`

কোরআন ও হাদীসের আলোকে সুদ বা রিবা

ইসলামের রিবা এবং বর্তমান সুদ সম্পর্কে স্পষ্ঠ ধারণা প্রদান ও পার্থক্য নিরূপনে কোরআন ও হাদীসের আলোকে অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক জনাব আকমল হোসেন স্যার অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় "সুদ, যাকাত এবং ইসলামী অর্থনীতি" নামক প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেছেন। জালালাবাদ২৪.কম পত্রিকার তা ‌ধারাবা‌হিকভাবে লেখা হ‌বে। (১ম ও ২য় অংশ প্রকাশের পর আজকের ৩য় পর্ব)
  • Views: 35264
  • Share:
আগষ্ট ৪, ২০২০ ১৯:১৮ Asia/Dhaka

আকমল হোসেন:: সুদ সংক্রান্ত ১ম আয়াত ‘সূরা রূম’ এ নাযিল হয়েছে। আয়াতটি হলো “যে সুদ তোমরা দিয়ে থাকো, যাতে মানুষের সম্পদের সাথে মিশে তা বেড়ে যায়, আল্লাহর কাছে তা বাড়ে না” (সূরা রূম-৩৯)। এটি হলো সুদ সংক্রান্ত প্রথম আয়াত, যা মক্কায় নাযিল হয়েছে। এ আয়াতে সুদ নিষিদ্ধ করা হয়নি, কিন্তু সুদ সম্পর্কে আল্লাহপাক নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন, অর্থাৎ সুদ আল্লাহর কাছে বাড়ে না।

(ক) উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রদান করতে গিয়ে তাফসীরকারকরা দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। প্রথম অংশে রয়েছেন হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (রাঃ), কাতাদাহ (র), ইকরামাহ (র.) প্রমুখ। তাদের বক্তব্য হলো এ আয়াতে রিবা (সুদ) বলতে নিষিদ্ধ সুদকে বুঝানো হয়নি। এখানে রিবা বলতে এ উদ্দেশে দান, তোহ্ফা বা হাদিয়া দেয়া হয়, যাতে বিশ্বাস থাকে গ্রহীতা ফেরত দেয়ার সময় এর চেয়ে বেশি পরিমাণ (রিবা বা সুদ) ফেরত দেবে। যেমন আমাদের বর্তমান সমাজে বিয়ে উপলক্ষে উপহার দেয়া হয় এবং মনের ভিতরে সংকল্প রাখা হয় আমার সময় এর চেয়ে বেশি পরিমাণ উপহার পাওয়া যাবে। উপরোক্ত তাফসীরকারকদের নিকট এ ধরনের বৃদ্ধি (রিবা বা সুদ) প্রত্যাশা করা নিন্দনীয়, কিন্তু নিষিদ্ধ নয়।

(খ) দ্বিতীয় অংশে রয়েছেন হযরত হাসান বশরী (র.), সুদ্দী (র.), আল্লামা আলুসি (র.) প্রমুখ। তাদের বক্তব্য হলো এখানে নিষিদ্ধ অর্থাৎ হারাম রিবার কথা বলা হয়েছে, যদিও এ আয়াতে রিবা বা সুদ নিষিদ্ধ করা হয়নি, বরং পর্যায়ক্রমে সুদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যেমন মদ নিষিদ্ধ করার পূর্বে অনেকগুলো আয়াত নাযিল করা হয়েছিল। সুরা আন্ নাহল এর ৬৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে মদ পবিত্র রিযিক নয়। সূরা বাকারার ২১৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে মদের ক্ষতি এর লাভের চেয়ে বেশি। এরপর সূরা আন্ নিসা এর ৪৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাযের ধারে কাছে যেয়ো না। এরপর মদকে চুড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ করা হয় সূরা মায়েদার ৯০ নং আয়াতে। তাই তাদের বক্তব্য হলো একইভাবে পর্যায়ক্রমে সুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং উপরোক্ত আয়াতের দ্বারা সুদ আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়, তা সেই সময়কার মুসলিমদের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। 
(২) “তারা সুদ গ্রহণ করে, যা করতে তাদের নিষেধ করা হয়েছিল” (সূরা নিসা - ১৬১)। আয়াতের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী এখানে তারা বলতে ইয়াহুদীদের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ তাওরাতেও সুদ নিষিদ্ধের কথা বলা হয়েছে।
(২০) “হে ঈমানদারগণ চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খাওয়া বন্ধ কর” (সূরা আলে ইমরান-১৩০)। সূরা ইমরানের এ আয়াতে সুপষ্টভাবে সুদকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে যারা সুদ খেতে চান, তারা এ আয়াতের আলোকে যুক্তি দেখাতে লাগলেন, আল্লাহপাক চক্রবৃদ্ধি সুদ নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু যে সুদ চক্রবৃদ্ধি সুদ নয়, তা নিষিদ্ধ নয়, অর্থাৎ সরল সুদ হলো বৈধ। বর্তমান গুটিকয়েক সুদপ্রেমিদের এই উদ্ভট যুক্তি প্রাচীন তাফসিরকারক হতে এখন পর্যন্ত কোন তাফসীরকারক দেননি। কারণ সুদভক্তরা সুদ সংক্রান্ত কোরআনের সর্বশেষ আয়াত দেখতে নারাজ। আর তাফসীরকারকরা সমস্ত কোরআন অধ্যয়ন করে এবং কোন সময় কোন সূরার কোন আয়াত কোন প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে, তা বিবেচনা করেই তাফসীর করে থাকেন। আর  আমরা সারা জীবন গণিত পড়ে বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ে তাফসীরকারক হয়ে যাই! আবার ব্যাখ্যা দেয়াও শুরু করি! 

(৩) “যারা সুদ ভক্ষণ করে, তারা শয়তানের স্পর্শে মোহাচ্ছন্ন হয়ে দাড়িয়ে থাকবে, যেহেতু এরা বলে সুদ তো ব্যবসা-বাণিজ্যের মত। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। ------যে নিবৃত্ত হয়, সুতরাং যা অতীত হয়েছে (অর্থাৎ এই আদেশের পূর্বে যে সুদ ভক্ষণ করা হয়েছে), তার কৃতকর্ম আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর (অর্থাৎ ক্ষমা পাবে), কিন্তু যারা পুনঃ (সুদ) গ্রহণ করবে, তারা জাহান্নামি এবং সেখানে চিরদিন থাকবে।” (সূরা বাকারা - ২৭৫)
“হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং যদি তোমরা মুমিন হও, তবে সুদের মধ্যে যা অবশিষ্ট রয়েছে, তা বর্জন কর।” (সূরা বাকারা - ২৭৮)। 
“কিন্তু যদি তা না কর, তবে আল্লাহ এবং তার রাসুলের পক্ষ হতে যুদ্ধের ঘোষণা থাকবে।” (সূরা বাকারা - ২৭৯)
“আর তোমরা সেই দিনের ভয় কর-যেদিন তোমরা আল্লাহর পানে প্রত্যাবর্তিত হবে, তখন যে যা অর্জন করেছে, তা সম্পূর্ণরূপে প্রদত্ত হবে এবং তারা অত্যাচারিত হবে না।” সূরা বাকারা - ২৮১  

(ক) বর্তমান সময়ে মুসলিম পরিচয় রাখতে চাই এবং সুদও খেতে চাই, তাদের জন্য সূরা বাকারার ২৭৫ হতে ২৮১ নং আয়াত মোটেই সুখকর নয়। এখানে কিন্তু চক্রবৃদ্ধি সুদের কথা বলা হয়নি। সুদের আগে কোন বিশেষণ (যেমন চক্রবৃদ্ধি) যোগ করা হয়নি। অর্থাৎ সূরা বাকারা এর মাধ্যমে সমস্ত ধরনের সুদকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আর সুদ সংক্রান্ত শেষের আয়াতগুলো সূরা বাকারা-তে নাযিল হয়। 

(খ) ২৭৫ নং আয়াত ভাল করে লক্ষ্য করুন, “এরা বলে সুদ তো ব্যবসা-বাণিজ্যের মত। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” দেখুন বর্তমান সময়ে আমরা বলছি, মহাজনি সুদ হারাম কিন্তু ব্যাংকের সুদ বা সরকারের সুদ হারাম নয়! সত্যিই কথার মধ্যে কী মিল তৎকালীন আরবদের সাথে!
(গ) সূরা বাকারার ২৭৫ নং আয়াতে অত্যন্ত স্পষ্ট করে সুদ এবং ব্যবসার মধ্যে পার্থক্য রচনা করা হয়েছে। একটিকে হারাম এবং অপরটিকে হালাল বলা হয়েছে। নিচে সুদ ও ব্যবসার মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, তা উল্লেখ করা হলো -
(I) সুদের উৎস হলো ঋণ। এখানে একটি নির্ধারিত মেয়াদ শেষে নির্দিষ্ট প্রাপ্তি ঘটে কিন্তু কোন বিনিময় হয় না। যেমন আপনি ১০০ টাকা দিলেন এবং নির্ধারিত মেয়াদ শেষে ১০০ টাকা ফেরত আনলেন (বিনিময় হলো না) এবং সেই সাথে নির্দিষ্ট প্রাপ্তিও আনলেন। বর্তমান সুদি ব্যাংকে আমরা এই নিয়মেই টাকা রাখি।
(II) ব্যবসা হলো ক্রয়-বিক্রয়। এখানে বিনিময় আছে। যেমন আপনি চালের বিনিময়ে গম ক্রয় করলেন। আবার বর্তমান অর্থভিত্তিক অর্থনীতিতে টাকার বিনিময়ে গমও ক্রয় করতে পারেন। এখানে বিনিময় হচ্ছে টাকার সাথে গম।

ব্যবসাতে কোন নির্দিষ্ট প্রাপ্তি নেই। আপনার মুনাফা বেশি হতে পারে, কমও হতে পারে, আবার ক্ষতিও হতে পারে। ব্যবসার জন্য ঋণ নেয়া যেতে পারে। কিন্তু ঋণদাতাকে ঋণের সমপরিমাণ ফেরত দিতে হবে। যদি ঋণদাতা ঋণের অতিরিক্ত দাবী করে, তবে এটি হবে সুদ, যা হারাম। ঋণদাতা যদি অতিরিক্ত নিতে চায়, তবে তাকে ব্যবসায় অংশীদার হতে হবে। যখনই সে ব্যবসায় অংশীদার হবে, তখন তার মুনাফা এবং মূলধন অনিশ্চিত হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে মুনাফা বেশি হতে পারে, কমও হতে পারে, আবার ক্ষতিও হতে পারে। বর্তমান সময়ে এর উদাহরণ হলো বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার। শেয়ারের ডিভিডেন্ট কত হবে, সেটি কিন্তু সুদের মত কেউ নিশ্চিত হয়ে বলতে পারবে না। কোম্পানির ক্ষতি হলে অবশ্যই মূলধনদাতাকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতি স্বীকার করতে হবে। বর্তমান সময়ে ব্যাংকের আচরণ যদি গ্রাহকের সাথে কোম্পানির মত হয়ে যায়, তবে ব্যাংক হতে প্রাপ্তিকে আর সুদ বলা যাবে না।

(৪) ঋণের উপর যে সুদ, যা ভোগের জন্য নেয়া হউক অথবা ব্যবসার জন্য নেয়া হউক, তা কোরআনের আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়েছে, এটি বুঝতে তৎকালীন আরবদের কারো বাকী ছিল না। রাসুল (সাঃ) এর হাদীসের মাধ্যমে আরও কিছু সুদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা তৎকালীন আরবদের নিকট স্পষ্ট ছিল না। এ ধরনের সুদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে যাতে মানুষ সুদের ধারে-কাছেও যেতে না পারে।

(৫) নুমান ইবনে বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) বলেন, হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট, উভয়ের মাঝে বহু অস্পষ্ট বিষয় রয়েছে। যে ব্যক্তি গুনাহের সন্দেহযুক্ত কাজ পরিত্যাগ করে, সে ব্যক্তি যে বিষয়ে গুনাহ হতে সুস্পষ্ট, সে বিষয়ে অধিকতর পরিত্যাগকারী হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি গুনাহের সন্দেহযুক্ত কাজ করার দুঃসাহস করে, সে ব্যক্তির সুস্পষ্ট গুনাহের কাজে পতিত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। গুনাহসমূহ আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা, যে জানোয়ার সংরক্ষিত এলাকার চারপাশে চরতে থাকে, তার ঐ সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করার সম্ভাবনা রয়েছে। (সহিহুল বুখারী, ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায়)। যারা বুদ্ধিমান, যারা ঈমানদার তারা এই হাদীস হতেই ইসলামী শরীয়াহ এর মূলনীতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেয়ে যাবেন। তাই সুদের মত স্পষ্ট বিষয়কে অস্পষ্ট বা সন্দেহযুক্ত করেও কিন্তু কোন রেহাই পাওয়া যাবে না।

(৬) আবু বাকরা (রাঃ) বর্ণিত, নবী (সাঃ) সমান সমান ছাড়া রূপার বদলে রূপা, সোনার বিনিময়ে সোনা ক্রয়-বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন এবং তিনি রূপার বিনিময়ে সোনা এবং সোনার বিনিময়ে রূপার বিক্রয়ে আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী অনুমতি দিয়েছেন (সহীহুল বুখারী, তৌহিদ প্রকাশনি -২১৭৫, আ. প্র-২০২৫, ই.ফা-২০৪০, মুসলিম, আহমাদ)। 

মালিক ইবনু আওয়াস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, উমর (রাঃ) বলেন, রাসুল (সাঃ) বলেছেন নগদ নগদ না হলে স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণের বিক্রয়, গমের বদলে গমের বিক্রয় এবং যবের বদলে যবের বিক্রয় সুদ হবে (সহীহুল বুখারী, তৌহিদ প্রকাশনি -২১৭৪, আ. প্র-২০২৪, ই.ফা-২০৩৯)। 

আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসুল (সাঃ) বলেছেন, দুই সা মিশ্রিত খেজুরের বিনময়ে এক সা উত্তম খেজুর ক্রয়-বিক্রয় করবে না। বরং মিশ্রিত খেজুর দিরহামের বিনিময়ে বিক্রয় করে দিরহাম দিয়ে উত্তম খেজুর ক্রয় করবে। (সহীহুল বুখারী, তৌহিদ প্রকাশনি -২২০১-২২০২, আ. প্র-২০৪৬, ই.ফা-২০৬১)। 

এছাড়াও আরও অসংখ্য হাদীস রয়েছে, যা ভয়ংকর অপরাধ হিসেবে গণ্য মূল সুদের কাছে মুসলিমরা যাতে পৌঁছাতে না পারে, সে জন্য আশ-পাশের পথগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ (২৩) নং এ রাসুল (সাঃ) যে সংরক্ষিত এলাকার কথা বলেছেন, সেই সংরক্ষিত এলাকার আশপাশ এলাকা বিভিন্ন হাদীস দ্বারা চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ করে গিয়েছেন। 

মূল সুদ হলো ১০০ টাকা ঋণ দিয়ে ১১০ টাকা ফেরত আনা। সেই পথ কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করার জন্য রাসুল (সাঃ) বলেছেন, দুই সা মিশ্রিত খেজুরের বিনময়ে এক সা উত্তম খেজুর ক্রয়-বিক্রয় করবে না। অর্থাৎ সমজাতীয় দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় করো না। বরং মিশ্রিত খেজুর দিরহামের বিনিময়ে বিক্রয় করে দিরহাম দিয়ে উত্তম খেজুর ক্রয় করবে। যদি রাসুল (সাঃ) এক সা উত্তম খেজুরে বিনিময়ে দুই সা মিশ্রিত খেজুর গ্রহণ বৈধ ঘোষণা করতেন, তবে একসময় ১০০ টাকা ঋণ দিয়ে ১১০ টাকা ফেরত আনা বৈধ হয়ে যেত। 

(৭) আজ পর্যন্ত সকল মুসলিম মনীষী ইসলামে সুদ নিষিদ্ধ - এ বিষয়ে কোন মতবিরোধ করেননি। এমনকি তাদের মধ্যে চক্রবৃদ্ধি সুদ নিষিদ্ধ, না সরল সুদ নিষিদ্ধ - এ নিয়ে কোন মতবিরোধ ছিল না। আবার তারা এ নিয়েও কোন মতবিরোধ করেননি, ভোগবাবদ ঋণের সুদ নিষিদ্ধ, না ব্যবসায়ে ব্যবহৃত ঋণের সুদ নিষিদ্ধ ? 

(৮) অনেকে প্রশ্ন করেন, পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রে সুদ নিষিদ্ধ ? আমি তাদের প্রশ্ন করব, পৃথিবীর বয়স কত ? তারা কি জানেন একসময় পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে সুদ ছিলা না ? রাসুল (সাঃ) এর মৃত্যুর পর খোলেফায়ে রাশেদীন শাসন করেছিলেন ৩০ বছর। এরপর উমাইয়া রাজবংশ এবং উমাইয়াদের পর আব্বাসীয়রা এই পৃথিবীর বড় একটি অংশ শাসন করেন। আব্বাসীয়দের পর আসে ওসমানীয় খেলাফত। ওসমানীয় খেলাফতের পতন ঘটে ১৯২২ সালে। প্রায় ১৩০০ বছর সারা পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় ইসলামী সাম্রাজ্য ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে শাসন ক্ষমতায় জালিম শাসকও যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন উমর ইবনুল আব্দুল আজীজের মত বহু উদার শাসকও। তখন সাম্রাজ্য পরিচালিত হত ইসলামী শরীয়াহ আইনের ভিত্তিতে। তর্কবাগীশরা বলতে পারেন, সে সময় অনেক ক্ষেত্রে আইনের বিচ্যুতি ঘটেছিল। সেটি কেউ অস্বীকার করছে না। এজন্যই বলা হয়েছে শাসন ক্ষমতায় জালিম শাসকও যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন উমর ইবনুল আব্দুল আজীজের মত বহু উদার শাসকও। মোট কথা হলো তখন ইসলামী শরীয়াহ আইন ছিল দেশের আইন। ফলে দীর্ঘ ১৩০০ বছর ইসলামী সাম্রাজ্যে সুদ কোন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। বরং সুদ ছাড়াই মুসলিম ব্যবসায়ী ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনা করে গিয়েছেন। কিন্তু পাশাপাশি খৃস্টান বিশ্বে সুদের বিকাশ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হয়েছিল-যা ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। খুব সহজেই উইকিপিডিয়াতে সার্চ দিয়ে বক্তব্যের সত্যতা পেয়ে যাবেন। দেখবেন সুদের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে উইকিপিডিয়াতে খৃস্টান বিশ্ব এবং ইয়াহুদীদের কথা এসেছে, কিন্তু মধ্যযুগে সবচেয়ে অগ্রসর মুসলিম সাম্রাজ্য সম্পর্কে কোন কথা নেই। সেই সময় জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর মুসলমানরা চিকিৎসা শাস্ত্রে, দর্শন শাস্ত্রে, রসায়নে, ভূগোলে, ইতিহাসে, ব্যবসা-বাণিজ্যে অবদান রাখলেও সুদভিত্তিক অর্থনীতিতে তাদের কোন অবদান নেই। কারণ ইসলামীয় শরীয়াহ অনুযায়ী সুদ হলো একটি কঠিন এবং জঘন্য গোনাহের কাজ, যা তৎকালীন মুসলিমদেরকে সুদ হতে দূরে রেখেছে।

(৯) ইসলামী সাম্রারজ্যর শেষের দিকে মুসলিমদের ভিতর বিভিন্ন ধরনের জাতীয়তাবাদ, ইউরোপীয় খৃস্টানদের অনুসরণ, বিভিন্ন স্থানে খৃস্টান উপনিবেশের অধীনে জীবন-যাপন করা, কোন কোন এলাকায় সাম্রাজ্য  হারানোর পর শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসরতা ইত্যাদি চেপে বসে। একসময় অনগ্রসর জাতি হিসেবে মুসলিম সমাজের আব্দুর রহমান, আব্দুর রহিমরা বিজয়ী ইংরেজ জাতির ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি গ্রহণ করে হয়ে গেলেন মুসলিম জাতির কর্ণধার, কিন্তু মনমগজে থেকে গেলেন রবার্ট ক্লাইভ বা লর্ড কার্জনের উত্তরসূরী হিসেবে। যার ফলে আজ বিজাতীয় উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত আব্দুর রহমান বা আব্দুর রহিমরা বলে থাকেন বর্তমান সুদ হারাম নয়!                                                                            (চলবে..............)

লেখক,
আকমল হোসাইন
সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ, মৌলভীবাজার।

user
user
Ad
Ad