`

হঠাৎ বৃষ্টি এবং রঙিন ছাতা!

  • Views: 1583
  • Share:
জুলাই ২৫, ২০২০ ১৬:১৩ Asia/Dhaka

খাইরুন নাহার চৌধুরী:: স্কুল ছুটির পর মাঝে মাঝে কিছুক্ষণ রিক্সার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। আমাদের প্রাইভেট রিক্সা চালক সামাদ ভাই বিড়ি সিগারেট ফুঁকতে এদিক সেদিক যাওয়ার কারণে এই অপেক্ষা। সেই ছুটির সময়টাতে হেংলা পাতলা এক তরুণকে মাঝে মাঝে দেখতাম হেঁটে স্কুলের সামন দিয়ে যাচ্ছেন।

হঠাৎ চোখাচোখি হলে, তিনি অদ্ভুত এক কৌশলে প্যান্টের বেল্ট টেনে টেনে উপরের দিকে উঠানোর চেষ্টা করতে করতে হাওয়া হয়ে যেতেন। আমি মনে মনে ভাবতাম, এই লোকটার তো শার্ট প্যান্ট সব জায়গা মতোই আছে, খামাকা এরকম করছেন কেনো? 

আমি তখন ক্লাস টেনে। আষাঢ় শ্রাবণের এই সময়টার কথা। স্কুল ছুটি হয়েছে, আমরা যথারীতি রিক্সার অপেক্ষায়। এর মধ্যে হুড়মুড় করে আমাদের বিখ্যাত সিলেটি মেঘ চলে আসলো। বেশ খানিকটা ভিজেও গেলাম। হঠাৎ দেখি সেই হেংলা পাতলা তরুণ দৌড়ে এসে উনার রঙিন ছাতাটা আমাকে দিয়ে বললেন," আপনি ভিজে যাচ্ছেন,এটা রাখেন প্লিজ, পরে ফেরত দিলেও চলবে।" কথাটি বলেই  বেচারা তাঁর স্বভাব মতো দ্রুত চলে গেলেন।

আমি খেয়াল করে দেখলাম, তিনি আমাদের স্কুলের(কিশোরী মোহন) পাশে "সিলেট নার্সিং হোম" নামের একটা ক্লিনিকে ঢুকে পড়লেন। বিষয়টি এতোটাই দ্রুত ঘটলো যে, আমি কিছু বলবার সুযোগ পাইনি।
 আমাদের ড্রাইভার সামাদ ভাই বললেন, "বালা মাইষর ফুয়া মনো অয়, থাখুক ছাত্তি ইটা, বাদে ফিরত দিয়া আইমুনে।" আমি বাসায় চলে আসলাম। তারপর থেকে এই ছাতাটি সামাদ ভাইয়ের হাওলায়। তিনি সেই তরুণকে ছাতা ফিরত দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। আমার সাথে উনার আর কখনও দেখা হয়নি। একদিন দেখলাম, সেই নার্সিং হোমটাই উঠে গেছে। সেখানে তার বদলে একটি কমিউনিটি সেন্টার হয়েছে, পরে যেটি আড়ং ছিল। 

এই ঘটনার নয় বছর পর আমার মেয়ের জন্ম হলো সিলেটের ধুপাদিঘীর পারের "সিলেট নার্সিং হোম" নামের একটি ক্লিনিকে। বর্তমানে সেটাও নেই, সম্ভবত এখন সেখানে একটি কমিউনিটি হল। এই নার্সিং হোমের বিষয়টি বড়ই অদ্ভূত! যেখানেই কার্যক্রম শুরু করে,কিছুদিন পরে সেটা বন্ধ হয়ে কমিউনিটি সেন্টারে পরিনত হয়। 

তো যে দিন আমার মেয়ের জন্ম হলো, সেদিন ছিল শুক্রবার, বৌদ্ধ পূর্ণিমাও ছিল। আর সম্ভবত কোরবানি ঈদের ছুটিও চলছিল। সব বন্ধ মিলিয়ে ডাক্তার সাহেবরা তখন লম্বা হলিডেতে ছিলেন। ক্লিনিকে গাইনি ডাক্তার নেই। পরিচিত কয়েকজন ডাক্তারের খোঁজ নিয়ে জানা গেলো উনারা কেউ দেশে নেই। খুব জটিল একটা পরিস্থিতি । তারপরেও বহু কষ্টে ডাক্তার মেনেজ করা হলো।

আমার মেয়ে আমার কোল আলো করে আসলো। সেদিন সন্ধ্যায় আমার শরীর কিছুটা ভালো বোধ করায় সবার সাথে টুকটাক কথাবার্তা বলছিলাম, এমন সময় এক ডাক্তার পারমিশন নিয়ে রুমে ঢুকলেন। আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন " এখন কেমন ফিল করছেন?" আমি উনাকে দেখে তো অবাক! সেই হেংলা পাতলা তরুণ, যিনি আমাকে ছাতা দিয়েছিলেন। তিনি যে নার্সিং হোমের ডাক্তার ছিলেন, সেটা জানতাম না। ভদ্রলোকের এই নয় বছরেও কোনো পরিবর্তন হয়নি। আমি উনার প্রশ্নের উত্তরে বললাম, "আপনার ছাতাটা তো দেয়া হলো না।" উনি হেসে দিয়ে বললেন, "মনে আছে তাহলে!?" আমার আর মেয়ের কোশলাদি জিজ্ঞেস করে বিদায় নিলেন। 

পরে আম্মার কাছে শুনলাম, এই ডাক্তার ভদ্রলোক নাকি সারাদিন ছুটোছুটি করে সব মেনেজ করেছেন, এমন কি রক্তের প্রয়োজন হলে নিজে দেয়ার কথাও জানিয়েছিলেন। উনি সেদিন না থাকলে হয়তো বিপদে পড়তে হতো। মানব জীবনে যে কতো রকমের গল্প লুকিয়ে আছে ! 
(গল্পের সাথের ছবিটা এঁকেছেন প্রিয় Fatima Nargis Rosy)। 

user
user
Ad
Ad