অভিযোগে সাধারণ জনগন ফুঁসে উঠলে সংগঠনের দায়িত্বশীলরা সংবাদ মাধ্যমে এসে তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা জানান। কিন্তু আমরা কখনো দেখিনি সংবাদ মাধ্যমে আবার ফিরে এসে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করতে। কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সেটা জানাতে। আর এগুলোকে আইওয়াশ ভাবতে আমাদের আপত্তি থাকেনা কোনো।
ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা দিনদিন কমে আসছে। এখন ভাই তোয়াজের মাধ্যমেই চলছে প্রধান ছাত্র সংগঠনগুলি। ফেইসবুকে দলীয় সভাপতি-সম্পাদকের স্তুতি আর অস্বস্তিকর তেলবাজির মাধ্যমে দলীয় পদ পদবীর সংস্থান করছেন সুযোগ সন্ধানীরা। যাদেরকে সংগঠন পরিচালনায় দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা এই স্তুতি আর তেলবাজির স্রোতে গা ভাসিয়ে দিচ্ছেন। নীতির চর্চা, সংগঠনের উদ্দেশ্য অর্জন, গুণগত পরিবর্তন আর সংস্কারের দিকে নজর দিতে দেখা যায়না তাই দায়িত্বশীলদেরকে।
কোনো ঘটনা ঘটার পর আমরা রিঅ্যাক্টিভ ব্যবস্থা নিতে দেখতে পাই। হয়তো গ্রেফতার করা হচ্ছে। সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হচ্ছে। এরপর বিচারের দিকে আর আমদের ফলো আপ থাকছেনা। অবস্থার উন্নয়নে কোনো প্রোঅ্যাক্টিভ ব্যবস্থা নজরে পড়েনা। আর তাই আমরা বলি রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটানো না হলে এসব ঘটনা ঘটতেই থাকবে। প্রোঅ্যাক্টিভ ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া এগুলো বন্ধ করা যাবে না।
আট.
বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির উজ্জ্বল ঐতিহ্য রয়েছে৷ ৫২এর ভাষা আন্দোলন, ৬২এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯এর গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র আন্দোলনের গৌরবজনক ভূমিকা রয়েছে৷ কিন্তু ৯০ সালে স্বৈরাচারের পতনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের যে নতুন অভিযাত্রা শুরু হয়েছে, তার সময় থেকেই শুরু হয়েছে ছাত্র রাজনীতির পচন৷ এই অবস্থার উত্তরণ বড়ই প্রয়োজন। ছাত্রদের মধ্যে রাজনীতি সচেতনতা প্রয়োজন রয়েছে। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার মাঝে সমস্যার সমাধান নেই। ছাত্ররাইতো রাজনীতর পাঠ নিবে, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দীক্ষা নেবে। আর এই সময়েই তাদের মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে হবে। প্রতিশ্রুতিশীল এই তরুণদের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে। হাতেখড়ি নিতে হবে একটা বহুত্ববাদী সমাজ আর রাষ্ট্র ব্যবস্থা বাস্তবায়নের। তাদের চারিত্রিক দৃঢ়তা অর্জন করতে হবে এখনই। তারাই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে আর তাই তাদের পরিশুদ্ধ চারিত্রিক গুণাবলীর অধিকারী হতে হবে। সকল প্রকারের নির্যাতন, নিপিড়নের বিরুদ্ধে এই তরুণদের অবস্থান নিতে হবে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান নিতে হবে। আর এভাবেই আমরা একটা শ্রেয়তর, বহুত্ববাদী সমাজ আর রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতে পারি।
আর এই অবস্থার উত্তরণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষকদের একটা বড় দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষকেরা কেমন জানি একটা কমপ্লেইনিং এটিটিউড ধারণ করছেন দিনকে দিন। তারা রাজনৈতিক দল আর ব্যবস্থার উপর দায় চাপিইয়েই যেনো নিজের দায়িত্ব শেষ করে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকেন। শৃঙ্খলা আর নিয়ম শেখানোর জন্য শিক্ষকদেরকে দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের কাজ শুধু শ্রেণিকক্ষে লেকচার দেয়ার মধ্যে সীমিত নয় এটা মনে রাখতে হবে। আমরা জানি এই কাজ কুসুমাস্তীর্ণ নয় তার পরেও এই মহান পেশার মহান মানুষদেরকেই জাতির মেরুদন্ড ঠিক রাখতে সাহায্য করতে হবে। একজন শিক্ষককে তাঁর সামাজিক আর নৈতিক দায় ছেড়ে দিয়ে শুধু চাকরিজীবি হয়ে উঠলে এই অবস্থার উত্তরণ কখনোই সম্ভব নয়।
১৮-২৫ বছর বয়সটাই এমন যে মানুষ নতুন কিছু করতে চায়, বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চায়। প্রচুর প্রাণশক্তি থাকে এই সময়টাতে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে, কলেজে পড়ুয়া এই টগবগে তরুণদের জীবিনীশক্তিকে ইতিবাচক পথে কাজে লাগানোটা খুবই জরুরী। তারুণ্যের সেই শক্তিকে গঠনমূলক কাজে লাগাতে না পারলেই বরং বিপদ। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যে সব প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ সেখানে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে। অনেকেই ছাত্র সংগঠনগুলোর কূকর্মে বিরক্ত হয়ে বলেন, এখন আর ছাত্র রাজনীতির কোনো লক্ষ্য নেই, তাই এর দরকারও নেই। আসলে কি তা ঠিক? এই যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গেস্টরুম, টর্চার সেল, র্যা গিংএর কথা শোনা যায়; সুস্থ ছাত্র রাজনীতি থাকলে কোনোভাবেই এটা সম্ভব হতো না বলে মনে করি।
নিজের পদ রক্ষায় আর অনৈতিক সুযোগ সুবিধা পাওয়ার ঢাল আর সিঁড়ি হিসেবে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রসংগঠনগুলোকে ব্যবহার করার অসুস্থ চর্চা বন্ধ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজগুলোতে প্রশাসন ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর কথায় কাজ করেন। নিজেরা মিলেমিশে অবৈধ সুযোগ সুবিধা ভাগ বাটোয়ারা করে নেন বলে নানান সময় সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়। এগুলো বন্ধ করতে হবে। শিক্ষকদের নৈতিক এই স্খলন রোধ করতে হবে।
অভিভাবকদের একটা বড় দায়িত্ব রয়েছে। পরিবার হচ্ছে শাশ্বত বিদ্যায়তন। পারিবারিক শিক্ষাটা এখানে খুবই প্রয়োজন। পিতামাতা, অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে তাদেরক সঠিক পথে পরিচালনা করার জন্য দিকনের্দেশনা দিতে হবে। অন্যায় আর অন্যায্য কাজের প্রশ্রয় দেয়া যাবেনা একদম। তাদের চলাফেরা, আচার আচরণের মধ্যে অস্বাভাবিকতা দেখলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। অনেক অভিভাবক আছেন, তারা তাদের সন্তান দলীয় ক্যাডার হয়ে ক্ষমতার চর্চা করলে গর্ববোধ করেন। আমি অমুকের বাবা বা ভাই বলে গর্ববোধ করেন। সন্তানদেরকে নানা অন্যায্য কাজে যুক্ত করে সুবিধা নিতে চান। এগুলো বন্ধ করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদগুলোকে কার্যকর করা খুবই প্রয়োজন। বছরের পর বছর ছাত্র সংসদগুলোকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। নির্বাচিত আর কার্যকর ছাত্র সংসদের অনুপস্থিতি ক্যাম্পাসগুলোতে দলীয় ছাত্র সংগঠনগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্যের পথ খোলাসা করে দিয়েছে। ক্যম্পাসে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা আর শিক্ষার্থিদের দাবি দাওয়াকে প্রতিষ্ঠা করারা জন্য ছাত্র সংসদগুলোকে কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই।
শিক্ষায়তনগুলোতে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বিস্তার ঘটাতে হবে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে প্রমোট করতে হবে। সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা অপরাধ রুখতে সহায়তা করে। শিক্ষার্থীরা যত এসব সাংস্কৃতিক আর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে যুক্ত হবে ততই দলীয় লেজুড়বৃত্তি আর অসুস্থ ক্ষমতার চর্চা থেকে বের হয়ে আসবে।
ছাত্র সংগঠনগুলোর দলীয় প্রশ্রয় বন্ধ করতে হবে। মূল দল কর্তৃক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া বন্ধ করতে হবে। ছাত্র সংগঠনকে নিজেদের দলীয় ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। নির্দিষ্ট লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোকে নিজেদের মত করে পরিচালিত হওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে মূল দলকেই। দীর্ঘদিনের এই দলীয় লেজুড়বৃত্তির চর্চা থেকে বের হতে সাহায্য করতে মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে মূল দলকেই।
ছাত্ররাজনীতি নয়, অপরাজনীতি বন্ধ হোক চিরতরে সেটাই চাই আমরা। আমরা প্রত্যাশা করি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসুক শিক্ষা এবং ছাত্র রাজনীতির সুষ্ঠু পরিবেশ। আবরার হত্যার পর আবেগ আর প্রবল দাবির প্রেক্ষিতে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে৷ আমরা চাই ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের অভ্যন্তরে শুদ্ধি অভিযান শুরু করুক। সংগঠনগুলো তাদের পরিচালনা পদ্ধতিতে সংস্কার নিয়ে আসুক। তাদের লক্ষ্য আর উদ্ধেশ্য ঠিক করুক আর দলীয় কর্মকান্ডে এগুলোর চর্চা করুক। সবাই যার যার অবস্থান থেকে সবাই সঠিক দায়িত্বটি পালন করুক। সুস্থ ছাত্র রাজনীতি ফিরে আসুক সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
মুহম্মদ আব্দুস সামাদ
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, উন্নয়নকর্মী, লেখক, প্রাবন্ধিক। Samadsust22@gmail.com.
- সিলেটের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল দ্রুত চালু করে ১২শ শয্যায় উন্নীত করা হবে: প্রধানমন্ত্রী
- পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে MS3 টেকনোলজি বিডি পরিবারের ঈদ শুভেচ্ছা
- এবার এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানে ইরানি আঘাত
- শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে ইরানের মোকাবিলা সম্ভব নয়: মুজতাবা খামেনেয়ী
- ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিণতির বিষয়ে রাশিয়ার হুঁশিয়ারি
- একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
- রমজান মাসই বন্ধ থাকছে মাধ্যমিকসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
- মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য, বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ: আইন উপদেষ্টা
- যুদ্ধ, বিভাজন ও অনিশ্চয়তা: বহুমুখী সংকটে ইসরায়েল
- পুরো রমজান মাসে হাইস্কুল বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ
- হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন তারেক রহমান
- বিজেপি-আরএসএসের বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় উইকিপিডিয়া
- আসামে তীব্র শীতের মধ্যেই ১৫০০ মুসলিম পরিবারের ঘর গুঁড়িয়ে দিল ভারত
- নুতন বই পেয়ে উচ্ছাসিত রাঙামাটির শিক্ষার্থীরা
- সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছেছে খালেদা জিয়ার মরদেহ
- আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই
- শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান
- জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানিয়ে নাহিদকে এনসিপির ৩০ নেতার চিঠি
- পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরশাসনের পতন
- তারেক রহমানের বহনকারী প্লেন নামল সিলেটে

