`

একদা আমিও শিক্ষক ছিলাম

  • Views: 1766
  • Share:
অক্টোবার ৫, ২০২০ ১৬:৪৩ Asia/Dhaka

মোঃ নুরুজ্জামান বিশ্বাস :: ২০১১ সালে কানাডা প্রবাসী হবার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে ১০ বছর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা করেছি। প্রবাসে আসার পূর্বে (২০০৬ থেকে ২০১১ এর মে পর্যন্ত) যথাক্রমে বিবিএ ও এমবিএ প্রোগ্রামের Program coordinator ছিলাম। শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে অনেক অভিজ্ঞতা ও অনেক স্মৃতি মনে হলে প্রবাসে নিজের অজান্তে ফিরে যাই অতীতের সেই দিনগুলোতে। হারিয়ে যাই এবং অনুভব করি সেই সময়টাকে। প্রবাসে একজন শিক্ষককে বা শিক্ষকতা পেশাকে খুব মিস করি।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেকটি ব্যাচে ২/৩ টি সেকশনে ক্লাশ হত। আমার কোর্সের ক্লাশগুলো আমি সাধারণত সব সেকশনকে একত্র করে বড় রুমে নিতাম। বিশেষ করে, research methodology ও  Bio Statistics কোর্সের ক্লাসগুলো আমি বড় রুমে নিতাম। ৮০ – ৯০ জনের উপস্থিতিতে একটানা  ২ ঘণ্টা পর্যন্ত ক্লাশ নিতাম।
ফল সেমিস্টারের কোন একদিনে সকাল ৮–১০ টা ক্লাশ নিচ্ছিলাম। ক্লাশ শুরুর ৩০ মিনিট পর হঠাৎ পিছনের সারির দিকে আমার নজর যায়। ফিসফিস ও মৃদু গুঞ্জন আমার দৃষ্টি গোচর হলে আমি পিছনে চলে আসি।

আমার কিছু টেকনিক ছিল, ক্লাশের ভদ্রগোছর বা সহজ সরল টাইপের ছাত্র/ ছাত্রীর দিকে রাগত দৃষ্টিতে তাকালে ভয়ে অনেক সত্য বের হয়ে আসত। এবারও তাই করলাম। ছাত্রীটি ফিস ফিস করে বলল, স্যার, পিছনের বেঞ্চে কারও ব্যাগে ডাইল (ফেন্সিডিল) আছে। আমি পিছনে চলে আসি এবং আবারও সেই টেকনিক এপ্লাই করি। এবার নাম পেয়ে গেলাম। মিন্টু (ছদ্ধ নাম, সংগত কারণে তার আসল নাম ও ব্যাচ প্রকাশ করা হল না)। আমি ছাত্রটির সামনে চলে আসি। তার সামনে এসে আই কন্ট্রাক্টের চেষ্টা করি এবং ঘটনার সত্যতা জানতে চাই। চোখে চোখ পড়তেই বুঝতে পারলাম, আমার প্রতি ওর সামান্যতম শ্রদ্ধা- ভক্তি নেই। সমাজের প্রতি কেমন একটা ঘৃণা ও বিরক্তিকর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একজন ছাত্রের ক্লাশে ব্যাগে করে বই খাতা নিয়ে আসার কথা, কোন শিক্ষার্থী ব্যাগে করে মাদক নিয়ে আসতে পারে –এটা আসলে আমার ধারনায় ছিল না। অবাক হলাম, ছাত্রটি ক্লাসে ব্যাগে করে মাদক নিয়ে এসেছে অথচ তার মাঝে কোন ধরণের অপরাধবোধ নাই। আমি ওকে বললাম “ তুমি যে অন্যায় করেছ তার পরিনাম/ শাস্তি কি তুমি জান? ছেলেটি নির্ভয়ে ও সোজা সাপটা জবাব দিল, কি করবেন, ক্লাশ থেকে বের করে দিবেন? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দিবেন নাকি পুলিশে দিবেন?” 

পরিস্থিতি এবং ওর মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে নিজেকে সামলে নিয়ে ভারী গলায় বললাম, “ক্লাশে আসছ শেখার জন্য, তোমাকে বের করে দিলে কাকে শিখাব আর শিখাবই বা কি করে? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়ার ক্ষমতা আমার নেই। পুলিশে দিলে তোমার নামের সাথে আমার ও আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটা পত্রিকায় আসবে। অতএব এর কোনটাই আমি করছি না। তোমার ব্যাগটা আমাকে দাও। ক্লাশ শেষে আমার সাথে কথা বলে আমার রুম থেকে ব্যাগ টা নিয়ে নিও”।

ছেলেটি সুবোধ বালকের মত আমার কথা শুনল। আমি ক্লাশটি সংক্ষেপ করে রুমে চলে আসি। ওয়াশ রুম থেকে বের হতেই পিয়ন নাম  উল্লেখ করে বলল ছেলেটি বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি মিন্টুকে নিয়ে পাশের রুমে যাই এবং পিয়নকে আমার নাস্তাটা ওখানে দেবার জন্য বলি।

বেশীর ভাগ ছাত্ররা যেহেতু হোস্টেল ও ম্যাচে থাকে তাই নিশ্চিত হবার জন্য ছেলেটি কোথায় থাকে তা জানতে চাইলাম এবং নিশ্চিত হলাম সে বাসায় থাকে। এত বড় অপকর্মের জন্য ওর মাঝে সামান্যতম অনুভূতি নেই এটা বুঝতে পেরে আমি আমার অবস্থান বদলিয়ে ওর মুখোমুখি বসলাম। সকালে নাস্তা খেয়েছে কিনা জানতে চাইলে মিন্টু না সুচক জবাব দেয়।  আমি আমার নাস্তাটা ওর  দিকে এগিয়ে দেই এবং পরিবেশটা সহজ করার জন্য মুখে হাসি এনে নিচু গলায় জিজ্ঞাস করি, তোমার মা সকালে নাস্তা বানায় নি? মার কথা জিজ্ঞাস করতেই ওর চোখ ভারী হয়ে গেল এবং চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগল। না থেমে বলতে লাগল “মা একজনের সাথে (ভাইগ্যা) চলে গেছে, বাবা আর এক মেয়ের সাথে সংসার শুরু করেছে”। তাই ধানমণ্ডিতে নানির বাসায় থাকে। ওর মামি এবং অন্যান্য আত্মীয়রা ওকে নিয়ে প্রতিনিয়ত কানা ঘুসা করে যা ওকে প্রতিনিয়ত কুড়েকুড়ে খাচ্ছে। 

ছেলেটির কথা শুনে আমি অনেকটা বাক্রুদ্ধ হয়ে যাই। কিছুক্ষণ নিরব থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে মিন্টুর দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে মিন্টু ই বলা শুরু করল। “আমার জায়গায় আপনি হলে কি করতেন?” আসলে আমিও ভাবছি আর নিজেকে ওর জায়গায় কল্পনা করছি। ওর জায়গায় আমি হলে কি করতাম! ওর মাথায় হাত রাখলাম। ওর চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছে। বললাম, তোমার জায়গায় আমি হলে কি করতাম জানি না। হয়ত তুমি যা করছ তার চেয়ে খারাপ কিছু করতাম।

তোমার হারানো কিছুই আমি ফেরত দিতে পারব না । তবে তোমার সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তুমি চাইলে কিছু করতে পারি। তোমার বাবা মা তারা তাদের সুখ বেছে নিয়েছে। তারা তোমার কথা চিন্তা করেনি। তুমি যদি এখন তোমার জীবনকে নষ্ট কর এর জন্য তুমি দায়ী থাকবে। ওকে বুঝাতে সক্ষম হলাম, ওর জীবনটা গড়ার দায়িত্ব ওর নিজের। কেন জানি কথা বলতে পারছিলাম না। মিন্টুকে ক্লাশে নিয়মিত হবার উপদেশ দিয়ে আমি আমার রুমে চলে আসি। অফিসে গিয়ে ওর ফাইল খুজে কন্ট্রাক্ট পার্সনের সাথে কথা বলে ওর ব্যাপারে নিশ্চিত হই। ওর মামা আমার সাথে দেখা করে ওর ব্যাপারে সব খুলে বললেন এবং ওর দিকে খেয়াল রাখার জন্য আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন। আমি নিয়মিত মিন্টুর  পড়ালেখার খোঁজ খবর নিতাম। পাশ করে বের হবার পর আমি ওর কথা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। 

২০১১ তে কানাডা আসার কয়েকদিন পূর্বে অপরিচিত একটি মোবাইল নাম্বার থেকে কল পাই। কলটি ছিল মিন্টুর এবং সে আমার সাথে দেখা করার অনুমতি চাইল। দেখা হলে। পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে চাইল। আমি জড়িয়ে ধরলাম। চোখের দিকে তাকাতেই চোখ নীচে নামিয়ে ফেলল। প্রথম দিন মিন্টুর তাকানোটা মনে পড়ে গেল।  টগবগে যুবক। বুঝার উপায় নাই, তার এমন একটি অতিত ছিল। আমাকে একটি সুন্দর গিফট দিল (শার্ট ও টাই) এবং অনুরোধ করল এয়ার পোর্টে যেতে কোন হেল্প লাগলে ওকে যেন জানাই। ছেলেটিকে দেখে আত্মতৃপ্ত হলাম এবং শুনে খুব ভাল লাগল যে সে ভাল একটি জব করে।

আসলে শিক্ষক হিসেবে আমাদের অনেক দায়িত্ব আছে। ছেলেটিকে আমি ক্লাশ থেকে বের করে দিতে পারতাম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়ার সুপারিশ করতে পারতাম অথবা পুলিশে দিতে পারতাম। পরিণামটা কি হত। এই ছেলেই হয়ত একদিন বেছে নিত চরমপন্থা (মাদকসেবী বা ছিনটাইকারী দলের সদস্য বা জঙ্গি)। এর দায় কিন্তু আমরা এড়াতে পাড়ি না। সমাজ গঠনে একজন শিক্ষকের অনেক দায়বদ্ধতা আছে। আমি আমার অনেক সিনিয়র (প্রফেসর এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক  ভিসিসহ অনেকে ) সহকর্মীর কাছে উদাহরণ হিসেবে এর সমাধান চাইলে তাদের উত্তর ছিল, “এরা বিশ্ববিদ্যালয়কে পলিউট করার পূর্বে এদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা উচিৎ” । তবে কারও কাছে এ ঘটনাটি প্রকাশ করি নি।
 
একজন ভাল শিক্ষক ছাত্রদের একাধারে একজন অভিভাবক একজন দিক নির্দেশনাকারী, একজন ভাল বন্ধু, একজন মনোবিজ্ঞানী এবং একজন ডাক্তার । 
 
একজন ছাত্র/ ছাত্রীর গতিবিধি  একজন শিক্ষকই প্রথম বুঝতে পারেন এবং তিনি যদি সেভাবে একজন শিক্ষার্থীকে গাইড করেন তাহলে অবশ্যই একজন শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীকে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারেন। 
 
একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণে আমাদের সবারই দায়িত্ব আছে। তবে সুন্দর সমাজ নির্মাণে শিক্ষক সমাজের দায়িত্বটা অন্যদের তুলনায় আরও অনেক বেশী। সমাজটি নষ্ট হয়ে গেছে বা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে নিজেকে নিরাপদ দূরে রাখছি বা রাখার চেষ্টা করছি। হয়ত অদুর ভবিষ্যতে আমরা কেউ ই এই নষ্টামির হাত থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখতে পারব না।
 
৫ই অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। 
শিক্ষক দিবসে সকল শিক্ষকের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও অবিরাম ভালবাসা।

লেখক
মোঃ নুরুজ্জামান বিশ্বাস 
টরেন্টো, কানাডা। 

user
user
Ad
Ad