`

একটি পদ্মফুলের আত্মকাহিনী

  • Views: 1069
  • Share:
আগষ্ট ১০, ২০২০ ১১:৪৬ Asia/Dhaka

সাবিনা আক্তার:: আজকাল দীপালির মন ভালো নেই। সবজিনিসের প্রতি মায়া যেন কেমন তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। এমনকি নিজের জীবনের প্রতিও।মাঝরাতে পুরো পৃথিবী যখন ঘুমের ঘোরে স্বপ্নে বিভোর দীপালি তখনও সজাগ। দূরের আকাশের চাঁদের সাথেই তখন তার সঙ্গ গড়ে ওঠে। ভাবতে থাকে চাঁদকে নিয়ে সবার কত প্রশংসা।চাঁদের সাথে মানুষ তার প্রিয় জনকে তুলনা করে। অথচ চাঁদ কত একা।নিশীথ কালো আঁধারে যেন জাগ্রত একা প্রদীপ। এসব ভাবতে ভাবতে দীপালির সকাল হয়ে যায়। ভোরের পাখির কিচিরমিচির শব্দ তাকে সংবেদনশীল করতে পারে না, তার মনে অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে না।

সকাল শুরু হতেই হালকা কাজ দিয়ে দিনটা শুরু। গতানুগতিক জীবন সকালের নাস্তা তৈরি করা, টেবিলে খাবার পরিবেশন করা, আর যার যেটা প্রয়োজন সেটা জায়গা মতো রেখে দেওয়া। এসবের পরে সবার কাছ থেকে তার গুণমুগ্ধ প্রশংসা পাওয়া এ যেন নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে। 
এই গতানুগতিক জীবনের আড়ালে যে বৈচিত্র্যময় জীবন তাকে স্পর্শ করতে পারেনি-এমন কিন্তু নয়।
অল্প কিছুদিন আগেই সেই বৈচিত্র্যময় জীবনের পাখাটা কেটে ফেলতে হয়েছে তাকে, নির্মম সত্য বাস্তবতার জন্যে। 

দীপালি যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে তখন তার বাবা মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। একমাত্র সেই ছিলো তাদের বাবা -মার সংসারে। মা -মেয়ের ভরণ পোষণ কে করবে -এসব ভেবে মা বিয়ে করে ফেলে অন্য একজনকে।সেখানে ও দীপালির ঠাঁই হলো না।শেষ পর্যন্ত তার স্থান হয় খালার বাড়িতে। দীপালির খালা একটা সরকারি চাকুরী করে।  ঘর -দুয়ারের হালকা কাজ আর পড়াশোনা ভালোই কেটে যাচ্ছে সময়। 
স্কুল পাশ করে কলেজের বারান্দায় পা রাখতেই এক বৈচিত্র্যময় জীবন তাকে কাছে টানে।তার থেকে তিন বছরের বড় এক ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যায় সে।
দীপালি মেয়েটার ধৈর্য ছিলো প্রচুর যার কারণে কলেজের বারান্দায় পা রাখতে পেরেছিলো।
সম্পর্কটা শেষ হয় -ঠিক শেষ না,যেসব সম্পর্ক বন্ধুত্বের মতো হয়, স্বপ্নে ভরপুর হয় সেসব সম্পর্ক কখনো শেষ হয় না। যদিও এসব সম্পর্ক পূর্ণতা পায় না।কিন্তু জীবন্ত থাকে প্রতিটি স্বপ্নের স্মৃতিতে।

সেদিনটি ছিলো ঝকঝকে রোদের বর্ষা মৌসুম।সড়কের পাশের বিলে হাজার হাজার পদ্ম ফুটে আছে। সৌরভ এসে বলল,দীপা কি করবো বলতো?বাবাকে আর মাকে অনেক বুঝিয়েছি আমি এখন বিয়ে করবো না।কিন্তু তারা কিছুতেই বুঝতে চেষ্টা করছে না।প্রতিটা মূহুর্তে আমি অভিশপ্ত হচ্ছি তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছি না বলে।আমি যে তোমাকে ছাড়া কাউকে কোনো দিন কল্পনা করিনি এবং আজও করতে পারছি না।এদিকে তারা মায়ের দূর সম্পর্কের বোনের মেয়ের সাথে বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। আমি তোমার কথা তাদের সাথে বলেছি অল্প কয়েক দিন আগে। তখন তারা বলছে, আচ্ছা বিষয় টা তারা দেখবে। অথচ গতকাল এসে বললো আমার খালাতো বোন রিমিকেই বিয়ে করতে হবে। 
আমি এখনো চাকুরী ছাড়া।তাদের সাহায্য ছাড়া তোমাকে নিয়ে চলতে পারবো এমন পরিস্থিতিও খুঁজে পাচ্ছি না।এত অসহায় লাগছে নিজেকে।

দীপালির ধৈর্যের আড়ালে লুকিয়ে রাখে চোখের পানি।বলে সৌরভ, আর কিছু বলতে হবে না তোমাকে।আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি তোমার বাবা -মায়ের কথা মতো বিয়ে করে ফেলো তাতেই তোমার মঙ্গল হবে। 
ততক্ষণে ঝকঝকে রোদ দমিয়ে দক্ষিণ দিকের আকাশ কালো করে মেঘ জমেছে। অল্পক্ষণেই হয়তো ভারী বর্ষণ শুরু হবে।এ যে বর্ষার নিয়ম কখনো কাঠ ফাটা রোদ আর কখনো আকাশ ভেঙে ভারী বৃষ্টি। এই নিয়ম ভাঙ্গার সাধ্য কারো নেই। 

তেমনি নির্মম হলেও সত্য দীপালির মতো মেয়েদের গুণ থাকবে, প্রশংসা থাকবে, এসবও ঢেকে যাবে তাদের সামাজিক অবস্থান,বংশ মর্যাদার আড়ালে। এই সামাজিক অবস্থানের কারণেই যে সৌরভের বাবা-মার তাদের সম্পর্কে সায় ছিলো না -সেটা বুঝতে দীপালির বিলম্ব হলো না।
পদ্মফুলের সৌন্দর্যে সবাই বিমোহিত হয়, মুগ্ধ হয় অথচ কারো টবে তার স্থান হয় না,জলেই মানায়। 

দীপালির মতো মেয়েদের জীবন ও গতানুগতিক চর্চায় সবাই মুগ্ধ হয়, বিমোহিত হয়। অথচ ভালোবেসে পূর্ণতা পেয়ে কারো ঘরে বিশেষ মর্যাদায় শোভা মিলে না।

লেখক,
সাবিনা আক্তার
শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ,
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

user
user
Ad
Ad