`

স্বপ্নের অপমৃত্যু

  • Views: 605
  • Share:
আগষ্ট ১৭, ২০২০ ১১:৪৭ Asia/Dhaka

খালিদ রায়হান:: বয়সে ও এখনো অনেক ছোট। ছেলেটির নাম সুদীপ্ত। পরিবারে ওর আপন বলতে কেউ নেই। বাবা-মা কলেরায় আক্কা পেয়েছে সেই গত বছরের ১ম দিকে।তাই সুদীপ্তকে শোকে কাতর থাকার কথা কিন্তু না,তার মধ্যে এমন কোনো লক্ষ্মণ নেই। তবে ওযে একেবারেই শোকাহত নয়, তা বলা মুচকিল।

ওর কোনো ভাই-বোন নেই। তার মা মরার অল্পদিন বাদেই বাবা গত হয়েছেন।এতটুকু ছেলে কিভাবেই বা বাবা-মা হারানোর শোক বয়ে বেড়ায়?

ঘটনার কিছুদিন পরেই ও গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে চলে যায়।সেখানে তাকে একটা করাতের মিলে কাজ করতে দেখা যায়। তবে তার বাবা-মা যতদিন বেঁচে ছিলো একমাত্র ছেলের সঙ্গেই থাকতো ওরা।সুদীপ্তের বাপ তাকে স্কুলে ভর্তি করেছিলো।ও রোজ বই হাতে নিয়ে স্কুলে যেত।পারিবারিক অবস্থা ভালো না থাকার দরুন হাত বেগ কিংবা কাঁধ বেগ কিছুই তার ছিলো না। 

এখন সুদীপ্ত করাতের কাজ পুরোপুরিই আয়ত্তে নিয়েছে। সে এখন অনেক কিছুই বোঝে,পাকাপোক্ত বোঝার বয়স হয়েছে তার। ও পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলো। স্কুলে বছর-চারেক পড়েছিল ও—
পরীক্ষা দিয়েছে মোটে পাঁচ কিম্বা সাতটা।ভালোই ফলাফল করেছিলো সুদীপ্ত। ও সবসময় কবিতা পড়তে ভালোবাসতো।রবীন্দ্রনাথ ও সুফিয়া কামালের  অনেক কবিতাই তার মুখস্থ। এমনকি করাতের কাজ করার সময় মাঝেমধ্যে মনের অজান্তেই ও কবিতা বলা শুরু করে দিতো।অন্যরা মুগ্ধ হয়ে শুনতো তা।অল্প বয়সেই কবিতা লিখার মতো এমন উঁচু মানের চিন্তা ওর মাথায় ঢুকে মগজ জুড়ে বসেছিল। সত্যিই বিষয়টা খুব স্বাভাবিক নয়।

সুদীপ্ত এখন অনেক বড়। সে করাতের কাজ পুরোপুরি শিখে নিয়েছে। কিন্তু ওতো করাতের কাজ করার জন্য জন্ম নেয়নি! ওর ভবনা এটি।ওর স্বপ্নতো একটাই—যা ওর ছোট বেলার স্বপ্ন,যা ওর মগজের পুরোটা জুড়েই বিদ্যমান থাকতো। 
কবিতা পড়া—
কবিতা মুখস্থ করা—
বড় হয়ে কবিতা লিখা—
আজকাল ও করাতের কাজ ছেড়ে দিয়েছে। একবেলা দুইবেলা খেয়ে না খেয়ে ও অনেকগুলো টাকা-কড়িও জমিয়েছে। একন ওর মন আর এসব কাজে বসে না।সমশ যত যাচ্ছে.... ওর মন কবিতার দিকে ততই ঝুকে পড়ছে।কিন্তু বাঁধাতো একটাই! 
ও সবেমাত্র ছোটকালে কয়েকবছর স্কুলে গিয়েছিল। এই অল্পদিনে যা কিছু শিখেছিলো তা দিয়ে কী আদৌ লিখালিখির যোগ্যতা প্রকাশ পায়?
সে যাই হোক,
যদি লক্ষ্যে অটুট আর দৃঢ় মনোবল থাকে অন্তরে, তবে কি না হয় এই ধরায়?

সুদীপ্ত এখন আর নিজের গ্রামে ফিরতে চায় না।ও ভুলেই গেছে সেই গায়ের কথা। ছোট বেলায় ওর বাপ-মার মৃত্যু ওকে না কাঁদালেও আজ তাহাদের কথা মনে আসলেই অন্তরটা জ্বলে যায়।তাই বুজি ও অজানা কোথাও পাড়ি জমিয়েছিলো।আর আজ ওখানেই ছোট্ট একটা কুঠিরের মালিক ও।একলা মানুষ,এতেই তার প্রয়োজন মিটে।
তার জমানো টাকাগুলো থেকে অল্প টাকায় সে ছোট্ট একটা মুদি দোকান ক্রয় করে নিলো।
আজকাল লেখালিখিটা সুদীপ্তের মনে মোহর মেরে বসেছে।আর এটাই তার আজন্ম স্বপ্ন ছিল। ও দোকানের কাজের ফাঁকে ফাঁকেই বই পড়ে। ও রিডিংটা খুব ভালো পড়তে পারে।দোকানের কাজ সন্ধ্যাট আগেই শেষ, এর পর তার কেবল ঐ একটাই কাজ—বই পড়া।রবীন্দ্রনাথ আর সুফিয়া কামালের বই সবই আছে তার বিছানার পাশে। অন্যান্য কিংবদন্তি অনেক লেখকের নন্দিত সাহিত্যকর্মও সে পড়ে থাকে।ও লিখতে চায়....
কবিতা লিখতে চায়।ওর ইচ্ছেটা এখন আরও বড়।এখন সে কল্পনাশ একটা কথাই ভাবে যে,একদিন সে সুকান্তের মতো বর মাপের কবি হবেন।সে এটা ভেবেই অত্যন্ত খুশি যে,লোকে তার বই পড়বে,লোকমুখে তার নাম ছড়াবে। অবশ্য তার আয়-রোজগারও বেশ হবে। অথচ, ওর এই ধারণা বোধহয় অস্পষ্ঠ যে,উপমহাদেশে কবিতা যারা লিখে কিংবা পড়ে ওদের মুল্য তুচ্ছ! 

আর লেখকদের আয়-রোজগারের কথা আর নাই বললাম। কিন্তু সুদীপ্তের তা আজন্ম স্বপ্ন। অনবদ্য কিছু বই পড়ে সে নতুন শব্দ পেয়েছে অনেক।আজকাল ২/১ টা কবিতাও লিখতে পারে ও....
হয়তো স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, কিংবা গদ্য ছন্দের তফাৎটা ওর জানা নেই! 
তাতে কী?
সব ছন্দের মিশ্রনেও'তো কবিতা লিখা যায়। ও এভাবেই চিন্তা করে সব।

এখন ২৯টা কবিতার মালিক সুদীপ্ত। দোকানের কাজ শেষে সন্ধ্যা হলেই ও বসে পড়ে স্বপ্নঘোরে কবিতা লিখতে।ও লিখেও ফেলে কিংশুক কিছু চরণ।
জীবন জীবিকার ভিরে এভাবে সংগ্রাম করে কবিতা লিখার দুর্বিষহ পথিকৃৎ ও।এটাই ওর জীবনের একমাত্র চাওয়া পাওয়া।এভাবেই চলছে সুদীপ্তের পরের জীবনটা!

অনেক পুরোনো ইচ্ছে তার। ৫৫/৬০ টা কবিতা নিয়ে ও একটা বই ছাপাবে।ছাপা খানার সাথে ওর কথাও হয়েছে। ওরা নাকি বলেছে ২৪,০০০টাকা লাগবে এমন একটি বই ছাপাতে।ও ঘাবড়ে যায়নি,অবশ্য দরকষাকষিও করেনি।পুরো টাকাটাই যোগাড় করেছে ও।এখনতো কাজ একটাই,ছাপাঘড়ে লেখা পাঠানো। এদিকে সুদীপ্তের মন বড়ই উতলা,তার বই হবে,মানুষে তা পড়বে,লোকমুখে তার নাম ছড়াবে, তাকে নিয়ে গায়ের লোকে গর্ব করবে।
অবশ্য তাকে নিয়ে গর্ব করার মতো পরিবারে ওর কেউ নেই। 

এই কথা ভাবলে কিশোর কবির মনে প্রচন্ড একটা ধাক্কা লাগে।তবুও লোকমুখে তার কথা হবে এই ভেবেই সে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়।

বাসের একটা টিকিট ক্রয় করে কবি ঢাকা শহরে রওনা করলো।ওকে এখন কবিও বলা চলে।তাকে ছাপাখানায় যেতে হলে প্রথমেই বাংলা বাজারে পৌঁছাতে হবে।কবি আগে কখনো ঢাকা শহরে পা রাখেননি। এ কোলাহলপূর্ণ শহরের অলিগলি তার কতই না অজানা/অচেনা!
ওর হাতে মলিন একটা ডায়েরি আছে। তার স্বরচিত কবিতাগুলোই এতে সুস্পষ্ট বন্দী। পকেটে পুরো ২৪,০০০ টাকা নেই। কিছু টাকা সে তার কুঠীরেই রেখে গিয়েছে।তার ইচ্ছে পরে যখন বই হাতে পাবে, তখন বাকি দেনা পরিশোধ করে দিবে।
শহরের রাস্তা দেখে সে বিস্মিত হয়।গায়ের রাস্তাগুলি কতই না অপ্রশস্ত-তবুও কোনো ক্রাউড নেই!
অথচ,
শহরের রাস্তাগুলোর আয়তন এত বিশাল,কিন্তু জনবহুলতা আরও বেশী।
কবি আশেপাশে কেবল দালানকোঠা দেখে, আর চমকে ওঠে।গ্রামের মতো বৃক্ষরাজির কোনো সমাহার সেখানে কবি দেখতে পায় না।প্রকাণ্ড সব গাড়ী দেখে কবি চমকে ওঠে আবার। 
মনে মনে কবি ভাবে,
এই বুঝি ঢাকা শহর!
বাস পিপড়ের গতিতে চলছে .... 
এর মানে বুঝতে পেরেছেন তো!
জ্যাম....জ্যাম.....
টুঙি পার হওয়ার প্রারম্ভেই কবি আকস্মিক চমকে ওঠলেন।অদ্ভুত এক শহর এটি,কবি ভাবলেন।
তার মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল মস্ত একটা আকাশযান।আবারও চমকে ওঠে কবি,চমকানোর যথেষ্ট কারণও রয়েছে বটে। 
এর আগে এত কাছ থেকে ও কখনো বিমান উড়তে দেখেনি তো!

সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসার প্রারম্ভেই কবি পুরান ঢাকায় পৌঁছে গেলেন।একটা পেডেল রিকশা করে এখন সে বাংলাবাজারের দিকে এগুচ্ছে.... 
বাজারের সামনেই তাকে নামিয়ে দিয়ে বৃদ্ধ রিকশা ওয়ালা চলে গেলেন।কিশোর কবি ওখানে একা দাঁড়িয়ে রয় আর মনের আনন্দে কল্পনায় কার সাথে যেনো কথা কয়!
চোখের সামনেই ছাপাখানার দোকান।তাহলে তার স্বপ্নের পুরোটাই এখন পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে।
আনন্দে কবির আঁখি হতে দু’ফোটা অশ্রু ঝরে পড়লো।মনে তার কত রংবেরঙের কল্পনা! ঠিক সেই মুহূর্তে একটা বিরাট ট্রাক এসে কবিকে চাঁপা দিয়ে চলে গেলো।আশেপাশে হৈচৈ শুরু হয়ে গেলো।একজন কিশোর কবির আজীবনের বাসনার অন্তিম অপমৃত্যু ঘটলো। 
লেখক,
খালিদ রায়হান,
সমাজকর্ম বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। 

user
user
Ad
Ad