`

উদর ফ্রিজে থাকুক সবার

  • Views: 611
  • Share:
আগষ্ট ১, ২০২০ ১০:৫৩ Asia/Dhaka

প্রভাষক কামরুন নাহার আক্তার: চারিদিকে একটা ভিন্ন আমেজ থাকার কথা ছিল, রাস্তার চৌকাঠ কিংবা তার কিছু দূরত্ব পরপর ভেসে আসা কিছু শব্দের সমাহার থাকার কথা ছিল - ও ভাই, কত নিল? রাস্তাঘাট, বাড়ির আঙিনা কিংবা খোলা মাঠে ছোট ছোট ছেলেমেয়ের উৎসুক দৃষ্টিতে হইহুল্লোড়ে ঘাস, লতাপাতা, খড় প্রভৃতি নিয়ে প্রিয় কুরবানির পশুটার সাথে সারাটা দিন মেতে থাকার কথা ছিল। থাকার কথা ছিল অনেক কিছুই। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানো পরিবারেরও ইচ্ছা ছিল এই ইদটাও একসাথে কাটানোর স্বপ্ন ছিল।

জলস্রোতে ভেসে যাওয়া শেষ আশ্রয়টুকু জীবনেরও ইচ্ছা ছিল অন্তত কিছু মাংস পাবে প্রতিবেশির কাছ থেকে পরিবারের সাথে একসাথে ভুরিভোজ করবে। করিম, সমির, জয়নুলের মতো হাজারো মানুষের ইচ্ছা ছিল চাকুরিটা দিয়ে তো পরিবারের মুখে অন্তত কিছুটা ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করে দিবে। আরাফার ময়দান লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক ধ্বনিতে মুখরিত হওয়ার ইচ্ছা ছিল।

আজ ঈদ। কিন্তু নেই ততটা আমেজ। শংকা যে খুব একটা বেশি আছে তা-ই বা বলি কিভাবে! পরিস্থিতি যা-ই হোক পরিবেশ যে ভিন্ন কথা বলে। 

অনেকটুকু পথ পাড়ি দিলাম। হয়ত কিছু দূরত্ব পরপর গরুর বাজার, কুরবানির পশুতে ভরপুর দেখার একটা ইচ্ছাও থাকতে পারতো। অনেক সময় পশুর হাটের জন্য যখন দীর্ঘ যানজটে বসে থাকতে হতো, নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় গাড়িতে কাটাতে হতো অনেকটা বিরক্তি নিয়ে তখন অনেক রাগ হতো। কিন্তু আজ আবারও বিরক্ত হচ্ছি।  আগের সেই চেনা রূপ না দেখার জন্য বিরক্ত হচ্ছি; কুরবানির পশু আর দামের কষাকষি দৃষ্টিপাত না হওয়ায় বিরক্ত হচ্ছি। গহীন মনে একটা শঙ্কা গ্রাস করছে - আমরা আর কী কী হারাতে বসেছি। আজ বারবার স্মৃতিপটে ভেসে আসছে - বাসায় ফেরার পথে যখন কুরবানির হাটে পশুদের মাঝে নিজের পথটাই হারিয়ে ফেলেছিলাম তখন অজানা শঙ্কায় কতটা ভীত ছিলাম।

হয়ত ভেবেছিলাম, শ্বশুরবাড়ির টাকায় কিংবা পাঠানো পশু দিয়ে কুরবানিটা অন্তত এবার নিজেকে কলঙ্কমুক্ত করতে পারবে। কিন্তু না; যখন দৃশ্যপট হলো মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে নিজের প্রিয় ছাগলটা পাঠিয়ে দিচ্ছে, কুরবানির খরচ পাঠাতে হচ্ছে, গরুর রানটা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে, তখন ভাবি আমরা যতই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে প্রস্তুত থাকি না কেন আমরা কি আদৌ পারবো আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে?

নামায আদায় না করলে আমরা ছোট হই না কিন্তু কুরবানি না দিলে আমরা ছোট হয়ে যাই। আমরা মানতে নারাজ  যে কুরবানি হলো আর্থিকভাবে সামর্থ্যবানদের জন্য। শ্বশুরবাড়ির অর্থ কিংবা পশুতে কুরবানি হয় না, এটা শুধু লোক দেখানো। কারণ এটা আমার নিজের সামর্থ্য নয়। 

সময়ের শিক্ষা বড় শিক্ষা। কিন্তু তা কতটুকু গ্রহণ করছি?  কতটুকু প্রয়োগ করছি বাস্তবজীবনে? একটিবার চিন্তা করি পানিবন্দী মানুষগুলোর দুর্বিসহ একটি ইদের কথা; প্রিয় মানুষটা হারানো স্ত্রী, সন্তান, পুত্র-কন্যা, মা-বাবা কিংবা পরিবারের কথা; উপার্জনের দ্বার রুদ্ধ ব্যক্তির কথা; চাকুরি হারানো ভাই কিংবা বোনটির কথা যে ছিল পরিবারের একমাত্র ভরসার আশ্রয়স্থল।

আছি তো বেশ, আলহামদুলিল্লাহ। একটু না হয় শিক্ষা নেই, একটু না হয় শিখি পরিস্থিতি থেকে। কুরবানির মাংসটা না হয় এবার উদর ফ্রিজে থাকুক সবার। মিলেমিশে ভালোবেসে পাশে দাঁড়াই সকলে সকলের। ইনশা আল্লাহ, আবার দেখবো নতুন ভোর। দূর হবে অপসংস্কৃতি, সামাজিকতার নামে অসামাজিকতা। আসবে আবার ইদের আমেজ; তবে এক নতুন রূপে।

পুরাতন কিছু অপসংস্কৃতির খোলস ছেড়ে সম্পূর্ণ এক নতুন রূপে। আরাফার ময়দান আবার মুখরিত হবে লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক ধ্বনিতে এবং স্বপন দেখি সেই কাতারে নিজেকে।  স্রষ্টার আনুগত্য প্রদর্শন এবং একই সাথে হবে মানবতার জয়; মানবধর্মের জয়।

লেখক:
কামরুন নাহার আক্তার
প্রভাষক,
দর্শন বিভাগ, মাস্টার নজির আহমদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, নাপোড়া,
বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।

user
user
Ad
Ad