`

পরিচিতা

  • Views: 1448
  • Share:
জুলাই ২৫, ২০২০ ১৯:৫৭ Asia/Dhaka

ফাহমিদা ফাম্মী:: বজলুর আজ মন ভীষণ ভাল। বসে বসে পান চিবুচ্ছে, দুপুরে নান্নার বিরিয়ানি খেয়ে পেট প্রায় টইটুম্বুর। একটু যা জায়গা বাকি ছিল তাও এই পান আর বোরহানি দিয়ে পরিপুর্ন! এই মন ভাল থাকার খবরটা দিতেই বজলু রুবির কাছে এসেছে। রুবির সাথে তার পরিচয় বছর পাঁচেক আগে থেকে। রুবির বয়স তিরিশ ছুঁই ছুঁই আর বজলুর বয়স কত তা সে নিজেও জানে না। তবে বজলুর এক দুসম্পর্কের মামা আছেন। যাকে সে কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে বয়স সম্পর্কে। তার এক এক বার এক এক উত্তরে বজলু খুব হতাশ! কখনো বলে বিশ, কখনো পয়তিরিশ কখনো বা তিরিশ!

একেক সময়ে এক এক বয়স মনে হয় নিজের, কখনো নিজের সাহস দেখে নিজেকে পয়তিরিশ বছর বয়সী মধ্যবয়স্ক মনে হয়। কখনো বয়ঃসন্ধি পার হওয়া প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া যুবক। তবে এই বিশ বছরের মনটাও যে বজলুর আছে তা সে শুধু টের পায় রুবির কাছে আসলেই। রুবিকে এই তল্লাটে সবাই রমিসা বাই নামেই চেনে। বজলুর সাথেও রুবির পরিচয় ছিল রমিসা বাই নামেই। 

কিন্তু তার কিছুদিন পর এক রাতে রমিসা বলল আমারে রুবি নামেই ডাকবা, আমার সত্যি সত্যি নাম রুবি। মা এই নামেই ডাকতেন। বজলু খানিকটা অবাক হল! এই পাড়ার মেয়ে মানুষ গুলো তাদের সত্যিকারের নাম কাউকে বলে না। কেউ জানতে চাইলেও বলে না। তবে রমিসা কেন বলল! রমিসা সুন্দরী,ছিপছাপ দেহ, চুল লম্বা,কথা বার্তা শুনলে মনে হয় পড়াশোনাও জানে। বজলুর মত এলেবেলে পাশ নয়! তবে শুধু পান খায়, এই দেখে দেখে বজলুও পান খাওয়া শিখে গেছে, সেও এখন খাওয়ার পরে একটা পান খায়, মিষ্টি পান। পানের পিক ফেলে একটা ছোট কৌটায়।কৌটাটা তার পকেটেই থাকে। রমিসা ওরফে রুবিকে বজলুর বেশ ভাল লাগে। 
বজলু রুবির ফিক্সড কাস্টমার। রুবির সাথে পরিচয় হওয়ার পর আর কারো সাথেই রাত কাটায় নাই বজলু। সব রাতেই তার রুবি চাই...রুবির সাথে তার বন্ধুত্ব নেই, অবশ্য বজলুর ছোট বেলা থেকেই কোন বন্ধু নেই। সে বরাবরই একা। রুবিকে সে ভালবাসে এমনও না। তবে রুবির সাথে তার সম্পর্ক কি? মাঝে মাঝেই এই বিষয়টা ভাবায় তাকে। তখন সে একটা সম্পর্ক দাড় করায়। সম্পর্কের নাম ‘পরিচিতা’। 

আজকে বজলুর মন ভাল, কেন ভাল সে সেটা শুধু মাত্র রুবিকেই বলতে চায়। রুবির ঘর ভেতর থেকে লাগানো। বিকেল বেলা বজলু তেমন একটা আসে না এই দিকে। কিন্তু আজ স্পেশাল কাজ বলেই বিকেলে চলে আসা... রাতে ক্ষেপ মারতে যাবে। কিসের ক্ষেপ? অপেক্ষা করুন একটু পর বলছি। 

রুবির ঘর থেকে প্রায় পঞ্চাশ উর্ধ এক লোক বের হল। চেহারা দেখে বেশ বড়লোক মনে হচ্ছে। সুট টাই পরা, হালকা ধাঁচের গোফ আছে। খুব মোটা না আবার শুকনাও না। বেশ আভিজাত্যের একটা ভাব আছে লোকটার মধ্যে। লোকটা বজলুর দিকে তাকিয়ে কেমন একটা চোখ করল! ভাবটা এমন যে ছি! এমন পাড়ায় কেউ আসে! বজলুর মত খারাপ লোকরাই হয়ত আসে। বজলু তার সামনের দাঁতগুলো বের করে এক হাসি দিল... বজলু মনে মনে বলল হালা কেমনে তাকায়! আরে বেটা তুই যার কাছে ছিলি তার কাছে আমি আছি বছর ধরে। আর তুই নতুন মাল! তর আর আমার মধ্যে তফাৎ কই! ধুর হালার পো! 

রুবির ঘরে ঢুকেই রুবির কোমর জড়িয়ে ধরলো বজলু। রুবি বজলুর শরীরের ঘ্রাণ জানে। একটা আলাদা সোদা গন্ধ সে টের পায় বজলুর কাছে আসলে। হাজার পুরুষের থেকে যে গন্ধকে আলাদা করা যায়। কাউকে ভালবাসলে বোধহয় এমনই হয়! গন্ধটাও ভালোবাসার হয়ে যায়। ছোট্ট শিশুরা যেমন মায়ের শরীরের ঘ্রাণ শুঁকলেই চিনতে পারে রুবিও তেমননি বজলুকে চেনে। বজলুর স্পর্শ চেনে। রুবি জিজ্ঞেস করল কাহিনী কী? আজ দেখি আপনের মন অনেক ভালা? কি হইছে টা কী?

বজলু বিছানায় বসতে বসতে বলল আজ বিরাট এক অর্ডার পাইছি। আজকে রাত্রেই কাম সারা লাগবো। পুরা পঞ্চাশ হাজার টাকা দিব... 
রুবি বেশ খুশি হয়ে। কি কন! এত!!! 
হ এতই তো। 
তবে এক মহিলা দিল ওর্ডারটা। আজকে রাইত ১০ টায় খুনটা করা লাগব। মহিলার জামাইরে। তার বাসার সামনেই। একটা খোলা জায়গা আছে অইখানে এই লোক রাত্রে হাটতে বাইর হয়। তখনই কাজটা সারবো... 
রুবি খুশি হয়ে বলল কিন্তু মিয়া এত টাকা দিয়া তুমি করবা কি?

বজলু বলল আরে কি করমু এই দেখ রাইতের বাসের টিকিট কাইটা আসছি। আজকে রাইতেই তোরে নিয়া কক্সবাজার যামু। খালি টিভিত দেখি কত কত মানুষ যায়, ঘুরতে বেড়াইতে। মাঝে মধ্যে আমারো তো মন চায় তরে নিয়া একটু ঘুরি... কি কস যাবি না?

রুবি মুচকি হাসলো। এই একটা মানুষ তার মনের কথা জানে... সবাই তো কাস্টমার, নিজের প্রয়োজনে আসে নিজের প্রয়োজনেই চলে যায়। কেউ একবার জিজ্ঞেসও করে না যে রুবির কি আজ মন ভাল? শরীর ভাল? কত কত দিন এমন যায় শরীর সায় দেয় না তাও তার বিছানায় যেতে হয়... কিন্তু বজলু আলাদা। কত কত রাত এমন গেছে সারারাত গল্প করেই রাত পার করছে দুইজনে। মাঝে মধ্যে তার ঘরের হাসির শব্দ শুনে পাশের ঘরে মিলি চিৎকার দিয়ে বলছে আরে চুপ কর, আমাগোর ডিস্টার্ব হইতেছে। বজলুকে যে রুবি ভালবাসে এই কথাটা কোন দিন বলা হয় নাই। যে মানুষটা বোঝ হওয়ার পর থেকে কয়টা খুন করছে সে নিজেও গুনে বলতে পারবে না, সেই মানুষটার জন্য রুবি মনে বিশাল জায়গা করে রেখেছে। মানুষটাও তাকে ভালবাসে। কিন্তু নিজেও বোঝে না। পরিচিতার মতই দূরের না কাছেরও না এমন কেউ হয়েই কি কেটে যাবে এই জীবন?

রুবি তাকিয়ে আছে বজলুর দিকে। একটা মানুষের পান খাওয়ার দৃশ্যও এত সুন্দর হতে পারে? তার জানা নাই... কতশত কাস্টমারের ভিড়ে এই একটা লোক তার মনের খবর জানে। যাকে তার কলিজা খুলে দিতে মন চায়। কিন্তু পারে না। 
বজলু হুট করে রুবির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো বিয়া করবি আমারে?
তবে শর্ত একটাই। অন্য লোকের কাছে আর যাওন যাইব না। শুধু আমার থাকবি। আমার লাইগা রানবি, ঘর গুছাবি। করবি?
রুবি তাকিয়ে আছে বজলুর দিকে... উত্তর তার জানা। সে মনে প্রাণে এইটাই চায়। উত্তর দিবে ঠিক এই সময় বজলু ঠা ঠা শব্দে হেসে ফেলল। 
আর বলল কারে কি জিগাই আমি... তুই নিশ্চয়ই না করবি। আর হ্যা বা করবি কেন? আমার মত সিরিয়াল কিলাররে বিয়া করার চেয়ে পানিত ডুইবা মরা সহজ... আইচ্ছা আজকে রাইতে দেখা হইব। ১২ টায় বাস। ১১ টার দিকে ফার্মগেইটের মোড়ে দাড়াইস। আমি সোয়া এগারোটার দিকে চইলা আসমু। মালডারে সরাইতে মিনিমাম ১০ মিনিট... এর পড়েই চইলা আসমু। অপেক্ষায় থাকিস।

রুবির কিছু বলার ছিল, বলল না। বজলুর চলে যাওয়া দেখলো। কেউ চলে গেলে তার খারাপ লাগে না। আজকেও লাগছে না। মনে হচ্ছে একটু পরেই রাত এর পরেই নতুন দিনের শুরুর অপেক্ষা। আজকে বলেই দিতে হবে বজলুকে যে সারাটা জীবন সে বজলুর জন্য চুলায় রান্না চাপিয়ে অপেক্ষা করতে চায়। বজলু একটা খুন করুক কিংবা হাজারটা খুন করুক... তাতে তার কিছুই যায় আসে না। বজলুর নরম মনটাকেই সে ভালবাসে, বার বার ভালবাসে... 

রাত ১১ টা।। রুবি দাড়িয়ে অপেক্ষায়। বজলু যে কোন সময় এসে বলবে, কিরে দাঁড়াইতে কষ্ট হয় না তোর? পান খাবি? মিষ্টি পান?
সময় যায় বজলু আসে না... দাঁড়াতে দাঁড়াতে এইবার সত্যি সত্যি পায়ে ব্যথা শুরু হয় রুবির। মিনিট পার হয়, ঘন্টা পার হয়। বজলুর দেখা নাই।। 
রাত প্রায় ২ টা বাজে। এক বিল্ডিং এর রেডিয়াম আলোয় জ্বলতে থাকা ঘড়ী জানান দেয় অপেক্ষার শেষ হোক... তখনই একটা সিএনজি এসে থামে রুবির সামনে... ড্রাইভার মুখ বের করে বলে, অই মাইয়্যা রেইট কত? রুবি হেটে একটু সামনে যায়, আর খুঁজতে থাকে বজলুকে। বজলু কি রাস্তার অই পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখছে রুবি কে? নাকি একক্ষনই চলে এসে ড্রাইভার কে বলবে এই হালা দূর যা...এইখানে তোর কাজ নাই... রুবি ঠায় দাঁড়িয়ে। সি এনজি ওয়ালা বলে বাড়ায়া দিমু নে। চইলা আয়... রুবি আরো এগিয়ে যায়।পাত্তা না পেয়ে সিএনজি ওয়ালা বিরক্ত হয়ে চলে যায়... 

রুবির চোখ জলে ঝাপসা হয়ে আসে। হাটুতে ব্যথা শুরু হয়, তখন একটা ট্রাক এসে থামে আবারো, একই ভাবে ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে, কি রে নাম কি তোর? আর তোর রেইট কত? 

রুবি কিছু না ভেবেই ট্রাকে উঠে পরে ড্রাইভারের দিকে না তাকিয়েই বলে আমার নাম রমিসা বাই আর টাকা লাগব না। কাজ শেষে একটা পান খাওাইস, মিষ্টি পান... 

লেখক,
ফাহমিদা ফাম্মী
প্রভাষক ও উপন্যাসিক

user
user
Ad
Ad